তারিক লিংকন-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

এইবার নীল নয় লাল বিদ্রোহের অপেক্ষায়

লিখেছেন: তারিক লিংকন

উনিশ শতকের শুরুর দিকে ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লব শুরু হয় আর সেই প্রাসঙ্গিকতায় নীলের চাহিদাও বৃদ্ধি পায় বিশ্ব জুড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশে ১৮১০ সাল থেকে ১৮৬০ সালের মধ্যে নীল চাষের ব্যাপক প্রসার ঘটে। কৃষকদের উপর চরম অত্যাচার নির্যাতন করে নীল চাষের প্রসার ঘটানো হয়। এই সব ইতিহাস এই বাংলার কারো অজানা হয়। তখন, ইংরেজ হিলস সাহেব প্রথম নীলের কোন বাজার দর ঠিক করে দেন। এদিকে কৃষকদের উপর চরম অত্যাচার নির্যাতনের প্রতিবাদ স্বরূপ ‘দীনবন্ধু মিত্র’ রচনা করেন ‘নীলদর্পন’ আর এর ইংরেজিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন ‘মাইকেল মধূসুদন দত্ত’। ১৮৫৯ সাল থেকে ১৮৯৫ সাল পর্যন্ত দফায় দফায় নীল চাষের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষকরা বিদ্রোহ করেন। সেই সাথে আইনজীবী যদুনাথ মজুমদারের সহায়তায় বৃটিশ পার্লামেন্টে আবেদনপত্র পাঠানো হয়। বৃটিশ সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করে।তদন্তে আবেদনপত্রের কথার সত্যতা প্রমানিত হয়। সরকার নীলের দাম বাড়িয়ে দিলে কুঠিয়ালরা ধীরে ধীরে ব্যবসা গোটাতে থাকে।১৮৯৫ সালের দিকে নীল চাষ বন্ধ হয়; সেবারের মত বেচে যান উপমহাদেশের কৃষকরা।

একটা উদাহরণ দেয় এইবারঃ নীল বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নীলকররা ছফাতুল্লা নামের যশোরের এক বিদ্রোহীকে ঘোড়ার জিনের সাথে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে “নীলকুঠিতে” নিয়ে যায় এবং ৭দিন নীলকুঠির অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটক করে রাখে। পরে কৃষকরা আবার কুঠি আক্রমণের প্রস্তুতি নিলে নীলকররা ছফাতুল্লাকে ছেড়ে দেয়।

নীলকুঠি আক্রমণের সময় কৃষকরা ব্যবহার করতো দেশী অস্ত্র। এর মধ্যে একটি অস্ত্র হচ্ছে ‘চেঙ্গা’; বাঁশ কেটে ছোট সাইজ করে দুমুখ ছুঁচালো করে লোহার পাত লাগিয়ে দেয়া হতো। এই চেঙ্গা জোরে ছুঁড়ে দেয়া হতো শত্রুপক্ষের দিকে। উদ্দেশ্য দুই দিকের যে কোন একদিক লেগে যাতে শত্রু পক্ষ ঘায়েল হয়। কখনও কখনও চেঙ্গার মাথায় কাপড় ছড়িয়ে কেরোসিন তেল দিয়ে আগুন ধরিয়ে তা ধনুকের সাহায্যে ছুঁড়ে দেয়া হতো।

অর্থাৎ, যখনই কোন ব্রিটিশ তাদের সভ্যতার বড়াই করতে আসে তখন নীল বিদ্রোহ, মসলিনের কারিগরদের আঙ্গুল কাটা, তিন লাখ বাঙ্গালিকে কৃত্তিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে মারা এইসব দেইখাইয়া দিয়া বলি তোরা নাজি জার্মানির থেকেও জঘণ্য, তোদের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হওয়া দরকার।

এইবার সাম্প্রতিক বাংলায় চোখ দেয়; বর্তমানে গার্মেন্টস শিল্পের নামে গরীব আর স্বল্পশিক্ষিত মানুষকে গার্মেন্টস মালিকেরা কীভাবে নিপীড়ন, নির্যাতন আর বঞ্চিত করছে দেখুন। অথচ, সেই নীলকুঠি’র সেই ব্রিটিশদের মত আজকের গার্মেন্টস মালিকেরা অভিজাত্যের নামে স্বেচ্ছাচারিতায় নিমজ্জিত দেখুন। কি সুন্দর সুন্দর জামা-কাপর পরে টিভিতে মিডিয়ার সামনে ব্রিফিং দিবে। কত নীতি কথা বলবে মনে হবে সাচ্চা একজন ভাল মানুষ আর এই মানুষটির কি পরিমাণ অর্থ-বিত্ত লুলুপ একজন উচ্চ মুনাফাখোর তা তাদের গাড়ি-বাড়ি আর বিলাসী জীবনের দিকে তাকালেই বুঝতে পারি।

আবার আমরা খুব গর্ব করে বলি আমরা খুব ভাগ্যবান যে সভ্যতার একটা ভাল অবস্থানে পৃথিবীতে আমরা আসছি। ভুল! ভুল!! সবই মিথ্যা!! কিসের সভ্যতা? মানুষ এখন সভ্যতার খুব বাজে একটা সংযোগস্থলে। মানুষের নৈতিকতার ধারনা পরিপূর্ণ হতে যাচ্ছে মাত্র পরিপক্বতাতো ডের দেরী। এখনও তা শৈশবে বলতে হবে। বিশ্বের বেশীরভাগ মানুষ-ই আজও অধিকার সচেতন না। তারা বুজেও না কি কারণে এই বিশ্বে বসবাস! অর্থাৎ তার বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য কি? সেলফিস জীনের ধারক হওয়ায় শুধু উদ্দেশ্য? প্রশ্ন রইল!!

