তারিক লিংকন-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

অসাড় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, জামাত-হিফাজতি সহিংসতা, সরকারের করনীয় আর গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান

লিখেছেন: তারিক লিংকন

গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান

তৃতীয় ভাগ: মৌলিক অধিকার, ২৮ নং অনুচ্ছেদ: ধর্ম প্রভৃতি কারণে বৈষম্য এর

উপ অনুচ্ছেদ-

(১) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শণ করিবেন না।

(২) রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।

(৩) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধ্যকতা বা বাধা শর্তের অধীন করা যাইবে না।

(৪) নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোনকিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।

 

এখন আমরা যদি অনুচ্ছেদের বিষয়গুলো একটু বিশ্লেষণ করি, তবে এই বিষয়ে সহজ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি। (১) ও (৩) উপ-অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশে কিন্তু ধর্মের কারণে মাদ্রাসা বলে কোন আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা থাকতে পারে না। দেশের সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার মাধ্যমে গণজীবনের মান উন্নত করা। সেখানে মাদ্রসা শিক্ষাব্যবস্থা সরাসরি এর বিপরীত। রাষ্ট্র মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা নামক আরেকটি শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে মৌলবাদী আদর্শে অদক্ষ-অকর্মঠ, দেশপ্রেমহীন নাগরিক তৈরি করতে পারে না। এই মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত (আসলে অক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন, প্রকৃত অর্থে শিক্ষার ব্যাপকতায় তারা শিক্ষিত কিনা তা সমাজবিজ্ঞানীরা ববেন) অধিকাংশই সমাজের উচ্ছিষ্টভুগি পরজীবী হয়ে জীবনাতিপাত করে। এদের ৭৫ শতাংশই বেকার থাকে অর্থাৎ সমাজের রাষ্ট্রের উন্নয়নে কোন ভূমিকা থাকে না, নেহাতই সমাজের বোঝা হয়েই এদের জীবনাবসান ঘটে। 

 

সম্প্রতি ডঃ আবুল বারকাত (অর্থনীতিবিদ) একটি সাপ্তাহিকে তার গবেষণার ফলাফল এইভাবে তুলে ধরেছেনঃ “বাংলাদেশে এখন প্রতি ৩ জন ছাত্রের ১ জন মাদ্রাসার ছাত্র (যার মোট সংখ্যা হবে ৮০ লাখ); দেশে মোট মাদ্রাসার সংখ্যা হবে ৫৫,০০০-এর বেশি, যার মধ্যে ৭৩ শতাংশ কওমি মাদ্রাসা; এসব মাদ্রাসা পরিচালনে বছরে ব্যয় হয় আনুমানিক ১,৪০০ কোটি টাকা, আর মাদ্রাসা পাসদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৭৫ শতাংশ। শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণের অভিঘাত ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে এ কথাও বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে যে অধিকাংশ মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রী কিন্তু স্বল্পবিত্ত-দরিদ্র পরিবার থেকে আগত। উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গি আত্মঘাতী বোমাবাজদের ক্ষেত্রেও কিন্তু একই ধরনের ধারণা-কাঠামো প্রযোজ্য। এখানে তরুণরা বিভ্রান্তির দলে।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক শ্রেণী কাঠামো বিকাশ প্রবণতা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের সার্বিক দারিদ্র্য অবস্থার অধোগতি হয়েছে। সেই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিম্নগামী প্রবণতা এবং মধ্য-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিম্ন-মধ্যবিত্তের দিকে ধাবিত হওয়া, নিম্ন-মধ্যবিত্তের গতি দরিদ্রমুখী আর সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে কিছু ধনিক শ্রেণীর মানুষের হাতে (যারা মোট জনসংখ্যার ২.৭ শতাংশ, আবার যাদের ১০ শতাংশ দখল করে আছে ধনীদের ৯০ শতাংশ সম্পদ), এক দিকে এই প্রকট গণদারিদ্র্য এবং ব্যাপক অসমতা আর অন্যদিকে মধ্যবিত্তের অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা এবং নগণ্যসংখ্যক মানুষের হাতে অঢেল সম্পদ। এসবই বাংলাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাসহ উগ্র মৌলবাদ উৎপাদন ও পুনরুৎপাদনের শক্তিশালী অনুকূল পরিসর সৃষ্টি করেছে।”

