তারিক লিংকন-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

আওরা আম্বাঃ পাহাড় চূড়ার এক স্বপ্ন রাজ্য (AWRA AMBA: Utopia in Ethiopia)

লিখেছেন: তারিক লিংকন

এ যেন এক রুপকথার গল্প, এ যেন এই স্বার্থপর পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীর মধ্যে আরেক লিঙ্গ বৈষম্যহীন বহুমাত্রিক এক স্বপ্নিল জগত। ইথোপিয়ার এক পাহাড়ের চুড়ায় আঁকা  স্বপ্নের কথা বলতে যাচ্ছি যা হয়তো গোটা মানব জাতিকে নতুন করে জীবনকে বুঝতে আর শিখতে প্রেরণা দিবে। পাহাড় চূড়ার এই স্বপ্ন রাজ্যের নাম ’আওরা আম্বা’ (AWRA AMBA)।

আওরা আম্বা হচ্ছে উত্তর ইথোপিয়ার ৪০০ সদস্যের একটি সামাজিক গোষ্ঠী যাদের স্বপ্ন বা আদর্শিক চেতনা গোটা দুনিয়ার হাজার হাজার বছরের সামাজিক জীবন ব্যবস্থার মূল্যবোধকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে শেখায়, জীবনবোধের নতুন সংজ্ঞা দেয়। ইথোপিয়ার আমহারা (AMHARA) সম্প্রদায়ের একদল আফ্রিকান ১৯৭২ সালে জুমরা নুরু (ZUMRA NURU)-এর নেতৃত্বে এই সামাজিক গোষ্ঠীর গোড়াপত্তন হয়, ২০০৭ সালে এই স্বপ্নের সাথী হলেন প্রায় ৪০০ জন আমহারা বাসি।awra_amba

প্রতিষ্ঠাতা জুমরা নুরু (ZUMRA NURU The Founder)

৮০’র দশকে এই সমাজ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অধিকতর সর্বজনীন সাম্যবাদ বৃদ্ধি করে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা যা তৎকালীন বিদ্যমান আমহারা সমাজের মূল্যবোধের ঠিক বিপরীত। এর মূলনীতিই ছিল লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ। আমহারা সমাজ ছিল এমন যেখানে একজন ৬ বছরের শিশু কাজে যুগ দিতে হত, ১১ বছর বয়সের আগেই তাকে স্কুলের পাঠ বন্ধ করতে হত (যারা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পেত!) এবং  গড়ে প্রায় ১৫ বছরের মধ্যেই সবাই বিয়ে করে পারিবারিক জীবন আরম্ভ করত।

প্রতিষ্ঠাতা জুমরা নুরু (ZUMRA NURU The Founder):

৪ বছর বয়সেই যখন সে কর্মক্ষেত্রে অর্থাৎ তার মা-বাবার সাথে মাঠের কৃষি কাজে সাহায্য করতে শুরু করে। তখন থেকেই জুমরা অবিরাম তার মাকে প্রশ্নবাণে অতিষ্ঠ করত অথচ তিনি কখনও স্কুলে যাওয়ারই সুযোগ পান নি। তার প্রশ্নগুলো ছিল এমন; একদিন সে তার প্রতিবেশী খ্রিষ্টান বন্ধুর কাছ থেকে এক টুকরা মাংস নিয়ে খেতে থাকে, তার মা জানতে পেরে মাংসটা কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। বলে এই মাংস তার ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঘাত করে। তখন সে জিজ্ঞেস করে তারাও মানুষ আমিও তারা এই মাংস খেতে পারলে আমি কেন পারব না?

অন্যদিকে সেই ছোট্ট বালকটি প্রায় লক্ষ্য করত মা-বাবা দুজনই সারাদিন মাঠে কাজ করে বাসায় ফিরে অথচ পরে তার বাবা বিশ্রামে চলে যায় আর তার মা আবার গৃহস্থলী কাজে ব্যস্থ হয়ে পরে। অনেক সময় তার মাকে প্রহৃত হতে হত বাবার কাছে, যা বালকটি  কখনই মানতে পারত না। এমন সব সামাজিক বৈষম্য তাকে ছোট বেলা থেকেই পীড়া দিত। তিনি প্রশ্ন করতেন কেন পুরুষেরা সব সময় মাস্টার আর নারীরা ভৃত্য? তখন তাঁকে বলা হয়েছিল আজ তুমি এমন প্রশ্ন করছ ভবিষ্যতে কি করবে? তুমি তো পাগল হয়ে যাচ্ছ। তাঁর পর্যবেক্ষণের মূল বিষয়গুলো ছিল পক্ষপাতদুষ্টতা লিঙ্গ বৈষম্য, বৃদ্ধদের প্রতি অবহেলা, শ্রম শোষণ, শিশুদের নিষ্ঠুর শাস্তি এবং মানুষের মধ্যে অসাধু লেনদেন এর অসদাচরণ ইত্যাদি। এমন প্রথা বিরোধী চেতনা থেকেই তিনি ১৩ বছর বয়সে তাঁর পরিবারকে ত্যাগ করেন; তারপর তিনি তাঁর কল্পিত স্বর্গরাজ্য (Utopia) নিয়ে কাজ করতে থাকেন, অবশেষে এল সেই বিশেষ ক্ষন যখন ১৯৭২ সালে মাত্র ১৯ জন সহকর্মীকে নিয়ে তিনি একটি স্বপ্ন প্রতিষ্ঠা করেন তিলে তিলে গড়া এই স্বপ্নের সাথী এখন ৪০০ জন।

