সাজেদুর-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

আমাদের সচেতনতা(!) ও কিছু ক্ষোভ

লিখেছেন: সাজেদুর

// লিখতে গিয়ে চিন্তায় প্যাঁচ লেগে যায়; কোন বিষয় নিয়ে লিখবো? সবকিছুতেই তো অনিয়ম। তাই আজ বেশ কিছু বিষয়কে একসাথে মিলিয়ে ক্ষোভের চুড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে লিখছি। কিছু কিছু অপ-শব্দ হয়তো চলে আসতে পারে, এর জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। //

 

সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান হয়ে যায় অতীত, আর ভবিষ্যত ধীরে ধীরে হয় বর্তমান। আমরা মানুষ, তাই সময়ের প্রবাহে বর্তমানকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি, থাকতে হয়। কিন্তু আমরা কি এতটাই নির্বোধ যে বিগত কয়েক মাসের ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক কিছু ঘটনাও মনে রাখতে পারিনা?

 

সাভার ট্রাজিডিঃ হ্যা, সাভারে ঘটে যাওয়া সে মর্মান্তিক আর্তনাত আমরা মনে রেখেছি। কিন্তু এর সাথে সম্পৃক্ত অপরাধ ও অপরাধীর কোন খবর আজ আর চোখে পরেনা এমনকি সেই “রানা”-র খবরও না। নিহতদের পরিবারের ক্ষতিপুরন শুধু খবরের কাগজের কিছু বাক্যালাপ হয়তো। ক্ষমতাসিনরা সব সময় দূর্বলের উপর অত্যাচার করবে, এটাই যুগ যুগ ধরে চলে এসেছে এবং এটাই হয়তো চলবে। আমরা কিছুদিন গলা ফাটাবো তারপর আবার চুপ মেরে যাব। এটাইতো হয়ে আসছে তাই না? রেশমা কাহিনী নিয়ে মিডিয়ায় তোলপাড়, ওদিকে অপরাধী ও ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে ভাববার সময় নেই!! আমরা শুধু প্রবাহিত হতে থাকবো আর কিছু অপকর্ম চাপা পড়বে কালের চাকায়।

 

গণজাগরণঃ অনেক আশা ও আবেগ নিয়ে ফেটে পরেছিলাম। হ্যা, পরেছিলাম বলছি, কারণ এতোটাই আশাহত হয়েছি যে সেটা প্রকাশ করার ভাষা নেই। রাজনীতি আমাদের আবেগকে নিজেদের ঢাল বানাতে গণজাগরণ মঞ্চকে ব্যবহার করেছে মাত্র, এ বিষয়ে কি কারে কোন দ্বিমত আছে? কি সুন্দর, কি সুক্ষ গেম খেলে আমাদের আশাহত করলো; মাঝখানে সব দোষ গিয়ে পড়লো গণজাগরণ মঞ্চের। সেই সময় থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত বাসে, রাস্তায়, চায়ের দোকানে মানুষের বিতৃষ্না-ই শুধু শুনেছি। সাধারন মানুষকে নিয়েই তো স্বপ্ন দেখেছিলাম, কিন্তু যখন এইসব সাধারণ মানুষেরাই গণজাগরণকে ঘৃণা করছে তখন কি গণজাগরণ-এর ভিত দূর্বল হয়নি? প্রশ্নবিদ্ধ হবার আগেই কি একবার ভাবা উচিত ছিলো না যে সাধারণ মানুষেরা উরো কথায় বিশ্বাস করে বেশি। কতজনই বা জানে অন্তর্নিহিত চেতরার প্রবাহ? আর “ইমরান-এইচ-সরকার” কে ফেসবুকে কিভাবে পঁচানো হয়েছে, হচ্ছে তা তো দেখেছি। গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র হলেও তিনি সবার আগে একজন মানুষ, একজন নাগরিক। আমি উপলব্ধি করি একদিকে সরকারের চাপ অন্যদিকে হেফাজতের চাপ- এসবকিছুর মাঝে পরে উনার স্বাভাবিক জীবন কি সঙ্কটে ছিলনা? তবুও আবাল কিছু মানুষ তাকে গালি দেয়। আমি নিজে মনে করি উনার কিছু দুরদর্শিতা থাকা উচিত ছিলো এবং রাজনীতির প্যাচে পরে নিজের ইমেজ যে নষ্ট হবে সেটাও বোঝা উচিত ছিলনা কি? সরকার যে শুধু গণজাগরণ মঞ্চকে ব্যবহার করেছে তা সুস্পশ্ট। তবুও আশা রাখি নতুন সূর্যের।

 

