তারিক লিংকন-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, প্রসঙ্গঃ ৩০ লাখ বাঙালী হত্যার আইকনিক মিথ

লিখেছেন: তারিক লিংকন

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পাকিস্তানি হানাদার সামরিক জান্তা নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ২৮ মার্চ ১৯৭১-এর নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, অপারেশন সার্চলাইট-এর ঐ একরাতের হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারায় ১০,০০০ নিরস্ত্র বাঙালী, যদিও ১ এপ্রিল নিউইয়র্ক টাইমস বলে ৩৫,০০০ হাজার বাঙালীর প্রাণহানি হয় অপারেশন সার্চলাইট’র একরাতে। সিডনির মর্নিং হেরাল্ড ২৯ মার্চ ১৯৭১-এ বলেছে অপারেশন সার্চলাইটে মোট নিহতের সংখ্যা ১০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ জন হতে পারে।

২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু। তিনি গ্রেফতারের পূর্বে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর থেকে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে আটক ছিলেন। গোটা বাঙলা যখন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করছে, বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে প্রহসনের বিচারে ফাঁসির আসামি হিসেবে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বাঙালিদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলে বিশ্বনেতারা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠেন এবং এ বিষয়ে শক্তিশালী জনমত সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক চাপে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের স্বাধীন স্বদেশ ভূমিতে ফেরা

অপেক্ষার পালা শেষে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে পিআইয়ের একটি বিশেষ বিমানে লন্ডনে পৌঁছে সাংবাদিকদের কাছে বিবৃতি দেন। ১০ জানুয়ারি ব্রিটেনের রাজকীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে নয়াদিল্লি হয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে সেদিন লাখো লাখো জনতার সামনে ভাষণে বঙ্গবন্ধু আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, যারা বর্বর বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, তাদের আত্মার প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। লক্ষ মানুষের প্রাণদানের পর আজ আমার দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আমার জীবনের স্বাদ পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার প্রতি জানাই সালাম। তোমারা আমার সালাম নাও। আমার বাংলায় আজ এক বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। ৩০ লক্ষ লোক মারা গেছে। আপনারাই জীবন দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন। বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বাস করবে। খেয়ে পরে সুখে থাকবে, এটাই ছিল আমার সাধনা।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে আরও বলেছিলেন, ‘ইয়াহিয়া খান আমার ফাঁসির হুকুম দিয়েছিলেন। আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। বাঙালিরা একবারই মরতে জানে। তাই আমি ঠিক করেছিলাম, আমি তাদের কাছে নতি স্বীকার করবো না। ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলবো, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা। তাদের আরো বলেছি তোমরা মারলে ক্ষতি নাই। কিন্তু আমার লাশ বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও।’

১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সালের অবিরাম মিথ্যাচার আজ দেশের কিছু মানুষকে বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছে যে বঙ্গবন্ধু ঐদিন (১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে) ভুলে ৩ লক্ষ শহীদের কথা বলতে গিয়ে ৩০ লক্ষ বলে ফেলেছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী বা ছদ্ম স্বাধীনতাবিরোধীরা ২১ বছরের ক্রমাগত মিথ্যাচারে সমাজের একাংশের কাছে ঠিকই এই মিথ্যাটাকে সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। আজ বঙ্গবন্ধুর এই আইকনিক সংখ্যার বিতর্কের অবসান ঘটাতে কিছু বলতে চাই। শুরুতে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক সংজ্ঞা জেনে নিই-

Genocide বা গণহত্যা: Among other things, the killing of people by a government because of their indelible group membership (race, ethnicity, religion, language). অর্থাৎ গণহত্যা হচ্ছে এমন একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড যা কোন সরকার বা শাসক কোন অমোচনীয় জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, ধর্মীয় বা ভাষাগত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালনা করে।

Politicide বা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড: The murder of any person or people by a government because of their politics or for political purposes. অর্থাৎ কোন সরকার বা গোষ্ঠী যদি কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকে তবে সেইরকম হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলা হবে।

