জন কার্টার-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

গেরিলা যোদ্ধা; আমাদের মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা যোদ্ধাদের অবদান……..

লিখেছেন: জন কার্টার

”দিন তোমাদের, রাত আমাদের/ রৌদ্র তোমাদের, বৃষ্টি আমাদের/ শহর তোমাদের,গ্রাম আমাদের।”

গেরিলাদের কার্যপরিধি ঠিক এভাবেই ব্যাখ্যা করেছিলেন ইতিহাসের বিখ্যাত গেরিলা নেতা মাও সে তুং।

গেরিলা একটি স্প্যানিশ শব্দ।যার অর্থ হল খুদে যোদ্ধা।গেরিলা শব্দটি মূলত দলছুট বা একক যোদ্ধার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হলেও কখনো কখনো গেরিলারা ছোট ছোট দল গড়ে তোলে।আবার কখনো কখনো গেরিলারা বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়েও শত্রুপক্ষের প্রশিক্ষিত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

গেরিলারা হল সেসব বেসামরিক যোদ্ধা যারা ভূমি ও ভৌগলিক সুবিধা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের উপর প্রভাব বিস্তার করে।এদের যুদ্ধ পদ্ধতি হয় অনেকটা ”হিট এন্ড রান” পদ্ধতিতে।গেরিলারা মূলত বিচ্ছিন্ন ভাবে শত্রুপক্ষের উপর আক্রমন পরিচালনা করে, এবং সহজেই শত্রুপক্ষকে বিপর্যস্ত করে তোলে।

গেরিলা যুদ্ধ বা যোদ্ধাদের বিকাশ ঘটেছিল মূলত নেপোলিয়নের সময়ে।এবং এর পরবর্তীতে সময়ে প্রায় প্রত্যেকটি যুদ্ধেই গেরিলা যোদ্ধাদের ছিল সরব উপস্থিতি।
এরই পরিক্রমাই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও গেরিলাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত।এবং মুক্তিযুদ্ধে এসকল গেরিলা যোদ্ধাদের সফলতাও ছিল রীতিমত কিংবদন্তিতুল্য।

……আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারী গেরিলা যোদ্ধাদের দ্বারা পরিচালিত প্রত্যেকটি অপারেশন প্রায় নির্ভুলভাবে সম্পূর্ন হয়েছিল এবং এসকল অপারেশনের সফলতাও ছিল প্রায় ১০০ ভাগ।

এপ্রসঙ্গে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক বলেন,

গেরিলা যোদ্ধারা এ যুদ্ধে রক্ত সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেছে।

যুদ্ধে সাধারণ গেরিলা যোদ্ধারা মূল ভূমিকা পালন করেছিলো। তারা অংশগ্রহণ না করলে এ যুদ্ধে বিজয় অর্জন সম্ভব হতোনা।

বাঙালীর মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা যোদ্ধাদের অবদান প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ৪ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল সি আর দত্ত বীরোত্তম বলেন,

গেরিলা যোদ্ধারা দেশকে শত্র“মুক্ত করার জন্য ‘জয়বাংলা’ শ্লোগানকে বুকে ধারণ এবং নিজের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিলো।

মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু হিসেবে সম্মাননা নিতে ঢাকায় আসা ভারতের সাবেক সেনানায়ক জ্যাকব একাত্তরের স্মৃতিচারণকালে গেরিলা যোদ্ধাদের প্রসঙ্গে বলেন,

‘এঁরা তাঁরাই যারা প্রতিরোধ গড়েছিলো . . . মুক্তি ফৌজ (গেরিলা যোদ্ধা) গড়ে তুলেছিলো . . . ভারতীয় সেনাবাহিনী যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলো’

এপ্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘আমি অবশ্যই বলতে চাই যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ছিলো সুপ্রশিক্ষিত, আধুনিক অস্ত্রে সুসজ্জিত . . . তাদেরকে পরাজিত করা ছিলো খুবই দূরুহ। কিন্তু মুক্তি ফৌজ(গেরিলা যোদ্ধা) তাদের ওপর আক্রমণ করে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলো যে তারা চলাফেরা করতে ভয় পেত. . . এই পরিস্থিতির কারণেই পাকিস্তান পরাজিত হয়েছিলো’।

পূর্ব পাকিস্তানে পরাজিত পাকিস্তান সেনা বাহিনীর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজী গেরিলা যোদ্ধাদের ‘মুক্তিযোদ্ধা” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তার বইতে ‘মুক্তি বাহিনী’ নামে একটি অধ্যায়ও লিখেন।
এবং গেরিলাদের আক্রমন সম্পর্কে তিনি বলেন,

এক পর্যায়ে তাঁর বাহিনী মুক্তি বাহিনীর(গেরিলা যোদ্ধা) আক্রমণের ভয়ে ব্যারাক অথবা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরুতে পারছিলো না।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনা প্রধান মুক্তিযুদ্ধের ৩ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ বলেন,


গেরিলা বাহিনী ছিলো যুদ্ধের প্রাণ। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের এমনভাবে প্রতিহত ও পরাস্ত করে যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তখন পালাতে পারলে বাঁচে।

তিনি আরও বলেন,

গেরিলা যোদ্ধারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ না করলে এবং যুদ্ধে অংশ না নিলে এ বিজয় সম্ভব হতো না।

গেরিলা যোদ্ধাদের ভূমিকা সম্পর্কে ১ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব:) রফিকুল ইসলাম বীরোত্তম বলেন,

বাঙালীর স্বাধীনতার যুদ্ধ কোন সামরিক অভিযান নয়, এ যুদ্ধ জনগণের যুদ্ধ। জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতীত কোনো স্বাধীনতা সংগ্রাম হতে পারেনা, চূড়ান্ত যুদ্ধে বিজয় অর্জন সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, এই যুদ্ধের মূল শক্তি ছিলো ছাত্র-শিক্ষকসহ সাধারণ মানুষ। অনেকে অনেক ভালো যুদ্ধ করেছেন। তারা অনেক ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর চেয়েও সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। এদেশের মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা যোদ্ধাদের অবদান অনেক অনেক বেশি। এরকম শত শত গেরিলা যোদ্ধা আছেন যাদের আত্মত্যাগ এই বিজয় অর্জনকে মহিমান্বিত করেছে।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/shuvo-291/28340.html