শিহাব হায়দার মুন (সপ্তক)-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

নরক ত্যাগ

লিখেছেন: শিহাব হায়দার মুন (সপ্তক)

~নরক ত্যাগ~

~~সপ্তক~~

 

 

 

হাইস্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে মুন্নাকে একটু বেগই পেতে হল। মতিঝিল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ভালই দিয়েছিল মুন্না, কিন্তু ইংরেজিটা একটু খারাপ হয়ে গেল। পান্না মুন্নার বড়ভাই মতিঝিল সরকারি স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র কিন্তু মুন্না চান্স পেল না । সরকারি প্রাথমিক স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী তক যা ইংরেজি মুন্না শিখেছে তাতে কুলাল না। পান্না,মুন্না,নান্না তিন ভায়ের প্রাইমারি স্কুল একই।মুন্নার ধারনা ছিল সে ইংরেজিতে একেবারে খারাপ না ।কিন্তু বিধি বাম। পীর-জঙ্গি মাজার এর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল টা খারাপ না , একটু নতুন সরকারি স্কুলের তুলনায় ।আইডিয়াল স্কুলেও যথারীতি ভর্তি পরীক্ষা দিলো মুন্না । তবে এবার চান্স পেল ওয়েটিং লিস্টে কিন্তুভর্তি হতে পারল।

আইডিয়াল স্কুলে প্রথম মুন্না ক্লাস করলো ,উনিশ ছিয়াত্তর এর মার্চ মাসে । প্রথম ক্লাসেই মুন্না ইসলামিয়াত এর শিক্ষক হেকমত স্যারের ক্লাসে পড়ে গেল।মুন্নাকে নাম ধাম জিজ্ঞেস করলো হেকমত স্যার ।এরপর নসিহত দিলেন স্কুল লাগোয়া মসজিদে সব ছাত্র জামাতে নামাজে শামিল হয়,এতে যেন কখনো ভুল না হয়।আর স্কুলে টুপি পড়ে আসতে হবে।মুন্নার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।পান্নার সরকারি স্কুলে এসবের বালাই নেই।ইচ্ছা না হলেও মুন্নাকে টুপি পকেটে নিয়ে স্কুলে আসতে হল,স্কুলে ঢোকার আগে টুপিটা মাথায় পরে নিত।

মুন্নাদের বাসায় ধর্মীয় গোঁড়ামি নেই।তিন ভাই বাসায় হুজুরের কাছে আরবি পড়ে।ইতিমধ্যে পান্না কোরান খতম দিয়েছে,মুন্না প্রায় দেবার পথে,নান্না মাত্র কোরান ধরেছে।মুন্না বুঝ হবার পর থেকে বাবাকে কখনো ঈদের/শবেবরাত এর নামাজ ছাড়া নামাজ পড়তে দেখে নাই, এমনকি জুম্মার নামাজও না। একটু লজ্জাই লাগত,সব বাবারাই জুম্মার নামাজ পড়ে , বাবাটা যে কেন পড়ে না?।তবে বাবার পীর ভক্তি আছে।আরও ছোট থাকতে মুন্নাদের তিন ভাইকে নিয়ে বংশালের এক পীরের দরবারে যেতেন বাবা।পানি ফু দিতেন খাবার জন্য পীর সাহেব বুকেও ফু দিয়ে দিতেন।পান্না ক্লাস ফাইভ থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে।নাইনে উঠার পর থেকে তিরিশটা রোজাও রাখা শুরু করেছে।

মুন্না এখন প্ররযন্ত তেমন একটা সিরিয়াস না । জুম্মার নামাযটাও ঠিক মত পড়া হয় না। আইডিয়াল স্কুলে ভর্তির সুবাদে জোহর এর নামাজ পড়া শুরু হয়ে গেল।টিফিন এর টাইম জোহর এর নামাজের সাথে মিলিয়ে দেয়া হয়।আগে জামাত এর সাথে নামাজ ,তারপর টিফিন খাওয়া।আইডিয়াল স্কুলে ক্লাস সিক্সে ইসলাম ধর্মে অতিরিক্ত দুটি বই পড়ানো হয় যা পুরপুরি আরবি,লিখতেও হয় আরবিতে যা অন্যকোন স্কুলে পড়ানো হয় না। এটা রীতিমত বিপদে ফেলে দিল মুন্নাকে ,পড়তে ত ইচ্ছা হয়ই না লেখা ত দুরের কথা। আইডিয়াল স্কুলের বেশীরভাগ শিক্ষকেরই দাড়ি আছে এবং টুপি পরেন। এমনকি সামসুজ্জামান স্যার বিজ্ঞান এর শিক্ষক রীতিমত পাগড়ী পরেন।স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফাইজুর রহমান হাল্কা পাতলা গড়নের ছোটখাটো মানুষ,মুখে দাড়ি ,মাথায় টুপি,পাঞ্জাবী পাজামা তাঁর নিয়মিত পোশাক। খুবই কাঠ খোট্টা টাইপের রাগী মানুষ। সারাদিন স্কুলেই থাকেন,স্কুলেই তাঁর বাসা,পরিবারসহ থাকেন। শওকতের আপা মুন্নাদের ইংরেজির ক্লাস নেন।খুব ভালো পড়ান কিন্তু এমন মেজাজি মহিলা শিক্ষক মুন্না এপর্যন্ত পায় নাই।পড়া না পারলে বেত দিয়ে মারতে মারতে মাটিতে শুইয়ে দিতেন ছেলেদের , ।শিক্ষকদের এমন মারধোর করাটা মুন্নার দু চোখের বিষ সেই ক্লাস ওয়ান থেকেই।এই ক্লাস সিক্স পর্যন্ত জীবনে মুন্না দেখে নাই কাউকে মারধর করে পড়া শিখানো গিয়েছে, মুন্না এমন নজির পায় নাই যে কেউ মার খেয়ে পড়া শিখে এসেছে।কিন্তু প্রচলিত কথা হচ্ছে শিক্ষকের মার না খেলে মানুষ হওয়া যায় না।

ক্লাস সিক্স এর ফাইনাল পরীক্ষায় মুন্না ইসলাম ধর্ম শিক্ষায় ফেল করল।এক বিষয়ে ফেল করার কারণে বিশেষ বিবেচনায় সেভেনে প্রমোশন পেল কিন্তু বাবাকে প্রধান শিক্ষকের সাথে দেখা করতে হল।এই প্রথম জীবনে ফেল করা।সেভেনেও এক ই অবস্থা,সেই দুটি আরবি বই বেশী পড়তে হবে। পান্নার সরকারি স্কুলে এ ব্যবস্থা নেই পান্না সিক্স সেভেনে ইসলামিয়াতে আশি নব্বই পেয়েই পাশ করেছে।কিন্তু আরবির জন্য পান্না মুন্নাকে কোন সাহায্যই করতে পারল না,যদিও অঙ্ক এবং ইংলিশে প্রয়োজনে সবসময় সাহায্য করে।যে হুজুর বাসায় কুরান পড়ান তাঁর কাছে সাহায্য নিতে গিয়ে মুন্না ব্যর্থ হল,হুযুর কোরানে হাফেজ হলেও এক লাইনেরও অর্থ জানেন না,হুযুর কোন প্রকার চেষ্টাও করলেন না। বাবা ব্যাপারটা বুঝলেন,কিছু বললেন না ।আর বাবা এমনিতে তিন ভাইয়ের কাউকেই কখনো পড়া দেখিয়ে দেন না।প্রয়োজনে প্রাইভেট পড়ার ব্যবস্থা করে দেন।এখন ক্লাস সেভেনে শুধু আরবি পড়ার জন্য প্রাইভেট পড়াটা হাস্যকর।চাপা টাইপের ছেলে মুন্না অসহায় বোধ করতে থাকে।