Mass Murder বা নির্বিচারে মানব হত্যা: The indiscriminate killing of any person or people by a government. অর্থাৎ একটি সরকার দ্বারা কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের নির্বিচারে হত্যা করা।

Democide: The murder of any person or people by a government, including genocide, politicide and mass murder. Democide is a term revived and redefined by the political scientist R. J. Rummel as “the murder of any person or people by a government, including genocide, politicide and mass murder.” অর্থাৎ কোন সরকার বা শাসক যখন নির্বিচারে গণহত্যা, রাজনৈতিক হত্যা এবং মানব হত্যা করে তখন তাকে সম্মিলিতভাবে ডেমোসাইড /Democide বলা হবে।

পৃথিবীতে যতগুলো স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মুক্তির সংগ্রাম হয়েছে সেগুলোর কোনটাতেই সামরিক-বেসামরিক মৃত্যুর কোন ধরণের নামিয় তালিকা নাই। এমন তালিকা কখনো করা হয়না কারণ এটা করা সম্ভব না। যুদ্ধ একটা অস্বাভাবিক অবস্থা। এটা একদিনের ঘূর্ণিঝড়, রোড ট্র্যাফিক অ্যাকসিডেন্ট, ভূমিকম্পে নিহতের মত কিংবা রানাপ্লাজার মত সীমাবদ্ধ স্থানের বিপর্যয় নয়। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাসের প্রয়োজনে এবং জনগোষ্ঠীর আবেগের সাথে তাল মিলিয়ে যুদ্ধে মৃতের একটা আইকনিক সংখ্যা বা ফিগার বলা হয় যেমন আমেরিকান গৃহযুদ্ধে মৃতের সংখ্যা বলা হয় ৬ লক্ষ ২০ হাজার। এটাও প্রকৃত কোন তালিকাগত সংখ্যা নয়, একটা আইকনিক ফিগার। তবে এই আইকনিক ফিগারেরও একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এবং বাস্তবসম্মত এনালাইসিস থাকে। এইবার আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ বা মুক্তির সংগ্রামে হারানো শহীদদের যে আইকনিক ফিগার আছে তার গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেবঃ

এক,
বিশিষ্ট রাজনীতি বিজ্ঞানী Rudolph Joseph Rummel বা R.J. Rummel তাঁর ‘China’s
Bloody Century
‘ এবং ‘Lethal Politics: Soviet Genocide and Mass Murder Since 1917’ নামের দু’টি গবেষণাধর্মী বইয়ের পরিশিষ্টে গণহত্যার পরিসংখ্যান কিভাবে করতে হয় সেটার একটা মেথডোলজি দিয়েছেন আগ্রহীরা পুরোটা পড়তে পারেন; নিবন্ধটি ‘ESTIMATING DEMOCIDE: METHODS AND PROCEDURES ESTIMATING DEMOCIDE: METHODS AND PROCEDURES’ সম্পূর্ণ পড়ুন এইখানে। তাঁর গবেষণায় তিনি নিম্ন, মধ্যম এবং উচ্চ সম্ভাবনার স্কেলে মানুষের হত্যার হিসেব করেছেন। তাঁর STATISTICS OF DEMOCIDE, Chapter 8, Statistics Of Pakistan’s Democide Estimates, Calculations, And Sources তিনি দেখিয়েছেন বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তির সংগ্রামে ৩০,০৩,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

টেবিল- ১ ডেমিসাইড বাংলাদেশ [পূর্ণাঙ্গ দেখতে এইখানে ক্লিক করুণ] এই তালিকা/ টেবিলের ৩৩ নম্বর সারিতে R.J. Rummel ৩০ লক্ষ ৩ হাজার মানুষের প্রাণ হারানোর কথা বলেছেন উচ্চ সম্ভাবনার কলামে আর মধ্যম সম্ভাবনায় বলেছেন ১৫ লক্ষের কথা। আর রিফিউজি বা শরণার্থীর ক্ষেত্রে ৩৭ নম্বর সারিতে মধ্যম এবং উচ্চ হিসেবে যথাক্রমে ১ কোটি এবং ১ কোটি ২০ লক্ষের কথা বলেছেন।

