এএস রিয়াদ-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

৭ নভেম্বর ‘৭৫, স্মরণীয় সেই দিন : লরেন্স লিফশুলজ (২য় পর্ব)

লিখেছেন: এএস রিয়াদ

যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের স্টোনি ক্রিকের বাসিন্দা লেখক, সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ ১৯৭৬ সালে হংকং ভিত্তিক পত্রিকা ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন। ১৯৭৪ ও ৭৫ সাল জুড়ে তার কর্মক্ষেত্র ছিল দক্ষিণ এশিয়া। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী সংঘাতময় নভেম্বর মাসের ঘটনাবলী অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি।  বাংলাদেশকে নিয়ে লিখেছেন ‘বাংলাদেশ : দি আনফিনিশড রেভ্যুলিউশন’। ভোরের কাগজ – এর অনুরোধ ঘটনাবহুল ৭ নভেম্বর উপলক্ষে লরেন্স লিফৎশুলজ নিউইয়র্ক থেকে ইমেইলে প্রতিবেদনে পাঠিয়েছেন তার বিশ্লেষণ।  আজ ২য় পর্ব।

১৯৭৪-৭৫ সালের দ্বন্দ্ব সংঘাতময় দিনগুলোতে জিয়া খুবই দুর্বোধ্য একটি চরিত্র ছিলেন। সম্ভবত তিনি নিজেও জানাতেন না তার জীবন এবং অঙ্গীকার কোন পথে প্রবাহিত হবে। যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এলো, জিয়া পরিচিত, চিরাচরিত পথটিই বেছে নিলেন। তবে, জিয়াউর রহমানের আচরণের প্রশ্নই যদি একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তাহলে ৭ নভেম্বরের    বিদ্রোহ যে ইস্যুগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছিল তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা যাবে না। মনোযোগ শুধু এক্ষেত্রেই কেন্দ্রীভূত করলে গভীর বিশ্লেষণ এড়িয়ে যাওয়া হবে। ৭ নভেম্বরে জাসদ যদি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যেতো তাহলে নিশ্চয়ই তাদের কিছু আপাৎকালীন প্রস্তুতি কাল ‘তিও থাকতো। কিন্তু তা তাদের ছিল না। কেন ছিল না সেটা বিশেষত জাসদের অভ্যন্তরে যারা বাম ঘেঁষা তাদের মনে বেশকিছু কঠিন এবং বিতর্কিত প্রশ্নের জন্ম দেয়। যারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের বেশিরভাগই কখনো সরাসরি এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হননি।

 

লিফশুলজ, তাহের, জিয়া

লিফশুলজ, তাহের, জিয়া

সাংবাদিক হিসেবে যখন প্রথম এইসব ঘটনার রিপোর্ট করা শুরু করি তখন থেকেই আমি অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে ঐ সময় কি ঘটেছিল তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করে আসছি। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যারা জীবিত ছিলেন তারা দুঃসহ কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরই এটা সম্ভব হয়। কিন্তু এ কাজের জন্য যে ধরনের গবেষণা প্রয়োজন তা করার মতো অবস্থা আমার নেই। যারা আরো ভালো অবস্থায় আছেন তাদেরই কারো এটা করা উচিত। সম্ভব হলে নিজের কাজকে বৈধ বলে জাহির করার খণ্ডিত, সংকীর্ণ সীমানা অতিক্রম করে এ কাজ করা উচিত। এখানেই প্রয়োজন ঐতিহাসিকের প্রতিভা।

আমি, যা হোক, কয়েকটি আপাত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। আমি ‘আপাত’ শব্দটার ওপর জোর দিচ্ছি। প্রায়শই প্রশ্ন করা হয়, ৭ নভেম্বরে ফুঁসে ওঠা ঐ বিদ্রোহ জাগিয়ে দেওয়ার পেছনে জাসদের মূল লক্ষ্য কি ছিল? আমার ধারণা হলো -  তারা বুঝতে পেরেছিল সাংগঠনিক দিক থেকে তারা ক্ষমতা দখলের উপযোগী অবস্থায় নেই। নিজেদের শক্তিকে এতটা বাড়িয়ে দেখার মতো বোকা তারা ছিল না। তাদের অনেক ক্যাডার ও কর্মীই তখন কারাগারে। আমি যতদূর তথ্য জোগাড় করতে পেরেছি তাতে জানা যায়, জাসদ নেতৃবৃন্দ বিশ্বাস করতেন যে, তারা নিজেদের জন্য একটি বড় ধরনের সূত্রপাতের প্রথম দফার কাজ শুরু করার মতো অবস্থানে রয়েছেন, যা পরবর্তীকালে সংহত করা সম্ভব হবে।

৭ নভেম্বরের বিদ্রোহের উদ্দেশ্য ছিল কারাগার থেকে তাদের নেতৃবৃন্দ ও সমর্থকদের মুক্ত করা, তারপর এস্টাবলিশমেণ্টের শরীক হওয়া এবং রাজনৈতিক এবং সামরিক ক্ষমতার সমান্তরাল কেন্দ্র তৈরী করা। জাসদ মনে করছিল যে, আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান না করেও ঘটনাপ্রবাহর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট ওজন তাদের আছে।