আজ মানুষের মাঝে এতটা মানবিকতা নাই যে একজন ব্যবসায়ী যার পরিশ্রমে এত এত মুনাফা করছেন তাদের সর্বনিন্ম পর্যায়ের জীবন যাপনের পারিশ্রমিকটুকুও দেন না। অথচ লাভ হচ্ছে না বিশ্ব বাজার মন্দা এমন হাজারও ওজুহাতে শ্রমিকদের মাসিক মাইনে দেরীতে দেয়া, উৎসব ভাতা না দেয়া বা কর্তন করা, বার্ষিক মাইনে বৃদ্ধি (increment) না দেয়া সহ হাজারও বঞ্চনায় শোষণ করে থাকেন হালের সুশীল ব্যবসায়ীরা নিরীহ বস্ত্র-শ্রমিকদের! ব্রিটিশ আমলে বিদেশী মুনাফাখোরদের নির্যাতনে নিষ্পেষিত ছিল এই মানবতা আর আজ বড় বড় ডিগ্রী নেয়া দেশি হায়েনাদের বঞ্চনার স্বীকার গরীব-দুঃখীরা!! সভ্যতার কি নির্মম বাস্তবতা। আর তাই সব সময় মনে হয় আজও শিক্ষা মানুষকে মূল্যবোধ শিখাতে ব্যর্থ।

কতটাই আর পার্থক্য, আগে বিক্রি হত শ্রম-রুপ-দেহ! আর আজ? এর সাথে যুক্ত মানবিক সব অনুভূতি!! আজ বাংলালিঙ্ক দামেই মানুষের জীবন পাওয়া যাই। ছাগলের দামেই মানুষ বিকুয়! আর মানবিকতা, শিক্ষা, বিবেক, বুদ্ধি, শিল্প, সংস্কৃতি, মাতৃপ্রেম, দেশপ্রেম, ধর্মানুভুতি, শিল্পানুভুতি, আদর্শ, কবিত্ব, প্রেম, ভালবাসা, আবেগ সব সবই বিক্রয় হয়!! এমনকি, মানুষের স্বকীয়তা আর, আত্মসম্মানবোধও বাজারে পাওয়া যায়!! মায়ের চুম্বন থেকে মানবিকতা, দেশপ্রেম থেকে সামাজিকতা সবই বিপণনের বিপননযোগ্য পন্য!! জানিনা কত আর কত বিপর্যয়ের পর মানুষ আবার নিজেকে চিনতে পারবে!

আমরা কি নীল চাষের সময়কার সেই বিদ্রোহের অপেক্ষায় আছি? শ্রমিকশ্রেণীর পীঠ দেয়াল থেকে আর কত দূরে? তাঁরা কি ঘুরে দাঁড়াবে না সহজাত বৈশিষ্ট্যে? আর কত আমাদের গার্মেন্টস শ্রমিকদের এইভাবে নানা ওজুহাতে বঞ্চিত-লাঞ্ছিত করা হবে। কবে পাবে তারা তাদের শ্রমের ন্যায্য মুল্য। কবে তাদের একটা নিরাপদ ঝুকিমুক্ত স্বাস্থ্য সম্মত পরিবেশে কাজের নিশ্চয়তা পাবে? আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কি শুধু শিক্ষিত (তথাকথিত) আর, ধনিক-শ্রেণীর? নাকি তারা গনমানুষের? এই কথাটা বুঝার নৈতিক-আদর্শিক অবস্থা কইজন রাজনীতিকের আছে? শুধু প্রশ্ন-ই করে যাব, আমরা? আজ আমরা সভ্যতার নামে এমন সভ্য হয়েছি যে অন্যায়ের প্রতীবাদ করতেই ভুলে গেছি।

মহান মনিষীর কথায় শেষ করবঃ

“You must not lose faith in humanity. Humanity is an ocean; if a few drops of the ocean are dirty, the ocean does not become dirty.”—মহাত্মা গান্ধী

 

আশা করব মানুষের জয় হবে একদিন!! মানবিকতার অফুরন্ত মহাসমুদ্র কি আজ ধ্বংসের কিনারায় থেকে আবার জয়গান গাইবে…

আশায় থাকব বিদ্রোহের রং পালটাবে এইবার!! আর সাদা, সবুজ,হলুদ বা নীল রঙের নয় একটা লাল বিদ্রোহের অপেক্ষায় রইলাম।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/tlincoln_bd/14783.html

 2 টি মন্তব্য

  1. আজাদ মাষ্টার

     গুড পোস্ট , আপনার পোস্টগুলি নিয়মিত পড়ছি ।

    1. তারিক লিংকন

      আপনাদের মন্তব্যই আমার প্রেরণা! ধন্যবাদ…একজন সিনিয়র সহ-ব্লগার একনিষ্ঠ পাঠক হলে তা আমার জন্যে বিশাল ব্যাপার!

মন্তব্য করুন