ক্লাস সেভেনে মুন্নার সাথে খাতির হয়েছে মাত্র দুজনের সাথে,নকিব আর মানিক।নকিব রা দুই বৎসর হল সৌদি আরব থেকে এসেছে,নকিবের বাবা সৌদিতে বাংলাদেশের দূতাবাসে চাকরি করতেন।এখন দূতাবাসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে অন্য চাকরি করেন,নকিবদের দেশে রেখে ওর বাবা এখন একাই সৌদিতে থাকেন।নকিব একটু ধনীর ছেলে ,নয়া পল্টনে থাকে,সুন্দর ছোট একটা সাইকেল আছে সোনালি রঙের ,মাঝে মাঝে চালিয়ে আসে। হাতে একটা বড় ডায়ালের সিকো ঘড়ি পরে। নকিব আর মানিক কে দুই প্রান্তের মানুষ মনে হয় মুন্নার কাছে। স্কুলের ক্লাস শুরু হবার অন্তত আধ ঘন্টা আগেই সবাই মোটামুটি এসে পরে। ক্লাস শুরু হবার আগের এই আধঘণ্টা তর্ক হয় আবাহনী মোহামেডানের খেলা অথবা বর্তমানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রাহমানের বীরোচিত আগমন বিষয়ক কথাবার্তা। মানিক জিয়ার খুব ভক্ত, বীর নেতা। পৃথিবীর যে দেশে যাচ্ছেন সে দেশেই লাল গালিচা সম্বর্ধনা পাচ্ছেন। দেশে উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে।মধ্যপ্রাচ্যের সাথে সম্পর্ক এতটাই ভাল করেছে জিয়া যে অল্প কিছুদিনের মধ্যে সৌদি আরব বিনে পয়সায় তেল দিবে।বাংলাদেশের ধনী হওয়া সময়র ব্যাপার মাত্র। নকিব উচ্চ কণ্ঠে এর প্রতিবাদ করে সবসময়। এই জিয়া বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পুরস্কৃত করেছেন।ইতিমধ্যে গোলাম আজমকে ফেরত এনেছেন দেশে,গোলাম আজম খুনি। এসব কথায় কান দেয় না মানিক বলে,আরে রাখ তোর শেখ মুজিব।উনাকে মারা হয়েছে ভালই হয়েছে।তা না হলে আজ ইন্ডিয়ার পেটে চলে যেতাম আমরা। শেখ কামালের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষ্যা পেয়েছে জাতি। শেখ কামাল কি করেছে জিজ্ঞেস করলে বলে , মেজর ডালিমের বউকে হাইজ্যাক করেছিল শেখ কামাল, সবাই জানে। নকীব ছাড়ার পাত্র না বলে ,তুই মানিক্যা দেখছিলি নাকি । মানিকের একই উত্তর,সবাই জানে। নকীব রেগে গিয়ে বলে,আরে বেটা শোন,শেখ কামাল অন্য দোষ থাকতে পারে কিন্তু ডালিমের বউকে হাইজ্যাক করার সাথে শেখ কামালের কোন সম্পর্ক নেই। আর তুই জানিস শেখ কামাল যে মুক্তি-যুদ্ধের সময় ওসমানীর এ,ডি,সি ছিল। মানিক বিশ্বাস করে না। বলে ,তুই বেটা নকিব চাপা মারিস।শেখ কামাল কোলকাতায় ফুর্তি করেছে নয় মাস। এবার নকিব মুন্নার দিকে বলেছিল,দেখ ত ঘুষি দিয়ে দাঁত ফেলে দিতে ইচ্ছা হয় না?। মুন্না থামিয়ে দিয়েছিল। মুন্না একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছে এখন সবাই শেখ মুজিবের নিন্দায় ব্যস্ত। একজন মহামানব কিভাবে রাতারাতি দানব হয়ে গেল?।

 

মুন্নার চিন্তা অন্যত্র , আরবি দুটি বই অতিরিক্ত ক্লাস সেভেনেও আছে। প্রাইমারী স্কুলে মুন্না ক্লাসে ফার্স্ট হত,এখন ফেল করলে মান সম্মান থাকে কিভাবে?। মুন্নার বাবা রেলওয়ের মাঝারী ধরনের কর্মকর্তা ,মুন্নারা সাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে থাকে । মুন্নাদের ফ্লাট মাঝারী ধরনের সাধারণ কলোনির চেয়ে বড় ,তিন রুমের । তিতাস এ,জি,বি কলোনিতে থাকে যা স্কুলের সাথে লাগোয়া। ছোট বেলা থেকেই তিতাসকে চেনে মুন্না,প্রাইমারিতে একসাথে পড়ত। দুরন্ত ছেলে তিতাস,ভাল ছাত্র না,কিন্তু আরবিতে ঠিকই পাশ করেছে,যদিও অঙ্কে ফেল করে বিশেষ বিবেচনায় ই সেভেন এ উঠেছে। স্কুলে এ,জি,বি কলোনির ছেলে মেয়েদের জন্য সীট সংরক্ষিত থাকায় তিতাস চান্স পেয়েছিল।মুন্না চরম লজ্জায় পড়ল,তিতাস পাশ করে অথচ মুন্না ফেল করল ধর্ম পরীক্ষায়।

তিতাস একদিন আসলো মুন্নার কাছে বিকেলে খেলতে যাওয়ার জন্য, খেলা শেষে তিতাস মুন্নার কাছে ইংরেজির নোট চাইল,মুন্না দিতে রাজি হোল। নোট গুলো যখন ফেরত দিল মুন্না জিজ্ঞেস করল,আচ্ছা তিতাস তুই ত আরবিতে ঠিকই পাশ করেছিলি, আমি ত পারলাম না, এই কঠিন আরবি তুই পারিস কিভাবে?,লিখিস কিভাবে?,মুখস্থ ই বা করিস কিভাবে?। তিতাস ফিক করে হেসে দিল। হাসি থামিয়ে বলল,আরে কিছুই পারি না,বুঝিও না। মুন্না অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,তাইলে?। এবার তিতাস যা বলল মুন্না রীতিমত তাজ্জব বনে গেল। স্কুলে অঙ্ক,ইংরেজির শিক্ষকরা যেমন প্রাইভেট টিউশানি পায় ইসলামিয়াত এর শিক্ষকরা তেমন একটাও পায় না,তিতাস হেকমত স্যারের কাছে এক মাস প্রাইভেট পড়েছিল,দুই শ টাকার বিনিময়ে। মুন্না জিজ্ঞেস করল,এক মাসে সব শিখে গেলি?। তিতাস ফেচকি হাসি দিয়ে বলল , আরে নাহ, হেকমত স্যার তিনটা প্রশ্ন আমাকে পরীক্ষার আগেই বলে দিয়েছিল,আমি সারা মাস ঐ তিন প্রশ্ন যা কিনা খাটি আরবির মুখস্থ আর ময়েশ করে রপ্ত করেছিলাম,বুঝিস না এক মাসে কুরান মুখস্থ করা যায় আর তিনটা প্রশ্ন ত নস্যি। মুন্না কাতর নয়নে তিতাস এর দিকে তাকাল। তিতাস এবার খুব মুরুব্বি চালে বলল, তুই কোন চিন্তাই করিস না, আমি এবারও পড়ব হেকমত স্যারের কাছে,তুই পেয়ে যাবি প্রশ্ন। মুন্না বলল, এবার ত হেকমত স্যার ক্লাস নিচ্ছে না, শমশের আলী স্যার নিচ্ছে। তিতাস জোরে হাসি দিয়ে বলল,আরে ওনাদের নিজেদের মধ্যে কানেকশান আছে,বুঝলি না ব্যাটা?,তুই ত ভালো ছেলে,কিছু জানিস না। মুন্না হাফ ছেড়ে বাঁচল যেন । মনের খুঁতখুঁতানি থাকলেও ক্লাস সেভেনে এবার মুন্না ফাইনাল পরীক্ষায় পঁচাশি মারক পেয়ে একেবারে সম্মিলিত মেধাতালিকায় তৃতীয় স্থানে চলে আসল। অথচ সিক্স থেকে সেভেন এ ওঠার সময় এই আরবিতে ফেল করার জন্য বিশেষ বিবেচনায় প্রমোশন পেয়েছিল,যা মুন্নাকে মানসিকভাবে প্রায় ভেঙ্গে ফেলেছিল।

ফল প্রকাশের পর মুন্না আত্মগ্লানিতে ভুগল কিছুদিন,পাপ করেছে মনে করে ।এটা অন্যায়,প্রশ্ন আগে পাওয়া,কিন্তু স্যারই ত দিয়েছে।স্যার দিলে অন্যায় হয়?।হয় না,এই ভেবে মুন্না মনকে শান্ত করল। তিতাস আবার একদিন আসল মুন্নার কাছে। একথা সেকথার পর তিতাস বলল, আচ্ছা মুন্না নামাজ কালাম পড়া ত ভালই,কি বলিস?। মুন্না কিছু না ভেবেই উত্তর দিল,হা ভালই ত। তিতাস বলল, শাখাওয়াত স্যার বলেছে ওনার সাথে যেতে,বিশেষ ক্লাস নেয়া হয় জানি কোথায়, নামাজ কালাম শিখায় ভাল করে। মুন্না তেমন একটা গা করল না। মুন্নার সোজা জবাব,এগুলো বাবা মা আমাদের ভালই শেখায়,এর জন্য কোথাও যাবার দরকার নেই আর তাছাড়া বাসায় হুজুর এর কাছে ত কুরান পড়িই,উনিও শেখান। তিতাস একটু মিন মিন করে বলল, নাহ মানে ইসলাম হোল গিয়ে মনে কর পুরনাংগ জীবন বিধান,বাসায় এগুলো শেখা হয় না,বিশেষ দক্ষ মানুষরাই কেবল শেখাতে পারে। মুন্না একটু দোমনায় পড়ে বলল, কি জানি ,আমি এগুলো নিয়ে ভাবি নাই। তিতাস বলল, চল যাই একদিন, ভালো লাগলে আবার যাব নইলে আর যাব না। মুন্না সম্মতি দিল। এর পরের শুক্রবারে তিতাস এসে মুন্নাকে বলল ,চল আজকে শাখাওয়াত স্যার যেতে বলেছে। মুন্না জিজ্ঞেস করল,কোথায় যেতে হবে?। তিতাস পকেট থেকে টুপি বের করে মাথায় দিতে দিতে বলল, খিলগাঁ চৌরাস্তায়, স্যার বলেছে ওখানে মসজিদে থাকবেন,আসর এর নামাজ পরে আলোচনায় বসবেন। মুন্নাও মাথায় টুপি দিয়ে তিতাস এর সাথে রাস্তায় নামল।

