দাদু ভাই-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

যে ছবি আঁকতে চেয়েছি মনের গহিনে পর্ব-০২

লিখেছেন: দাদু ভাই

দুই ভাই চার বোন ও বাবাকে রেখে মা চলে গেলেন। মা চলে যাবার পূর্বেই বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। ভাই আমার থেকে পনর বছরের বড়। অবশিষ্ট্য দুই বোনের মধ্যে বড় জন বয়সে আমার থেকে চার বছরের বড় এবং ছোট বোনটির বয়স মাত্র তিন মাস। মনে পড়ে এক বিকেলে মা আমার সেই ছোট্ট বোনটিকে কোলে নিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং আমি তার ঝুলন্ত একটি পা আমার মাথায় লাগিয়ে ছিলাম। তখন মা আমাকে বলেছিলেন কাহারো পা মাথায় লাগাবে না। মায়ের সেই বাণী এখনো আমার মনে আছে। ছোট বোনটিকে নিয়ে সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন যে এই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কী করে বাবা লালন-পালন করবেন? মা মারা যাওয়ার কিছুদিন পূর্বে আমাদের পাড়ার এক মহিলার দুগ্ধপোষ্য একটি বাচ্চা মারা গিয়েছিল তাই তার স্তনে তখনো দুধ আছে। সে জন্য সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই মহিলার নিকট আমার টুকটুকে বোনটিকে দিলো দুগ্ধ পানের জন্য। বাবা প্রায় প্রতিদিন সকালে যেয়ে সেই বোনের কাঁথা কাপড় ধুয়ে দিয়ে আসতেন। কথা ছিল দুগ্ধ ত্যাগের পর বোনকে ফিরিয়ে আনা হবে। যাহা আমি আরো বড় হয়ে জানতে পেরেছি। কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, সে বোনটি আমার দুগ্ধ ত্যাগের পূর্বেই এই সবুজ শ্যামল আলো ঝলমলে পৃথিবীর আলো-বাতাস ত্যাগ করে মায়ের ঠিকানায় চলে গেল। তাকেও মায়ের পাশেই শুইয়ে দেয়া হলো মাটির নিচে। আর এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর নির্মমতার স্বাদ গ্রহনার্থে থেকে যাই আমরা চার জন। বাবা, বড় ভাই, তিন নম্বর বোন আর আমি, আজকের দাদু ভাই। মা আমদেরকে ছেড়ে যাবার পূর্বেই আমাদের জমাজমি, বসত-ভিটা সর্বনাশা নদী গিলে খেয়ে তার আকৃতি বাড়িয়ে আরো শক্তিবান হয়ে তার কড়াল গ্রাস ও আগ্রাসী ভুমিকায় বাড়িয়ে চলল। আর এই পৃথিবীর মানুষেরা খোলা আকাশের নিচে জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে লাগল। বাবার ব্যবসায়ের পুঁজি দিয়ে একখন্ড জমি কিনে নতুন বসত-ভিটা তৈরী করলেন। আমাদের এই পাড়ার সবাই নদী ভাঙ্গা জীবন সংগ্রামী। তাই সকলের অবস্থা একই রকম। বাবার পুঁজিতে ভাটা পড়ায় গঞ্জের ব্যবসায় বন্ধ করে হাটে হাটে টুকিটাকি করে সংসার চালাচ্ছিলেন। পাড়ার সকলেই উপলব্ধি করলেন আমাদের ভাই-বোন দু’জনের প্রতিপালনের জন্য একজন মহিলা প্রয়োজন। তাই সকলে মিলে পাড়ার এক বিধবা মহিলাকে ঠিক করলেন বাবার সাথে বিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু বাবা কোন প্রকারেই রাজী হলেন না। সবাই বললেন, একজন মেয়ে মানুষ ছাড়া এত ছোট দু’টি বাচ্চাকে আপনি প্রতিপালন করতে পারবেন না। ওরা মরে যাবে। আপনি বাঁচাতে পারবেন না। বাবা বললেন, যদি তাদের হায়াৎ না থাকে, মৃত্যুই যদি তাদের ভাগ্যলিপিতে থেকে থাকে, তাহলে আমার বুকেই মরবে এবং নিজ হাতে তাদের মায়ের পাশে শুইয়ে দিব আমার ছোট্ট মেয়ের ন্যায়। তবু আমার সন্তানদেরকে সৎ মা দ্বারা কষ্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখব না। এই বলে বাবা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং আমাদের জন্য তার জীবন উৎসর্গ করে দিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন এই পৃথিবীতে। সত্যিই আমার বাবা ছিলেন একজন বড় মাপের মানুষ। যার হৃদয়ে ছিল সন্তানের জন্য অকৃত্রিম ভালবাসা ও দায়িত্বশীলতা। যা তিনি তার জীবদ্দশায় শতভাগই নিষ্ঠার সাথে পালন করে গেছেন। তাই বাবা’ই আমার আদর্শ। বড় ভাই চতুর্থ শ্রেনির পর লেখাপড়ায় ইস্তফা দিয়ে কিছুদিন ধিতাং ধিতাং করে একটু বড় হওয়ার পর কখন কোথায় থাকেন, কী করেন তা বলা খুব মুস্কিল ছিল। এমতাবস্তায় মা আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় আমাদের ভাই-বোন দু’জনের দেখ-ভালের জন্য বাড়িতে থেকে বাবার সর্বশেষ পুঁজিও অল্প দিনের মধ্যেই শূণ্যের কোঠায় পৌঁছে গেল। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের ভরণ-পোষনের দায়িত্ব পালন করার জন্য বাবা দিনমজুরে পরিণত হলেন। সাড়া দিন মাঠে কাজ শেষে রাতে আমাদেরকে বুকে নিয়ে ঘুমাতেন। আর হয়ত মায়ের কথা স্মরণ করে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিতেন। কিন্তু আমাদের বয়সের কারণেই তা খেয়াল করি নাই বা বুঝতে পারি নাই। বাবা প্রতিদিন পান্তা খাইয়ে রেখে চলে যেতেন এবং দুপুর বেলা এসে রান্না করে খাইয়ে আবার চলে যেতেন। সন্ধায় এসে আবার রান্না করে খাইয়ে আমাদের দু’জনকে দু’দিকে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। এভাবেই চলল আমাদেরকে নিয়ে বাবার অন্তহীন জীবন। একদিন বাবা সকালে বেড়িয়ে গেলেন কিন্তু কেন যেন দুপুরে ফিরলেন না। এদিকে আমরা ক্ষুদায় কাতর। ঘড়ে ডাল-চাল থাকলেও রান্না করার কেউ না থাকাতে না খেয়েই আছি। আমার কান্না সহ্য করতে না পেরে বুবু কিছু ডাল নিয়ে পানি দিয়ে চুলায় বসিয়ে কোন রকমে শেদ্ধ করে আমাকে খেতে দিয়েছিলেন। বাবা বাড়ি ফিরে রাতে সেকথা শুনে কী দীর্ঘ-শ্বাস ফেলেছিলেন, না নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছিলেন তা আমার মনে নেই। আজ শুধু অনুভব করি নিশ্চয়ই বাবা তার প্রিয়তমাকে স্মরণ করে নিরবে নিভৃতে কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছিলেন। মনে পড়ে বাবা প্রতিদিন ভোরে, সূর্য উঠার পূর্বে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে কেঁদে কেঁদে দু’গাল নোনা-জলে ভাষিয়ে সকলের জন্য দোয়া করতেন। যে ছবি আঁকতে চেয়েছি মনের গহিনে-এর নাম পরিবর্তন করে “আত্ম-কথন” নাম করণ করলাম দুই ভাই চার বোন ও বাবাকে রেখে মা চলে গেলেন। মা চলে যাবার পূর্বেই বড় দুই বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। ভাই আমার থেকে পনর বছরের বড়। অবশিষ্ট্য দুই বোনের মধ্যে বড় জন বয়সে আমার থেকে চার বছরের বড় এবং ছোট বোনটির বয়স মাত্র তিন মাস। মনে পড়ে এক বিকেলে মা আমার সেই ছোট্ট বোনটিকে কোলে নিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং আমি তার ঝুলন্ত একটি পা আমার মাথায় লাগিয়ে ছিলাম। তখন মা আমাকে বলেছিলেন কাহারো পা মাথায় লাগাবে না। মায়ের সেই বাণী এখনো আমার মনে আছে। ছোট বোনটিকে নিয়ে সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন যে এই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে কী করে বাবা লালন-পালন করবেন? মা মারা যাওয়ার কিছুদিন পূর্বে আমাদের পাড়ার এক মহিলার দুগ্ধপোষ্য একটি বাচ্চা মারা গিয়েছিল তাই তার স্তনে তখনো দুধ আছে। সে জন্য সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই মহিলার নিকট আমার টুকটুকে বোনটিকে দিলো দুগ্ধ পানের জন্য। বাবা প্রায় প্রতিদিন সকালে যেয়ে সেই বোনের কাঁথা কাপড় ধুয়ে দিয়ে আসতেন। কথা ছিল দুগ্ধ ত্যাগের পর বোনকে ফিরিয়ে আনা হবে। যাহা আমি আরো বড় হয়ে জানতে পেরেছি। কিন্তু নিয়তির কি নির্মম পরিহাস, সে বোনটি আমার দুগ্ধ ত্যাগের পূর্বেই এই সবুজ শ্যামল আলো ঝলমলে পৃথিবীর আলো-বাতাস ত্যাগ করে মায়ের ঠিকানায় চলে গেল। তাকেও মায়ের পাশেই শুইয়ে দেয়া হলো মাটির নিচে। আর এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর নির্মমতার স্বাদ গ্রহনার্থে থেকে যাই আমরা চার জন। বাবা, বড় ভাই, তিন নম্বর বোন আর আমি, আজকের দাদু ভাই। মা আমদেরকে ছেড়ে যাবার পূর্বেই আমাদের