সাংসদ রনিঃ কিছুদিন আগেই আমরা সবাই হয়তো সংবাদ জেনেছি সাংসদ রনি-র খবরাখবর। আমি বার বার নিজেকে প্রশ্ন করি এটাও কি সাজানো খেলা (এর উত্তর আশা করি) ? আর যদি খেলা না হয়ে থাকে তবে সরকারের বলা কথাগুলো কি কাকের গায়ে ময়ূরের পালক লাগানোর মত না? সরকার মিডিয়াবান্ধব এটা প্রমাণ করার জন্যই যদি রনির বিরুদ্ধে ব্যবস্হা গ্রহন করেন তবে আজ ৫৩৫ তম দিনেও সাগর-রুনির হত্যা একটা রহস্য-ই রয়ে গেলো? ব্যপারটা একটু খটকা কি দেয়না! এইরুপ অনেক অনেক অপরাধ, দুর্নীতি আমাদের চোখের সামনে বুক ফুলিয়ে করা হচ্ছে কিন্তু আমরা নির্বাক শ্রোতা ও দর্শক মাত্র। আজ ব্লগারদের জেলে পুরে দেওয়া হচ্ছে সঙ্গত কোন কারণ ছাড়াই। সত্য সহ্য করার ক্ষমতা যদি ক্ষমতাসিনদের না থাকে তবে ক্ষমতার দাপটে আর কতকাল মুখে কুলূপ এটে রাখবে? আমরা আমাদের জনজীবনের কথাও প্রকাশ করতে পারবো না? পারবোনা নিজেদের মতাতম প্রকাশ করতে!! এটা মগের মুল্লুক না এটা বাংলাদেশ, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন দেশ।

 

যোগাযোগ ব্যবস্হাঃ চলছে ঈদের আমেজ ও ঘরে ফেরার ঢল। যখনই ঈদ আসে নিজেকে উদ্বাস্তু মনে হয়, কারণ আমাকেও ফিরতে হয়। জীবন ও জীবিকার তাগিদে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যায় ঢাকা শহর আজ বসবাসের উপযোগীতা হারিয়েছে। যাই হোক, জনসংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহন ও যানজট। আমি নিজেকে দিয়েই উদাহরণ দেব কারণ আমিও একজন সাধারণ নাগরিক এবং ভুক্তভুগি। প্রত্যেকদিন ৪/৫ ঘন্টা সময় নষ্ট হয় শুধু মাত্র পথে, অফিস যাওয়া-আসায়। এভাবে মাসের ও বছরের হিসাব করলে যে সময়টা নষ্ট হচ্ছে তা কে ফিরিয়ে দেবে? প্রতিদিন বি-আর-টি-এ ২০টি-র মত যানের লাইসেন্স প্রদান করে কিন্তু আমাদের চলাচলের রাস্তা কি প্রতিদিন ২০ ইঞ্চিও বাড়ছে?? তবে এমনটি কেন এবং কোন যুক্তিতে তা বোঝবার জ্ঞান এই ক্ষুদ্র মস্তিস্কে নেই।

এবার আসি রেলপথে। আমার নিজের একটা বাস্তব অভিজ্ঞতা সেয়ার করছি। আমি রেলপথে খুব একটা অভ্যস্ত নই। তবুও বন্ধুর আবদারে গত মে মাসে চট্ট্রগ্রাম গিয়েছিলাম ট্রেন-এ। শোভন এর টিকিট যে ১০ দিন আগে কাটতে হয় তা জানা ছিলনা, এমনকি অনলাইনেও কোন টিকিট পেলাম না। তবুও ক্ষিণ আশা নিয়ে গেলাম কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। অনেক ঘোরাঘুরির পর ফেরার পথ নিলাম। ভাগ্য ভাল না মন্দ তা জানিনা একজন মধ্যবয়সি লোকের সাথে হঠাৎ কথা হলো। হ্যা, উনি একজন দালাল (যদিও দালাল শব্দটা লিখতে ইচ্ছে করছেনা, কিন্তু এই মুহুর্তে এর প্রতিশব্দ মনে আসছে না); উনারা কেমন করে যেন টের পেয়ে যায় কার প্রয়োজন কতটুকু!!! যাই হোক, দ্বিগুনেরও বেশী ‍দামে টিকিট নিতে হলো।

আমার কথা হলো-এই টিকিটগুলো ভি-আই-পি নামে বুকিং হয় এবং প্রয়োজন বুঝে চড়া দামে বিক্রি হয়। আমাদের রেলমন্ত্রীর কাছে প্রশ্নঃ রেলওয়ে খাতে উন্নতির নেপথ্যে কি আমাদের কষ্টের জল করা অর্থ? সেবার নামে কি আমাদের শোষন করা হচ্ছে না? আমি চোখ বন্ধ করে বলতে পারবো রেলওয়ের অভ্যন্তরীন কিছু ব্যক্তি এর সাথে অতোপ্রতোভাবে জরিত। কারণ যে টিকিটটি আমার হাতে দেওয়া হয়েছিল তাতে টিকিট ক্রয়ের তারিখটা অগ্রীম হলেও কাগজটি ছিলো সদ্য প্রিন্ট করা। সাধারণ দিনে যদি দ্বিগুন অর্থ লাগে তবে এই ঈদ-এ না জানি কি পরিমান দুর্নীতি হচ্ছে!!! আর বাড়ছে আমাদের দুর্ভোগ।

এবার আসি ফুটপাতে। ফুটপাত পথচারিদের জন্য নাকি ক্ষমতাবানদের ব্যবসায়িক ইজারা-র জন্য তা ভাবতে হচ্ছে। হাটবার পথটুকু যদি দখল দুঃখিত বেদখল হয়ে থাকে তবে কি আমরা উড়ে উড়ে পথ চলবো? শহরের এমন কোন ফুটপাত নেই যা দিয়ে নিশ্চিন্ত হাটা-চলা করা যায়। যেসব হকারেরা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছে তারা মাসিক চাঁদা দেয় তখাকথিক ক্ষমাতাবানদের চামচাদের। যত কথাই বলিনা কেন প্রতক্ষভাবে হোক আর পরোক্ষভাবেই হোক ভোগান্তি তো আমাদেরই।

 

সামাজিকতাঃ সামাজিকতা বলতে যে আজ কি বোঝায় তা বুঝতেও ঘাম ঝড়াতে হয়। মানুষ –> সমাজ –> নিয়মকানুন (আইন) –> রাজনীতি। এ সবকিছুই একে অপরের সাথে জড়িত। কিন্তু আজ সামাজিক বৈষম্য এত এত বেশী যে ভাবা যায়না। রাস্তার ধারে কেউ না খেয়ে ঘুমায় আবার কেউ লাখ টাকার খাবার নষ্ট করে। কিন্তু আমরা নিজেদের সামাজিক জীব বলে গলা ফাটাই। এই বৈষম্য কি আমাদের চোখে পরেনা? ঈদের কেনাকাটায় শপিং মলগুলোতে উপচে পড়া ভীড় আর ওদিকে ষ্টেশনে, ফুটপাতে, গাছতলায় অনেকে অর্ধনগ্ন দিন পার করছে। মাথার উপর ছাদ আছে, দুবেলা খাবার যোগান আছে আমার হয়তো চিন্তা নেই কিন্তু পথের মানুষগুলো!! ঝড়, বৃষ্টি, রোদে কষ্ট পাওয়া মানুষগুলোর সব ক্ষোভ যেন উপরওয়ালার উপর। এ সমাজে তারা উপেক্ষিত, অবাঞ্চিত। আমাদের শুশিল সমাজ অনেক বানী দেন, টক ঝাল মিষ্ট শোতে কথার খই ফোটান কিন্তু এসব মানুষে পাশে দাড়ানোর মত সময় ও ইচ্ছা তাদের কথায়? মাঝে মাঝে মনে হয় এ সমাজ আমার জন্য না অথবা আমিই এ সমাজের নই। দিন বদলের চেষ্টা প্রতিনিয়ত সবাই করছি কিন্তু সেটা শুধুর নিজের জন্য, সামগ্র সমাজ ব্যবস্হার পরিবর্তন আশা করা কি দুশনিয়? ভাবনাগুলো খুব বেশী পিড়া দেয়।

আজ মানুষের পরিচয় তার অর্থে তার চাকচিক্যে, কিন্তু এটাই কি হওয়া উচিত ছিলো? আমরা কি শেখাচ্ছি আমাদের সন্তানদের, অনুজদের? বৈষম্য দুর করার চিন্তাতাকে বিষ্ফরিত না করলে-তো সমাজ বিভক্ত হতে হতে এক পর্যায়ে জাতি-ও বিভাজিত হবে। তারপর আবার আমরা ফিরে যাব সেই বর্বর যুগে যেখানে দাশ প্রথা প্রচলিত ছিলো! হ্যা, এমনই হবে না? আজ ব্যবসা তথা অর্থনীতি কিছু ব্যক্তির হাতে চলে গিয়েছে, তারাই কলকাঠি নাড়ায় আর আমরা জেগে উঠি, ঘুমাই।

 

শেষাংশঃ জানিনা আমাদের দৈনান্দিন জীবনের সমস্যাগুলো সমাধান পাবে কি পাবেনা, আমরা সচেতন হবো কি হবোনা। স্বপ্ন দেখি খুব বেশী তাই আশাবাদী হই আবার ভেঙ্গেও পরি। একটা সুন্দর সুষ্ঠ দেশ আশা করা নিশ্চই অমুলক না। স্কুলে পড়াকালিন সময়ে ভাসানী স্যারের একটা ছবি দেখেছিলাম, উনি চুলার পাশে বসে রান্না করছেন। সেই থেকে নিজের কাজগুলো নিজেই করতাম এবং নিজেকে গড়েছি নিজের মত করে। শরীরে বল খুব একটা নেই হয়তো কিন্তু বুকে সাহসের কমতি নেই একবিন্দু। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে দেখলে গা জ্বলে। আগ্নীগিরি কিন্তু একদিনে ফেটে পরেনা-জ্বলতে জ্বলতে শেষে ফেটে পড়ে আগুনের ঝড় নিয়ে। আমি নিজেকে প্রকাশ করতে সাচ্ছন্দবোধ করিনা কিন্তু আজ আমি বেপরোয়া। মৃত্যু ভয় ভীত করেনা। বার বার একটা কথা মস্তিস্কে প্রতিধ্বনিত হয় “পিশাচকে দমন করতে হলে পিশাচ হতে হয়”।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/shajadur/19857.html



মন্তব্য করুন