জন কার্টার-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

অতঃপর ভালবাসা (চন্দ্রার গল্প)…………

লিখেছেন: জন কার্টার

রিকশা থেকে নেমে চারদিকে ভালো করে দেখার চেষ্টা করল চন্দ্রা।সবকিছুই আগের মতই আছে তবে কেন জানি বুকের মধ্যে এক চাপা কষ্ট।কোন কিছু হারিয়ে ফেলার কষ্ট! এই জায়গাটা চন্দ্রার ভীষণ পছন্দের।রোজ বিকেল সে সময় পেলেই এই জায়গাটাতে বেড়াতে আসে।

এই কোলাহল,ভিড়-ভাট্টা, গাড়ি-ঘোড়ার শব্দ ভীষণ রকমের পছন্দ করে চন্দ্রা। এগুলোর মধ্যে অসাধারণ রকমের এক ভালো লাগা আছে চন্দ্রার।কিন্তু আজ যেন তার কিছুই ভালো লাগছে না।

চন্দ্রা হেঁটে চলছে ফুটপাতের উপর দিয়ে, ইচ্ছা ছিল চার রাস্তার মোড়ের টং দোকানে বসে চা খাবে কিন্তু নাহ্ এখন আর সে ইচ্ছা করছে নাহ্। চন্দ্রা ফুটপাত ঘেঁষা কফিশপ টাতে গিয়ে ঢুকল। দিনের এই সময় টা তে কফিশপের গোল টেবিলগুলো কানায় কানায় ভর্তি থাকে কিন্তু আজ কফিশপটা অনেকটাই ফাঁকা। চন্দ্রা কফিশপের দক্ষিণের কাঁচ ঘেঁষা টেবিল টাতে গিয়ে বসল।

অল্প-বয়সী কলেজপড়ুয়া কিছু ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টায় মসগুল।কোণার টেবিল টাতে মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক ল্যাপটপে কোন অফিসিয়াল এসাইনমেন্টে মগ্ন। কফিশপটাও কি তার অফিসের অঙ্গ? পৃথিবী কি গতিশীল! নিজের মনেই ভাবল চন্দ্রা।

পাশের কাচের দেওয়ালে চোখ পড়ল চন্দ্রার।ফুটপাতের সিমেন্টের রাস্তায় দুটি নেড়িকুকুর একে অপরকে জড়িয়ে সোহাগ-সঙ্গমে মাতাল। পৃথিবীর রীতিনীতি’র কোন তোয়াক্কা না করে দুজনে আদিম রিপুতে অন্ধ। এক দৃষ্টে খাণেকক্ষণ ওদিকে তাকিয়ে থাকল চন্দ্রা। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে দৃষ্টি ফেরালো চন্দ্রা।

নিজের কথা ভেবে মাঝে মাঝে খুব আফসোস হয় চন্দ্রার। মাঝে মাঝে প্রচন্ড রাগও হয়! ইচ্ছা করে চিৎকার করে সৃষ্টিকর্তাকে জিজ্ঞেস করতে, ”তাকে কেন আর আট-দশটা সাধারণ মেয়ের মত করে তৈরি করা হল না?” কি দোষ ছিল তার? সে তো এরকম জীবন চাই নি, তবে তাকে কেন এভাবে বাঁচতে হবে?

মনে প্রাণে একজন নারী হয়েও সে কেন একজন সাধারণ নারীর মত জীবন যাপন করতে পারবে নাহ্? কেন পারবে না আর আট-দশটা নারীর মত স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে ঘরসংসার করতে? একজন সুস্থসবল নারীর মত নারী সুলভ সকল অঙ্গ-প্রত্যাঙ্গ থাকার পরও কি দরকার ছিল একটা অতিরিক্ত অঙ্গের? এসব কথা ভাবতে ভাবতে মনটা বিষন্ন হয়ে এল চন্দ্রার। কখন যে দু’ফোঁটা জল চোখের কোণায় ভিড় করছে তা বুঝতেই পারিনি চন্দ্রা। চোখ মুছে রাস্তার দিকে দেখল চন্দ্রা।

