তারিক লিংকন-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা পরিচয় সংকটের বাংলাদেশীদের জন্য কিছু কথা

লিখেছেন: তারিক লিংকন

‘ইংরেজ’ বা, ‘English’ বলতে আমরা কি বুঝি? ‘ইংরেজ’ বা, English’রা হল একটি জাতি এবং জাতিগত গোষ্ঠী যাদের নেটিভ ভাষা ইংরেজী আর বসবাস করে ইংল্যান্ড। ‘ইংরেজ’-দের প্রাচীন পরিচয় মধ্যযুগীয় হলেও ,তারও আগে ইংরেজরা Anglecynn হিসাবে পরিচিত ছিল অর্থাৎ ইংরেজ বলতে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ইংরেজি ভাষা-ভাষীর মানুষদের বুঝায়! অথচ বিশ্বে আজ অনেক দেশ আছে যেখানে ইংরেজি ভাষা-ভাষীর মানুষের আধিক্য কিন্তু তাদের আমরা ইংরেজ বলি না। যেমন নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ ইংরেজি ভাষাভাষী আরও অনেক রাষ্ট্রের অধিবাসীদের আমরা ইংরেজ বলি না।

অনুরূপে ‘বাঙ্গালী’ একটি জাতি এবং জাতিগত গোষ্ঠী যাদের Native ভাষা বাংলা আর বসবাস বাংলাদেশে অর্থাৎ বাঙ্গালী বলতে কলকাতার বাঙ্গালী ভাষাভাষীদের সাথে গুলিয়ে ফেলার কিছু নাই সংজ্ঞা খুবই পরিষ্কার আর নির্দিষ্ট। ইউএস ইংলিশ বা, অস্ট্রেলিয়ান ইংরেজের মত তারাও কলকাতার বাঙ্গালী।

এইবার আসি আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর প্রাসঙ্গিকতার বিচারে। বিভিন্ন টকশো বা রাজনৈতিক আড্ডায় একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল বাঙ্গালী বললে তো বাংলাদেশের পাহাড়িদের বঞ্চিত বা নিগৃহীত করা হয় কিনা। এমন কথায় যারা উদ্বেলিত হয়ে এইসব মৌলিক বিষয়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন তাদের জন্যে বলছি ঠাণ্ডা মাথায় একটু যাচাই করুন নিন্মের ব্যাখ্যাগুলো। বাঙ্গালী একসাথে নেটিভ (Native) বাংলা ভাষাভাষীদের ও বুজাচ্ছে সাথে সাথে বাংলাদেশে বসবাসকারীদেরও বুজাচ্ছে। সংজ্ঞাটি আবার পড়ুনঃ ‘বাঙ্গালী’ একটি জাতি এবং জাতিগত গোষ্ঠী যাদের Native ভাষা বাংলা, আর বসবাস বাংলাদেশে’।

এই নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠীকে বাঙ্গালী বলা বা বাংলাদেশী না বলার কারণঃ

১) বাংলা বছর, বাংলা উৎসব, পালাপার্বণ, সামাজিক রীতিনীতি, জামা-কাপড় পরা, সম্পূর্ণ জীবনধারার মিলেই বাঙ্গালী সংস্কৃতি। আর পাহাড়ি বিভিন্ন ভাষাভাষীদের মাঝে বাঙ্গালী উৎসবগুলো আরও তীব্র, আর তাই বাঙ্গালী বললে শুধু বাংলা ভাষাভাষীদের না এই বাংলায় সব ভাষার বাঙ্গালী সংস্কৃতির অধিবাসীদের বুজাচ্ছে। আর তাই যৌক্তিক কারণেই বাঙ্গালী বললে পাহাড়িদের বা উপজাতিদের অথবা অধিবাসীদের বঞ্চিত করা হয় না কোনভাবেই।

২) যারা এমন প্রশ্ন তুলেন তাদের বড় অংশই একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের এবং বাঙ্গালী জাতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে পক্ষপাতদুষ্ট। তাদের জন্যে বলি তাহলে বাংলাদেশ নামটাও পরিবর্তন করতে হয় কারণ পাহাড়িরা তো চাইবে চাকমাদেশ, মারমাদেশ, মুরংদেশ বা এমন কিছু, তাই না? তাই উত্তরাধিকারে রাজনৈতিক আদর্শ স্থির করার আগে একটু ভাবুন। আর তাই তাদের নাম করে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ একটা রাজনৈতিক ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়।

৩)আবার এমনভাবে যারা ৮৫% মানুষের একটা অংশকে তুষ্ট করতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করে ১৫% কে ২য় শ্রেণীর নাগরিক করে দেয়; তাদের মুখে ১% এর কম পাহাড়ি-উপজাতিদের সন্তুষ্ট করতে জাতীয়তা বাঙ্গালী থেকে বাংলাদেশী করা কথাটা কতটা মানায়?

