তারিক লিংকন-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

পুরুষতন্ত্র আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বোধহয় হাজার বছরের নৃশংসতায় আর নির্যাতনে নারীর জেনেটিক কোডই পরিবর্তন করে দিয়েছে

লিখেছেন: তারিক লিংকন

কৃষিসভ্যতার পর থেকে যখন নারীরা ক্রমেই বন্ধী হতে লাগল তখন থেকেই তাদের ব্যক্তিস্বত্বা আর স্বকীয়তা ভুলন্ডিত হয়ে অবিরত রবীঠাকুরের হৈমন্তীর মত শোপিস এবং সম্পদের সত্ত্বায় বিকশিত হতে থাকল। এর আগে নারীরা পুরুষের সাথে সমান কর্মক্ষম আর কর্মচঞ্চল ছিল। কৃষিসভ্যতার পর নারীরা ক্রমেই ঘরে বন্ধী হতে থাকে। তাদের মূল কাজ হয়ে পরল গৃহস্থলী কাজ আর সন্তান লালন-পালন। এরপর যেহেতু মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পরল  পুরুষের উপর তাই তাঁকে প্রত্যাশিতভাবেই শোপিস এবং সম্পদের সত্ত্বা বরণ করতে হল।

এমন কি ধর্মগুলো এসে এই ব্যাপারটা প্রতিষ্ঠিত করা হল যে পুরুষেরা নারীর অবলম্বন বা পুরুষদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে অথবা নারীরা পুরুষের উপার্জন খরচ করে অর্থাৎ পরনির্ভরশীল। এক মহীয়সী নারীর কথায়ঃ

“আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্যেই পুরুষগণ ঐ ধর্মগ্রন্থগুলোকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করেছেন” — বেগম রোকেয়া…

আর প্রাসঙ্গিক এবং অতি-প্রাসঙ্গিকভাবেই নারীরা আজও যদি অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল থাকে তবেই ধর্ম ব্যবসায়িদের লাভ আর তাই আজ বাংলার নারীরা কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি আর ব্যবসা সবদিকেই সর্বত্র ছড়িয়ে পরছে বলেই হিফাজতিরা তাদের অস্তিত্বের সংকট অনুধাবন করতে পেরে নারীর প্রতি বিরুদ্ধাচার করছে। তাই তারা যেকোন মুল্যে নারীদের আবার অন্ধকারে নিক্ষেপ করতে চাই। অতিব দুঃখের বিষয় আমাদের নারীরাই অনেকে এইসব বুঝতে পারে না। তারা বুঝতেই পারে না অর্থনৈতিক মুক্তিই হচ্ছে তার মুক্তির মূল কথা আর ব্যক্তিস্বত্বার মূল চেতনা। এই মুক্তি ছাড়া তার স্বাধীনতা নিশ্চিত হওয়া তো দূরের কথা স্বাধীনতা কি তাই বুঝতে পারবেন না কস্মিনকালেও। কোন মানুষকে আজ্ঞবহ পশুর মত করতে চাইলে তার সব উপার্জনক্ষমতা ধ্বংস করে দাও তাহলেই কেবল সে গৃহপালিত পশুর ন্যায় আচারন করবে।

অর্থাৎ কৃষিসভ্যতার পর পরিবার আর সমাজ নিয়ন্ত্রণের ঝাণ্ডা পুরুষের হাতে যেতে শুরু করে। এই হাজার হাজার বছরের পটপরিক্রমায় আজ এই পুরুষতন্ত্র নারিকে শুধু গৃহে বন্ধী করে নি বন্ধী করেছে তার স্বাবলম্বী স্বত্বাকেও আজ উন্নত বিশ্বসহ বিশ্বের প্রায় সবকটি দেশেই নারী স্রেফ একটা খেলার পুতুল আর বিপণনের প্রধান হাতিয়ার। আজ কোন মেয়েকে ১ মিলিয়ন টাকা দিলে তা সে দেশে বা বহির্বিশ্বে যেকোন স্থানেরই হোক না কেন তারা রুপ চর্চায় এর সিংহভাগ অপচয় করবে অথচ সম-পরিস্থিতিতে একজন পুরুষ তার সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যেই এই অর্থ ব্যয় করবে সার্থকভাবে (উভয় ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম আছে)! এর মুলেই রয়েছে তার নিজেক শোপিস আর সম্পদ করে সাজায় রাখার তীব্র মনবাসনা। কেন আজ নারী নিজ থেকেই তা করে। দেখুন যখন আমাদের সমাজে কোন মানব সন্তান জন্ম নেয় তখন তার মধ্যে কোন মানসিক লিঙ্গ বৈষম্য থাকে না থাকে শুধু শাররীক লিঙ্গ বৈষম্য। আর আপনি লক্ষ্য করলেই দেখবেন চারপাশের ছেলে সন্তান মাঠে গিয়ে দুরন্তপনা করতে শুরু করেছে আর মেয়ে সন্তান আয়নার সামনে বসে বউ সাজার অনুশীলনে মত্ত। মাত্র ৪-৫ বছর বয়সেই কন্যা সন্তানের এইরুপ বিকশিত করে আরেক নারী হয় তার মা বা, নানি আথবা দাদি এমন তা বড় বোনও হতে পারে। এতেও নারীর কোন প্রকার দোষ বা দুর্বলতা দেখি না। কারণ এই পুরুষতন্ত্র আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজ বোধহয় হাজার বছরের নৃশংসতায় ও নির্যাতনে নারীর জেনেটিক কোডই পরিবর্তন করে দিয়েছে।

