তারিক লিংকন-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

রামপাল বিতর্ক- প্রথম পর্বঃ পরিবেশদ্রোহী বা ঐতিহ্যবিরোধী সরকার ও তার স্বরূপ এবং দ্রোহের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড

লিখেছেন: তারিক লিংকন

এই সরকার রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়ার পর থেকে সচেতন মানুষসকল এবং পরিবেশবাদীরা সরকারকে ঐতিহ্যবিরোধী এবং পরিবেশদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত করেছে অথবা সুন্দরবন ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে দাবী করেছেন। আন্দোলনকারীরা দেশের এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের রক্ষায় রাস্তায় নেমেছে যা আধুনিক এবং সচেতন মানুষ-নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলেরই এর সাথে একাত্মতা থাকা উচিৎ। এখন তার আগে আমাদের যাচাই করে নিতে হবে ৩ টা মৌলিক প্রশ্নের, সেগুলো হল-

১) অভিযুক্ত সরকার আসলেই ঐতিহ্যবিরোধী বা পরিবেশদ্রোহী কিনা?

২) কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কি আসলেই তা পরিবেশের জন্য কতটা হুমকি?

৩)আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে পরিবেশবাদী আমাদের করণীয় কি?

ধারাবাহিক এই পোস্টের প্রথম প্রশ্নের উত্তর খুঁজব এবং কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বরূপ বিশ্বজুড়ে কেমন দেখব। এই লক্ষ্যে প্রথমে আমরা একটু দেখে নিই বাঙলাদেশের জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় এ পর্যন্ত নেয়া সকল সরকারী উদ্যোগ। যেখানে দেখা যাবে বর্তমানে তিন শ্রেণীতে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রচলিত আইন রহিতপূর্বক দেশের জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানকল্পে প্রণীত আইন প্রয়োগের নিমিত্তে সরক্ষিত বন বা উদ্যান সংরক্ষিত আছে, সেগুলো হল- ক) জাতীয় উদ্যান, খ) অভয়ারণ্য এবং গ) বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা।

=>১) অভিযুক্ত সরকার আসলেই ঐতিহ্যবিরোধী বা পরিবেশদ্রোহী কিনা?

ক) জাতীয় উদ্যানঃসংখ্যা মোট ১৭টি, নিম্নে উদ্যানগুলোর আয়তন এবং সংরক্ষনের আওয়তায় অন্তর্ভুক্তির সময়-

১. ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানঃ অবস্থান:গাজীপুর, ঘোষণার তারিখ: ১১.৫. ১৯৮২, মোট আয়তন: ৫০২২ হেক্টর।

২. মধুপুরঃ অবস্থান: টাঙ্গাইল/ময়মনসিংহ, ঘোষণার বছর: ২৪.০২. ১৯৮২, মোট আয়তন: ৮৪৬৩ হেক্টর।

৩. রামসাগরঃ অবস্থান: দিনাজপুর, ঘোষণার বছর: ৩০.০৪.২০০১, মোট আয়তন: ২৭.৭৫ হেক্টর।

৪. হিমছড়িঃ অবস্থান: কক্সবাজার, ষণার বছর: ১৫.০২.১৯৮০, মোট আয়তন: ১৭২৯ হেক্টর।

৫. লাউয়াছড়াঃ অবস্থান: শ্রীমঙ্গল/ মৌলভীবাজার, ঘোষণার বছর: ০৭.০৭.১৯৯৬, মোট আয়তন: ১২৫০ হেক্টর।

৬. কাপ্তাইঃ অবস্থান: রাঙামাটি (পার্বত্য চট্টগ্রাম), ঘোষণার বছর: ০৯.০৯.১৯৯৯, মোট আয়তন: ৫৪৬৪ হেক্টর।

৭. নিঝুম দ্বীপঃ অবস্থান: নোয়াখালি, ঘোষণার বছর: ০৮.০৪.২০০১, মোট আয়তন: ১৬৩৫৩ হেক্টর।

৮. মেধা কচ্ছপিয়াঃ 
অবস্থান: কক্সবাজার, ঘোষণার বছর: ০৮.০৮.২০০৮, মোট আয়তন: ৩৯৬ হেক্টর।

