আজাদ মাষ্টার-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

দিল্লীর ঝাড়ুওয়ালা

লিখেছেন: আজাদ মাষ্টার

বাংলাদেশী পত্রিকায় , নিউজ চ্যানেলে ক্রমাগত জাতীয় পার্টি আর এরশাদ শব্দ শুনে আর দেখে বিরক্ত ক্লান্ত হয়ে গেছি ফলে পত্রিকার পাতা উল্টানো বাদ দিয়েছি টিভিতেও দেশী খবরের চ্যানেল অন করি না । দিল্লির ঝাড়ুওয়ালাদের সাফল্যের খবর বিবিসি সিএনন এনডিটিভিতে দেখি আর ঈর্ষা করি ।

 

1484010_614012275313758_1263616191_o

 ২০১২ সালে তৈরি হওয়া ঝাড়ু মার্কা নিয়ে নির্বাচন করা দিল্লীর তরুণদের তৈরি আমআদমি পার্টিকে অভিনন্দন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা দিল্লীর বিরোধী দলে বসতে যাচ্ছে। ৭০ আসনের দিল্লীর প্রাদেশিক সংসদে বিজেপি এখন পর্যন্ত পেয়েছে ৩২টি আসন, আম আদমি পার্টি পেয়েছে ২৮টি। আর ক্ষমতাসীন কংগ্রেস গতবার ৪৫টি পেলেও এখন পর্যন্ত ৮টি আসন পার হতে পারেনি।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্না হাজারির অনশন মূলত একটি ‘সুশীল’ উদ্যোগ ছিল। সেই উদ্যোগকে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার জন্য যখন চ্যালেঞ্জ আসে তখন আন্না হাজারে এবং ‘টিম আন্না’ নামে পরিচিত তার বড় বড় সমর্থকদের প্রায় সকলেই পিছিয়ে গেলেন। তাঁরা সুশীলতার মধ্যেই থাকতে চান, রাজনীতির কাঁদামাটিতে গড়াগড়ি করতে চান না। কিন্তু যুবক ইনকামট্যাক্স অফিসার অরভিন্দ কেজরিওয়াল সেই স্পিরিটকে সামনে নিয়েই গড়ে তুলেছেন ‘আম আদমি পার্টি।’
ফলো করছিলাম তাঁদের কার্যক্রম। হ্যান কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই যা তাঁদের পার হতে হয়নি। সেই একই ফর্মুলায় অরভিন্দ কেজরিওয়াল আর তার দলের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলা হয়েছে বারবার। স্বয়ং আন্না হাজারে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছেন যে উনার ফান্ড এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে কী না! আম আদমি পার্টির বিপরীতে ‘ভারতীয় আম আদমি পার্টি-বাপ’ নামের সংগঠনও দাঁড়িয়ে গেছে। তাঁদের প্রচার প্রচারণায় বাঁধা দিতে অনেক চেষ্টা করা হয়েছে।
কিন্তু অরভিন্দ কেজরিওয়াল তাঁদের পার্টির প্রতিটি পাই পয়সার হিসাব পরিস্কার করেছেন। এই নতুন রাজনীতিবিদ নিরাপদ আসনে দাঁড়ান নাই, স্বয়ং মূখ্যমন্ত্রীর আসনে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছেন।
এবং আজকে তিনি ফল পেয়েছেন।
যদি সৎ থাকতে পারেন, তাহলে দিল্লীর মসনদে হয়তো আম আদমি পার্টি পরের নির্বাচনেই বসতে পারবে। সময়ই বলে দেবে কী হবে।
কিন্তু সুশীলতার সীমা ডিঙিয়ে রাজনীতির কাদায় গড়াগড়ি খাওয়ার সাহস দেখানোয় অরভিন্দ কেজরিওয়াল আর তাঁর তরুণ নেতাদের অভিনন্দন। পত্রিকার কলাম আর টিভির সুশীল টকশো দিয়ে আদৌ খুব বেশি পরিবর্তন আনা যায় না, পরিবর্তন চাইলে রাজনীতির কঠিন মাঠেই নামতে হয়। ভারতের মতো বড় দেশে দীর্ঘমেয়াদে যদি আপনারা টিকে থাকতে না-ও পারেন, তবু রাজনীতিকে শুদ্ধ করার ক্ষেত্রে আপনাদের এই বিজয় অবশ্যই ভুমিকা রাখবে।

