জন কার্টার-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

সিভিল পাইওনিয়ার ফোর্স; এক নৃশংস হায়ানার দল……..

লিখেছেন: জন কার্টার

সিভিল পাইওনিয়ার ফোর্স ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম রেলওয়েতে কর্মরত অবাঙালি, বিহারিদের নিয়ে গঠিত একটি সংগঠন।১৯৭১ সালে রেলওয়েতে কর্মরত ৪০ বছরের নিচে প্রায় সকল পাকিস্তানিই এই বাহিনীর সদস্য ছিল।মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন সময়ে যে কয়েকটি সংগঠন সরাসরি হত্যাযজ্ঞে মেতে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এই সিভিল পাইওনিয়ার ফোর্স নামক সংগঠনটি। এই সংগঠনটির প্রধান কাজ ছিল ১৯৭১ সালে বাঙালি নিধনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাহায্য করা। কিন্তু পরবর্তীতে সিভিল পাইওনিয়ার ফোর্স নিজেরাই একটি বাহিনীতে রূপান্তরিত হয় এবং বিভিন্ন স্থানে গণহত্যায় মেতে ওঠে।মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন সময়ে বিভিন্ন স্থানে এই বাহিনীর হাতে প্রায় ১৪০০ মুক্তিকামী বাঙালি নিহত হয়।এই বাহিনী এতটাই নৃশংস ছিল যে এদের থেকে শিশু, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ কেউ-ই রক্ষা পেত না।

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সিভিল পাইওনিয়ার ফোর্স চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা চালায় এবং কয়েক’শ নিরস্ত্র বাঙালিকে হত্যা করে।এই বাহিনীর গণহত্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ওয়্যারলেস কলোনির গণহত্যা।চট্টগ্রাম শহরের ওয়্যারলেস কলোনিতে ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনী পাইওনিয়ার ফোর্সের সহায়তায় এই নারকীয় গণহত্যা চালায়।

১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর ওয়্যারলেস কলোনি এবং বাহাদুর শাহ কলোনির শিশু, যুবক-যুবতী, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধদের বাসা থেকে ধরে আনে সিভিল পাইওনিয়ার ফোর্সের লোকেরা।সেদিন অনেককেই মিলিটারি অফিসার সাহেব ডাকছে বলে ঘর থেকে বের করে নিয়ে যায় এই বাহিনীর সদস্যরা।এরপর জল্লাদরা ধরে আনা ঐসব বাঙালিদের উপর ধারালো অস্ত্র ও স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায়। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এই হত্যাযজ্ঞে আনুমানিক দুইশ’ লোককে তারা হত্যা করে। শত শত নারী-পুরুষের লাশ সেখানে পড়েছিল। এই লাশগুলোকে একত্র করে পাকিস্তানি হায়েনারা পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।এরা এতটাই নৃশংস ছিল অনেক লাশকে আবার গান পাউডার ব্যবহার করে ধ্বংস করে দেয়।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকে সিভিল পাইওনিয়ার ফোর্সের গণহত্যা সংক্রান্ত একটি নিউজ প্রকাশিত হয় যা নিম্নরূপঃ-

ঢাকা হইতে বি.এস.এস পরিবেশিত এক সংবাদে জানা গিয়াছে যে, চট্টগ্রামে পাক বাহিনী কর্তৃক সংগঠিত পাইওনিয়ার ফোর্স নামক একটি নরঘাতক দলের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে। রেলওয়ে অবাঙ্গালী কর্মচারীদের নিয়া গঠিত এই দলটি উচ্চপদস্থ বাঙ্গালী রেল কর্মচারীসহ প্রায় ১৪০০ (চৌদ্দ শত) লোককে হত্যা করিয়াছে বলিয়া খবর পাওয়া গিয়াছে। এই ব্যাপারে প্রাপ্ত সংবাদে জানা গিয়াছে যে, ইহাদের প্রধান কাজ ছিল রেল, সরকারী ও আধা-সরকারী অফিস হইতে শিকার উঠাইয়া আনা এবং হত্যা করা।

এক সংবাদে দাবী করা হইয়াছে যে, তদানীন্তন পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চীফ পার্সোন্যাল অফিসার আর্শাদ মাহমুদের উদ্যোগে এবং পাক-বাহিনীর সহায়তায় এই বাহিনী গঠন করা হইয়াছিল। অনূর্ধ্ব ৪০ বৎসর সকল শ্রেণীর রেল কর্মচারী এই নরঘাতক বাহিনীর যোগ্য সদস্য বলিয়া বিবেচিত হইত। তাহাদের সামরিক ট্রেনিং দান করা হইত এবং ট্রেনিং প্রাপ্তির পর ইহাদের মধ্য হইতে কয়েকজনকে পাকশী, সৈয়দপুরের ন্যায় অন্যান্য কেন্দ্রে হত্যাযজ্ঞ পরিচালনার জন্য প্রেরণ করা হইত।

এই নরঘাতক বাহিনীর সদস্যরা চট্টগ্রামে হত্যাযজ্ঞ সমাপ্ত করিবার পর খুনের নেশায় উন্মত্ত হইয়া উঠে এবং সেই নেশার ঘোরে এই নরপশুর দল চট্টগ্রামের সন্নিকটস্থ সীতাকুন্ড ও মীরেসরাই এলাকায় কয়েক হাজার বাঙ্গালীকে হত্যা করে।

যদিও এই দলের সহিত সংশ্লিষ্ট কোন বাঙ্গালী সহযোগীর সন্ধান এখনও পাওয়া যায় নাই, তবুও সন্দেহ করা হইতেছে যে, অধুনালুপ্ত জামাতে ইসলামীর কিছু সংখ্যক বাঙ্গালী রেল কর্মচারী এই বাহিনীর সহিত জড়িত ছিল। এই দালালদের প্রধান কাজ ছিল সম্ভাব্য শিকার সম্পর্কিত তথ্য সরবরাহ করা।

এই পর্যন্ত প্রাপ্ত আধা সামরিক বাহিনীর যে তালিকা পাওয়া যায় তার মধ্যে আলবদর, আলশামস, রাজাকার, ইফকাপ- এর নাম সুপরিচিত হইলেও পাইওনিয়ার ফোর্স নামক নরঘাতক দলটির নাম নূতনভাবে উদঘাটিত হইয়াছে।

১৯৭২ সালে দৈনিক অবজারভার পত্রিকাতেও “পাইওনিয়ার ফোর্স কিল্ড ১৪০০” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।যেখানে সিভিল পাইওনিয়ার ফোর্সের নরকীয় হত্যাযজ্ঞের কথা তুলে ধরা হয়।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/shuvo-291/28523.html