৯. সাতছড়িঃ অবস্থান: হবিগঞ্জ, ঘোষণার বছর: ১৫.১০. ২০০৫, মোট আয়তন: ২৪৩ হেক্টর।

১০. খাদিমনগরঃ অবস্থান: সিলেট, ঘোষণার বছর: ০৬.০৪.২০১০, মোট আয়তন: ৬৭৯ হেক্টর।

১১. বারৈয়াঢালাঃ অবস্থান: চ্ট্টগ্রাম, ঘোষণার বছর: ০৬.০৪.২০১০, মোট আয়তন: ২৯৩৪ হেক্টর।

১২. কুয়াকাটাঃ অবস্থান: পটুয়াখালি, ঘোষণার বছর: ২৪.১০.২০১০, মোট আয়তন: ১৬১৩ হেক্টর।

১৩. নবাবগঞ্জঃ অবস্থান: দিনাজপুর, ঘোষণার বছর: ২৪.১০.২০১০, মোট আয়তন: ৫১৮ হেক্টর।

১৪. সিঙড়াঃ অবস্থান: দিনাজপুর, ঘোষণার বছর: ২৪.১০.২০১০, মোট আয়তন: ৩০৬ হেক্টর।

১৫. কাদিগড়ঃ অবস্থান: ময়মনসিংহ, ঘোষণার বছর: ২৪.১০.২০১০, মোট আয়তন: ৩৪৪ হেক্টর।

১৬. আলতাদিঘীঃ অবস্থান: নওগাঁ, ঘোষণার বছর: ২৪.১২.২০১১, মোট আয়তন: ২৬৪ হেক্টর।

১৭. বীরগঞ্জঃ অবস্থান: দিনাজপুর, ঘোষণার বছর: ২৪.১২. ২০১১, মোট আয়তন: ১৬৯ হেক্টর।

এই ১৭ টি জাতীয় উদ্যানের ১২ টিই আওয়ামীলীগের আমলে (ঘোষণার তারিখ বোল্ড এবং আণ্ডারলাইন করা আছে…) ঘোষণা করা হয়েছে।

খ) বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যঃসংখ্যা মোট ১৭টি, আয়তন এবং সংরক্ষনের আওয়তায় অন্তর্ভুক্তির সময় ডেট সহকারে দেয়া হল-

১. রেমা কালেঙ্গাঃ অবস্থান: হরিগঞ্জ, ঘোষণার বছর: ০৭.০৭.১৯৯৬, মোট আয়তন: ১৭৯৬ হেক্টর।

২. চর কুকরি মুকরিঃ অবস্থান: ভোলা, ঘোষণার বছর: ১৯.১২.১৯৮১, মোট আয়তন: ৪০ হেক্টর।

৩. সুন্দরবনঃ (পূর্ব) অবস্থান: বাগেরহাট, ঘোষণার বছর: ০৬.০৪.১৯৯৬, মোট আয়তন: ৩১২২৭ হেক্টর।

৪. সুন্দরবনঃ (পশ্চিম) অবস্থান: সাতক্ষীরা, ঘোষণার বছর: ০৬.০৪.১৯৯৬, মোট আয়তন: ৭১৫০২ হেক্টর।

৫. সুন্দরবনঃ (দক্ষিণ) অবস্থান: খুলনা, ঘোষণার বছর: ০৬.০৪.১৯৯৬, মোট আয়তন: ৩৬৯৭০ হেক্টর।

৬. পাবলাখালিঃ অবস্থান: পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙামাটি), ঘোষণার বছর: ২০.০৯.১৯৮৩, মোট আয়তন: ৪২০৮৭ হেক্টর।

৭. চুনাতিঃ অবস্থান: চট্টগ্রাম, ঘোষণার বছর: ১৮.০৩.১৯৮৬, মোট আয়তন: ৭৭৬৪ হেক্টর।

৮. ফাসিয়াখালিঃ অবস্থান: কক্সবাজার, ঘোষণার বছর: ১১.০৪.২০০৭, মোট আয়তন: ১৩০২ হেক্টর।

৯. দুধপুকুরিয়া-ধোপাছড়িঃ অবস্থান: চট্টগ্রাম, ঘোষণার বছর: ০৬.০৪.২০১০, মোট আয়তন: ৪৭১৭ হেক্টর।