মুন্নাদের কলোনির নাম সাজাহানপুর কলোনি হলেও আসলে বিল্ডিং গুলো পড়েছে একেবারে মতিঝিল সরকারি স্কুলের সামনের রাস্তার ওপরেই অর্থাৎ বাসার সামনের রাস্তা টা কমলাপুর ষ্টেশন এর সামনে থেকে পীর-জঙ্গি মাজার হয়ে মালিবাগ মোড় বরাবর মগবাজার এর দিকে চলে গিয়েছে। এখান থেকে খিলগাঁ বেশ দূরই। তাও মুন্না রওনা দিল কারণ তিতাস মুন্নার হিতাকাঙ্ক্ষী। সহযোগিতা করা উচিৎ। শাখাওয়াত স্যার ওদের নিয়ে নামাজ পড়ার পর মসজিদ থেকে বের হয়ে পাশে অন্য একটি বাসায় প্রবেশ করলেন। মুন্না ভেবেছিল মসজিদেই কথা বলবেন,কিন্তু না,অন্য বাসায় বসলেন। বেশ কিছু ছেলে মুন্নাদের বয়সী এবং সিনিয়র ছেলে গোল হয়ে বসল। তাদের মধ্যে একজন সিনিয়র ছেলে ক্লাস টেন বা নাইন এর হবে আল্লাহর ধর্মের বয়ান দিলেন। আসার সময় কিছু ইসলামিক বই দিল সিনিয়র ছেলেরা,যা পড়ে আবার ফেরত দিতে হবে। বইগুলো মুন্না যখন বাসায় পড়ল তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ কিছু পেল না, এগুলো বেহশ্তে-ই-জেওর এ আগেও পড়েছে মুন্না। এভাবেই মাস ছয়েক তিতাস এর সাথে মুন্না যাওয়া আসা করল। তেমন কিছু না, নামাজ কালাম পড়া এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনা,এই হোল কাজ। কিন্তু ছ মাস পরে মুন্না ধাক্কা খেলো। একদিন বড় এক ভাই আর সব বই এর সাথে “গোলাম আজমের দর্শন” নামক একটি বই হাতে ধরিয়ে দিল। প্রথমে মুন্না খেয়াল করে নাই। পরে পথে আসতে আসতে যখন চোখে পড়ল একটু চমকে উঠল, গোলাম আজমকে ত মুন্না চেনে। রাজাকার এর সর্দার। একটা ছবিও আছে ভেতরের পাতায়,এ লোককে সবাই চেনে। মুন্নার গা ঘিন ঘিন করে উঠল। তিতাস কে বইটা দেখিয়ে যখন বলল,কি রে এরা মনে হয় জামাতের লোক?। তিতাসও একটু অবাক হোল। কিন্তু তিতাস মুখে কিছু না বলে চুপ করেই থাকল। মুন্না ঘড়ে ঢোকার আগে বইগুলো সব একসাথে ডাস্টবিনে ফেলে দিল। জামাতে ইসলামি নামের একটি নতুন দল হয়েছে,এদের ছাত্র সংগঠনের নাম শিবির। সব স্কুলের কচি ছেলেদের ইসলামের কথা বলে মগজ ধোলাই করে, মুন্না এটা শুনেছে। বেশীকিছু জানে না তবে এতটুকু জানে যে স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু এই গোলাম আজমের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিলেন,জিয়া আবার তাকে দেশে ফেরত এনে নাগরিকত্ব দিয়েছেন। জিয়ার উপর মানুষ এখন খুব খুশী তাই এগুলো নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না,সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে হবে,অতীত টেনে লাভ কি?। কিন্তু মুন্নার মন গোলাম আজমকে স্বীকৃতি দিল না।

এর মাঝে মুন্নাদের ক্লাস সেভেনেরই ছেলেদের শাখার সাথে মেয়েদের শাখার সাধারণ জ্ঞানের অনুষ্ঠান এর প্রতিযোগিতা হোল বি,টি,ভি তে যা সরাসরি সম্প্রচার করা হোল। এই অনুষ্ঠানে মুন্না আর নকীব দুজনেই চান্স পেল। রামপুরা টি,ভি ভবন নতুন হয়েছে। অনুষ্ঠান শেষে আসার সময় নকীব মুন্নাকে নিজের সাথে নিয়ে স্কুটারে উঠল প্রায় জোর করেই। মুন্নার আপত্তি স্বত্বেও নকীব বলল, আরে চল আগে আমার বাসায় চল,একটু আড্ডা দিয়ে তারপরে যাবি,আমি তোকে তোর বাসায় দিয়ে আসব। সন্ধ্যা প্রায় হয়ে গিয়েছিল। তারপরেও নকিবের জোরাজুরিতে মুন্না উঠে পরল। নকীবদের বাসার ড্রয়িং রুমে পা দিয়েই মুন্না একটু থমকে গেল। দেয়ালে সোনালি ফ্রেমে বাধানো বঙ্গবন্ধুর ছবি। এ দৃশ্য এখন দেশে বিরল। নকিবদের বাসার জৌলুস মুন্না যতটা আশা করেছিল ততটা না হলেও কমও না। নকীব খুব খাতির করল মুন্নাকে। পারিবারিক ছবির এ্যালবাম নিয়ে এসে দেখাল। মুন্না বুঝল নকিবের পরিবার আসলে মুন্নাদের মতই সাদাসিধে । নকিবরা দুই ভাই এক বোন। ছোট ভাই লিটল জুইয়েলস এ পড়ে ক্লাস ক্লাস ওয়ান এ বোন মাঝখানে ক্লাস থ্রি তে পড়ে এক ই স্কুলে ছোট ভাইয়ের সাথে। মুন্না প্রথমে একটু অস্বস্তি বোধ করলেও সহজ হয়ে গেল নকীবের পরিবারের সাথে। নকীবের আম্মা খালাম্মা খুব আন্তরিক মানুষ মুন্নাকে খুব আদর করল। নকীব এই ক্লাস সেভেন এ পড়ুয়া ছেলেই মোটামুটি বর্তমানে এই পরিবারের লোকাল গার্জিয়ান বোঝা গেল। শেখ মুজিবের ছবিটা নকিবদের ড্রয়িং রুমে সেটা মাথায় নিয়েই মুন্না সেদিন বাসায় ফিরল।

অষ্টম শ্রেণীর রেজাল্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ ,কারণ নাইন থেকে ভাগ হবে বিজ্ঞান,কলা,বাণিজ্য বিভাগ। প্রধান শিক্ষক ফাইজুর রাহমান খুব সতর্ক এব্যাপারে,ভাল ছাত্র অন্তত অঙ্কে ভাল রেজাল্ট না করলে বিজ্ঞান বিভাগে উনি চান্স দেবেন না ,এ ব্যাপারে কোন আপোষ উনি করেন না। অনেক ছাত্র শুধু সায়েন্স না পাবার কাড়নে স্কুল ছেড়ে চলে যায়। তিতাসের কল্যাণে মুন্নার মাথায় আরবির ভয় নাই । এইট এ রেজাল্ট ভালই করল মুন্না । মুন্না নকিব দুজনেই সায়েন্স পেল। তিতাস বাণিজ্য বিভাগেও পেল না।কলা বিভাগে নির্লিপ্তে চলে গেল। ক্লাস নাইনে স্যার রা দেখা গেল ছাত্রদের একটু সমীহ করছেন,মার ধর বন্ধ। তিতাস এর ভাব সাব যেন কেমন বদলে গেল রাতারাতি। মনে হোল নাইন এ ওঠার জন্যই অপেক্ষা করছিল ও । বড় চুল ত রাখলই বিড়ি টানা শুরু করল। একটা চরম উদ্দীপনা বা উত্তেজনা পেয়ে বসেছে দেশকে স্বাধীনতার পর থেকেই। পঁচাত্তরের পর সেটা যেন কেমন অন্যখাতে বইছে। রাজ্জাক একটা ছবি বানিয়েছে নাম রংবাজ, মাস্তানিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে। অল্প বয়সের ছেলেদের মধ্যে কেমন যেন হিরো হিরো ভাব, অনেকে গ্যাং বানিয়েছে,সাথে কয়েকজন নিয়ে ঘোড়া ফেরা করে , পাড়ার কলোনির দু দলের মারামারি লেগেই আছে। কি কাড়নে কেও জানেও না। রংবাজ ছবিতে রাজ্জাকের বোতল ধরে মদ্যপান ,জসীম নামে এক নতুন খল নায়কের আমদানি করেছে,মারামারি ঘুসা ঘুষি করে। রাস্তায় এখন বাচ্চা ছেলেরা পর্যন্ত ঘুষোঘুষি করে ওটা নাকি কারাতে কুং ফু। আসলে কিছুই না। বেলবটম প্যান্ট ত এসেছেই। একদিন কলোনিতে দেখল তিনজন ছেলে মিলে বয়স যা তাতে মনে হয় ক্লাস নাইন বা টেনের ছাত্র হবে একটি ছেলেকে বেদম প্রহার করছে। সবচেয়ে নিদারুণ ব্যাপার হচ্ছে ছেলেটির মাথায় দশ ইঞ্চি ইট দিয়ে আঘাত করলো একজন, দর দর করে রক্ত পড়া শুরু হোল।

