problem child-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

সাম্প্রদায়িক সংঘাত: মৌলবাদী ও সেক্যুলারদের মধ্যে পার্থক্য কি?

লিখেছেন: problem child

হঠাৎ একটি বিষয় নিয়ে বেশ চিন্তা হচ্ছে। বিষয়টি- সেক্যুলার/বামপন্থীদের রাজনৈতিক দর্শন। বামপন্থী রাজনীতিকদের বক্তব্যের একটা ক’মন বিষয়- ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা। অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ে তুলতে হবে।’ ভাল কথা। কিন্তু অসাম্প্রদায়িক অর্থ কী? নিশ্চয়ই ধর্মহীনতা নয়। অসাম্প্রদায়িক বলতে বামপন্থী রাজনীতিকদের বক্তব্য থেকে যা বোঝা যায় তা হলো- দেশে সকল ধর্মের মানুষ নিজ নিজ অবস্থানে থেকে স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করবে। কোন ধর্মভিত্তিক হানাহানি থাকবে না। পারস্পারিক সম্প্রীতি বজায় থাকবে। তবে আমার চিন্তার মূল বিষয় এটি নয়।

বামপন্থী রাজনীতিকরা অনেক সময় অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ সৃষ্টি করতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি করে বসেন। আবার মৌলবাদীরা ধর্মকে পুঁিজ করে, অপপ্রচার চালিয়ে স্বার্থ হাচিলের জন্য সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি করেন। যদি উভয়ের কারণে সাম্প্রদায়িক সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তাহলে সেক্যুলার ও মৌলবাদীদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

২০১২ সালের ২৭ মার্চ। সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের ফতেপুরে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘হুজুরে কেবলা’। নাটকটি প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল মুনসুর আহমেদের গল্প অবলম্বনে তৈরি। একই দিন হুজুরে কেবলা’র আগে নারী সমাজকে নিয়ে আরেকটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। পরের নাটকটি পরিচালনা করেন এক হিন্দু স্কুল শিক্ষিকা।

২৯ মার্চ সাতক্ষীরার স্থানীয় দৈনিক দৃষ্টিপাতে নাটক হুজুরে কেবলা’য় মহানবী (সা.) কে অবমাননা করা হয়েছে মর্মে একটি কাল্পনিক সংবাদ ছাপা হয়। পরের দিনই মৌলবাদীরা ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে ফতেপুরে ব্যাপক সহিংসতা চালায়। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ঘর-বাড়ি ভাঙচুর করে, আগুণ ধরিয়ে দেয়, লুটপাট করে। বাদ পড়েনি নারী সমাজকে নিয়ে মঞ্চস্থ নাটকের পরিচালক হিন্দু স্কুল শিক্ষিকার বাড়িঘরও। একই ঘটনার জেরধরে কালিগঞ্জের চাকদাহেও ব্যাপক সহিংসতা চালায় মৌলবাদীরা। পরবর্তীতে ওই নাটকের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সেখানে মহানবী (সা.) কে অবমাননা করে কোন সংলাপ ছিল না। মৌলবাদীরা তাদের স্বার্থ হাচিলের জন্যই ওই তাণ্ডব চালায়। এছাড়া তারা নিয়মিত ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে, অপপ্রচার চালিয়ে ধর্মভীরু মানুষকে কাছে টানতে চায়- এ কথা সর্বজন স্বীকৃত। তারা মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হতে কুণ্ঠাবোধ করে না।

এবার আসা যাক সেক্যুলারদের ধর্মবিরোধী নানা সংঘাত সৃষ্টিকারক বক্তব্যের দিকে। ব্লগার রাজীব হায়দার। নামটি সম-সাময়িককালে বেশ আলোচিত। তিনি ব্লগে থাবা বাবা নামে লিখতেন। তার লেখায় মহানবী (সা.) সম্পর্কে কটুক্তি করা হয়েছে- এমন তথ্যে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের মধ্যে যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল তা অস্বীকার করা যায় না। ওই একটি কারণেই গণজাগরণ মঞ্চ সৃষ্টি হওয়ার পর সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের মধ্যে যে বিপ্লবের সৃষ্টি হয়েছিল, মৌলবাদীরা অপপ্রচার চালিয়ে তা বির্তকিত করে তোলে। সমগ্র দেশে আস্তিক-নাস্তিক নিয়ে ব্যাপক আড়োলন সৃষ্টি হয়। রাজীব হায়দার মার্ডার হওয়ার পর তার প্রতি মানুষের মনে যে সহানুভূতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। যদিও রাজীব হায়দারের যে লেখাটি নিয়ে এত কিছু, সেটি প্রকৃতপক্ষে তার কিনা, তা নিয়ে দেখা দেয় বির্তক। প্রযুক্তিবিদরা বলেন- লেখাটি তার ব্লগের একাউন্ট হ্যাক করে পোস্ট করা হয়েছে। অপরপক্ষে মৌলবাদীরা লেখাটি রাজীবের বলে প্রচার চালিয়ে তা মানুষের মনে গেথে দিতে সফল হয়। কেননা রাজীব সেক্যুলার। যার ফলশ্র“তিতে জন্ম নেয় হেফাজতে ইসলাম। মৌলবাদী এই সংগঠনটি ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে। যা আমাদের দেশের রাজনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