১০. হাজারিখিলঃ অবস্থান: চট্টগ্রাম, ঘোষণার বছর: ০৬.০৪.২০১০, মোট আয়তন: ১১৭৮ হেক্টর।

১১. সাঙ্গুঃ অবস্থান: বান্দরবান, ঘোষণার বছর: ০৬.০৪.২০১০, মোট আয়তন: ২৩৩২ হেক্টর।

১২. টেকনাফঃ অবস্থান: কক্সবাজার, ঘোষণার বছর: ২৪.০৩.২০১০, মোট আয়তন: ১১৬১৫ হেক্টর।

১৩. টেংরাগিরিঃ অবস্থান: বরগুণা, ঘোষণার বছর: ২৪.১০.২০১০, মোট আয়তন: ৪০৪৯ হেক্টর।

১৪. দুধমুখিঃ অবস্থান: বাগেরহাট, ঘোষণার বছর: ২৯.০১.২০১২, মোট আয়তন: ১৭০ হেক্টর।

১৫. চাঁদপাইঃ অবস্থান:বাগেরহাট, ঘোষণার বছর: ২৯.০১.২০১২, মোট আয়তন: ৫৬০ হেক্টর।

১৬. ঢাংমারিঃ অবস্থান: বাগেরহাট, ঘোষণার বছর: ২৯.০১.২০১২, মোট আয়তন: ৩৪০ হেক্টর।

১৭. সোনার চরঃ অবস্থান: পটুয়াখালি, ঘোষণার বছর: ২৪.১২.২০১১, মোট আয়তন: ২০২৬ হেক্টর।

এই ১৭ টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ১০ টিরই ঘোষণা এসেছে আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে (ঘোষণার তারিখ বোল্ড এবং আণ্ডারলাইন করা আছে)।

গ) বিশেষ সংরক্ষিত এলাকাঃএছাড়া আরো ৫টি সংরক্ষিত এলাকা রয়েছে-

১. জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানঃ অবস্থান: ঢাকা, ঘোষণার বছর: ১৯৬১, মোট আয়তন: ৮৪ হেক্টর।

২. বলধা গার্ডেনঃ অবস্থান: ঢাকা, স্থাপিত: ১৯০৯, মোট আয়তন: ১.৫ হেক্টর।

৩. মাধবকুন্ড ইকোপার্কঃ অবস্থান: মৌলভীবাজার, ঘোষণার বছর: ২০০১, মোট আয়তন: ২৬৬ হেক্টর।

৪. সীতাকুন্ড উদ্ধিদ উদ্যান ও ইকোপার্কঃ অবস্থান: চট্টগ্রাম, ঘোষণার বছর: ১৯৯৮, মোট আয়তন:৮০৮ হেক্টর।

৫. ডুলাহাজরা সাফারি পার্কঃ 
অবস্থান: কক্সবাজার, ঘোষণার বছর: ১৯৯৯, মোট আয়তন: ৬০০ হেক্টর।

অর্থাৎ ৫ টি বিশেষ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৩ টিই আওয়ামীলীগের আমলে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার।

এইসব তথ্য থেকে আমরা পাই দেশের মোট সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যান, অভয়ারণ্য বা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ১৭+১৭+৫=৩৯ টির মধ্যে ২৫টি বা, ৬৪.১০% -ই আওয়ামীলীগের শাসনামলে সংরক্ষন করা হয়েছে অথচ বাঙলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর সময়ের ৪২ বছরের মাত্র ১৩ বছর ৬ মাস সময় তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল। যার অর্থ দাঁড়ায় রাষ্ট্র ক্ষমতার ৩২.১৫% সময় শাসন করে জীব বৈচিত্র্য রক্ষার সরকারী উদ্যোগের ৬৪.১০% কাজই এই দলটি করেছে। এদিকে ২ টি বা ৫.১৩% বনাঞ্চলের সরক্ষন ঘোষণা এসেছে ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলে অর্থাৎ রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা সামরিক বা ছদ্ম সামরিক অথবা তাদের রাজনৈতিক দলদের শাসন আমলের ৬৭.৮৫% সময়ে জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় তারা কাজ করে ৩০.৭৭% কাজ

অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর আমলে করা জাতীয় বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) (সংশোধন) আদেশ ১৯৭৪-এর ২নং অনুচ্ছেদের ‘জ’ ধারা অনুযায়ী বোঝানো হয় মনোরম ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যবিশিষ্ট অপেক্ষাকৃত বৃহত্তর এলাকা, যার মুখ্য উদ্দেশ্য প্রাকৃতিকভাবে সুন্দর চিত্রানুগ দৃশ্য, উদ্ভিদকুল রক্ষা এবং সংরক্ষণ করা ও যেখানে বিনোদন, শিক্ষা এবং গবেষণার জন্য জনসাধারণের প্রবেশ অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে। মূলত এই আইনের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় এবং মানবকল্যাণে এসবের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের উপর জোর দেয়া হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে আসে পূর্ণাঙ্গ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন।

বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২
(২০১২ সনের ৩০ নং আইন ) ১০ জুলাই, ২০১২

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত প্রচলিত আইন রহিতপূর্বক দেশের জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধানকল্পে প্রণীত আইন
[বিস্তারিতঃ এইখানে…]

যে রাজনৈতিক দলের শাসন আমলের সরকারী কার্যাবলীর একটি প্রধান কাজ হিসেবে সবসময় বিবেচিত হয়ে এসেছে দেশের জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ; তাদের একটা উন্নয়নমুলক কাজের যখন বিরোধিতা করতে যাব জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অভিযোগে তখন কি আমাদের গঠমূলক সমালোচনা করা উচিৎ নয়?

=> ২) কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কি আসলেই তা পরিবেশের জন্য কতটা হুমকি?

কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কীভাবে কাজ করে?

খুব সহজে যদি মূল বিষয়টা দেখি তা অনেকটা এইরকম- কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রথমে পাউডারে বিচূর্ণ করা হয় চক্রের (চিত্রে দ্রষ্টব্য!) কনভেয়র যা পরবর্তীতে বয়লারে যাওয়ার আগে পালভারাইজড হয়। পিসিসি (PCC= Pulverized Coal Combustion) সিস্টেমের কম্বাশন চেম্বার হয়ে বয়লারে উচ্চতাপে পুড়ানো হয়। এইখানে চিনমি (Stack) হয়ে কয়লা পুড়া ধূয়া বের হবে আর ভস্মীভূত ছাই নিজ দিয়ে নির্গত হয়। অন্যদিকে পানি থেকে রূপান্তরিত বাষ্প টার্বাইনে উচ্চ চাপে প্রবেশ করে যেখানে হাজার প্রোপেলারকে সে হাইস্পীডে ঘুরাতে থাকে যা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই বাষ্প টার্বাইন থেকে আবার কনডেনসারে কন্ডেন্সড হয়ে পুনরায় বয়লারে যায় আরেকবার ব্যবহৃত হতে। এই সহজ চক্রে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো তার উৎপাদন চক্র শেষ করে। এইখানে পরিবেশ দূষণের উপাদান নির্গত হয় চিমনি দিয়ে, নির্গত পানির সাথে এবং ভস্মীভূত ছাই হিসেবে। এইখানে উল্লখ্য পানি বিশুদ্ধিকরণের জন্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বসানো হলেও আমার জানামতে দুনিয়াজুড়ে চিমনী দিয়ে নির্গত বিষাক্ত ধুঁয়ার কোন প্রকার ট্রিটমেন্ট করা হয় না।

 

চিত্রঃ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পর্যায়ক্রমিক চিত্র/ফ্লোচার্ট

কর্মদক্ষতা উন্নয়ন / Efficiency Improvements:

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে অধিকতর কর্মদক্ষতা অর্জন করতে বা Efficiency Improvements বৃদ্ধি করতে কম্বাশন টেকনোলোজিতে ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য গবেষকেরা কাজ করে যাচ্ছেন। এই উন্নয়ন কম কয়লা পুড়ে অধিকতর বিদ্যুৎ উৎপাদনে মানব জাতিকে নতুন পথ দেখাবে। এই কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে ন্যুনতম কার্বন-ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে সাহায্য করবে। সহজ করে বললে ১% পিসিসি (PCC= Pulverized Coal Combustion) সিস্টেমের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি ২-৩% কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) নিঃসরণ কমাবে।

