সঞ্জীবন সুদীপ-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

দাম দিয়ে কিনেছি বাংলাঃ মাকালকান্দি গণহত্যা

লিখেছেন: সঞ্জীবন সুদীপ

পূর্বের জেলা হবিগঞ্জের ভাটি জনপদ বানিয়াচং এর কাগাপাশা ইউনিয়নে হাওরের পানিতে দ্বীপের মত ভেসে থাকা ছায়া সুনিবিড় এই গ্রামের নাম মাকালকান্দি। হিন্দু অধ্যুষিত এই গ্রাম শিক্ষা দীক্ষা আর বিত্তবৈভবের জন্য সুপরিচিত ছিল।

তারিখ ১৮ আগস্ট ১৯৭১। শ্রাবণ সংক্রান্তি। বরাবরের মতো সর্প দেবী মনসার আরাধনায় আর উৎসবে মগ্ন থাকার কথা ছিল গ্রামের মানুষদের। কিন্তু গল্পটা একাত্তরের বলেই সবকিছু বরাবরের মতো হয়নি। হিংস্র ভিনদেশি শ্বাপদ আর স্বদেশী সাপের ছোবলে তছনছ হয়ে গিয়েছিল শান্ত জনপদ।

শ্রাবণ সংক্রান্তির ভোর। যুদ্ধের দেশে নিরুপায় মানুষগুলো আরো বেশি করে দেবীর পায়ে নিজেদের সঁপে দিচ্ছিল। তখন ও আকাশ মেঘে ঢাকা…..৪০-৫০টা নৌকায় হানা দেয় পাকি জানোয়ারেরা। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে এই দেশেরই কিছু বিশ্বাসঘাতক রাজাকার।

গোপাল রঞ্জন চৌধুরীর পরিবার তখন পূজার্চনায় ব্যস্ত। এই পরিবারের ১১জনকে দেবী মনসার সামনেই হত্যা করে পাকবাহিনী। একমাত্র সদস্য হিসেবে বেঁচে যান গোপাল রঞ্জন চৌধুরী। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরে এই গোপাল রঞ্জনের দীর্ঘশ্বাস আমার দৃষ্টি সীমানাকে ঝাপসা করে দেয়।

৩মাসের ছেলে কানুকে বাঁচাতে বুক পেতে দিয়েছিলেন মিনতি রাণী চৌধুরী। বাঁচাতে পারেননি। কোল থেকে কেড়ে নিয়ে সেই দেবশিশুকে নির্মম ভাবে মেরেছিল বুনো হায়েনার দল। রক্তাক্ত সেই পুত্রের লাশকে বুকে জড়িয়ে আর্তনাদ করে উঠেছিলেন মিনতি রাণী,একটা বুলেটের জন্য অনুনয় করেছিলেন। নিজের পুত্রের লাশ আজীবন বয়ে বেড়ায়ে চাননি এই হতভাগ্য মা। তাঁর কোল থেকে কেড়ে নিয়ে হাওরের পানিতে ছুঁড়ে ফেলেছিল কানুর প্রাণহীন রক্তাক্ত দেহ। মিনতি রাণীকে  চরমতম অপমানের পর গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ঘুরয়েছিল পুরো গ্রাম।

৮৭ বছরের বৃদ্ধ কংশ মোহন আজো বয়ে বেড়ান নিজের চোখের সামনে বাবার লুটিয়ে পড়ার ভয়াবহ দুঃস্মৃতি। যেমন করুণা সিন্ধু চৌধুরী বয়ে বেড়ান তাঁর বাবা ভাই ভাতিজাসহ পরিবারের ছয় সদস্যের লাশ।

নাম না জানা এক মা ছোট দুই বাচ্চাকে সন্তর্পণে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন হাওরের পানিতে। একটা কলাগাছ ধরে ভাসতে ভাসতে তারা উঠেছিল পাশের গ্রামে। সেই মায়ের খবর জানিনা…..

আরেক বৃদ্ধা গোলাগুলির শব্দে ভয় পেয়ে লুকিয়েছিলেন বাড়ির দোতলার ঘুপচিতে। ভয় পেয়ে আর নামেননি পাঁচদিন। বেঁচেছিলেন বৃষ্টির পানি খেয়ে,পাঁচদিন পরে ভয়ে ভয়ে নেমে সেই মহিলা দেখেন চারদিকে শুনশান নীরবতা। কেউ কোথাও নেই। এখানে ওখানে লাশের স্তুপ,শেয়াল কুকুরে টেনে ছিঁড়ছে গলিত মাংস।গলিত লাশের উৎকট গন্ধে তাঁর নাক বন্ধ হয়ে আসে।

কি,রূপকথা মনে হয়? একাত্তর এমনি আশ্চর্য রূপকথার সময়। একদিকে পুড়ছে গ্রাম,স্বদেশী শুয়োরেরা লুটতরাজে ব্যস্ত। আরেকদিকে আমার দশের ঘরে না পৌঁছানো বোনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে মাংস লোলুপ জানোয়ার। আমার বোন কেঁদে মাকে ডাকে…..মা তখন সংজ্ঞাহীন। বেয়নেটের আঘাতে রক্তাক্ত শরীর থেকে নেমে আসা রক্ত থেকে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন মানচিত্র। হাওরে নাক উঁচিয়ে সব দেখা আমার ভাইটা কদিন পরেই ঝাঁপিয়ে পড়বে,ছিনিয়ে আনবে লাল সবুজের পতাকা।

মাকালকান্দির সেই গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী করুণাসিন্ধু চৌধুরী জানাচ্ছেন,সেই গণহত্যায় প্রায় তিনশ মানুষ মারা গিয়েছিল। তাঁদের কারোরই কোনো সৎকার হয়নি। লুট হয়েছিল কোটি টাকার সম্পদ। আগুনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল ঘরবাড়ি। যারা বেঁচেছিল পাড়ি জমিয়েছিল ভারতে। পথে ভয়াবহ ডায়রিয়ায় আরো শ’দুয়েক মানুষ মারা যায়। দেশ স্বাধীন হবার পর ফিরে দেখেন এখানে ওখানে শুধু মানুষের হাড় আর মাথার খুলি।

 

পরে সব এক করে গণকবর দেয়া হয়েছিল। এসে দেখেছিলেন দখল হয়ে গেছে অনেক জমি জমা। অনেক বছর পর মাকালকান্দিতে নির্মাণ করা হয় শহিদ স্মৃতিসৌধ,যা সাক্ষী হয়ে আছে সেই নির্মম গণহত্যার।

ঐ গণহত্যা ও লুটে অংশ নেয়া রাজাকারদের ভেতরে যাদের নামা জানা গিয়েছে,সৈয়দ ফজলে হক মোতাওয়াল্লী,উপজেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক কনর মিয়া,আব্দুল খালিক,আজমান,ইব্রাহিম শেখ,আতাউর। আমার মায়ের রক্তে ভেজা মাটিতে আজো হেঁটে চলে এই জানোয়াররা। এই লজ্জা রাখি কোথায়…..

লেখাটা লিখতে গিয়ে বারবার চোখ ঝাপসা হচ্ছে,বারবার রক্তে নতুন শপথ জাগছে এত দামে কেনা এই দেশ শুয়োরের খোঁয়াড় হতে পারেনা।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/sudeep/31879.html



মন্তব্য করুন