 

অন্যদিকে, এমন ব্যবস্থা সংবিধানের উপরোক্ত (১) ও (৩) অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই প্রজন্ম চত্বর থেকেই সরকারকে আহ্বান জানানো উচিৎ এই ব্যাপারে অতিদ্রুত উদ্যোগী হতে এবং বাংলাদেশে এক ও অভিন্ন শিক্ষাপদ্ধতি চালু করতে। নতুবা আমাদের ধ্বংসের জামাতি রূপরেখার বাস্তবায়ন কেউ ঠেকাতে পারবে না!! আবার (২) নং উপঅনুচ্ছেদের বিশ্লেষণে আমরা পাই সরকার সরকার একশ্রেণীর জনগণকে ধর্মীয় শিক্ষার নামে আধুনিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে। তাহলে সর্বস্তরে সমান অধিকার নিশ্চিত হল কীভাবে? (৩) উপ-অনুচ্ছেদের অপব্যাখ্যায় কেউ দাবী করতে পারে মাদ্রাসা কোন অমুসলিমকে ভর্তি করতে অনিচ্ছুক না। দাবিটা (৩) উপ-অনুচ্ছেদের ফাঁক গলে বের হইতে চাইবে, কিন্তু সরাকার যেহেতু অন্য কোন ধর্মের জন্যে এত বিশালাকারে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখেন নাই তাই অতি যুক্তিকভাবে একটা নির্দিষ্ট ধর্মের জন্যে চালু রাখাটাও সংবিধান পরিপন্থী। আবার (৪) নং উপঅনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্র এখানে বালিকা বিদ্যালয় / শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাতে পারে। কিন্তু কোন বালক বিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠান চালাতে পারেনা। সেটা সরাসরি (২) নং উপঅনুচ্ছেদের পরিপন্থী। অন্যভাবে বললে একক বালক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী অবৈধ। যেহেতু এগুলো সরাসরি উক্ত অণুচ্ছেদের সাথে সাংঘর্ষিক। বালক বিদ্যালয়ে পড়া ছাত্রদের সাথে কম্বাইন্ড ( ছাত্র-ছাত্রী একসাথে) বিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থীর মধ্যে কতটা গুনগত পার্থক্য আছে তা বলার দায়িত্ব সমাজবিজ্ঞানীদের, ভবিষ্যতে সেই বিষয়ে না হয় আলোচনা করবে কোন বিজ্ঞ পাঠক।

অতি সচেতন ভাবেই আমাদের এই কাজ টা করতে হবে।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষাবিদের মতামতে আর তাবৎ দুনিয়ার অভিজ্ঞতা সরকারের শিক্ষাপ্রতিবন্ধী বানানোর স্বপক্ষে মতামত দেয় না। আবার, সংবিধানের সাথে যেহেতু এই শিক্ষা ব্যব্স্থা সাংঘর্ষিক তাহলে এই কাজ টা করতে সরকারের কোন বাধা থাকার কথা না। আজ যেহেতূ এই প্রজন্ম শাহবাগে জেগে উঠেছে তাই জন-সমর্থন নিয়ে ও সরকারের আর সন্দেহ থাকা উচিৎ না। অপরদিকে সরকারের সংসদে ২/৩ অংশ এর বেশি শক্তি আছে। সরকার যদি সত্যি নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি মনে করে তবে এখন-ই এই অত্যাবশ্যকিয় কাজ গুলো করা অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তানাহলে ভবিষ্যতের আর্থ-সামাজিক বিপর্যয় থামানো কষ্টসাধ্য হবে। বারকাত স্যারের সাক্ষাৎকারে সেই আশংকা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়েছে।