নকীবের সাথে দীর্ঘ দিন ধরে মাঝে মাঝে দেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলে মুন্নার মনটা খারাপ হয়ে গেল। নকীব অনেককিছু জানে অথচ মুন্না কিছুই জানে দেশের ইতিহাস। পাঠ্যপুস্তকে ত কিছুই নাই। মুন্না পরেরদিনই গেল স্কুলের লাইব্রেরীতে। আইডিয়াল স্কুলের লাইব্রেরী বলতে তেমন কিছু নাই,এসিস্ট্যান্ট হেড স্যারের রুমের একপাশে কয়েকটি আলমারিতে কিছু বই। এই লাইব্রেরীর চার্জে শাখাওয়াত স্যার। মুন্না মুক্তিযুদ্ধের উপর তেমন কোন বই পেল না। একটি মাত্র বই আছে তাও বেশ মোটা। বইটি নিয়ে শাখাওয়াত স্যারের কাছে নিয়ে যেতেই উনি মুখ বাঁকা করে বললেন ,এটা গবেষনামুলক বই, ছোটদের না, অন্যকোন বই নাও। মুন্না অবাক হয়ে গেল , স্কুলের লাইব্রেরীর বই স্কুলের ছাত্রদের জন্যই।কিন্তু কিছুতেই দিবেন না শখাওয়াত স্যার,মুন্না বাধ্য হয়ে আবার লাইব্রেরীর আলমারি থেকে “ইসলামের আলোয় জীবন গড়া” নামে একটি বই নিয়ে তাঁর নীচে স্বাধীনতার উপর লেখা বইটি নিয়ে গেল। এবার মুখে বিরক্তি প্রকাশ করলেও ইস্যু করে দিল। কিন্তু বইটা পড়ে মুন্না কোন তথ্যই পেল না,শুধু যুদ্ধের কারণ এবং ভয়াবহতা নিয়ে লেখা একটি বই ওটা। নকীবকে যখন জিজ্ঞেস করল কোথা থেকে ও জানল ইতিহাসে এ কথার নকীব জবাব দিল বাবার কাছে এবং মামার কাছে। নকীবের মামা কলেজের ইতিহাসের শিক্ষক ,মাঝে মাঝে মুন্নাদের বাসায় এসে থাকেন মামা। মামা অবিবাহিত।

নাইনের ক্লাস শুরু হতে না হতেই শুনল মাওলানা শাখাওয়াত হোসেন কে স্কুল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে এক ছাত্রীর শ্লীলতা হানির জন্য। খুব অবাক হোল মুন্না। একজন ইসলাম শিক্ষার শিক্ষক কিভাবে মেয়েদের শ্লীলতা হানি করে?,এরা কি মানুষ?। আরও একটা কথা শুনল মুন্না নকীবের কাছেই। মুন্নাদের ক্রীড়া শিক্ষক আরমান স্যার একজন চরম বদমেজাজি মানুষ, কেউ বড় চুল রাখলে কাচি দিয়ে ক্লাসে এসে চুল কেটে দেন। তিতাসের চুলও কাটা পড়ল একদিন। এই আরমান স্যার স্কাউট পরিচালনা করেন,একদিন ক্লাসে নোটিস পেল ছাত্ররা। স্কাউটে যারা যোগ দিতে চায় তারা আবেদন করতে পারে একটা পরীক্ষা মানে ভাইভা নেয়া হবে। মুন্না নকীবকে জিজ্ঞেস করল আবেদন করবে কিনা?। নকীব যে কথা বলল মুন্না চুপসে গেল। মুন্নাদের ক্লাসের কুবাদ নাকি সেভেনে থাকতেই স্কাউটে যোগ দিয়েছিল।কিন্তু কুবাদের একটা খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে। মুন্না জিজ্ঞেস করল,কি অভিজ্ঞতা? নকীব হাহাহা করে হেসে দিয়ে বলল , কামরান স্যার কুবাদকে করেছে। মুন্না বলল , করেছে মানে?। নকীব বলল, আরে বেটা স্বামী স্ত্রীকে যা করে। মুন্নার গা গুলিয়ে উঠল । কি বলে নকীব ?। কান গরম হয়ে গেল মুন্নার । নারী পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে মুন্নার জানা অনেক কম। তারপরেও যা বুঝল তাতে শিক্ষকদের প্রতি একটা অবিমিশ্র ধারনার জন্ম নিল মুন্নার কচি মনে।

এরপর একদিন মুন্না শুধু নকিবকে জিজ্ঞেস করল,আচ্ছা মানুষ ত জিয়াকে ভালই বলে জিয়া নিজেও ত শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে বলে না । নকীবের উত্তর সোজা সাপটা, ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে চরম ভাবে, মানুষকে জানতে দেয়া হচ্ছে না।

মুন্নাকে এসব নিয়ে বেশী চিন্তা করতে হোল না, হাতে হাতে দুটি প্রমাণ পেল। এক ইতিহাস যেন না জানতে পারে মানুষ তাঁর প্রচেষ্টা ত দেখল মাওলানা শাখাওয়াত হোসেন এর বই দিতে না চাওয়া,কারণ এই শাখাওয়াত স্যার একজন রাজাকার নকীবের মতে। নকীব কেন তা মনে করে তা ব্যাখ্যায় গেল না যদিও। আর একটি প্রমাণ পেল কিছুদিন আগে খান আতাউর রাহমানের একটি ছবি যখন টি,ভি তে দেখাল “ আবার তোরা মানুষ হ” , এই ছবিটা মুন্না খুব ছোটবেলায় দেখেছিল , ছবিতে একজন প্রধান চরিত্র একজন কলেজের অধ্যক্ষ যার চরিত্রে ছিলেন খান আতা নিজেই। অধ্যক্ষের রুমের দেয়ালে শেখ মুজিবের একটি ছবি টাঙানো ছিল। এখন যখন ছবিটি আবার দেখল

অধ্যক্ষের রুমের সেই ছবিটার উপরে দেখা গেল বুড়ো আঙ্গুলের মত একটি ছাপ যা নড়ছে, ছবিটা দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মানে জিয়া বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চায়। এর মাঝে জিয়া একদিন স্কুলে আসলেন , একে আসা বলা যায় না , এই চার বছরে মেজর থেকে মেজর জেনারেল হওয়া প্রেসিডেন্ট পায়ে হেটে ঘুরে বেরান দেশব্যপি, হাটতে হাটতেই এলেন স্কুলে , স্কুলের ছাদে, বারান্দায় সবজায়গায় সশস্র আর্মি পাহারায় দাঁড়াল। অথচ উনিশস বাহাত্তরে শেখ মুজিব মতিঝিল সরকারি স্কুলের মাঠে এসেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে অস্র জমা নিতে,মুন্না তখনো স্কুলে ভর্তি হয় নাই কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে একজন পুলিশও ছিল বলে পড়ল না। জিয়ার কথা একটাই , বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ,বাংলাদেশ জিন্দাবাদ। ঢাকায় কুখ্যাত মোনায়েম খাঁড় মেয়ের জামাই আবুল হাসনাত কে ঢাকার মেয়র বানান হোল । মুন্নাদের ওয়ার্ডের কমিশনার নির্বাচিত হোল মীর্জা আব্বাস । এই মীর্জা আব্বাস কে মুন্না চেনে, পাতি মাস্তান ছিল। মুন্নাদের তিন বছরের সিনিয়র আরেক পাতি মাস্তান মীর্জা আব্বাস কে হকি স্টিক দিয়ে পিটিয়েছিল পীর জঙ্গি মাজারের মোড়ে। শাহ আজিজুর রহমান নামক আরেক স্বাধীনতা বিরোধী কে প্রধানমন্ত্রী বানালেন। দেশের মানুষের তেমন কোন বিকার দেখা গেলো না ,মনে হোল যা হয় হোক ,এমন একটি ভাব জনগণের।