576304_459756897416225_2139095285_n

আওরা আম্বার একজন ট্যুর গাইডের জীবন বোধ

 আওরা আম্বা ইথোপিয়ায় স্বপ্ন (AWRA AMBA the Utopia in Ethiopia): 

৪ মে ২০০৯ এর তথ্য অনুযায়ী এই স্বপ্ন রাজ্যের অধিবাসি ৪০৩ জন যারা বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী থেকে আগত বেশীরভাগই হয় খ্রিস্টান অথবা মুসলিম, যারা ১০৭ টা কুঠির বা বাড়িতে ১৭ হেক্টর জায়গা নিয়ে বসবাস করে। তাদের মূল পেশা কৃষি কাজ ও বুনন-শিল্প বা Weaving। এইখানে কিছু মূলনীতি বিদ্যমান, এইসব মূলনীতি না মানতে পারলে কেউ এর অধিবাসী হতে পারে না। প্রথমেই এইসব মূলনীতিতে সবাইকে একমত হতে হবে। এই সমাজে কোন ধর্মীয় উপসনালয় নেই নেই কোন চার্চ বা মসজিদ। আওরা আম্বা ডট কম এর একটা ভিডিওতে দেখা যায় যে এইসমাজের সবাই সর্বেশ্বরবাদী, তারা মনে করে ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান তাই কোন উপসনালয়ে ঈশ্বরকে বন্ধী করার কোন যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না, আর তাই কাজই তাদের মূল ধর্ম। এইখানে কোন লিঙ্গ বৈষম্য নেই, নেই কোন লোভ, হিংসা আর বিদ্বেষ; মনে হবে গোটা গ্রামটাই একটা পরিবার। নারী পুরুষ সকলে একসাথে কাজ করে যে যে কাজে দক্ষ তাকে সে কাজ দেয়া হয়। কাজ শেষে সবাইকে সমান মূল্যায়ন করা হয়। পুরুষেরা যেমন নারীদের গৃহস্থলী কাজে সাহায্য করে তেমনি নারীরা মাঠেও নিজ নিজ পছন্দের কাজ করে।

awra-amba

আওরা আম্বার প্রধান পেশা বুনন-শিল্পে সবাই কর্মরত  

এই সমাজে কোন ধর্মীয় ও লৈঙ্গিক নয় এখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য নেই কেননা তারা সবাই মিলে যে পরিমাণ উৎপাদন করে বছর শেষে বা প্রান্তিক শেষ উৎপাদনের বা আয়ের সমবণ্টন হয় সবার মাঝে। এইখানে শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এমন কি বৃদ্ধদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাছাড়া বৃদ্ধদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ১৮ বছর বয়সে নারী ও ২২ বছর বয়সের নিচে পুরুষের বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আওরা আম্বার কাজের এবং আদর্শিক অবস্থানের মূল ক্ষেত্র বিবেচনা করলে দাঁড়ায় এমনঃ

১) লিঙ্গ বৈষম্য বা Gender Equality

২) টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি বা Economic Sustainability

৩) গণতন্ত্র বা Democracy

৪) শিল্পভিত্তিক বানিজ্য বা Entrepreneurship

৫) দাতব্য কাজ বা Charity

৬) সার্বজনীন শিক্ষা বা Education

৭) স্বাস্থ্য বা Heath

৮) বৃদ্ধ সেবা বা Elderly Care

৯) পরিবার পরিকল্পনা বা Family Planning

১০) সততা ও শান্তি বা Faith & Peace [সুত্রঃwww.awraamba.com]