জমাজমি, বসত-ভিটা সর্বনাশা নদী গিলে খেয়ে তার আকৃতি বাড়িয়ে আরো শক্তিবান হয়ে তার কড়াল গ্রাস ও আগ্রাসী ভুমিকায় বাড়িয়ে চলল। আর এই পৃথিবীর মানুষেরা খোলা আকাশের নিচে জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে লাগল। বাবার ব্যবসায়ের পুঁজি দিয়ে একখন্ড জমি কিনে নতুন বসত-ভিটা তৈরী করলেন। আমাদের এই পাড়ার সবাই নদী ভাঙ্গা জীবন সংগ্রামী। তাই সকলের অবস্থা একই রকম। বাবার পুঁজিতে ভাটা পড়ায় গঞ্জের ব্যবসায় বন্ধ করে হাটে হাটে টুকিটাকি করে সংসার চালাচ্ছিলেন। পাড়ার সকলেই উপলব্ধি করলেন আমাদের ভাই-বোন দু’জনের প্রতিপালনের জন্য একজন মহিলা প্রয়োজন। তাই সকলে মিলে পাড়ার এক বিধবা মহিলাকে ঠিক করলেন বাবার সাথে বিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু বাবা কোন প্রকারেই রাজী হলেন না। সবাই বললেন, একজন মেয়ে মানুষ ছাড়া এত ছোট দু’টি বাচ্চাকে আপনি প্রতিপালন করতে পারবেন না। ওরা মরে যাবে। আপনি বাঁচাতে পারবেন না। বাবা বললেন, যদি তাদের হায়াৎ না থাকে, মৃত্যুই যদি তাদের ভাগ্যলিপিতে থেকে থাকে, তাহলে আমার বুকেই মরবে এবং নিজ হাতে তাদের মায়ের পাশে শুইয়ে দিব আমার ছোট্ট মেয়ের ন্যায়। তবু আমার সন্তানদেরকে সৎ মা দ্বারা কষ্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখব না। এই বলে বাবা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং আমাদের জন্য তার জীবন উৎসর্গ করে দিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন এই পৃথিবীতে। সত্যিই আমার বাবা ছিলেন একজন বড় মাপের মানুষ। যার হৃদয়ে ছিল সন্তানের জন্য অকৃত্রিম ভালবাসা ও দায়িত্বশীলতা। যা তিনি তার জীবদ্দশায় শতভাগই নিষ্ঠার সাথে পালন করে গেছেন। তাই বাবা’ই আমার আদর্শ। বড় ভাই চতুর্থ শ্রেনির পর লেখাপড়ায় ইস্তফা দিয়ে কিছুদিন ধিতাং ধিতাং করে একটু বড় হওয়ার পর কখন কোথায় থাকেন, কী করেন তা বলা খুব মুস্কিল ছিল। এমতাবস্তায় মা আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় আমাদের ভাই-বোন দু’জনের দেখ-ভালের জন্য বাড়িতে থেকে বাবার সর্বশেষ পুঁজিও অল্প দিনের মধ্যেই শূণ্যের কোঠায় পৌঁছে গেল। তাই বাধ্য হয়ে আমাদের ভরণ-পোষনের দায়িত্ব পালন করার জন্য বাবা দিনমজুরে পরিণত হলেন। সাড়া দিন মাঠে কাজ শেষে রাতে আমাদেরকে বুকে নিয়ে ঘুমাতেন। আর হয়ত মায়ের কথা স্মরণ করে নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিতেন। কিন্তু আমাদের বয়সের কারণেই তা খেয়াল করি নাই বা বুঝতে পারি নাই। বাবা প্রতিদিন পান্তা খাইয়ে রেখে চলে যেতেন এবং দুপুর বেলা এসে রান্না করে খাইয়ে আবার চলে যেতেন। সন্ধায় এসে আবার রান্না করে খাইয়ে আমাদের দু’জনকে দু’দিকে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতেন। এভাবেই চলল আমাদেরকে নিয়ে বাবার অন্তহীন জীবন। একদিন বাবা সকালে বেড়িয়ে গেলেন কিন্তু কেন যেন দুপুরে ফিরলেন না। এদিকে আমরা ক্ষুদায় কাতর। ঘড়ে ডাল-চাল থাকলেও রান্না করার কেউ না থাকাতে না খেয়েই আছি। আমার কান্না সহ্য করতে না পেরে বুবু কিছু ডাল নিয়ে পানি দিয়ে চুলায় বসিয়ে কোন রকমে শেদ্ধ করে আমাকে খেতে দিয়েছিলেন। বাবা বাড়ি ফিরে রাতে সেকথা শুনে কী দীর্ঘ-শ্বাস ফেলেছিলেন, না নিরবে অশ্রু বিসর্জন দিয়েছিলেন তা আমার মনে নেই। আজ শুধু অনুভব করি নিশ্চয়ই বাবা তার প্রিয়তমাকে স্মরণ করে নিরবে নিভৃতে কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছিলেন। মনে পড়ে বাবা প্রতিদিন ভোরে, সূর্য উঠার পূর্বে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে কেঁদে কেঁদে দু’গাল নোনা-জলে ভাষিয়ে সকলের জন্য দোয়া করতেন।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/shams/25820.html



মন্তব্য করুন