এস , এস, সি পরীক্ষার সীট পরল নারিন্দা সরকারি স্কুলে। পরীক্ষা খুব মনের মত না হলেও মুন্না মোটামুটি সন্তষ্ট ই হল।পরীক্ষা শেষে মুন্না ছোট খালুর সাথে নানার বাড়ী যশোর যাবার জন্য রওনা দিল।খালু অফিসের কাজে ঢাকায় এসেছিলেন । ছোট খালা যশোরেই থাকেন ওখানে খালুর পোস্টিং। আরিচা ঘাটে ফেরি পার হবার জন্য বি,আর,টি,সি বাসে অপেক্ষা করছিল মুন্নারা । হটাত একজন যাত্রী বাসে উঠে বলল, প্রেসিডেন্ট সাহেব মারা গেলেন । প্রথমে বোঝাই গেল না কি বলে লোকটা। জিয়ারে রহমান মারা গিয়েছেন চিটাগাং এ। রেডিওতে সেনাবাহিনী প্রধান বিদ্রোহীদের অত্মসমরপরন করতে বলছে।মুন্নাদের বাসায় তখনো রঙ্গিন টি,ভি কেনা হয় নাই। সাদা কাল টিভি চ্যানেল একটাই, তাও চল্লিশ দিন জিয়ার শোক প্রকাশে মত্ত থাকলো, বিনোদন লাটে উঠলো। চাপা একটা খুশী শধু দেখা গেলো নকীবের চোখে মুখে। নকিবের বক্তব্য যে যেভাবে ক্ষমতায় আসে সে সেভাবেই বিদায় নেয়। মুন্না নকীবকে পুরোপুরি মন থেকে সমর্থন করতে পারে না। কেন মানুষ জিয়ার এত ভক্ত?।নিশ্চয় কারণ আছে। আবার এটাও মানতে পারে না আবার রাতারাতি একজন মহানায়ক কিভাবে খলনায়ক হয়ে যায়। এর মাঝে মুন্না সুযোগ পেল নকীবের মামা মানে সেলিম মামা র সাথে কথা বলার। সেলিম মামার বিয়ে ঠিক হয়েছে আর বিয়েটা হবে নকিবদের বাসায়। সেলিম মামা ইতিহাসের অধ্যাপক । মামার সাথে মুন্নার খুব খাতির হয়ে গেলো, যা হয় ছোট মামা দের সাথে ভাগ্নে ভাগ্নিদের খুব বন্ধুর মত সম্পর্ক থাকে। মামা দিল খোলা মানুষ। মুন্নার খুব ভালো লাগল। মুন্না আগেই নকিবের কাছে শুনেছিল সেলিম মামা মুক্তিযুদ্ধের ওপর রীতিমত গবেষণা করেন। সেলিম মামাকে একদিন ধরল মুন্না ,মামা আমাকে একটু সময় দেন আমার কিছু প্রশ্ন আছে আপনার কাছে। দুদিন পর মামার গায়ে হলুদ ,মামা বেশ আবেশে আছেন। কিন্তু মুন্নার সাথে বসে গেলেন আড্ডায়। মুন্নার প্রথম প্রশ্নই হোল, আচ্ছা মামা শেখ মুজিব রাতারাতি হিরো থেকে জিরো হয়ে গেলেন কেন?। মুন্নার প্রশ্ন শুনে মামা হেসে দিলেন, ভালই বলেছ। কিন্তু এই ছোট প্রশ্নের উত্তর দিতে যে বয়ান দিতে হবে তা শোনার ধৈর্য হবে না মামা। মুন্না জেদ ধরল,আপনি বলেন মামা আমি শুনব। মামা একটু থেমে শুরু করলেন, দেখ মুন্না তুমি আমার একটি প্রশ্নের উত্তর আগে দাও একটি জাতি গোষ্ঠী কি হটাত করে স্বাধীন হয়ে যায়?,বা স্বাধীন হতে চাইলেই হতে পারে?। প্যালেস্টাইন,কাশ্মীর এরা কত বছর ধরে সংগ্রাম করছে তাই না?। মুন্না মাথা ঝাঁকাল। আসলে মানুষের আকাঙ্ক্ষা আর সঠিক নেতৃত্ব যখন এক বিন্দুতে ছেদ করে তখনই মানুষের এধরনের সংগ্রাম সফল হয়। জনগণের আকাঙ্ক্ষা আর নেতৃত্বের দন্ধের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ কিন্তু আমরা পাই আমাদের পূর্বসূরিদের কাছ থেকেই ,আমরা কবার স্বাধীন হয়েছি?, দুবার একবার সাতচল্লিশে আরেকবার একাত্তরে। পৃথিবীর আর কোন জাতির ত দুবার স্বাধীনতার ইতিহাস নেই। আবার দেখ এ দুবার স্বাধীনতার মূল হোতা কিন্তু আমরাই অর্থাৎ এ অঞ্চলের মানুষ বা বাঙ্গালী মুসলমান । অনেকে বলেন ব্রিটিশ ভারত দু ভাগ করে দিয়ে গেছে ,আবার অনেকে কখনো জিন্নাহ,কখনো নে-হেরু-গান্ধি,কখনও বল্লভ ভাই প্যাটেল কে অভিযুক্ত করে। কিন্তু ইতিহাস ত বলে আমরাই এমনটি চেয়েছিলাম। যে দ্বি- জাতি তত্ত্বের কথা আমরা শুনি তা কিন্তু আমাদের মানে বাঙ্গালী মুসলিমদের নিরঙ্কুশ সমর্থন ছিল এর বড় কারণ শুধু এটাই না যে বাংলায় মুসলিমদের একটি বড় অংশ বাস করত, বরং কংগ্রেস এর পর সবচেয়ে বড় যে রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম লীগ তাঁর জন্মই হয়েছিল আজকের বাংলাদেশের ঢাকায়। তবে মুন্না তোমার প্রশ্নটি ছিল একবাক্যের “ একজন নায়ক কিভাবে রাতারাতি খলনায়ক হয়ে গেলেন” অর্থাৎ তুমি শেখ মুজিবের দিকে ইঙ্গিত করেছ। মুন্না সম্মতি সূচক মাথা নাড়ল। মামা শুরু করলেন আবার, এর উত্তর একবাক্যে আমি তোমাকে দেব না। এই না দেয়ার অনেক কারণের মাঝে একটি কারণ পঁচাত্তর এবং পঁচাত্তর পরবর্তী ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী এখনো আমাদের কাছে কুয়াশাচ্ছন্ন। যাই হোক আমি চাই তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর সন্ধান কর এবং সিদ্ধ্যান্তে পৌছাও। এর জন্য আমি তোমাকে সাহায্য করব। মুন্না তড়িৎ উত্তর দিল, কিন্তু মামা ইতিহাস ত আমাদের জানতে দেয়া হচ্ছে না। মামা কোন চিন্তা না করেই উত্তর দিলেন, এখন এ এ প্রশ্নের উত্তর আমরা পাব না এটা ঠিক কিন্তু পাব। তবে তাঁর আগে তোমাকে জানতে হবে বাঙ্গালীর ইতিহাস। মুন্না অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,কেন মামা?, এর সাথে বাঙ্গালীর ইতিহাসের কি সম্পর্ক?। মামা মাথা কাত করে বললেন, আছে মুন্না আছে। শেখ মুজিব নায়ক হতে খলনায়ক কি আসলে ই হয়েছিলেন?,নাকি তিনি প্রথম থেকেই খলনায়ক ছিলেন নাকি তিনি মৃত্যু পর্যন্তই নায়ক ছিলেন?, সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে হলে জানতেই হবে বাঙালির ইতিহাস। আমিও জানার চেষ্টা করছি। মামার বিয়ের ধুম লেগে গেল।

মুন্নাদের আগের দুই ব্যাচ এস,এস,সি তে খুব ভাল রেজাল্ট করল। আইডিয়াল স্কুলের অবস্থান মতিঝিল সরকারি স্কুলের কাছাকাছি চলে আসল। তবে আইডিয়াল স্কুল থেকে প্রথম বোর্ডে প্রথম স্থান অধিকার করল মুন্নাদের ব্যাচ এর কলা বিভাগের মেয়ে লোটাস। এই মেয়ে ইচ্ছে করেই কলা বিভাগে গিয়েছিল বিজ্ঞানে না গিয়ে। মুন্না স্টার মারক পেল , নকীব একটুর র জন্য পেল না। মুন্না নকিব খুশী নিজেদের ফলাফলে। পান্না , মুন্নার তিন বছরের বড় এস,এস,সি তে স্টার পায় নাই, ছয় বিষয়ে লেটার মার্ক পেয়েছিল পান্না কিন্তু স্টার পায় নাই। তাও বাবা মা খুব খুশী ছিলেন পান্নার রেজাল্টে । মুন্নার রেজাল্টে বাবা মা র মনোভাব টা এমন যে এমন রেজাল্ট ই স্বাভাবিক। মুন্নার এত ভাল রেজাল্টের পরেও বাসায় মিষ্টি আনা হোল না,অথচ পান্নার রেজাল্টের পর মিষ্টির বন্যা বয়ে গিয়েছিল বাসায়।মনে একটু কষ্ট পেলেও মুন্না গায়ে লাগাল না । নটর ডেম কলেজে ভর্তি হয়ে গেল মুন্না। বাসার কাছে এবং হাটা পথ। যদিও স্টার মার্ক পেলে ঢাকা কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয় না, কিন্তু মুন্না ঢাকা কলেজে এপ্লাই ই করল না। নকীবও নটর ডেম কলেজে ভর্তি হল।নটর ডেম কলেজে ভাল ছাত্ররা ভর্তি হতে চায় না কারণ সায়েন্সে প্রচুর প্রাক্টিক্যাল করায় , সময় এর অপচয় হয়। এছাড়া ঢাকার বাইরের ছাত্রদের জন্য হোস্টেল নেই , বাইরের অনেক ভাল ছাত্রদের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নটর ডেমে ভর্তি হতে পারে না । নটরডেমে ভর্তি হয়ে মুন্না আইডিয়াল স্কুলের বিপরীত চিত্রের দেখা পেল। এখানে বেশিরভাগ শিক্ষক হিন্দু। যদিও মিশনারি কলেজ কিন্তু খ্রিস্টান স্যারেরা ভুলেও কখনো ধর্মের কথা বলেন না। ফাঁদার পিসোতো একজন সাদা আমেরিকান ফাদার মুন্নাদের ফিজিক্স পড়ান। ফাদারের কথা বুঝতে খুব অসুবিধা হয় ছাত্রদের, বাংলায় পড়ান উনি। ছাত্ররা মাইন্ড করে না, মনে হয় আমেরিকান তাই । । মুন্না আর নকিব দুজনেই বিজ্ঞান ক্লাব এবং ডিবেট ক্লাবে যোগ দিল। এর মধ্যে কলেজে বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হোল । সুশান্ত স্যার মুন্নাকে একটা প্রজেক্ট দিতে বলল। মুন্না নকীবকে বলতেই নকীব গা করল না। । নকিব বাধ্য হয়েই রাজী হোল। মুন্নার মাথা থেকেই আসল, ইলেক্ট্রিক ক্রেন বানানো যায়। নকীবদের বাসায় অনেক টুলস আছে, নকিবের বাবা সৌদি আরব থেকে এনেছেন ইলেক্ট্রিক করাত,ড্রিল মেশিন ইত্যাদি। কলেজের বিজ্ঞান ক্লাব কিছু টাকা দিলো প্রজেক্ট বানানর জন্য। মটর গিয়ার কেনা হোল। অনেকটা নকীব একাই বানিয়ে ফেলল একটি ক্রেন । নটর ডেম কলেজের বিজ্ঞান মেলা ভালই জমে ,অনেক মানুষ আসে দেখতে। ছাত্রদের আগ্রহের মাত্রা বাড়ে যখন হলিক্রস কলেজের ছাত্রীরা আসে। উৎসাহ যেন তুঙ্গে ওঠে। মুন্না আর নকীবের প্রজেক্ট তৃতীয় পুরস্কার পেল। মুন্না একটু অবাকই হোল , অনেক ভাল ভাল প্রজেক্ট ছিল যেমন সোলার দিয়ে গাড়ী চালানো কিন্তু পুরস্কার পেল না অগুলো, বিচারক ছিলেন ডঃ আলী আজগর, ডঃ ইব্রাহীম আর অধ্যক্ষ ফাদার পিশোতো।

