শাহরিয়ার শিমুল-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

একটি আসিফ মহিউদ্দিন,একজন লেখা

লিখেছেন: শাহরিয়ার শিমুল

সামুতে মে বি তারে ব্যান করা হইছে,বা যে কারনেই হোক তার লেখা গুলো খুজে পাইতেছি না। আসিফ ভাইয়ের এই লেখা টা হারিয়ে যাওয়া উচিত না। আমার কাছে ছিলো, পোস্ট করে দিলাম। আর ব্যাক্তিগত ভাবে বলবো এরকম যুক্তিপুর্ণ লেখা খুব কমই পরছি

>>>>

ব্লগ, ফেসবুক স্ট্যাটাস বা মাইক্রোব্লগ আসলে কী? একজন ডায়রী লিখতো, এখন সে তার ডায়রীর কথাগুলো ব্লগে লেখে। এগুলো ভাল হতে পারে, খারাপ হতে পারে, উঁচুমানের সাহিত্য হতে পারে বা নিম্নমানের কটুক্তিও হতে পারে, এমনকি খুব অশালীন যৌন উত্তেজক লেখাও হতে পারে। কিন্তু একজনার ডায়রীর লেখাগুলো প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে নিয়ে এসে সেগুলো লক্ষ লক্ষ মানুষের বেডরুমে পৌছে দেয়া এবং তা পড়তে বাধ্য করার জন্য তাহলে কাদের গ্রেফতার করা জরুরী? কোন লেখা ছাপার যোগ্য আর কোন লেখা ছাপার যোগ্য নয়, এতটুকু দায়িত্বশীলতা কী ঐ সকল সাংবাদিকদের থেকে আমরা আশা করতে পারি না?
অনলাইনে আপনার কারো লেখা পছন্দ নয়? আপনাকে কেউ কোন ব্লগ বা লেখা পড়তে বাধ্য করতে পারবে না। কোন লেখা পড়তে গেলে আপনারই সেই লেখকের ব্লগে ঢুকতে হবে, আপনারই সেই লেখককে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে হবে, আপনারই তাকে খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে। ভাল না লাগলে তাকে ব্লক করে দিয়ে তার লেখা পড়া থেকেও আপনি বিরত থাকতে পারেন। আপনাকে কেউ বাধ্য করতে পারবে না, কেউ আপনার সামনে সেগুলো নিয়ে আসবে না। গুগলে ফেসবুকে ইয়াহুতে সার্চ দিলে লক্ষ লক্ষ ধর্ম অবমাননাকর লেখা চলে আসবে, সেগুলো পেতে হলে আপনাকেই সার্চ বাটনে ক্লিক করতে হবে।

কিন্তু এই কাজটিই করে তা প্রচার করেছে ‘আমারদ্বেষ’-এর মাহমুদুর রহমান, এই কাজটিই করেছে ইনকিলাবের ‘বাহাউদ্দীন’, এই কাজটিই করেছে দিগন্ত টেলিভিশন থেকে শুরু করে অনেকেই। লক্ষ লক্ষ মানুষকে তা পড়তে বাধ্য করেছে, বেডরুম পর্যন্ত পৌছে দিয়েছে ব্লগের ঐ বিশেষ লেখাগুলো।

তারা যদি ব্লগের যৌক্তিক এবং চমৎকার আলোচনাগুলো ছেপে দিতেন, তাহলে সমস্যা ছিল না। কিন্তু তারা এমন কিছু লেখা ছেপেছেন যা আসলে রাজীবের লেখা কিনা, তা নিয়ে নানামুখী বক্তব্য আছে। তাহলে সেই লেখাগুলো ঘরে ঘরে পৌছে দিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধাবার জন্য কাদের গ্রেফতার করা জরুরী?

ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই ঘোষণা ব্লগস্ফিয়ারে বাক-স্বাধীনতার উপরে একটি হস্তক্ষেপ। বাঙলা ব্লগস্ফিয়ারে জনগণ সচেতন এবং তারা খুব ভালভাবেই শত্রুমিত্র চিনে নিতে পারে। যারা যৌক্তিক অবস্থান থেকে লিখবে তাদেরকে জনগণ সমর্থন করবে, যারা অযৌক্তিক মিথ্যাকথা লিখবে তাদের বাতিল করবে। এইখানে যত বেশি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে, পাঠকের লেখার মান বিচারের দায়িত্ব যখন সরকার গ্রহণ করবে, তখন তা বিপদজনক হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে অবশ্যই কিছু নিয়ম কানুন মেনে লিখতে হবে। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহারের ইচ্ছায় যদি প্রিন্ট মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরী।