(আরিফ জেবতিক)

মাত্র একবছরের সদ্য গঠিত হওয়া দল ছিলো আম আদমি পার্টি , কিন্তু এক বছরে তাঁরা নির্বাচন টার্গেট করে দিল্লীতে ১ লাখ ৫০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি গঠন করে সমর্থকদের নিয়ে । ২০ কোটি একটা নির্বাচনি তহবিল গঠন করবার টার্গেট ছিলো তাঁদের স্রেফ অনলাইনের ডোনেশন ক্যাম্পেইনের মধ্যে দিয়েই তাঁরা এর বৃহৎ অংশ সংগ্রহ করে ফেলে , নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহ করতে তাঁরা কোন ব্যবসায়ির কালো টাকার জন্যে মাথা বিক্রি করতে রাজী ছিলো না আম আদমি অর্থাৎ সাধারণ মানুষের থেকেই অর্থ কালেক্ট করেছে ।

দিল্লীতে নির্বাচনী আসন ছিলো ৭০টা প্রত্যেকটার নির্বাচনী আসনের জন্যে তাঁরা একটা করে লোকাল ইস্যুভিত্তিক ইস্তেহার তৈরি করেছে জনমত জরিপ করে ।

প্রত্যেকটা আসনে তাঁরা ক্লিন প্রার্থী দিয়েছে , তাঁদের পার্টি সংবিধানে ছিলো নির্বাচনের একদিন আগেও যদিও কোন প্রার্থীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ পাওয়া যায় তাহলে সেই আসন তারা শূন্যে রেখে দিতে রাজী কিন্তু কোন ক্রিমিনালকে তাঁরা সংসদে প্রবেশ করতে দিবে না ।

আম আদমি পার্টি আর তাদের নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আউট অব বক্স রাজনৈতিক করার প্রচেষ্টার ফলাফল দিল্লীর রাজ্যে দ্বিদলীয় পার্টি সিস্টেম চুড়মার হয়ে গেছে তিন টার্মের ক্ষমতাসিন দল কংগ্রেস মাত্র ৮ আসনে আটকে গেছে , বিজেপি ৩২ আসনে আটকে আছে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের সামর্থ্য তাদের নাই আম আদমি পার্টি ২৮ টা আসনে জয় লাভ করে তাদের কপাল পুড়িয়েছে , নানা হিসেব বলেছে আম আদমি পার্টি বিজেপি কংগ্রেস দুইজনের ভোট খেয়েছে । অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন যেহেুতু কারো কাছেই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাই কাজেই রাষ্ট্রপতি শাসন এবং ৬ মাস পর ফের দিল্লীতে ইলেকশন হতে পারে ।

অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং আম আদমি পার্টির এই সাফল্যে ইজি কেক ছিলো না , ক্ষমতাসিন কংগ্রেস এবং একই সাথে বিজেপি এমন কোন ডার্ট ট্রিকস ছিলো না যেইটা প্রয়োগ করে নাই

টিভিতে দেখলাম অরবিন্দ কেজরিওয়াল সাক্ষাৎকারে বললেন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা আইবি তাঁর ফোন ট্যাপ করে সর্বদা , মাঝখানে আন্না হাজারে প্রভাবিত করে তাঁর বিরুদ্ধে একটা চিঠিও লেখায় যে অরবিন্দ কেজরিওয়াল নাকি তাঁর নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি করেছে , ইনডিয়া এগেনস্ট করাপশন মুভনেণ্ট অর্থ তসরুফের অভিযোগ করা হয় , পয়সা দিয়ে আম আদমি পার্টির কিছু সুবিধাবাদী নেতা কর্মী দিয়ে প্রেস কনফারেন্স করে দল ভাঙার চেষ্টা করা হয় , প্রত্যেকটা পার্টি নেতার বাড়িতে ইনকাম ট্যাক্সের রেড দেওয়া আরম্ভ করে , এবং সবশেষে চলে গোপন ক্যামেরা ফিট করে আম আদমি পার্টি এম্পি প্রার্থীদের উপর স্তিং অপরাশেন ।