এইচ,এস,সি তে নকীব মুন্নার চেয়ে ভাল রেজাল্ট করল। নকীব স্টার মার্ক পেল, মুন্না দুই নম্বরের জন্য স্টার পেল না। ভবিষ্যতের স্বপ্ন সব ছাত্রেরই এক ইঞ্জিনিয়ারিং অথবা ডাক্তারি তে ভর্তি হওয়া । বুয়েটে আগে ভর্তি পরীক্ষা হোল মুন্না চান্স পেল না। নকীব বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষাই দেয় নাই। ডাক্তারি পড়বে । মুন্না অবাক হয়েছিল ঢাকায় চান্স না পেলে কি করবি, জিজ্ঞেস করলে নকীব বলেছিল বাইরে যাব পড়তে,কিন্তু ডাক্তারিই পড়ব। মেডিক্যাল এ নকিব পেল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে আর মুন্না সিলেট মেডিক্যাল কলেজে। মুন্নার চেয়ে নকিব মন খারাপ করল বেশী। তারপরেও নকিব মুন্নাকে সান্ত্বনা দিল, অনেক ভাল ছাত্র কোথাও ই চান্স পায় নাই। এক সপ্তাহ পর পান্না ভার্সিটি থেকে বাসায় এসে বলল , মুন্নার নাম ওয়েটিং লিস্ট এ আছে, বুয়েটে । ওয়েটিং লিস্টের নাম মুন্নার মাথায়ই ছিল না,দেখতেও যায় নাই। কি মনে করে পান্না দেখেছে। মুন্নার মন খারাপ টা হয়ত পান্নাকে কিছুটা স্পর্শ করেছে। পান্না মুন্নাকে বলল, তোর সিরিয়াল যা তাতে চান্স পাবি। মুন্না চান্স পেল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। মেকানিক্যাল টা মানুষ বেশী চেনে না। সবাই সিভিল বা ইলেক্ট্রিক্যাল এ পড়ে । কিন্তু পান্না মুন্নাকে সাহস দিল , এখন মেকানিক্যাল এর অনেক ডিমান্ড , তাছাড়া ইঞ্জিনিয়ারিং বলতে ত যন্ত্র-পাতি ই বুঝায় যা মেকানিক্যালে ই পরায়। মুন্না ভর্তি হয়ে গেল। মুন্নার চেয়ে বেশী খুশী হোল নকিব। এক শহরে থাকবে দুই জন। বুয়েটের চেয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রদের মাঝে সংস্কৃতির চর্চা একটু বেশী।তাই মুন্না মাঝে মাঝে নকিবের সাথে আড্ডা দিতে ই শুধু না ওদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দেখতে গিয়ে মেডিক্যালের ছাত্রদের বন্ধু হয়ে গেল বেশী, মেডিক্যালের অনেকে ছাত্রই মুন্নাকে মেডিক্যালের ছাত্রই মনে করত। মুন্না মজা পেত ভুল ভাঙ্গাত না। কিন্তু এই ভুলের মাঝে যে ভুল হয়ে গেল তা হোল দীয়ার সাথে পরিচয়। মুন্না তৃতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় দীয়া আসল মেডিক্যালের প্রথম বর্ষের ছাত্রী হয়ে। কিভাবে যে পরিচয় হয়েছিল আজ মুন্নারও মনে নেই। প্রেম শুরু হয়েছিল অনেকটা স্বয়ংক্রিয় ভাবেই। প্রেম শুরুর পরে মুন্না অবাক হয়ে দেখল প্রচণ্ড জেদি এই মেয়ে দীয়া। যা ভাবে,যা চিন্তা করে তা এমন প্রচণ্ড ভাবে বিশ্বাস করে যে যুক্তি তর্ক সব বুঝেই বিশ্বাস করে। আরসব ন্যাকা মেয়েদের মত না দীয়া। মুন্নার ভাল লাগে প্রথম থেকেই।

মুন্না যখন ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হোল পান্নার চাকরীর বয়স তখন দুই বছরের উপরে। মুন্না প্রথমে একটা প্রাইভেট মিলে জয়েন করল, ভালো লাগল না ব্যক্তিমালিকানাধীন মিল, মালিক কর্মচারী কর্মকর্তাদের সাথে চাকরের মত ব্যবহার করে। মুন্না বুঝল কেন বাবা-চাচারা এদেশে প্রাইভেট চাকুরী করতেন না। বাংলাদেশে প্রাইভেট সেক্টরে এখনো আসলে শিক্ষিত মানুষের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। মুন্না কিছুদিন পর জয়েন করল বহুজাতিক এক কোম্পানিতে। এখানে চাকুরীর কোন সময়সীমা নেই,সকাল নয়টায় অফিসে যেতে হবে কিন্তু ছুটি কখন কেউ জানে না। বাসাই ফিরতে ফিরতে রাত আটটা/নয়টা বাজে। মুন্না শেষ পর্যন্ত বি,সি,আই,সি তে জয়েন করল। কর্পোরেশন ,বেতন এত কম যে পকেট খরচ ই চলে না। দীয়া চতুর্থ বর্ষে ।

পান্নার বিয়ের ধুম লেগে গেল। পাঠ্য বই এর পোকা পান্না কে দেখা গেল বিয়ের ব্যাপারে খুব উৎসাহী। মুন্নার হাসি পেল। কোনদিন কোন মেয়ের সাথে পান্না মিশেছে বলে মুন্নার মনে হয়নি। পাঠ্য বইয়ের বাইরে যায়যায়দিন ছাড়া পান্নাকে কোন বই পড়তে দেখেনি মুন্না। অবশ্য নান্নার ও একই অবস্থা। নান্না সায়েন্সে পড়লেও এইচ,এস,সি তে সেকেন্ড ডিভিশন পেল । কোন প্রকার ভাবান্তর দেখা গেল না নান্নার মাঝে। দেশের বাইরে যাবার জন্য ধান্দা শুরু করে চলেও গিয়েছিল আমেরিকাতে মুন্না তখন ইঞ্জিনিয়ারিঙের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। আমেরিকায় গিয়েছে নান্না প্রায় ছয় বছর একবারও দেশে আসেনি। ওখানে নাকি পড়াশুনা করেছে । মুন্নার বিশ্বাস হয় না।

দীয়া মফস্বলের মেয়ে বাবা কলেজ এবং মা স্কুলের শিক্ষক। দীয়া বড় মেয়ে ,ছোট বোন আছে ,এবার বিয়ে পাশ করেছে। দিয়ার বাবা/মা মেয়ের বিয়ের কথা ভাবছেন। পান্নার বিয়ে হল ঢাকা ইউনিভারসিটিতে পড়ুয়া মেয়ের সাথে। ভালো ফ্যামিলি। মুন্না আস্তে আস্তে মার কাছে এবার নিজেরটা পাড়ল। প্রথমে মেয়ে ডাক্তারি পরে শুনে মা একটু খুশীই হলেন। তিন ছেলের কেউ ডাক্তারি পরে নাই, এখন এক ছেলের বউ ডাক্তার হলে ত সোনায় সোহাগা। কিন্তু মা দীয়ার সাথে কথা বলার পর ভাবীর কাছে মন্তব্য করলেন , মেয়েটা দেখতে যাই হোক চেহারাটা একেবারে কাঠখোট্টা। দীয়া সাজগোজের ধার ধারে না।

পান্নার বিয়ের সময় বাবা বেশ খাই খড়চা করলেও মুন্নার ক্ষেত্রে তেমন উৎসাহ দেখা গেল না। বড় ছেলের বেলায় করা দরকার ছিল ,অনেক মানুষের ছেলে মেয়ের বিয়ে খাওয়া হয়েছে, না করে উপায় নেই। মুন্না একটু বিপদে পরে গেল । জমানো কোন টাকাই ত নেই। পান্না হিসেবি ছেলে ওর বিয়েতে ওর নিজেরও টাকা ছিল। হানিমুন ও করেছে কক্সবাজারে গিয়ে। মার মন মেজাজও তেমন ভালো না, ভাবি খুব একটা রান্নাঘরে হাত লাগায় না। ছেলের বিয়েতে মার উৎসাহ এমনিতেই কমে গেছে। মার ধারনা এসব শিক্ষিত মেয়েদের বউ করে এনে রান্না করে খাওয়াতে হবে। মুন্নাকে উদ্ধার করল নান্না। ফোনে বলল , তুই যে বিয়ে করবি, টাকা পয়সা কিছু আছে?। মুন্নারা পিঠাপিঠি বলে তিন ভাই এর সম্পর্কই তুই তোকারি। মুন্না আমতা আমতা করল, কিছুই বলল না। পান্না পঞ্চাশ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিল। মুন্না হাফ ছেড়ে বাঁচল। মা একটু যেন অখুশি হলেন। নান্না এই প্রথম টাকা পাঠাল তাও বিয়ের জন্য। খুব ধুম ধাম না হলেও বিয়ের আয়োজন খারাপ হল না। দীয়ার বড় মামা ঢাকায় থাকেন, মামার বাসা থেকেই বিয়ের কাজ চলল। দীয়া চতুর্থ বর্ষে ,ক্লাস বাসা থেকেই শুরু করল।