প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গকে অনুরোধ জানাবো, অবিলম্বে ‘আমারদ্বেষ’, ‘ইনকিলাব’, দিগন্তটিভি’, ‘নয়াদিগন্ত’ নামক দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং ধর্মান্ধ জামাত ইসলামীর প্রচারযন্ত্রগুলোর বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননা এবং হযরত মুহাম্মদের অবমাননামূলক লেখা প্রচারের জন্য এবং ঘরে ঘরে পৌছে দেয়ার জন্য গ্রেফতার করুন। ফেসবুক ব্লগকে এর আওতা থেকে মুক্ত রাখুন, কারণ এই অঞ্চলটা মুক্ত অঞ্চল। এখানে পাঠক দায়িত্বশীলতার সাথেই যাচাই বাছাই করে, এই দায়িত্বটুকু অনলাইনের পাঠকের হাতেই ছেড়ে দিন। প্রগতিশীল মুক্তমনা স্বাধীনচেতা মানুষের উপরে আস্থা রাখুন, দিনশেষে ঠকবেন না।

বাঙলা সিনেমায় সেন্সরবোর্ড নামক একটি কুৎসিত ব্যাপার প্রোমোট করার পরে বাঙলা সিনেমায় ভালগার এবং বিকৃতরুচির কাটপিস বৃদ্ধি পেয়েছিল, বিকৃত পর্ণের ছড়াছড়ি শুরু হয়েছিল। আমরা চাই না মানূষ অনলাইনে বিকৃতরুচির পর্ণে আসক্ত হোক, যেমনটা আমরা দেখি পাকিস্তানে। এনিমেল পর্ণ সার্চে পাকিস্তান এখনও গৌরবের সাথে প্রথম স্থান দখল করে আছে। তাই যত বেশি নিয়ন্ত্রণ, তত বেশি নোংরামিতে এই মুক্ত অঞ্চলটি পরিপূর্ণ হবে। ধর্মের পক্ষ বা বিপক্ষে নিজের মতামত প্রকাশ মানুষের অধিকার, এই অধিকার হরণ করা হলে বাঙলাদেশ আসলে বাঙলাস্থানের দিকেই অগ্রসর হবে।
একদিন বর্বর আরবদের দেশে একজন সাধারণ মানুষ বাপদাদার ধর্ম ত্যাগ করে সেই সময়ের সমাজ, ধর্ম, প্রথা এবং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন; সেই দেশের প্রচলিত ধর্মের নামে অনাচার, মূর্তিপূজা, মেয়েদের জন্মের সময়ই মাটিতে পুতে ফেলার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেনতিনি বললেন, এই সব অনাচার বন্ধ হোক, এই সব আইন মানি না, সকল ধর্ম ভুল এবং মিথ্যাধর্মের নামে কোন অনাচার চলতে দেয়া হবে না 
তিনি তৎকালীন ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন, যেমনটা করেছিলেন সক্রেটিস, যেমনটা করেছিলেন গৌতম বুদ্ধসে সময়ে প্রচলিত আইনে তার বিরুদ্ধেও নেমে এসেছিল দমন পীড়ন, মৃত্যু হুমকিতার পিঠে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল উটের নাড়িভূঁড়ি, তার উপরে চলত নিদারুণ অত্যাচারতার অনুসারীদের হত্যা করা হলো, তাকে ভয়ভীতি দেখানো হলোতাকে বলা হলো প্রচলিত দেবতাদের সম্মান করে কথা বলতে, তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না করতেকিন্তু তিনি দমে গেলেন নাপ্রতিবাদ আর প্রতিরোধে মুখর হলেনচেষ্টা চালিয়ে গেলেন বর্বর আরবদের বর্বর সব প্রথার বিরুদ্ধেশক্তিশালী বক্তব্য দিয়ে আঘাত করতে লাগলেন সেই সব প্রথা নামের অনাচারের বিরুদ্ধেপৌত্তলিক ধর্মগুলোকে প্রশ্ন করলেন, সন্দেহ করলেন, এবং অবিশ্বাস করলেন, বাতিল ঘোষণা করলেনমূর্তিগুলোর বিরুদ্ধে কথা বললেনতিনি বললেন মূর্তিগুলোর ক্ষমতা থাকলে তার ক্ষতি করে দেখাকসে সময়ে এই ধরণের কথা অত্যন্ত ভয়ংকর পাপ বলে বিবেচিত হতো, ঈশ্বরের অবমাননা বলে বিবেচিত হতো, ঠিক এখন যেমন ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বললে ধার্মিকগণ ক্ষেপে ওঠে, সে সময়েও একই অবস্থা ছিলপ্রচলিত প্রথা এবং ধর্মবিরোধিতার অভিযোগে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হলোতিনি পালিয়ে গেলেন মদিনায় 
সেই লোকটির নামই হযরত মুহাম্মদ, তার প্রবর্তিত ধর্মের নাম হচ্ছে ইসলাম ধর্মতিনি কাবায় ৩৬০ টি মূর্তি ধ্বংস করেছিলেন, তৎকালীন ধর্মগুলো মিথ্যা বাতিল ঘোষণা করেছিলেন 