গত ২২ বছর ধরে নিজের মধ্যে অন্য এক স্বত্তাকে লুকিয়ে রেখেছে চন্দ্রা। বাইরে থেকে কোন কিছুই বোঝার উপায় নেই। আর আট-দশটা সাধারণ মেয়ের মতই চন্দ্রার শারীরিক গঠন প্রায় একই রকমের। তবে অতিরিক্ত অঙ্গ হিসাবে একটা পুরুষাঙ্গ(Penis) আছে চন্দ্রার।বিজ্ঞানের মতে সে মেয়েও না আবার ছেলেও নাহ্। বিজ্ঞানের ভাষায় সে হল Shemale অর্থাৎ যার নিজেস্ব কোন স্বত্তা নেই।

হঠাৎ করেই জগৎ-এর সব নীরবতা ভেঙে চন্দ্রার মোবাইল ফোনটা কর্কশ কন্ঠে বেজে উঠল। শুভ্র-র ফোন। গত কয়েকদিন ধরে চন্দ্রা শুভ্র কে ভীষণভাবে ইগনোর করার চেষ্টা করেছে। চেষ্টা করেছে শুভ্র যেন তাকে কে ভুল বুঝে। কিন্তু ছেলেটা ভীষণ রকমের অবুঝ! কোন কিছু বুঝতে চাই না ছেলেটা।

চন্দ্রার নগ্ন বাস্তবতাকে খুলে বলার পর পুরো থ মেরে গেছিলো ছেলেটা। এরপর পুরো এক সপ্তাহ্ চন্দ্রার সাথে কোন যোগাযোগ করেনি শুভ্র। চন্দ্রা ভেবেছিল শুভ্র হয়তো আর যোগাযোগ করবে নাহ্। ঐ এক সপ্তাহ্ খুব কষ্টে কেটেছিল চন্দ্রার। কিন্তুগত একসপ্তাহ্ ধরে শুভ্র’র সাথে আবারো নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে চন্দ্রার। সবকিছুই যেন আবার আগের মত গেছে। চন্দ্রা ভীষণ খুশি ছিল শুভ্র’র ফিরে আসাতে।

কিন্তু গতকাল রাতে শুভ্র যখন থেকে তার নতুন মেয়েবন্ধুর কথা বলেছে তখন থেকেই চন্দ্রার মনটা ভীষণ রকমের খারাপ। আসলে চন্দ্রাও শুভ্রকে ভীষণ রকমের ভালবাসে ।কিন্তু নিজের শারীরিক অক্ষমতার কথা ভেবে নিজের ভালবাসার কথা শুভ্র কে কখন বলতে পারিনি চন্দ্রা।

আজ সকালে শুভ্র যখন ফোন করে চন্দ্রাকে তার নতুন মেয়েবন্ধুর সাথে দেখার করার জন্য কফিশপ টা তে আসার কথা বলল তখন ডুকরেকেঁদে ফেলেছিল চন্দ্রা। ভেবেছিল সে কিছুতেই আসবে না কফিশপে কিন্তু কোন এক অদৃশ্য শক্তি যেন চন্দ্রা কে কফিশপে টেনে নিয়ে এলে।

ফোনটা রিসিভ করে কানে রাখতেই ওপার থেকে ভেসে এল, ”I Love U Chondra.Will u marry me?” ভীষণ অবাক হয়ে গেল চন্দ্রা! চোখ তুলে একটু তাকাতেই দেখতে পেল কফিশপের দরজার কাছে একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে দাড়িয়ে আছে শুভ্র।

কফিশপের বাইরে নেড়িকুকুর দুটো এখনও একে অপরকে পরম আশ্লেষে আদর করে চলছে।ওদের ভিতর কোন কুয়াশা নেই।সত্যি, ভালবাসা কী সুন্দর!!

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/shuvo-291/29270.html