এর মাঝে বাবা এল,পি,আর এ গেলেন। এবার মুন্নাদের পরিবারটি একটি ঝাঁকি খেল। কলোনির বাসা ছেড়ে দিতে হবে। বাবা সৎ মানুষ,যা হয় তেমন কিছু করতে পারেন নাই। অনেক আগে সেই গোরানেরও পেছনে সিপাহি বাগে পাঁচ কাঠার একটি জমি কিনেছিলেন। এবার বললেন রিটায়ারমেন্ট এর পর যা পাবেন ওখানে বাড়ি করবেন। পান্নাকে মা বললেন বাবাকে সাহায্য করতে। ভাবী নিজেও এখন একটা চাকরী করছে। মতিঝিলে অফিস,তেমন কিছু না তবে অফিস থেকে মাইক্রোবাস আসে ,অনেক মহিলা একসাথে যান অফিসে। ভাবীর কাছে এই চাকরীটা অনেককিছু। ওই সিপাহিবাগে গাড়ী যাবে না ,অফিসে যেতে আসতেই বেতন শেষ হয়ে যাবে। পান্না নতুন প্রস্তাব দিল, পান্না আলাদা হবে , মতিঝিলের দিকেই বাসা নেবে,পান্নার অফিসও মতিঝিলে। পান্না এটাও বলল সে যা পারে দেবে বাড়ি করার সময়। মুন্নার কিছু বলার নাই। বেতন যা পায় টোনা-টুনি দুজনের চলাই মুশকিল। দীয়া মাত্র ইন্টার্নিশিপ করছে। সামান্য কিছু পায়। মুন্না বি,সি,আই,সির হেড অফিসে বসে ,মান নিয়ন্ত্রণ বিভাগে। ইঞ্জিনিয়াররা কিছু উপরি পায় এটা চালু একটা ধারনা। মুন্না স্বস্তি বোধ করে উপরি নেই বলে। পান্না বি,সি,এস দিয়ে টি,এন্ড,টি তে জয়েন করেছে। পান্নার চলন বলন খরচ বরচ দেখে মনে হয় না সরকারি চাকরি করে। মা মুন্নাকে মাঝে মাঝে বলেন, কি রে তোর অফিসে কি কোন ইনকামের ব্যবস্থা নেই?। মুন্না অবাক হয়,বেতন আছে তো। মা বিরক্ত হয়ে বলে,আরে বেতন দিয়ে কি চলে নাকি?। মুন্না জবাব দেয়,বাবা ত বেতন ছাড়া কিছু পায় না। মা র জবাব,তোর বাবা বাসা পেয়েছিলেন। বাসা ভাড়া কত জানিস?। মুন্না জবাব দেয় না। পান্না বাসা ভাড়া নিয়ে সত্যি সত্যি জসিমুদ্দিন রোডে চলে গেল।

পান্নার ছেলে হবার সময়ও মা’র সাথে পান্নার শাশুড়ির একটু মন কষাকষি হল। পান্নার ছেলে হল মনোয়ারা হাসপাতালে। মা হাসপাতালে ছিলেন প্রথম দিন। সিজার তাই কয়েকদিন ভাবীকে হাসপাতালে থাকতে হবে। পান্নার শাশুড়ি মা’কে বলেছিল,বিয়াইন আপনি রাতে একটু থাকেন আমি দিনে আসব। মা ক্ষেপে আগুন। মেয়ের মা কিভাবে এমন কথা বলে?। পান্না মিন মিন করে বুঝাতে চাইল ভাবীর মা’র হার্ট এর সমস্যা আছে । মা গায়ে মাখলেন না। মুন্না প্রমাদ গুনল। কারণ দীয়া ইতিমধ্যে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। পান্না বাবা-মা কে নিয়ে সিপাহিবাগে বাসা ভাড়া নিল। বাবা রিটায়ারমেন্ট এর টাকা পেলে বাড়ির কাজ শুরু হবে। নান্না কথা দিয়েছে কিছু পাঠাবে।

অফিসে রাজনীতি হাউকাউ লেগেই আছে। মুন্নার ভালো লাগে না এসব। মুন্নার সাথে গায়ে পড়ে অনেকে রাজনীতির আলাপ করতে আসে। হু হাঁ করে মুন্না পাশ কাটিয়ে দেয়। কিন্তু ডিপার্টমেন্টের এনায়েত সাহেব অনেক সিনিয়র, এখনো এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার হয়েই পড়ে আছেন। প্রমোশন হয় না। হবার কোন কারণও নেই, উনি ডিপ্লোমা । দেশ স্বাধীন না হলে আদৌ অফিসার পর্যায়ে আসতে পারতেন কিনা সন্দেহ আছে। কিন্তু এই এনায়েত সাহেব প্রতিদিন মুন্নাকে ডেকে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বলে। মুন্না কিছু বলে না। সিনিয়র মানুষ তা ছাড়া মুন্না কোন রাজনৈতিক নেতারই ভক্ত না। কিন্তু একদিন এনায়েত সাহেব বঙ্গবন্ধুর চরিত্র নিয়ে কথা বলে বসলে মুন্না ক্ষেপে গেল, এমনিতে মুন্নার ইদানিং মেজাজ খারাপ থাকে বাসার কারনে। মুখের ওপর মুন্না বলে দিল, আপনার আর এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার হওয়া লাগত না বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে, এটা বুঝেন?। একেবারে লা জবাব হয়ে গেলেন এনায়েত সাহেব। মুন্নার মত ভদ্র একটি ছেলের কাছে এমন জবাব আশা করেন নাই। কিন্তু সরকার বদল হলে পরে মুন্নাকে বদলী করা হল খুলনা পেপার মিলে। মুন্না পরে শুনল, মুন্নার গ্রামের বাড়ী ফেনী, এটাই নাকি অপরাধ। বিভাগীয় বস এখন গোপাল গঞ্জের। বসের ধারনা ফেনীর সব মানুষ নাকি খালেদা জিয়ার আত্মীয়। চাকরীতে বদলী স্বাভাবিক। মুন্না বিপদে পড়ল দীয়া কে নিয়ে। বেচারির সময় ও বেশীদিন নেই। দীয়া খুব সাহসী আর তেজী মেয়ে। সাহস দিল ,যাও আবার বদলী হয়ে আসতে পারবে। মুন্না দীয়া কে বলল, এজন্যেই বঙ্গবন্ধুকে মানুষ পছন্দ করে নাই স্বাধীনতার পরে। দীয়ার সাথে মুন্নার রাজনীতি নিয়ে আগে তেমন কথা হয় নাই। দীয়া একেবারে সোজা সাপটা জবাব দিল,দেখ এভাবে বল কেন? তোমার বস কি আমেরিকান? বাঙ্গালি, একজন বাঙালি আমেরিকানের মত সভ্য আচরণ করবে না। করলে বঙ্গবন্ধু মরতেন না। মুন্না বলল, কিন্তু জিয়াও খারাপ কিছু করে নাই। দীয়া এবার গলায় একটু চড়িয়ে জবাব দিল,দেখ সভ্য মানুষের সাথে অসভ্যদের তুলনা হয় না। আইয়ুব,ইয়াহিয়া,জিয়া,এরশাদ একই শুয়োরের খোঁয়াড় অর্থাৎ পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমী থেকে বের হওয়া প্রাণী। এদের সাথে বঙ্গবন্ধুর তুলনা করলে আমরাই ছোট হই ,বঙ্গবন্ধুর কিছু হয় না। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশে গিয়ে তুমি বলতে পারবে যে, একজন সামরিক শাসকও ভাল শাসক হতে পারে?। এটা লজ্জার কথা মুন্না। দীয়া এত বেশী আত্মবিশ্বাসের সাথে কথাগুলো বলল যে মুন্না একটু চুপসেই গেল।