তিনি ছিলেন তার সময়ের বিপ্লবী, সমাজ সংস্কারক, প্রথাবিরোধীঠিক যেমন আমাদের অঞ্চলে প্রথাবিরোধী, সমাজসংস্কারক ছিলেন লালন ফকির, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, আরজ আলী মাতুব্বর, আহমদ শরীফ বা হুমায়ুন আজাদ; রাজনীতির ক্ষেত্রে মহাত্মা গান্ধী, শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন আহমেদ, মনি সিংহ 
সেসময়ে প্রথার রক্ষকরা ছিলেন মক্কার প্যাগান এবং কাফেরগণ, এসময়ের প্রথার রক্ষকরা হচ্ছেন ধর্মান্ধ মৌলবাদীগণসে সময়ে প্রয়োজন ছিল নতুন ধর্মের, সময়ে প্রয়োজন ধর্ম বর্ণ জাত পাত ভেদাভেদহীন একক মানব সমাজের
মুক্তচিন্তা অথবা নাস্তিক্যবাদ হচ্ছে যুক্তিপ্রমাণহীন কিছু দাবীকে অস্বীকার করার দর্শন, সে সম্পর্কে অনুসন্ধান-পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কোন তত্ব বাতিল করার প্রজ্ঞাযখন একজন নাস্তিক কোন ধর্মদর্শনকে বাতিল করবে, যুক্তিপ্রমাণ দিয়ে তা ভুল প্রমাণ করবে, স্বাভাবিকভাবেই সেই ধর্মটিও প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচিত হবেএই দেশ ইসলাম প্রধান বলে স্বাভাবিকভাবেই ইসলাম নিয়েই বেশী আলোচনা হবে, যেমন ডকিন্স-হিচেন্স-হ্যারিস খ্রিষ্টধর্ম নিয়ে বেশী আলোচনা করেছেন, যেমন এপিকুরাস তৎকালীন প্যাগান ধর্মের সমালোচনা করেছেন, গৌতম বুদ্ধ বেদের সমালোচনা করেছেন, আরজ আলী করেছেন ইসলাম হিন্দু এবং খ্রিষ্ট ধর্মের সমালোচনা-বিশেষভাবে ইসলামেরপ্রতিটি প্রথাবিরোধী সমাজসংস্কারক স্ব স্ব অঞ্চলে স্ব স্ব সময়ে প্রচলিত ধর্ম প্রথারই সমালোচনা করেছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাতিল ঘোষণাও করেছেন 
আজ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা ধর্ম অবমাননার কথা যদি আসেই, তাহলে যুগে যুগে সকল প্রথাবিরোধী, প্রচলিত ধর্মবিরোধী, আইন কানুন বিরোধী বিপ্লবী সমাজসংস্কারকদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবেতারাও তাদের সময়ে ধর্মের অবমাননাকারী, নতুন ধারণা এবং বিপ্লব সৃষ্টিকারীমুহাম্মদ সে সময়ের প্রচলিত ধর্মের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিল, শেখ মুজিবুর রহমান সে সময়ে প্রচলিত রাষ্ট্র এবং আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলযারা ধর্মের অবমাননার ধোঁয়া তুলে প্রথাবিরোধীদের দমন করতে চায়, তারা হযরত মুহাম্মদের সময়ের সেই সকল কাফেরদেরই বংশধর যারা প্রথাবিরোধী মুহাম্মদকে নির্যাতন করেছিলআর যারা নতুন চিন্তা, নতুন ধারণা, নতুন মতবাদ প্রচার করতে গিয়ে ঘাতকের দ্বারা রক্তাক্ত হয়, আইনের দ্বারা নির্যাতিত হয়, তারাই মুহাম্মদের প্রকৃত অনুসারী, তারাই বিপ্লবী চেতনার মানুষ 

 

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/unsocial/17284.html

 2 টি মন্তব্য

  1. Kazi Ahmad Pervez

    কয়েক মাস আগে আমার একটা ফেসবুক স্ট্যাটাসে ব্লগ এবং ডাইরী লিখার তুলনা করেছিলাম। এই পোস্টটার প্রথম দিকে একই ধরনের ব্যাখ্যা দেখে খুউবই প্রীত হলাম। দেখুনঃ http://www.facebook.com/Pervez840/posts/10151575544101427সেসময়ে অনেক জ্ঞানীগুনীজন আমার এই সব এনালজির ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। আজ এই লিখাটা পড়ে বেশ স্বস্তি পেলাম। আমার দলে আরও মানুষ আছেন যারা আমারই মত আপত্তিকর বিষয়ের লেখকের চেয়ে প্রচারককে বেশি দায়ী মনে করেন।সুন্দর একটা রাইট-আপ উপহার দেয়ার জন্য ধন্যবাদ…

    1. অসামাজিক

      যাহোক ভাই, আপনার সমমনা একটা লেখা খুজে দিতে পেরে ভাল লাগলো

মন্তব্য করুন