Bibliotheque_Awra_Amba

আওরা আম্বা’র একটি পাঠাগার

গোটা ইথোপিয়ার সকল ধর্মের বিশেষ করে ইসলাম ও খ্রিষ্টান ধর্মের নেতারা আওরা আম্বা পরিদর্শন করতে আসে কেননা তারা দরিদ্র বিমোচনে সবচে সফল দেশের মধ্যে। এক সাক্ষাৎকারে প্রতিষ্ঠাতা ও কো-চেয়ারম্যান জুমরা নুরু বলেন আমি আমার আইডিয়া সবার কাছে শেয়ার করি এবং আমিও তাদের সবারটা শুনি। আর আওরা আম্বার অর্থনৈতিক অর্জন নিয়ে তাদের প্রাদেশিক সরকারের এক প্রশাসক মুলগেতা অলেটাউ বলেন,  “So many Christian and Muslim leaders from all over [Ethiopia's northern Amhara region] and some from outside have visited the village because it is very famous in its endeavor to eliminate poverty.”; অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক মোহাম্মদ মুসা বলেন, “This is an extraordinary initiative within a traditional and conservative community,It’s a good example for other Ethiopian communities – and even beyond Ethiopia – because of its gender equality, its work ethic, and its social security system.”

তার এমন ব্যতিক্রমধর্মী সামাজিক বিপ্লবের জন্য সবসময় আওরা আম্বায় পর্যটকদের ভীর লেগে থাকে। সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে গবেষণার জন্যে ছাত্ররা আসে, সকল নামি দামি মিডিয়ার লোকজন তার সাক্ষাৎকার নিতে ব্যস্ত সবসময়। তার জনকল্যান এবং উন্নয়নের এমন বিরল অবদানের জন্যে তাকে সম্মানজনক পিএইচডি ডিগ্রি দেয়া হয়, তাঁকে করা হয় শান্তি দূত। আজ তিনি যৌবন শেষে বার্ধক্যে তার স্বপ্নের সহযাত্রী এখন ১৯ থেকে ৪৫০ জন, যারা সবাই আওরা আম্বার স্থায়ী অধিবাসী। এক সাক্ষাৎকারে  Ezega.com তাকে জনগণের উদ্দেশ্য কিছু বলার আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন,  ‘I believe the greatest treasure we have in this world is us human beings. Regardless of everything else, I wish we understand that we are from the same origin; we should love and respect one another.  This is my greatest wish and advice to my fellow Ethiopians.’ [ZUMRA NURU the Founder & Co-Chairman of Awra Amba.]

Vue_Awra_Amba

আওরা আম্বা গ্রাম; পাহাড় চুড়ার স্বপ্ন

আওরা আম্বা গ্রামটির ১০ টি ঘরের ভিতরকার ৩৬০ ডিগ্রি ছবি বা Panoramic View ১০ টি শর্টফিল্মের মত জীবন্ত; যেমন ধরেন যদি আপনি আওরা আম্বার বুনন-শিল্পের ঘরটির দিকে দেখেন তবে আপনি দেখতে পাবেন লিঙ্গ বৈষম্য দূরীকরণের একটি কাব্যিক চিত্রকল্প একইভাবে গ্রামের পাঠাগারটিও তাই অথবা বৃদ্ধদের জন্যে রাখা সেবা কেন্দ্রটিও স্ব স্ব মহিমায় উদ্ভাসিত। আওরা আম্বার নির্মাণ শৈলী এবং জীবনবোধের শৈল্পিক আর মানবিক ও সাম্যবাদের এমন নিদর্শনকে এইভাবেই বর্ণনা করেছে আওরা আম্বা দ্যা প্রজেক্ট, অনুরূপ ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এইখানেও। ইউটিউব এর ২৮ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের ভিডিও টি দেখলে আপনার অনেক প্রশ্নের উত্তরই মিলবে যা নতুন করে জীবন সম্পর্কে ভাবতে শিখাবে।

আজ আমরা সকল সুযোগ সুবিধা পেয়েও তাঁর মত করে মা’দের জন্যে ভাবতে পারছি না, অথচ ন্যুনতম শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হত দরিদ্র পরিবারের এই মহান মানুষটি তাঁর জীবন দিয়ে মায়ের ঋণ শোধে একটি লিঙ্গ বৈষম্যহীন সাম্যের সমাজ গড়ার জন্যে কাজ করে গেছেন জীবন ভর। জুমরা  নুরুর একটা কথা দিয়েই তার এই অনবদ্য প্রয়াসকে ও তাঁকে শ্রদ্ধা জানাব ‘আমি এমন একটি সমাজে বসবাস করতে চাই যেখানে নারী আর পুরুষেরা সমান’ বা  ‘I wanted to live in a place where men & women are equal’….

তথ্যসূত্রঃ

১) উইকিপিডিয়া

২) ইউটিউব

৩) আওরা আম্বা  ডট কম

৪) ফিল্মস ফর একশন

৫) গ্রে ঢাকার বাচ্চু ভাই

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/tlincoln_bd/19812.html



মন্তব্য করুন