এদিকে ‘নারী’ আর ‘মা’র জন্যে একটি করে দিবস রেখেছে আজকের আধুনিক বিশ্ব! সব নারীই ‘মা’ এই স্বীকার্যে বলছিঃ ভেবে দেখুন কতবড় হঠকারিতা (দুঃখিত এইভাবে বলার জন্যে, কিন্তু আমার কাছে তাই মনে হয়); আরে আমরা এই দুনিয়ার মুখ দেখলাম যার জন্যে মাত্র একটা দিন দিবেন তাঁকে? নাকি জীবদ্দশার প্রত্যেকটা দিনই মায়ের জন্যে উৎসর্গিত? ‘মা’য়ের কথা আসলেই আমার ম্যাক্সিম গোর্কির বিখ্যাত গল্প ‘মানুষের জন্ম’ (১৮৯২) এর কথা মনে পরে। আর সেই ‘মা’ কে মানুষভিন্ন অন্য কিছু ভেবে আমাদের সমাজেরই কিছু পুরুষ নীতিমালা বা আচারনবিধি বেঁধে দেয় তখন সেই মা’য়ের মানুষ-স্বত্বা আলাদা করে খুঁজে পাই না। সব নারীই ‘মা’; তাই মা’দের জন্যে আলাদা নীতিমালাও বাতুলতা। দুনিয়ার সব মানুষই সমান স্বাধীন; অথচ পুরুষতন্ত্রের ভাবখানা এমন নারীরা অধিকারভুক্ত সম্পদ সে যেভাবে খুশি চালাবে। নীতিমালা করে দিবে আবার দিবসও রাখবে, এ যেন আরেক নাটক।

ভাববেন না পুরুষদেরই শুধু খোলা আকাশ বিস্তীর্ণ পাহাড় আর সুবিশাল সবুজ মাঠ বা অরণ্য অথবা অফুরন্ত সমুদ্রের রুপ উপভোগ অধিকার আছে। নারী পুরুষদের মতই সমান অধিকার নিয়ে এই দুনিয়াতে এসেছে; প্রত্যেকটা মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দই তার ব্যক্তিগত নীতিমালা করে দিবে যে সে কীভাবে তার জীবন যাপন করবেন!

এখন প্রশ্ন আপনি কি আপনার মা-বউ-মেয়েকে মানুষ ভাবেন আপনার মত, নাকি নারীদের আপনি একটা কৃতদাসী বা অধিকারভুক্ত ভৃত্য ভাবেন? যদি আপনার মত মানুষ ভাবেন তবে তাঁকে তাঁর মত চলতে দিন। আপনি যেমনটি মানুষ আপনার কলিজার টুকরা ছোট্ট মেয়েটিও তাই, আপনার প্রেয়সী বউ আর মহীয়সী মা কিন্তু এর ব্যতিক্রম নয়! ইনারা সবাই মানুষ আমার মতই একটা স্বত্বা তারও আমারমতই তাঁর সব অনুভূতি সংবেদনশীল। নিজেকে শ্রদ্ধা করলে তাকেও করুণ। আমরা কেউ পুরুষ বা নারী হয়ে জন্মগ্রহণ করি নি বা আমরা কেউ হিন্দু-মুসলিম-খ্রিষ্টান হয়েও জন্মায় নাই। আমরা জন্ম নিয়েছি মানব সন্তান হিসেবে।  আমি সব সময় স্বপ্ন দেখি ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-গোষ্ঠী-লিঙ্গ বৈষম্যহীন একটি স্বাধীন সমাজের…

স্বপ্ন দেখুন জানেনতো স্বপ্নে কোন নিয়ম নেই…

স্বপ্নই একমাত্র যথার্থ স্বাধীন…  

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/tlincoln_bd/14528.html



মন্তব্য করুন