কয়লার ব্যবহারঃ
২০০০ সালের পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানী হিসেবে কয়লার ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। চীন, ইউএসএ, রাশিয়া, ভারত এবং জাপান সাড়া বিশ্বে ব্যবহৃত কয়লার ৭৬% ব্যবহার করে-

অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা ব্যবহারে শীর্ষ ১০ টি দেশ-

অন্যদিকে কয়লার দহন থেকে কি কি পন্য আমরা বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে পেতে পারি-

-ফ্লাই এশ (fly ash)
-বোটম এশ (bottom ash)
-বয়লার স্লাগ (boiler slag)
-flue gas desulphurisation gypsum
-others types of material such as fluidized bed combustion ash, cenospheres, and scrubber residues।

ফ্লাই এশ ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে কনক্রিটের অন্যতম প্রধান উপাদান সিমেন্ট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ওয়ার্ল্ড কোল এ্যাসোসিয়েশন বলছে ‘Fly ash can be used to replace or supplement cement in concrete. In the USA, for example, more than half of the concrete produced is blended with fly ash. Among the most significant environmental benefits of using fly ash over conventional cement is that greenhouse gas (GHG) emissions can be significantly reduced. For every tonne of fly ash used for a tonne of Portland cement (the most common type of cement in general use around the world) approximately one tonne of carbon dioxide is prevented from entering the earth’s atmosphere. Fly ash does not require the energy-intensive kilning process required by Portland cement.’

এইবার দেখি দুনিয়াজুড়ে মোট উৎপাদিত বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোন কোন জ্বালানী কি হারে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। জীবাশ্ম জ্বালানীর অপর দুই উপাদান তেল এবং গ্যাস যেখানে ২৮% বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় সেখানে কয়লা একাই ৪১% বিদ্যুৎ উৎপাদন করে থাকে।

 

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিভিন্ন জ্বালানী ব্যবহারের তুলনামূলক চিত্র

এখনও প্রশ্ন আনবিক শক্তির যুগে কেন কয়লার ব্যবহার এত বেশী? কারণ- খরচ অপেক্ষাকৃত অনেক কম আর আনবিক শক্তি থেকে কম বিপদজনক। বিশ্ব কয়লা সংস্থা (WCA) বলছে ‘Continuous improvements in technology have dramatically reduced or eliminated many of the environmental impacts traditionally associated with the use of coal in the vital electricity generation and steelmaking industries.’।
তারা সালফার অক্সাইড, নাইট্রোজেন, মার্কারি, গ্রিন হাউজ গ্যাস (GHG), কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) নিঃসরণ, এবং মিথেন ইত্যাদির দূষণ নিয়ে বৃহৎ গবেষণা করছেন। তাঁরা বলছেন অতি উচ্চমানের প্রযুক্তির ব্যবহার এই দূষণের হারকে কমাবে। তাদের ভাষ্য চীন এবং ভারতের মত দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক শক্তির উত্থান ও ক্লাইমেট চেঞ্জ দুটার সমন্বয় করতে কয়লা ব্যবহারের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং দূষণ হ্রাসে ব্যাপক গবেষণা অত্যাবশ্যক। আমরা একটা বিষয় লক্ষ্য করছি না কয়লার ব্যবহার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহার হয়ে থাকে ষ্টীল ইন্ডাস্ট্রিতে। বাঙলাদেশের ষ্টীল ইন্ডাস্ট্রির সিংহভাগই ব্যপক জনবসতিপূর্ণ চট্টগ্রাম এবং ঢাকা শহরের অতি সন্নিকটে অবস্থিত।

বিশ্বের বিদ্যুৎ ব্যাবহারে সবচে উপরের ২০ দেশের তালিকা একটু দেখুন-

এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৫২স্থানে। আর যদি মাথাপিছু পাওয়ার খরচের হিসেবে আসি তবে আমাদের মাথাপিছু বদ্যুৎ ব্যায় ২৮ ওয়াট, যেখানে তালিকার শীর্ষের দেশ আইসল্যান্ডের মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যায় ৫৮৩৭; এখন এলাকাভিত্তিক কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবস্থান একটু দেখে নিই-

