ডার্ক ম্যান-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর —(প্রথম পর্ব)

লিখেছেন: ডার্ক ম্যান

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হবার পূর্ব থেকে ভারত পাকিস্তানের দূতাবাসগুলি থেকে অতি গোপনে তথ্য সম্বলিত রিপোর্ট পাঠাতে থাকে। সেই গোপন রিপোর্ট জমা ছিল ম্যারিল্যান্ডস্থ যুক্তরাস্ট্রের জাতীয় আর্কাইভে।

পাকিস্তানের এক সাবেক সিভিল সার্ভেন্ট বিভিন্ন সময়ে পাক মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সচিব রোয়েদাদ খান ১৯৯৮ সালে যুক্তরাস্ট্রের চিকিৎসা থাকাকালীন সময়ে রিপোর্টগুলা সংগ্রহ করার সুযোগ পান। তিনি সংগ্রহ করেন ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ ও অতি গোপন দলিল।

পরে এই দলিল অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস করাচী থেকে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, সশস্ত্র সংগ্রাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগ ইত্যাদি বিষয়ে মার্কিনী মনোভাব এই দলিল গুলোতে স্পষ্টভাবে আমরা দেখতে পাই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে যুক্তরাস্ট্রে সরকার তথ্য সংগ্রহ এবং সেই তথ্যের আলোকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভ্যুদয় নিয়ে মার্কিনী মাথাব্যথার একটা ব্যাখ্যাই আমরা দিতে পারি। সেটা হল পরাশক্তির দম্ভ এবং বিশ্বের সর্বত্র মার্কিনী প্রভাব বলয় বিস্তার করা।

বিশ্বের সেরা গণতান্ত্রিক দেশ বলে পরিচিতি অর্জনকারী যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে সহজে মর্যাদা দিয়েছে তেমন নজির নেই বললে চলে।

 

আমরা উদ্বারকৃত সেই গোপন প্রতিবেদনের তথ্য ও তৎকালীন উপমহাদেশের রাজনীতি নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের উদ্বেগ কোন মাত্রায় উঠানামা করেছিল এবার সেদিকে মনোযোগী হব।

১৯৭০ সালে তৎকালীন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্টিত হয়। এই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ
নিরুকুশ বিজয়(জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের ১৬৭টি আওয়ামী প্রাথী জয়ী হন) হয়। এই সম্পর্কে গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে, ডিসেম্বর’ ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে একক পার্টি হিসেবে আবির্ভূত হল। এই চমকপ্রদ বিজয়, এক্তা রাজনৈতিক দলের বিজয়কে ছাপিয়ে গেছে একজন ব্যক্তির বিজয়। তিনি হলেন শক্তিশালী দলে বিতর্ক হীন নেতা শেক মুজিবুর রহমান।

এই গোপন রিপোর্টে মন্তব্য করা হয়েছে, শেখ মুজিব নিজেই এই বিজয়ে বিস্মিত হয়েছেন। এই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ”’শেখ মুজিবুর রহমান”’। তাই প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সম্পর্কে দূতাবাসের মূল্যায়ন যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুজিব একজন সার্বক্ষণিক রাজনীতিবিদ। তিনি যে গ্রেট ইস্টার্ন লাইফ ইন্সুরেন্স কোম্পানির একজন বেতনভুক্ত উপদেষ্টা ছিলেন, সেই তথ্যেরও উল্লেখ আছে রিপোর্টে। ১৯৬৫ সালে তিনি প্রাদেশিক মন্ত্রী ছিলেন, এখানে তাও উল্লেখ রয়েছে। সেই সঙ্গে রিপোর্টে দেখা যায়, শেখ মুজিব দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে আতাউর রহমান খানের সাথে বিরোধে জড়ান এবং মুজিব জয়ী হন।

১৯৪৮ সাল থেকে তিনি ১০টি বছর জেলে কাটিয়েছেন উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগরতলা মামলার আসামী হিসেবে তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠেন এবং তিনি যে একদিন শীর্ষে উঠবেন এমন একটা নিশ্চয়তার ভাব জনসমর্থনে প্রকাশ ঘটাতে পেরেছিলেন।

গোপন তথ্যে বলা হয়েছে, মুজিবের চরিত্র নির্ধারণ যথেষ্ট সমস্যার ব্যাপার। ব্যক্তিগত কথাবার্তায় তাঁর অভিব্যক্তি মনোমুগ্ধকর, শান্ত এবং আত্মবিশ্বাসে প্রবল। মঞ্চে তিনি অনলবর্ষী বক্তা। প্রবল বৃষ্টিতেও হাজার হাজার লোককে তাঁর বক্তৃতা শুনতে যাদু করে রাখতেন তিনি।

দলীয় নেতা হিসেবে মুজিব প্রভাবশালী এবং কখনো কখনো উগ্র। দীর্ঘদিন ধরে যখন তিনি বলেন, আমার জনগণ- আমার দেশ- আমার নদী তখন বুঝা যায় তিনি বাঙ্গালির প্রত্যাশার সাথে নিজেকে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিয়েছেন।

তিনি মূলতঃ গণআন্দোলনের স্রষ্টা এবং একজন জননেতা। মুজিব বৈদেশিক নীতি বিষয়ে খুব খোলাসা নন। তবে তিনি সেন্টো-সিয়েটো থেকে  সরে আসার এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পক্ষে আছেন।

বেশ কিছু বাঙ্গালির ধারণা মুজিব কাশ্মীর সম্পর্কে কঠোর পন্থার অনুসারী নন। বেশ কিছু বাঙ্গালির বিশ্বাস, ফারাক্কা সমস্যার সুরাহা হবে ভারত পাকিস্তান যদি সুসম্পর্কের মধ্যে থাকে।

(চলবে)

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/shaikot_08/27963.html



মন্তব্য করুন