এর সাথে আরেকটি প্রাসঙ্গিক বিতর্কের অবতারণা হয় তাহল আমি আগে মুসলিম না আগে বাঙ্গালী? আমার উত্তর আমি বাঙ্গালী! অথবা আমার জাতিগত পরিচয় কি? এইখানে কোন সন্দেহ বা দু’বার চিন্তা করারও অবকাশ নেই কেননা-

১) আমি যেমন জন্মগতভাবে মানুষ ঠিক তেমনি জন্মগতভাবেই আমার নৃতাত্ত্বিক আর জাতিগত পরিচয় বাঙ্গালী। আর শৈশব থেকে কৈশোরে পারিবারিক ধর্মীয় রীতি বা বিশ্বাস থেকে আমার ধর্মীয় পরিচয়টা লাভ করি। তাই সে যেকোন ধর্মের হতে পারে এমন কি আমার প্রাপ্ত বয়সে গিয়ে আমি আমার ধর্মীয় বিশ্বাস অনেক যৌক্তিক কারণেই পরিবর্তন করতে পারি।

২) আমি বাঙ্গালী মুসলমান, আমি বাঙ্গালী হিন্দু, আমি বাঙ্গালী খ্রিষ্টান, আমি বাঙ্গালী বৌদ্ধ যা আমরা ৭১ থেকেই বলে আসছি অর্থাৎ বাঙ্গালী পরিচয়টা এই বাঙ্গালার সবার তাই বুঝা যায় অর্থাৎ আমাদের Common Identity বাঙ্গালী। এর পর যার যার ধর্ম তারতার।

৩) আমি কোন অবস্থাতেই আমার নৃতাত্ত্বিক পরিচয় পরিবর্তন করতে পারব না। কিন্তু স্যামসন এইচ চৌধুরী মুসলিম থেকে ক্রিস্টিয়ান হয়েছেন বা অনেকে অমুসলিম থেকে মুসলিম হয়েছেন আবার কেউ ধর্মহীনও হয়েছেন! কিন্তু কেউ বাঙ্গালী থেকে ইংলিশ হতে পারেন নি। রুসনারা আলী ২য় প্রজন্মে গিয়েও বাঙ্গালী পরিচয় হারাবেন না বা বদলাতে পারবেন না যেমন- ভি এস নাইপল কে বলে ‘Indo-Trinidadian’ তার পূর্ব পুরুষের পরিচয়ে অথচ তার জন্মই ত্রিনিদাদে কিন্তু আজও তাঁর নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে ইন্ডিয়ান নৃতাত্ত্বিকতা থেকে যাচ্ছে আর যৌক্তিকভাবেই এইটাই তাঁর পরিচয়।

৪) আরেকটি ব্যাপার লক্ষ্য করুন DNA টেস্ট করে নৃতাত্ত্বিক বা জাতিগত পরিচয় বের করা যাই কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় না। এই ভূখণ্ডে এই জনগোষ্ঠীর  মানুষ কত বছর আগে কোন ভূখণ্ড থেকে এইখানে নিবাস গড়ছে তাও বের করা যাই তবে ধর্মীয় বা আদর্শিক পরিচয় বের করা যাই না কেননা কোন অবস্থাতেই আমার নৃতাত্ত্বিক বা জাতিগত পরিচয় পরিবর্তন করার সুযোগ নেই কিন্তু ধর্মীয় পরিচয় বা বিশ্বাস অথবা সংস্কৃতি পরিবর্তন করা সম্ভব।

অর্থাৎ, আমার স্থায়ী ঠিকানাটাই প্রথমে আসবে তাহল আমি ‘বাঙ্গালী’

“তুমি কে? আমি কে?

বাঙ্গালী… বাঙ্গালী…”

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/tlincoln_bd/20737.html

 2 টি মন্তব্য

  1. কবির য়াহমদ

    বাঙ্গালী’ একটি জাতি এবং জাতিগত গোষ্ঠী যাদের Native ভাষা বাংলা, আর বসবাস বাংলাদেশে’। 

    1. তারিক লিংকন

      ভাই কি মাইন্ড করলেন? নাকি সহমত পোষণ করলেন বুঝলাম না!!আসলে বাঙালি জাতির কোন সঠিক সংজ্ঞা বা ব্যাখ্যা কোথাও পেলাম না…তাই কিছু একটা দাড় করানোর চেষ্টা করলাম! হয়তো এমন হলে আরও চমৎকার বা যথার্থ হতঃ ‘বাঙালি’ একটি জাতি এবং জাতিগত গোষ্ঠী যাদের রাষ্ট্রভাষা বা স্থানীয় (Native) ভাষা বাংলা, আর বসবাস বাংলাদেশে।ধন্যবাদ…

মন্তব্য করুন