বিজেপির তাঁদের মিডিয়ায় তাদেরকে চিত্রিত করে উগ্র নকশালি বাম , কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নাতাবাদি সন্ত্রাসীদের পৃষ্ঠপোষক হিসাবে । অন্যদিকে কংগ্রেস কমিউনিস্ট সমর্থক মিডিয়া বুদ্ধিজীবী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং তাঁর দলকে মার্কিনি ফোড ফাইউনেশনের দালাল বলে চিত্রিত করে , এমনকি অনেক আর্টিকেল সে ছাত্র জীবনে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস করতো বলে অভিযোগ আনে ।

দিনের শেষে অরবিন্দ কেজরিওয়াল আর তাঁর পার্টি সবাইকে চুনা লাগিয়ে দিয়েছে । ক্যারভান ম্যাগাজিন তাঁকে উপাধি দিয়েছে “The Insurgent” ( গেরিলা) বলে । কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয়ের জন্যেই আম আদমি পার্টি ২০১৪ সালের লোক সভা নির্বাচনে ঘাম ছুটাবে এইটা টিভিতে তাঁদের নেতারা স্বীকার করেছেন ।

অকুপাই ওয়াল্ড ষ্ট্রীট মুভেমেণ্টের কিংবা আণ্ণা হাজারের আন্দোলনের কথা যখন পড়তাম দেখতাম মিডিয়াতে তখন কখনো কল্পনাই করি নাই এইরকম কিছু একটা নিজের শহর ঢাকাতে ঘটবে এবং তাঁতে আমার পরিচিত ব্যক্তিরা একটা বড় রোল প্লে করবে । আম আদমি পার্টি যখন মাত্র গঠিত হয় এক বছর আগে তখন থেকেই এইটা সম্পর্কে আমি খুঁটীনাটি প্রত্যেকটা বিষয় নিয়ে স্টাডি করা আরম্ভ করি , আমার যা মনে হয়েছে এই ধরনের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির ঊথান হওয়ার জন্যে পরিবেশ এলিমেণ্ট আমাদের দেশেও বিদ্যমান আছে , একটা কথা মনে রাখবেন নকশাল মুভমেণ্ট যখন ভারতে আরম্ভ হয় তখন সেইটার ধাক্কা আমাদের এইখানে লাগে ৬০ দশকে । শিক্ষিত মধ্যবিত্তের সংখ্যা বাড়ছে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্য যারা রাজনৈতিক সচেতন কিন্তু মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলা তাদের অংশগ্রহণের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে যুব ছাত্র সংগঠনগুলা ৫০ বছরের বুড়োদের বসিয়ে রেখেছে । এদের জন্যে স্পেস না করতে পারলে এরা নিজেরাই স্পেস করে নিবে ।

তবে খালি নতুনেরা নয় মূলধারার রাজনৈতিক দল এবং তাঁর নীতিনির্ধারকদের জন্যেও আম আদমি পার্টির সাফল্য থেকে অনেক কিছু  গ্রহণ করার  আছে । দিল্লির নির্বাচনে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১১০ বছরের পুরানো রাজনৈতিক দল কংগ্রেস । নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর কংগ্রেস পার্টির অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্ব রাহুল গান্ধী প্রেস কনফারেন্স করে ঘোষণা দেন যে তাঁর দল কংগ্রেস আম আদমির সাফল্যকে অধ্যায়ন করবে এবং নিজের দলের মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনবেন ।   অপর প্রতিদ্বন্দ্বী দল ভারতীয় জনতা পার্টি তো নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যখানেই নিজের মুখ্যমন্ত্রী ক্যান্ডিডেট পরিবর্তন করে দলের সবচেয়ে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি ডাক্তার হর্ষ বর্ধনকে সামনে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে ।

আমাদের দেশে মূলধারার বড় দলগুলি  জাতীয় পার্টির সংস্কৃতি রপ্ত করতে যতোটা মুখিয়ে থাকে । সেই শ্রম যদি তাঁরা  আম আদমি পার্টির থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্যে সচেষ্ট হয় তাহলে  সবাই লাভবান হতে পারতো । তবে সম্ভাবনা বর্তমান পরিস্থিতিতে শূন্যের কোঠায়।

 

 

 

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/roommate/26110.html