এখন দেখি অ্যামেরিকার হালহকিকত-

 

২০০৯ সালের তথ্যানুযায়ী ইউএসএ’র বিদ্যুৎ উৎপাদনে

বিভিন্ন জ্বালানী ব্যবহারের তুলনামুলক চিত্র

অন্যদিকে নিউইয়র্ক শহরের ৯.৯% বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয় কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে যার পরিমাণ ২৬৮৪ মেগাওয়াট-

বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর তালিকা নিম্নে দেয়া হল-

NY-List

তালিকায় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন কেন্দ্রটি নিউইয়র্কের Tonawanda শহরে উৎপাদন ক্ষমতা ৮১৬ মেগাওয়াট। বৃহৎ এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি Huntley Generating Station টি নায়াগ্রা নদীর পাড়ে জনবহুল শহরের মধ্যেই। ছবিটি দেখুন-

সারাবিশ্বের কয়লাভিত্তিক বৃহৎ কেন্দ্রগুলোর দিকে একনজর চোখ বুলিয়ে নেই-
 উৎপাদন ক্ষমতায় বৃহৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন কয়েকটি প্ল্যান্টের ছবি-

Taichung Power Plant

Bełchatów Power Station, Poland.

ইউরোপের  অন্যতম বৃহৎ কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র Drax

যদি পুঁজিবাদী অর্থনীতির পূর্ণাঙ্গ বিকাশ হয়ে থাকে সমাজতন্ত্রের সফলতার একটি অত্যাবশ্যকীয় ধাপ তবে শিল্পের বিকাশ শুধু ইউরোপ এমেরিকায় নয় আমাদের মত বঞ্চিত দেশের মানুষের জন্যও দরকার, তাই আমিও চাই সকল ধরনের শিল্পের সমবিকাশ সারাবিশ্বজুড়ে। নাচতে নেমে ঘোমটা টানা কখনই মঙ্গলময় কিছু নয়। তাদের দূষণে বাংলাদেশ প্লাবিত হয়ে বঞ্চিত মানুষেরা আবার লাঞ্ছিত হবে তার থেকে নিজের দূষণে মৃত্যুর আগে মাথা তুলে বাঁচুক এই নদীমাতৃক বাঙলাদেশের দুঃখী মানুষগুলো।

আর সত্যিই যদি আমরা পরিবেশের ভাল চাই তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মত করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম এমন ঔষধ আবিষ্কারের মত করে বিশ্বজুড়ে পরিবেশ বান্ধব শিল্পের বিকাশে কাজ করা উচিৎ। তা হতে পারে গবেষণার মাধ্যমে হতে পারে রিনিউএবল এনার্জির ব্যপক ব্যবহারে অথবা সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে। কেননা ৫% জনসংখ্যার ইউএসএ সারাবিশ্বের মোট দূষণের ২৫% করবে আর আমাদের মত উন্নয়নশীল রাষ্ট্র ২.৫% জনসংখ্যা নিয়ে ০.৫% দূষণও করবে না কিন্তু ইউরোপ-অ্যামেরিকার দূষণের বলির পাঁঠা হবে এইটা মানা যায় না। আমাদেরও এগিয়ে যেতে হবে; বিদ্যুৎ উৎপাদন যেহেতু শিল্প বিকাশের অন্যতম প্রধান নিয়ামক তাই কম ব্যায়ে কয়লাভিত্তিক ব্যাপক বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমাদের সারাবিশ্বের সাথে তাল মিলাতে হবে। না হয় আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পরব। রামপাল ছাড়াও অন্য সকল সম্ভাব্য সম্ভাবনাময় অঞ্চলে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যাপক উৎপাদন এবং তার ব্যাবহার নিশ্চিত করতে হবে।

নোটঃ আগামী পর্বে কয়লার দূষণ এবং আমাদের করণীয় সম্পর্কে জানব সাথে সাথে বনাঞ্চল ধ্বংসের জন্য মূল দায়ী বিষয় সমূহ খুঁজে বের করব। সবাইকে অফুরন্ত ধন্যবাদ।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/tlincoln_bd/23017.html



মন্তব্য করুন