রাষ্ট্র যদি এক দল কিশোর ও তরূন জনগোষ্টি কে ইচ্ছাকৃত ভাবে প্রতিবন্ধি আর মৌলবাদি বানায় তবে যৌক্তিকভাবেই সমাজের অন্তঃসারশুন্যতার পরিচায়ক হবে এমন শিক্ষানীতি (দ্বৈতনীতি)। আমার পরিচিত এক মাদ্রাসার ছাত্র আমায় আফসোস করে বলছিল যে তারা আলিম / পাশ করার পর মেডিকেল/ প্রকৌশল শিক্ষা ব্যবস্থায় ভর্তি পরীক্ষায় পিছিয়ে থাকে। তারা কোনভাবেই মূলধারার ছাত্রদের সাথে পেড়ে উঠতে পারে না, দু-এক জন কঠোর পরিশ্রম করে মূলধারায় পড়তে এসে জঙ্গিপনা শুরু করে (সম্প্রতি রাজীব হত্যা, বুয়েটের ছাত্রকে কুপিয়ে জখমই এইসবের প্রমান), তাদেরকে সেই উদ্দ্যেশ্যেই গড়ে তোলা হয়।

অবিলম্বে সরকারের প্রতি এই ব্যপারে উদ্যোগ নেয়ার অনূরোধ রইল। এক দেশ এক শিক্ষা ব্যবস্থা । নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান-প্রণয়ন হইতে কোনকিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।        উপানুচ্ছেদের এই ৪ নং ধারা বরং ওইসব মাদ্রাসার ছাত্রদের দ্রুত মূলধারার সাথে সমন্বয়ের তাগিদ দেয়। আর আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা উল্টা তাদের আরও বেশী অনগ্রসর করে রাখছে উগ্র সাম্প্রদায়িক পশ্চাৎপদ  শিক্ষাব্যবস্থায়।  রাষ্ট্রকে যেকোন মুল্যে এই বিপুল পরিমান জনগণকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে এমন শিক্ষাব্যবস্থার আনায়ন করতে হবে যা তাদের ধর্মীয় শিক্ষাকে উৎসাহী করবে বা নিবৃত করবে না, আবার আধুনিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত করবে না; যা এই বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীকে গড়ে তুলবে সম্পদ হিসেবে।

আমাদের সংবিধানে সব কিছূর এত সূন্দর সমাধান থাকতে আমাদের সরকারগূলো কেন এত পিছিয়ে আছে? তাই আজ একটাই দাবি ‘মুক্তিযুদ্ধের এক অভিন্ন চেতনাই হবে এই বাঙলাদেশ’

কূপমণ্ডূকতা আর সাম্প্রদায়িকতার দিন শেষ করতেই হবে! তবেই আমরা বাঙ্গালীরা সরকার ও বিরোধী উভয় দলকেই মুক্তিযুদ্ধের শক্তি হিসেবে দেখতে পাব। আর এইটাই প্রজন্ম চত্বরের সবচে জোরাল আদর্শিক অবস্থান…

জয় বাংলা… জয় বঙ্গবন্ধু…

জয় তারুণ্য… জয় শাহ্‌বাগ… জয় গণজাগরণ…

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/tlincoln_bd/13547.html

 2 টি মন্তব্য

  1. আজাদ মাষ্টার

     রেফারেন্স হিসাবে আপনার পোস্ট অনেক কাজেই লাগবে পরিশ্রম করে এইরকম একটা লেখার জন্যে আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ ।

    1. তারিক লিংকন

      প্রজন্ম ব্লগে এইটা আমার ৩য় লিখা। আপনার মত সিনিয়র ব্লগারের কাছে এমন মন্তব্য সত্যিই অনেক প্রেরনাদায়ক… অফুরন্ত আন্তরিক ধন্যবাদ!! 

মন্তব্য করুন