যদিও সঠিক হিসেবে ৩ ডিসেম্বরই ১ কোটি ১০ লক্ষ বা ১১ মিলিয়ন শরণার্থীর কথা ইতিহাস জানে, তবুও এইখানে বলে রাখা ভাল যে রিফিউজির মিছিল ১৫ ডিসেম্বর’৭১ পর্যন্ত ভারতে গিয়েছিল আর মায়ানমারে যাওয়া শরণার্থীর কোন হিসেবে আমরা আজ পর্যন্ত পাইনি, অর্থাৎ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উচ্চ সম্ভাবনার হিসেবটাই গ্রহণযোগ্য মনে হয়।

টেবিল –২ জেনোসাইড বাংলাদেশ [পূর্ণাঙ্গ দেখতে এইখানে ক্লিক করুন] অর্থাৎ কোন অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধু ভুলে ৩ লক্ষকে ৩০ লক্ষ বলেন নি, ত্রিশ লাখ শহীদের কথা তিনি সচেতনভাবেই বলেছেন।

দুই, 
মানব সভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস সেই শাসক দম্ভ করেই ৩০ লক্ষ খুনের কথা বলেছিলেন। মানবতা যা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জার্নাল এবং মিডিয়ায় প্রকাশ পায়। At a meeting of the military top brass, Yahya Khan declared: “Kill 3 million of them and the rest will eat out of our hands.” Accordingly, on the night of 25 March, the Pakistani Army launched Operation Searchlight to “crush” Bengali resistance in which Bengali members of military services were disarmed and killed, students and the intelligentsia systematically liquidated and able-bodied Bengali males just picked up and gunned down. [Source: Robert Payne, Massacre [1972], p. 50 & According to the Asia Times]

তিন,
defence.pk ওয়েবসাইটের ‘The Radical Truth: Teaching MPACUK the forgotten chapter of Pakistan’s history’ শীর্ষক নিবন্ধে কি বলা আছে একটু দেখুনঃ
“It’s common knowledge that Pakistan does not teach its school children the truth about its brutalities during 1971, when East Pakistan broke away to become Bangladesh. The Guinness Book of Records lists the Bangladesh Genocide as one of the top 5 genocides in the 20th century, yet it’s hardly featured in Pakistan’s textbooks, academic discussion or the media. On the 40th Victory Day of Bangladesh, BBC Radio 4 documented how the Pakistani school children perceive Bangladesh Liberation War; they’re in a state of denial of Pakistan’s genocide of Bengali people in former East Pakistan. They have been taught by the propagandist a conspiracy of Hindu Indians causing tensions between the two Muslim wings of Pakistan. The children’s deny Pakistanis could ever do such things to their brothers and sisters in Bangladesh! In one sense these children are also suffering abuse by their own government by being denied the truth. Pakistanis are suffering from this curse even today except of course, the military elite who live on American handouts to the tune of billions of dollars.” [নিবন্ধটির প্রথম প্যারা এইটি]

তৃতীয় প্যারায় ব্রিটিশ একজন পাকিস্তান ইতিহাসবিদের বরাত দিয়ে বলছেঃ “In 1971, over 9 months, President Yahya Khan and his military commanders with the aid of local collaborators committed mass atrocities on unarmed civilians, killed an estimated three million people, raped over 300,000 women, destroyed innumerable homes to crush the rebellion, which was termed an “Indian-inspired” conspiracy. The minority Hindu community was particularly targeted. This unprecedented atrocities led to a mass exodus to India, where an estimated 10 million people took refuge.” এই নিবন্ধেই গিনিস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড বুকের স্বীকৃতির কথা বলা আছে। তাই আলাদা আরেকটি পয়েন্টে দিলাম না।