পান্না একদিন বাসায় এসে মা’কে বলল ও কানাডায় যাবার জন্য এপ্লাই করেছে। মা বাবা র জন্ম তারিখ লাগবে। কিভাবে কানাডা যাবে?। কানাডায় নতুন নিয়ম হয়েছে। নাম্বার ভিত্তিতে পেশাজীবীরা যেতে পারবে। লম্বা নিয়ম। এপ্লাই কর,ইন্টারভিউ দিতে সিঙ্গাপুর যাও ,অনেক ঝক্কি। পান্না পারে এসব। দীয়ার তারিখ যখন এগিয়ে আসল,লাগাতার হরতাল শুরু হয়ে গেল। মুন্না মনোয়ারা হাসপাতালে কথা বলে রাখল ,দীয়ার এক সিনিয়ার আপা ওখানে আছেন। সিজার করতে হবে আগেই বলে দিয়েছেন,মুন্নাকে নকিব বলল আপা টাকা নিবেন না,দীয়া ত ডাক্তার। হরতালের একদিন মুন্না বাসায় ছিল অফিসে যায় নাই।খুলনা যেতে হবে,অফিসে তেমন কাজও নেই। দীয়ার তারিখ তখনও ৪ দিন দেরী। আপা বলেছেন আগের-দিন ভর্তি হলেই হবে। কিন্তু দীয়ার পেইন উঠল। হরতাল,কিছু নেই,মুন্না দোকান থেকে এম্বুলেন্সের জন্য ফোন করল। জবাব এল এম্বুলেন্স ঝুঁকিপূর্ণ,জালিয়ে দিচ্ছে। মুন্নার এতটাই অসহায় লাগল যে মনে হোল পৃথিবীতে অসহায়ের সংজ্ঞাটাই বোধহয় কেউ জানে না। মা বললেন একটা রিকশা ডাক,যা হয় হবে ,আল্লাহ ভরসা। দীয়া ভয় পায় নাই। রিকশা করেই রওনা দিল।কাছে নার্সিং হোম আছে কিন্তু অপারেশন করবে কিভাবে?। মুন্নাদের পাশের বাসার ভদ্রলোক বললেন সাজাহানপুর পর্যন্ত চলেন,ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল আছে। কোনরকমে যাওয়া গেল ওই পর্যন্ত। বিকেলে সিজার করলেন অন্য ডাক্তার। মেয়ে হল,মুন্না যখন মেয়ের কপালে একটি চুমা দিয়ে মিষ্টি পাওয়া যায় কিনা খোঁজ নিতে নীচে নামল দেখল মাওলানা নিজামি বের হয়ে যাচ্ছেন। একজন পাশ থেকে বলল, এই জামাত ই ইসলাম এর লোকরা কত কম খরচে চিকিৎসা মানুষের ঘরের কাছে নিয়ে এসেছে। এদের রাজাকার বলে গাল দেয়া ঠিক না। মুন্না চমকে উঠল ,মুন্নার মেয়ের জন্ম হল রাজাকারের হাসপাতালে!! কই এতক্ষণ তা মনে হয় নাই!

তিন বছরের মাথায় পান্না কানাডা চলে গেল। মুন্নার মাথায় দেশ ছাড়ার কথা কখনো আসে নাই। মুন্না খুব হোম সিক। মানুষ দেশ ছেড়ে যে কিভাবে যায় মুন্না বুঝে উঠতে পারে না। মুন্না খুলনায় বছর খানেক ছিল। হেড অফিস থেকেই মুন্নাকে আবার কোয়ালিটি কন্ট্রোল বিভাগে ফিরিয়ে আনা হোল। মেয়ের নাম দীয়া রেখেছে তিশা। মুন্নার বোন নেই,মুন্না মেয়েকে বুকে নিয়ে বসে থাকে সারাদিন। কট কট কথা বলে তিশা এগার মাস বয়স থেকেই। খুব আদুরে মেয়ে তিশা,কেউ আদর না করে পারে না। দীয়া একটি ক্লিনিকে জয়েন করেছিল ইন্টার্র্নি শেষে। নকিব পাশ করার পর পাওয়া প্রথম বি,সি,এস দেয় নাই, দ্বিতীয় বার দিল,পোস্টিং পেল চুয়াডাঙ্গা । নকিব বেশ খুশী মনে চলে গেল। দীয়া মুন্না কেউই বি,সি,এস দিল না। দুজনের কোথায় পোস্টিং হয় আরেক হুজ্জৎ।

দীয়া যে ক্লিনিকে জয়েন করল সেখানে বেতন ভাল।প্রাইভেট ক্লিনিক এখনো তেমন হয়নি খুব বেশী। দীয়ার চাকরী টা হওয়াতে মুন্না একটু স্বস্তি পেয়েছিল। দীয়া আশ্চর্য জনক ভাবে বেতনের প্রায় সব টাকা মা র হাতে তুলে দিল। মা খুশী। বাবার রিটায়ারমেন্টের পাওয়া এককালীন টাকায় একতলা বাড়ী করা গেছে,ফাউন্ডেশন ছাড়া। খারাপ না। ভদ্র ভাবে থাকা যায়। দীয়া একদিন ক্লিনিক থেকে এসে খুব মন খারাপ করে ঘড়ের কাজ করছিল। মুন্না কারণ জানতে চাইলে দীয়া হতাশ ভাবে যা বলল তার সারমর্ম, ক্লিনিকে থাকা অবস্থায় নামাযের ওয়াক্ত হলে নামাজ পড়তে হবে, ম্যানেজমেন্ট সার্কুলার না দিলেও মৌখিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে। তা মানা যায়,কিন্তু মহিলা ডাক্তারদের হিজাব পড়ে আসতে হবে। দীয়ার মতে এটা জুলুম। এটা দীয়া পারবে না। মুন্না নিজেও স্বীকার করল, না এটা মানা যায় না। ক্লিনিক টা আসলে জামাতিদের। এবার মুন্না নিজের দিকে ফিরল,আর কত?। এভাবে নরকে আর কতকাল বসবাস করা যায়। মেয়ের জন্ম হয়েছে জামাতিদের হাসপাতালে। বউ কে হিজাব পড়তে হবে চাকরীর জন্য ,এরপর তো জামাতিদের প্রণাম করতে হবে।

মুন্না আলমারি থেকে পান্নার দিয়ে যাওয়া সব কাগজের বাণ্ডিল বের করল। পান্না যাবার আগে সব কাগজের একসেট কপি মুন্নাকে দিয়ে গিয়েছিল, কানাডার। মুন্না ধমাধম এপ্লাই করে দিল। সিংগাপুরে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে মুন্না সিংগাপুর শহর দেখল না, কোনরকমে ইমিগ্রেশান ভিসা নিয়ে দেশে ফিরল। নান্না ,পান্না ফোনে বলল চলে আয়, পরে বাবা মাকে নিয়ে আসা যাবে। বেশী সময় লাগবে না।

নকিব কিছুই বলল না। শুধু একদিন ঢাকায় আসলে বলল, মুন্না তোর আইডিয়াল স্কুলের শাখাওয়াত স্যারের কথা মনে আছে? । মুন্না বলল,কোন শখাওয়াত স্যার?, ওই যে এক মেয়ের সম্মান নষ্ট করার জন্য স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল ?। নকিব বলল, হা উনি যশোর থেকে এবার সংসদের এম,পি নির্বাচিত হয়েছেন, জামাত ই ইসলাম থেকে। দেশটা সত্যি নরক হয়ে গেছে রে মুন্না।

এয়ারপোর্টে সবাই গেল, নকীবের সাথে একই গাড়িতে উঠল মুন্না। মহাখালী রেল-গেটের কাছে এসে ট্রাফিক জ্যামে পড়ল, কোন মন্ত্রী যাবেন রাস্তা আটকে দেয়া হয়েছে। একটু পরেই মন্ত্রীর গাড়ী পাশ দিয়ে বের হয়ে গেল। জাতীয় পতাকা সহ গাড়ীতে বসা বাংলাদেশের মন্ত্রী মাওলানা নিজামি। নকিব প্রায় ছল ছল চোখে মুন্নার দিকে তাকাল। মুন্না অন্যদিকে মুখ ঘুড়িয়ে নিল। বাবা মা, নকিব সবাই বিদায় নিলে মুন্নারা ইমিগ্রেশনের দিকে পা বাড়াল দীয়া আর তিশা একটু পিছনে ছিল। মুন্নার হাতে টানা লাগেজ। হটাৎ মুন্না নকিবের গলা শুনতে পেল, কি রে মুন্না শেষ পর্যন্ত পালালি?। মুন্না চমকে বলে উঠল,নকিব?। দিয়া কাছে এসে বলল,কি? নকিব ভাইয়েরা তো চলে গেছে । বিদায় নিয়ে চলে গেল না?। মুন্না সম্বিত ফিরে পেয়ে তিশাকে কোলে তুলে নিয়ে দীয়া কে পাশে নিয়ে ইমিগ্রেশানের দিকে যেতে যেতে স্বগোক্তি করল, পালালাম কোথায় রে নকিব, আমি তো নরক ত্যাগ করলাম। !!!

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/soptok/552.html

 4 টি মন্তব্য

(ফোনেটিক বাংলায়) মন্তব্য করুন

  1. নির্ঝর মজুমদার

    এটা আমার দেখা YPD ব্লগের সব থেকে চমৎকার লেখা।

    1. soptok

      নির্ঝর

      আপনাকে ধন্যবাদ ,কস্ট করে পড়েছেন। আসলে এ ব্লগটি যুবকদের জন্য,আমি সংজ্ঞানুসারে যুবক নই কিন্তু নুতন প্রজন্মের জন্যই মাঝে মাঝে কলম ধরি ।১৯৭১ এ আমার বয়স ছিল চার বছর। আমার দুঃখ কি জানেন ?, আমাদের লেখকরা ৭১ নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কোন গল্প বাঁ উপন্যাস লিখেন নাই বাঁ লিখতে পারেন নাই সাহস এর অভাবে। কবিতা প্রচুর লেখা হয়েছে। কাজেই অগত্যা নিজ হাতে আইন তুলে নেয়া আর কি…হা হা হা…আমি লেখক নই ভাই।

  2. প্রজন্মের পথিক

    অসাধারন লিখেছেন…ভাল লাগল

    1. soptok

      ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন