ডার্ক ম্যান-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর -; দ্বিতীয় পর্ব

লিখেছেন: ডার্ক ম্যান

সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। এই দলের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব। তিনি পাকিস্তানের নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারেন কীভাবে। এই সম্পর্কে গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে-

প্রথম দফা তিনি চরম প্রতিবন্ধকতায় পড়বেন। কারণ এ পর্যন্ত মুজিবের যত প্রচারণা তা হলো পশ্চিম পাকিস্তানের কতৃত্বের বিরুদ্ধে। আর তিনি যদি কিছু নমনীয় হয়ে কিছুটা আপসরফা করতে চান তখন তিনি নিজের অনুগত দলীয় জঙ্গি কর্মী বাহিনীর রোষের শিকার হবেন।

এই গোপন প্রতিবেদনে শেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে যে, শেখ মুজিব ছয় দফা ও বাংলাদেশ এই দুই সিদ্ধান্তের সীমাবদ্ধ কারাগারে বন্দি হয়ে থাকতে বাধ্য হবেন। বাঙালি জনগণের সঙ্গে সম্পর্কচ্যুত হয়ে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন এটা কল্পনা করা কঠিন। হয়তো তিনি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের নেতা হিসেবে নিজেকে আত্মপ্রকাশ দিকে ঝুঁকতে পারেন এবং ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনী ফলাফল সেই সম্ভাবনাটা বাড়িয়ে দিয়েছে। ২৯ জানুয়ারি ১৯৭১ সালের গোপন ফাইল (ঢাকাস্থ মার্কিন কনস্যুলেট থেকে প্রেরিত) আওয়ামী লীগ সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য আছে।

এতে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সকল স্তরের জনগণের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। গরিব, কৃষক, জঙ্গি ছাত্র, শ্রমিক শ্রেণী, মধ্যবিত্ত, ধনী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, শিল্পপতিরাও এই দলের সমর্থনে দলে দলে এগিয়ে আসছে। একটাই মৌলিক চেতনা তাদের সমবেত করেছে এবং সেটা হল বাঙালি জাতীয়তাবাদ। কিংবা ভিন্ন কথায় পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী মনোভাব এবং এটাই হলো আওয়ামী লীগের সর্বাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শেখ মুজিবের অসাধারণ সাংগঠনিক শক্তি এবং অসাধারণ নেতৃত্ব। এই রাজনৈতিক দলটি সংসদীয় গণতন্ত্রের কথা বলে। তবে ভবিষ্যতের জন্য পরিষ্কার এই দলের অবস্থান সামগ্রিকভাবে কোন দিকে। শেখের কর্তৃত্ববাদ এবং বিরোধী দল বলতে কোন কিছু না থাকায় দলের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। জঙ্গি ছাত্রকর্মী ও উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক সমাজ একদলীয় শাসনে দেশটিকে কোথায় নিয়ে যাবে সেটাও পর্যবেক্ষণের বিষয়। আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক দর্শন সম্পর্কে গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, দলীয় ম্যানিফেস্টোতে অগোছালো সমাজতান্ত্রিক কথাবার্তা রয়েছে, ছয় দফার বিষয় গুলতে আছে।

এই প্রসঙ্গে শেখ মুজিবের নেতৃত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, কোন বাহ্যিক উপদেশ অপেক্ষা স্ব-প্রবৃত্তিতে চলাকে তিনি উত্তম বিবেচনা করেন। এমন ধারণা দূতাবাস নাকি পেয়েছে, আওয়ামী লীগের উঁচু পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে। তবে তারা যে শেখ মুজিবকে ঘৃণা করেন, তার প্রমাণ সুস্পষ্টভাবে গোপন দলিলে উপস্থাপিত হয়েছে।

বলা হয়েছে যে,- Mujib is less a visionary than a shrewd, pragmatic, political animal.

এই গোপন প্রতিবেদনে সম্ভাব্য একটা আওয়ামী লীগের মন্ত্রীসভার উল্লেখ আছে।

মন্ত্রীসভার গঠন দেখানো হয়েছে এভাবে-

প্রধানমন্ত্রী- শেখ মুজিবুর রহমান।

প্রেসিডেন্ট- এম। ইয়াহিয়া খান।

স্পীকার- জহিরুদ্দিন আহমদ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী- ড. কামাল হোসেন।

গুরুত্বপূর্ণ- সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

অর্থমন্ত্রী বা অর্থনৈতিক পরিকল্পনা মন্ত্রী- রেহমান সোবহান। (তাঁর পরিচয় দেয়া হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী অর্থনীতিবিদ) ।

মতিউর রহমান, ঢাকা চেম্বারের প্রেসিডেন্ট বা এম। আর। সিদ্দিকী।

Goep(সরকারি) মুখ্য সচিব- ক্যাপ্টেন মনসুর আলী।

গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদ- কমরুদ্দিন আহমদ , সাবেক কূটনৈতিক ও আলমগীর রহমান ESSO জেনারেল ম্যানেজার।

এই গোপন প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ সরকারের পররাস্ট্রনীতি কি হতে পারে তেমন অনুমান করা হয়েছে। বলা হয়েছে আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রনীতির মুখ্য স্থানে আছে পাক-ভারত সু-সম্পর্ক, আওয়ামী লীগ ভারতের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের পুনরুজ্জীবন চায়। বলা হয়েছে, যদিও দলটি প্রো-ইন্ডিয়ান নয় তবুও আওয়ামী লীগের বিশ্বাস, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস স্থাপন করা গেলে দ্বিপক্ষীয় সব বিরোধের মীমাংসা অনেক সহজ হবে।

১৯৭১ সালের দুই ফেব্রুয়ারী ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাস থেকে পাঠানো রিপোর্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অ জুলফিকার আলী ভুট্টো সম্পর্কে ইয়াহিয়ার মন্তব্য আছে।

দূতাবাসের শীর্ষ কর্মকর্তারা ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এই দুই নেতা সম্পর্কে ইয়াহিয়া নিজের মন্তব্য প্রকাশ করেন।

ইয়াহিয়া এই দুই নেতার শক্তির প্রাদেশিক ভিত্তির কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন। ইয়াহিয়া বলেছেন, পশ্চিম পাকিস্তানে মুজিবের কোন সমর্থন নেই পূর্ব পাকিস্তানেও ভুট্টোর একিই অবস্থা।

ইয়াহিয়া দুই নেতাকে পাকিস্তানে দুই দলীয় শাসনের ঐকমত্য গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। এই পরামর্শ আগামী নির্বাচন পর্যন্ত। এর মধ্যে দুই নেতাই জাতীয় ভিত্তিতে(সমগ্র পাকিস্তান) তাদের রাজনৈতিক দলকে সম্প্রসারণ করার উদ্যোগ নিবেন। ইয়াহিয়া মার্কিন দুতাবাসের কর্মকর্তাদের নাকি বলেছেন, ভুট্টো আমার সব কথা বুঝেছেন। কিন্তু মুজিব আমার(ইয়াহিয়ার) ধারণা নিয়ে মৌনভাব অবলম্বন করেছেন। ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ভাল রকমের হোম-ওয়ার্ক করেছে বলে মন্তব্য করে বলেন, এই দলের ভিত্তি পাকিস্তানে খুবই মজবুত। কিন্তু ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কে মুল্যায়ন করতে গিয়ে ক্রোধের ধাপ ঢাকতে পারেন নি। ইয়াহিয়ার মূল্যায়নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- তাঁর শিক্ষা যথেষ্ট। কিন্তু ব্যাপক নয়। ১৯৪৭ সালের আগে থেকেই তিনি রাজনৈতিক আন্দোলনকারী হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন সেই ধারণা এখনো বর্তমান। তিনি তাঁর  দীর্ঘ কারাজীবনকে কৌশল হিসেবে সফল রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ গঠনের কাজে লাগিয়েছেন। আওয়ামী লীগের ছয় দফা বাঙালি জাতীয়তাবাদ নামে আঞ্চলিক মতবাদের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। মুজিব বাঙালি জাতীয়তাবাদের শিখা এমন ভাবে জ্বালিয়েছেন যে, তার নিয়ন্ত্রণে রাখা এখন যথেষ্ট কঠিন। আগামী সংসদকে যদিও মুজিব নিয়ন্ত্রণ করতে যাচ্ছেন তবে এটা বলা যাবে মুজিব ভুট্টোকে নিয়ে যথেষ্ট ভীত। ভীত এই কারণে যে মুইজব অপেক্ষা ভুট্টো বেশী সুশিক্ষিত। সরকারি বিষয়ে নিজের পারঙ্গমতায় ভুট্টো অনেক বেশি চতুর।

চলবে

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/shaikot_08/28274.html



মন্তব্য করুন