রাজীব হায়দার যে দিন মার্ডার হয় তারপর দিন সাতক্ষীরা শহরে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। আমি মিছিলে অংশ নিয়েছিলাম। একজন মুক্তমনা মানুষকে হত্যার প্রতিবাদে সেদিন স্লোগান দিয়েছি। তার দু’একদিন পরেই মৌলবাদ সমর্থক দুটি পত্রিকায় রাজীব হায়দারের সেই কথিত লেখাটি ছাপা হয়। সেটি পড়ার দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে। এত নোংরা ভাষার কোন লেখা এর আগে আমি পড়িনি। লেখাটি পড়ার পর আমার সারা শরীর কাপছিল। শত্র“রা রাজীবের ব্লগ একাউন্ট হ্যাক করে যে লেখাটি তার নামে ছেড়েছে সেটি নিঃসন্দেহে প্রকাশের অযোগ্য। আবার শত্র“দের কথা মতো- সেটি যদি সত্যি রাজীবের লেখা হয়, তা হলে বলব, রাজীবের মস্কিক বিকৃত ছিল। তার লেখাটি মুক্ত বুদ্ধি চর্চার কোন অংশ নয়। শুধুই অসভ্য আচরণ, প্রকাশ অযোগ্য। মুক্ত বুদ্ধি চর্চা এমন হতে পারে না। এক্ষেত্রে মৌলবাদ, সেক্যুলারদের তথাকথিত মুক্ত বুদ্ধি চর্চা ও যে পত্রিকা দুটি লেখাটি ছেপে মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে- তিনটি শ্রেণিই সমান অপরাধী। অবশ্যই মৌলবাদী, সেক্যুলারদের তথাকথিত মুক্ত বুদ্ধি চর্চা ও সংশ্লিষ্ট পত্রিকা কর্তৃপক্ষের শাস্তি হওয়া উচিত। একই সাথে ব্লগার রাজীব হায়দারের হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হওয়া উচিত।

শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ফেইসবুকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জামায়াত-শিবিরের ধর্মীয় অপপ্রচার ও সেক্যুলারদের ধর্ম বিদ্বেষী আচরণের প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টিতে যথেষ্ট।

লেখার শুরুতেই বামপন্থী রাজনীতিকদের প্রসঙ্গ তুলেছিলাম। তাদের কথা তোলার কারণ হলো- তারা নাকি সেক্যুলার। বক্তব্যে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার কথা বলেন। কিন্তু ধর্ম বিদ্বেষী আচরণ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা কি এক? ব্লগের একটি লেখাকে কেন্দ্র করে দেশে যে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি হয়েছে, এর দায়দায়িত্ব কে নেবে? দায়দায়িত্ব কাধে নেয়ার ক্ষমতা কি বামপন্থী রাজনীতিকদের আছে। দেখুন, মুক্ত বুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা বা বাধার সৃষ্টি হলে কথার বুলি ফোটান বামপন্থী রাজনীতিকরা। কিন্তু মুক্ত বুদ্ধি চর্চার নামে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি হলে- সেটি কোন অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ? আজ বাংলাদেশে যে অবস্থা- পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এর পথ কি সেক্যুলাররা তৈরি করছেন না, আচ্চা পুরোটা না, ওই পথ তৈরিতে আপনাদের ভূমিকা তো অস্বীকার করতে পারবেন না। কেন জানি, মৌলবাদ ও সেক্যুলারদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমি কোন পার্থক্য খুঁেজ পাচ্ছি না। একজন সংবাদ কর্মী হিসেবে আমি আবারও বলতে চাই, ব্লগের ওই লেখাটির নূন্যতম কোন প্রকাশ যোগ্যতা নেই। এর সাথে জড়িত মৌলবাদী, তথাকথিত মুক্ত বুদ্ধি চিন্তক ও সংশ্লিষ্ট পত্রিকা দুটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। নয়তো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশ তার ঐতিহ্য হারাবে। আমরা হবো বিপদাপন্ন।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/sktanzir/23630.html



মন্তব্য করুন