চার,
বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আগের কিছুদিনের দৈনিকগুলো একটু দেখিঃ
দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদক তাঁর পত্রিকায় ২২ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ “ইয়াহইয়া জান্তার ফাঁসি দাও” শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় লিখেন। তাঁর কলামে এইভাবে ফুটে উঠে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার রূপ এইভাবে “হানাদার দুশমন বাহিনী বাংলাদেশের প্রায় ৩০ লাখ নিরীহ লোক ও দু’শতাধিক বুদ্ধিজীবিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে…”

এরপর আন্তর্জাতিক মহলের দিকে তাকালে দেখি রাশিয়ার কমিউনিষ্ট পার্টির মুখপত্র প্রাভদা পত্রিকা ডিসেম্বরেই ৩০ লক্ষ শহীদের বিষয়টি তাদের পত্রিকায় প্রকাশ করে। “over 30 lakh persons were killed throughout Bangladesh by the Pakistani occupation forces during the last nine months”। যার বাঙলা সংস্করণে১৯৭২ সালে ৫ জানুয়ারি শিরোনাম হয় ‘দখলদার বাহিনী বাংলাদেশে ত্রিশলক্ষাধিক মানুষ হত্যা করেছে’

ঢাকার পত্রিকা দৈনিক অবজারভার শিরোনাম করে এভাবে, “Pak Army Killed over 30 Lakh people” যেটা প্রকাশিত হয় ০৫ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে, বঙ্গবন্ধুর দেশে আসার ৫ দিন আগে।

পাঁচ,
উইকিপিডিয়ার List of genocides by death toll নিবন্ধের ৪ নম্বর তালিকায় একাত্তরের নৃশংস গণহত্যা। সময়ের ব্যপ্তিতে মাত্র ৯ মাসে এমন গনহত্যা নজির দুনিয়ায় আর নেই। এইখানেও ৩ মিলিয়ন বা ৩০ লক্ষ মানুষের প্রাণহানির কথা বলা আছে। তালিকাটি দেখুন এবং পাশে শেষ কলামের নোটে কি লিখা আছে পড়ুনঃ

List of genocides by death toll


নোটটি পড়ুন

ছয়,
“Sheikh Mujib’s government says that three million Bengalis died between March and December of 1971. The figure is probably inflated but certainly the terrors and atrocities committed here- in Dacca and all across this gentle land of rivers and marshlands- came close to genocide.” অর্থাৎ ‘শেখ মুজিবের সরকার বলছে, দেশে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে ৩০ লক্ষ বাঙালি নিহত হয়েছে। সংখ্যাটি হয়তো অতিরঞ্জিত, কিন্তু সে সময় ঢাকাসহ এই বিস্তীর্ণ নদীমাতৃক দেশের প্রতিটি প্রান্তে যে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে তা নিঃসন্দেহে গণহত্যার এই নৃশংসতার খুব কাছাকাছি’। [NatGeo, Sept 1972; Article: "Bangladesh: Hope Nourishes a New Nation"]. সম্পূর্ণ নিবন্ধটির বাঙলা ভাবানুবাদ করেছেন শিক্ষানবিস নামের bangladesh-71.info এর একজন ব্লগার। তাঁর সম্পূর্ণ অনুবাদ পড়ুন এইখানে

ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনের সেপ্টেম্বর, ১৯৭২ সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়। সেই ২৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনেরই বাংলা অখণ্ড ভাবানুবাদ এটি। সাথে ভিয়েতনাম যুদ্ধের আলোকচিত্রী ডিক ডুরেন্সের তোলা ছবিগুলোও আছে।

সাত, 
Samuel Totten, William S. Parsons & Israel W. Charny সংকলিত ‘Century of Genocide: Critical Esssesy and Eyewitness Accounts’ গবেষণা গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় নিউইয়র্ক এবং লন্ডনের Routledge প্রকাশনী থেকে। সেই গ্রন্থের ৯ম চ্যাপ্টার ‘Genocide in Bangladesh’ নিবন্ধটি লিখেছেন রওনাক জাহান, তিনিও ৩ মিলিয়ন হত্যা এবং কোয়ার্টার মিলিয়ন নারী ধর্ষণের কথা বলেছেন। [বইটির ২য় সংস্করণের ২৯৫ পৃষ্ঠা দেখুন]

আট,
বিভিন্ন সময়ে দেশের ৩৫টি স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করে সেগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মোট কতগুলি স্থান বধ্যভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সেই সংক্রান্ত কোনো তালিকা পাওয়া যায় না; তবে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এদেশে প্রায় ৯৪২টি বধ্যভূমি শনাক্ত করেছে। এরমধ্যে চট্টগ্রামে ১১৬টি স্থানকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও দেশের আনাচে কানাচে সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে আরও অগণিত বধ্যভূমি। এর মধ্যে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী বধ্যভূমি স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক প্রফেসর ড. গাজী সালেহ উদ্দিন জানান, স্বাধীনতার পর এ বধ্যভূমির শুধু একটি গর্ত থেকেই প্রায় ১ হাজার ১০০ মাথার খুলি উদ্ধার করা হয়। সংগৃহীত কঙ্কাল এখনও সংরক্ষিত রয়েছে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের স্মৃতি অম্লান জাদুঘরে। একাত্তরের এপ্রিল থেকে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে ২০ হাজারের মতো বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালে ঢাকায় হত্যা করে রায়েরবাজারে এনে ফেলে রাখা হতো। আর চট্টগ্রামে লোকজনদের ধরে এনে হত্যার কাজটি চলত পাহাড়তলীতে। যেখানে বধ করা হয় সেটাই বধ্যভূমি। সে হিসেবে পাহাড়তলী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বধ্যভূমি। রায়েরবাজার এবং জল্লাদখানা বধ্যভুমির মোট লাশের সংখ্যা কখনই নির্ণয় করা যাবে না। অর্থাৎ আমরা যদি না পাওয়া বধ্যভুমির কথা হিসেব করে সর্বসাকুল্যে মোট ১৫০০ বধ্যভূমির সংখ্যা ধরে নেই তবে প্রতি বধ্যভূমিতে ২০০০ করে লাশ থাকলেই মোট প্রাণ হারানো বাঙালীর সংখ্যা হয় ৩০ লক্ষ! কিন্তু এমন অনেক বধ্যভূমি আছে যেইখানে ২০ হাজারেরও অধিক মানুষের লাশ আছে আবার ১০০/২০০ লাশের বধ্যভূমিও আছে কিন্তু অন্যদিকে আমরা কখনই নদীমাতৃক বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া লাখ শহীদের কোন হিসেব পাব না।

নয়,

ইউনাইটেড নেশনস-এর ডিক্লারেশন অফ ইউনিভারসাল হিউম্যান রাইটস ১৯৮১ সালে লিখেছে ‘মানব সভ্যতার ইতিহাসে যতগুলি গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে অল্প সময়ের মধ্যে সব থেকে বেশি সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বাংলাদেশে, ১৯৭১ সালে। প্রত্যেক দিন গড়ে ৬০০০ থেকে ১২,০০০ হাজার মানুষ খুন হয়েছিল। গণহত্যার ইতিহাসে এটাই সর্ব্বোচ্চ প্রাত্যহিক গড়’; যদিও অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম রাতের প্রাণহানির সংখ্যা ছিল কমপক্ষে ৩৫,০০০; বাংলাদেশে দখলদারি পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রায় ২৬০ দিন (২৫ শে মার্চ, ১৯৭১ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ পর্যন্ত) এই নৃশংসতা চালিয়ে যায়। এবার ইউনাইটেড নেশনসের দেওয়া দিন প্রতি নিহতের সংখ্যাকে ২৬০ দিয়ে গুণ করলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে নিহত বাঙ্তেগালিদের সর্ব নিম্ন সংখ্যা ১,৫৬০,০০০ (পনেরো লক্ষ ষাট হাজার ) এবং সর্বোচ্চ সংখ্যা ৩, ১২০,০০০ (একত্রিশ লক্ষ কুড়ি হাজার) যা গড় করলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ২,৩৪০,০০০ (তেইশ লক্ষ চল্লিশ হাজার)।

দশ,
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় সাত কোটি (যদিও সাড়ে সাত কোটি বা ৭.৯ কোটির হিসেবও মিলে); সেই সময় সাধারনভাবে একটি বাঙ্গালি পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল পাঁচজন অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষ পরিবার। সেই হিসেবে পরিবার পিছু নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ০.২১ অথবা অন্তত একজন সদস্য মারা গেছে এমন পরিবারের ২১ শতাংশ। অবশ্য এই রকম বহু পরিবার ছিল যাদের একাধিক সদস্য নিহত হয়েছিলেন। আবার এমনও অনেক পরিবার ছিল সে পরিবার সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

এগারো,
প্রত্যেক পাকিস্তানি সেনা (ধরে নিলাম ৯০,০০০ সৈন্য পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধ করেছে) ২৬০ দিনে ৩৩.৩৩ জন অর্থাৎ ৭.৮ দিনে একজন করে বাঙালী হত্যা করলেই ২৬০ দিনে ৩০ লক্ষ হত্যা হয়। ৯০,০০০*(২৬০/৭.৮)=৩০ লক্ষ। এই দিকে ১ কোটি ১০ লক্ষ শরণার্থীর কতজন যে অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছে তার হিসেব তো করার সুযোগই পেলাম না।

এরপরও যারা নিজের মায়ের রক্তাক্ত ইতিহাস মায়ের ধর্ষকদের এবং তাদের সমমনাদের কাছে শুনে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের ত্যাগ ও অর্জনকে ছোট করতে চায়, তাদের জন্যে ধিক্কার এবং নিকৃষ্টতম ঘৃণা। ৩০ লাখ প্রাণের জন্যে বলবার মত কোন ভাষা আমার জানা নেই,শুধু অফুরন্ত ভালবাসা এবং শ্রদ্ধা…

‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে,
বাংলার আকাশে,
রক্তিম সূর্য আনলে যারা,
তোমাদের এই ঋণ কোনদিন শোধ হবে না।
মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িয়ে,
সাত কোটি মানুষের,
জীবনের সন্ধান আনলে যারা,
সে নামের মহিমা কোনদিন ম্লান হবে না’

 

তথ্যসূত্রঃ
জেনসাইড বাংলাদেশ ডট অরগ
> উইকিপিডিয়া
> ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
> এবং নিবন্ধে দেয়া লিংকসমূহ

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/tlincoln_bd/27829.html

 4 টি মন্তব্য

(ফোনেটিক বাংলায়) মন্তব্য করুন

  1. ফাতেমা জোহরা

    চমৎকার তথ্যপূর্ণ একটি লেখা। যারা এই বিষয়টি নিয়ে এখনো সন্দিহান আমার মনেহয় এই লেখাটি পড়ার পর তাদের সকল সন্দেহ, মিথ্যা ভাবনা কাটিয়ে তুলতে পারবেন।আর এতো চমৎকার তথ্যপূর্ণ একটি লেখার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। 

    1. তারিক লিংকন

      আপনাকেও ধন্যবাদ…  

  2. Farzana Sonia

    জ্ঞানপাপী, সুবিধাবাদী, অকৃতজ্ঞ কিছু মানুষ আছে যারা কেবলমাত্র নিজেদের স্বার্থের জন্য দেশের বিপক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। কখনো আবার এরা বর্ণচোরা হয়ে মিশে থাকে এই সমাজেই। যাদের খোলা চোখে চেনা যায় না। কিন্ত এরা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবেই। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস হয়ত সাময়িকভাবে বিকৃত করা সম্ভব কিন্তু মুছে ফেলা যাবে না কোনদিনই। অতল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা বীর শহিদ আর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি। ধন্যবাদ আপনাকে এত সমৃদ্ধ একটি লেখার জন্য।

    1. তারিক লিংকন

      সুন্দর বলেছেন। আপনাকেও অফুরন্ত ধন্যবাদ…

মন্তব্য করুন