তারিক লিংকন-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

তেঁতুল গাছের ভুত এবং ওঝায় চিকিৎসা; প্রসঙ্গঃ নারীবাদ

লিখেছেন: তারিক লিংকন

অতিসম্প্রতি বাংলার রাজনীতিতে নারী ও তেঁতুল শব্দ-দ্বয় নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে, তারসাথে তাল মিলিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া এবং বাংলা ব্লগগুলোও কম যায় না। প্রাগৈতিহাসিক (Prehistoric Age) যুগ থেকে যখন কৃষিসভ্যতার পর ক্রমেই নারীকে ঘরে বন্ধী করতে শুরু করল তখন থেকেই নারী হয়ে গেল শাসক এবং শোষক গোষ্ঠীর তুরুপের টেক্কা; তাই যথারীতি আজ প্রচুর লিখালিখি হচ্ছে এইসব নিয়ে এবং সঙ্গত কারণে প্রচুর রাজনীতিও হচ্ছে। এদিকে সোশ্যাল মিডিয়া বা ব্লগ এবং হাতে নিয়ে বই পড়ার মধ্যে পার্থক্য এইখানে এইটা উভমুখী সোশ্যাল মিডিয়া বা ব্লগে পাঠক লিখকের সাথে তথ্য বা তত্ত্বের আদান প্রদান করতে পারছে যা লিখক ও পাঠক উভয়ের মননের সহনশীল এবং যুক্তিবাদী হতে শিখায়। যাহোক বর্তমান পোস্টের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে নারীবাদ; খুবই সেনসেটিভ কিন্তু কালোত্তীর্ণ একটি বিষয়।

প্রথমে একটা সংস্কারের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েই মূল আলোচনায় যাব। আমরা বাঙ্গালীরা কমবেশি সবাই তেঁতুল গাছে ভুত থাকে এমন সংস্কার নিয়ে জ্ঞাত আছি। আসলে ব্যাপারটা কি? স্যাটেলাইট আর এন্ড্রয়েড জমানায় ভুত বিষয়ক এমন গালগপ্প কেউ আমলে নেয়ারও কথা না তাই নিচ্ছেও না। আমাদের এই ধারনার পিছনের বৈজ্ঞানিক কারণ বা ব্যাখ্যা জানতে হবে। আমরা প্রায় সকলেই জানি যে উদ্ভিদ দিনের বেলায় সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় সূর্যালোকের উপস্থিতিতে কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) গ্রহন করে নিজের খাদ্য তৈরি করে আর অক্সিজেন (O2) ত্যাগ করে। রাতের বেলায় উদ্ভিদ দিনের প্রস্তুতকৃত খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তরিত করার সময় অল্প পরিমানে অক্সিজেন (O2) গ্রহন করে আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড (CO2) যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে শ্বসন বা Respiration।

যেহেতু তেতুল গাছ একটি বহুপত্রবিশিষ্ট বৃক্ষ, তাই রাতের বেলায় এটি অধিক পরিমানে O2 গ্যাস গ্রহন করে এবং প্রচুর পরিমানে CO2 গ্যাস ত্যাগ করে ফলশ্রুতিতে রাতে তেতুলগাছের চারপাশ থাকে প্রায় অক্সিজেনহীন, যা বিরাটাকার কোন তেঁতুল গাছের নিচে আরও প্রকট। অক্সিজেন শূন্যতার জন্য সাধারণত রাতের বেলায় গাছের নিচে বসে থাকা উচিৎ নয় তবে নিম শ্রেণীর কিছু উদ্ভিদ এর ব্যতিক্রম। এর জন্যে রাতের বেলায় তেতুল গাছের নিচে দিয়ে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের অভাবে মানুষ আজ্ঞান হয়ে যেতে পারে, বা ঘাড় বাকা হয়ে যেতে পারে এমনকি মারাও যেতে পারে। এই ঘটনাটাই গ্রাম বাংলার অন্ধকারে থাকা অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত মানুষ ভূতে ধরা বলে। এমন অবস্থায় প্রথমিকভাবে পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ ভূতে ধরা ব্যাক্তির জন্য জরুরী, ওঝা নয়।

এইবার আসি প্রাসঙ্গিক আলোচনায়; নারীবাদী বিরোধীদের বেশ কিছু সফল হাতিয়ার আছে যার;
প্রথমটি, হুজুগবাদ বা ফ্যাশন কন্ট্রোভারসিঃ নারী বিদ্বেষী বা ধর্মীয় মৌলবাদীরা নারিবাদীদের হুজুগে বা আঁতেল অথবা লোক দেখানো তকমা লাগিয়ে দেয় কেননা তাহলেই তাদের উদ্দেশ্য হাসিল হয়। যেমনটি আমি দূরগ্রামে গিয়ে যদি তেঁতুল গাছে ভুতে ধরা নিয়ে সঠিক ব্যাখ্যা দেয় আর স্থানীয় লোকজন অথবা যারা এই ভুতে ধরা তত্ত্ব নিয়ে পেট চালায় তারা আমার সর্বাত্মক বিরোধিতা করবে অর্থাৎ অবধারিতভাবেই ওঝা শ্রেণী থাকবে এর প্রধান বিরোধী আর এমন সব বাজারি কন্ট্রোভারসি ক্রিয়েট করবে। তাই বলি কি নারীবাদ কোন ফ্যাশন নয় আমরা যারা নারীর অধিকার নিয়ে কথা বলি বা লিখালিখি করি তারা জনপ্রিয়তার জন্যে বা আলাদা হওয়ার জন্যে করি না আমরা হাজার বছরের ভুতে ধরার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে চাই। আর আসলেই যদি কেউ লোক দেখানো নারীবাদী হয় তাতেও সমস্যা নাই কারণ ভুতে ধরার বৈজ্ঞানিক ধারনার পক্ষেই সে দাঁড়াচ্ছে না বুঝে হলেও, খারাপ কি। বুঝে খারাপ কাজ করা থেকে না বুঝে ভাল কাজ করাই বরং ভাল।

দ্বিতীয়টি, তেঁতুলবাদ বা ধর্মীয় কন্ট্রোভারসিঃ নারীবাদের স্বপক্ষে থাকার মূলমন্ত্র হিসেবে ধর্মকে আঘাত করার প্রবনতা লক্ষণীয়। এই কথাটাই হয়তো অধিক শক্তিশালী প্রথমটার তুলনায়। কেননা এমন একটা হুজুগই যেকোন মানবকল্যানের অগ্রগতিকে থমকে দিতে পারে ঠিক যেমনটি মৌলবাদীরা করেছে গণজাগরণ মঞ্চকে নিয়ে। শুধু বেগম রোকেয়া না দুনিয়ার তাবৎ সমাজ বিজ্ঞানী বা দার্শনিকই একমত যে সভ্যতার শুরু থেকেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ধর্মকে ব্যবহার করেছে নারীকে জব্দ ও শোষণ করার জন্যে। তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রাসঙ্গিক কারণে নারীবাদ নিয়ে বলতে গেলেই ধর্মের প্রতি আঘাত আসবে। বাংলায় ইসলামি গণজাগরণ খ্যাত শাপলা চত্বরের হিরো তেঁতুলবীদ শফি সাহেব যখন নারী ইস্যুতে কথা বলে তখন নারী আর মানুষ থাকে না আর তাই যৌক্তিকভাবেই নারী অধিকার নিয়ে কথা বললে তিনি আর তার আদর্শ যায়গায় থাকে না থাকারও কথা না এবং আঘাত প্রাপ্ত হয় যেমন করে তেঁতুল গাছের ভুত ধরতে গেলে যেমন ওঝাতত্ত্বের সমাজপতিরা ধেয়ে আসে। শেষ কথা দাঁড়ায়,নারীবাদের স্বপক্ষে থাকার জন্যে তার মূল শত্রু আঘাত পাবে প্রত্যাশিতভাবে কেননা দুনিয়ার সকল ধর্মই নারীকে কমবেশী পন্য বা সম্পদ হিসেবে দেখেছে মানুষ হিসেবে নয়।

তৃতীয়টি, মন্ত্রমুগ্ধতা বা মানুষের স্বেচ্ছাচারী ও আত্মঘাতি স্বভাবঃ কোন নারী যদি এমন একটি আইনের জন্যে আন্দোলন করে যা কিনা নারীকে মানুষ বিবেচনা না করে তেঁতুল বা পন্য অথবা অর্ধমানব মনে করে তবে তাকে তার স্বেচ্ছাচারী ও আত্মঘাতি স্বভাব বলা ছাড়া কিইবা বলার আছে। গ্রামের কথা মনে পরে তেতুল গাছের ভুত নামাতে মা তার ৮ বছরের বুকের ধনকে ওজার হাতে তুলে দেয় সুস্থ (প্রহৃত) করার জন্যে অথচ ভেবেই দেখে না ঐ ওঝর জন্মই ভুল কেননা গাছে ভুত নাই (বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত); একইভাবে আমাদের নারীরা এতই হিপ্নোটাইজড বা মন্ত্রমুগ্ধ যে নিজের যমদেরকে সমাজপতি করতে কলম ধরে। কিন্তু একবারও ভাবে না তার পছন্দ শখ ইচ্ছা সবই আরেকজন নির্ধারণ করে দিয়েছে তাদের নিজেদের ভোগবিলাস আর পুরুষস্বার্থ হাসিলের জন্যে। যদিও এর জন্যে আমি নারীদের দোষ দেয় না কারণ হাজার বছরের পত্নী-উপপত্নীদশা বা পন্যনারীর অভ্যেস তার জেনেটিক কোডেই প্রভাব বিস্তার করছে।

এইবার আমাদের সংবিধানে নারীর অধিকার নিয়ে কি বলা আছে দেখি;
গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান পূর্ণ সম্মান ও শ্রদ্ধা দিয়ে সমাজের বৈষম্য দূর করার কথা বলা আছে যা পড়ে মনেই হবে না এইটা পুরুষের বা পুরুষতন্ত্রের লিখা। কেননা এইটা তাবৎ দুনিয়া অন্যতম সেরা লিখিত সংবিধান আর তা মানুষের লিখা। দুঃখের বিষয় আমরা এমন সম্পদের যথার্থ ব্যবহার করতে পারি না; আমরা চোখ থাকিতে অন্ধ, মাথা থাকিতে বিবেক শুন্য আর মুক্ত অবাধ তথ্য ভান্ডার (ইন্টারনেট) থাকতেও তথ্যশুন্য।

গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান
তৃতীয় ভাগ: মৌলিক অধিকার
২৮ নং অনুচ্ছেদ: ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য এর উপ অনুচ্ছেদ-

(১) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শণ করিবেন না।
(২) রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।
(৩) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধ্যকতা বা বাধা শর্তের অধীন করা যাইবে না।
(৪) নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনকিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।

যতদিন পাহাড়িরা সমতল ভুমির মানুষের কাছাকাছি সমান শিক্ষিত এবং উন্নত হবে না ততদিন তাদের জন্যে কোটা ব্যবস্থা থাকতে হবে এইটা তাদের রাষ্ট্রীয় ও নৈতিক অধিকার। মা যেমন কোন ছেলে অরোগ্য লাভের পর তাকে বেশী আদর ভালোবাসা আর মিষ্টি ভাল খাবার দেয় অন্য ছেলের তুলনায় সুস্থ করে তুলে তেমনি আমাদের অবহেলিত জনগোষ্ঠী আর অবরোধবাসিনী নারীকে সমান মানুষ করার আগ পর্যন্ত তাদের সর্বত্রই আলাদা সুযোগ দিতে হবে। তাই এই ইস্যুতে যারা তর্ক করে তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই করে কেননা তারা নারীর অগ্রযাত্রা চাই না। এইখানে নারীর আঘাত পাওয়ার কিছু নাই কেননা হাজার বছর বন্ধীদশা পেরিয়ে নারী এখন মুক্তির ও যুক্তির পথে তাদের মূল শত্রু তেঁতুল গাছের ভুত ও তাদের ওঝাদের দিন শেষ হয়ে আসছে বলে তারা শুধুই বিতর্ক সৃষ্টি করে চলছে আর আমাদের কিছু অবলা নারীও বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। আর কেউ যদি বলে যে নারীদের আলাদা অধিকার দিয়ে তাদের ছোট করা হচ্ছে তাহলে নিশ্চিত ধরে নিবেন এরা তারাই যারা এযাবৎ কাল পর্যন্ত নিজের মা – বোন – স্ত্রীকে নিজের অর্ধেক মনে করে এসেছে; এরাই তারা যারা আপনার আরোগ্য লাভের পর ভিটামিন দিতে চাই না আলাদা যত্ন নিতে দেয় না; মোদ্দাকথা তারা চাইনা আপনারা সমঅধিকার ভোগ করেন। আর বর্তমান নারীবাদের জন্ম উনিশশতকের দার্শনিক জন স্টুয়ারট মিল’এর হাত ধরে আর তা ঠিক পথেই ধাবমান। নারীবাদের এই ধারায় একদিন আমরা লিঙ্গ সাম্যের সমাজ দেখতে পাব।

ভুলে গেলে চলবে না আমরা পৃথিবীতে জন্মাইছি মানব সন্তান হিসেবে নারী পুরুষ হিসেবে নয়। আপনার চোখের সামনের শিশু ছেলেটিকে ‘বল’ আর মেয়েটিকে ‘গয়নার বক্স’ তুলে দেয়ায় সামাজিক লিঙ্গ বৈষম্য সৃষ্টির প্রথম ধাপ। মানুষ হিসেবে বড় করুন তবেই দেখবেন চোখের সামনে কীভাবে মানুষের মত মানুষ হবে মানব সন্তান। যেমনটি সক্রেটিস থেকে মেন্ডেলা বা হাইপেশিয়া থেকে সু চি সবাই মানবতার জন্যেই কাজ করে তারা বেঁচে আছেন; তাঁরা মানুষ হিসেবে মানুষের জন্য কাজ করেছেন নারী বা পুরুষ হিসেবে নয়।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/tlincoln_bd/20237.html



মন্তব্য করুন