এ অবস্থায় জাসদ তার গণ সংগঠনগুলোকে সক্রিয় করা এবং সেনানিবাসে অনুগত সামরিক কমিটি গঠন করার মাধ্যমে নিচ থেকে এক ধরনের ‘আধিপত্য’ তৈরি করতে চেয়েছিল। এ সময় জাসদ অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। তারা আন্দাজ করেছিল সমর্থনের রাজনৈতিক,  সামাজিক ও সামরিক ভিত্তি তারা প্রসারিত করতে পারবে। এদিক দিয়ে দেখলে অন্যান্য প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে মৈত্রীর কৌশল অনুসরণের ব্যাপারে তারা প্রস্তুতি কাল ‘তই ছিল, যা সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য পূরণের উপযোগী একটি রাষ্ট্র তৈরির ক্ষেত্রে  অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। এটা হতে পারতো ঐ বিদ্রোহের দ্বিতীয় পর্যায়, যার জন্য হয়তো কয়েক মাস সময় লাগতো, আর এ সময়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন অস্থায়ী সরকার ক্ষমতায় থাকতো।

কিন্তু ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে প্রশ্ন জাগে, ৭ নভেম্বরের বিদ্রোহের সময় তাদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি কালটি , জাসদের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিদ্রোহের লক্ষ্য পূরণের উপযোগী ছিল না। এ প্রশ্নের বহু দিক রয়েছে এবং তা ঐ বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে নিঃসন্দেহে এক বিতর্কের বিষয়বস্তু হয়ে থাকবে চিরকাল। তার গ্রেপ্তার হওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে, ১৫ নভেম্বর, আমি যখন তাহেরের সঙ্গে দেখা করি, তিনি এই বিষয়টি নিয়েই পর্যালোচনা করেছিলেন। এই সংকট সম্পর্কে রিপোর্ট করতে আমি তখন ভারত থেকে ঢাকায় এসেছি। প্রায় এক বছর ধরে তাহেরের সঙ্গে দেখা নেই। যে মানুষটা একদা আমাকে প্রাচীন বাংলার সেচ ব্যবস্থার ইতিহাস এবং আধুনিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার খুঁটিনাটি জটিলতা, ধৈর্য সহকারে বুঝিয়েছিলেন, আমি হঠাৎ করে দেখলাম তিনি এখন এক বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের নায়ক।

তার সঙ্গে আমার আলোচনায় তাহের জোর দিয়ে বললেন, ঘটনার গতিধারাই তাদেরকে আগেভাগে এ্যাকশনে যেতে বাধ্য করেছে। তিনি বললেন, তাদের নিজেদের হিসাব-নিকাশ অনুযায়ী  একেবারে আটঘাট বেঁধে প্রস্তুতি কাল ‘ত হওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছতে, প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতি কাল ‘তি সম্পন্ন করতে ১৯৭৬ সালের মার্চ বা এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগে যেত। অর্থাৎ আরো ছয় মাস। ছয় মাস অপেক্ষা করলে ততোদিনে শহরে এবং গ্রাম এলাকায় তারা তাদের জনসমর্থন নতুন করে সাজাতে পারতেন। এর আগের বছর জাসদের কর্ম ও সমর্থকদের ব্যাপকহারে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

তাহের যুক্তি দেখালেন, একটার পর একটা অভ্যুত্থান আর পাল্টা অভ্যুত্থান সশস্ত্র বাহিনীকে গভীরভাবে অস্থির  করে তুলেছিল। এর কারণ, সবাই বুঝে গেছে সামরিক বাহিনীর যে, সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে একপক্ষের ওপর আরেক পক্ষের বাড়তি সুযোগ – সুবিধাই কেবল প্রতিষ্ঠিত হয়, দেশের যে হত দরিদ্র সিংহভাগ মানুষ, তাদের ক্ষেত্রে তা কোন মৌলিক পরিবর্তন আনে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লা ব্রিগেডের মাধ্যমে তিনি বারবার যে বাণীটি প্রচার করতেন তা হলো-একজন সৈন্যের পক্ষে দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ হলো সবকিছুর ঊর্ধ্বে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত শ্রেণীটিকে তুলে ধরা। বাংলাদেশের মতো বিশ্বের এক দরিদ্রতম দেশে এই বাণী সামরিক বাহিনীর রাজনীতি সচেতন অংশটির মধ্যে বিপুলভাবে জায়গা করে নিয়েছিল।

এই রাজনীতি সচেতন শক্তিটিই তাহের এবং জাসদকে বিদ্রোহে নেমে পড়তে চাপ দিয়েছিল। নিঃসন্দেহে, এমনকি তুখোড় পর্যালোচনা সত্ত্বেও, তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। মনে করা হচ্ছিলো, তারা অংশগ্রহণ করুন আর নাই করুন একটি বিদ্রোহ অত্যাসন্ন। জাসদের সামনে তখন এ বিদ্রোহে ভ্যান গার্ড হিসেবে অবতীর্ণ হওয়ার অথবা না হওয়ার প্রশ্ন। তারা তখন ভ্যান গার্ড হওয়ার মতো উপযোগী অবস্থানে ছিল। ফলে তারা বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িত থেকে পথনির্দেশ দিয়েছে। সম্ভবত তারা এমন এক সমাজে বসবাস করতে করতে অধৈর্য হয়ে পড়ছিল যেখানে সমাজতন্ত্রের বুলি আওড়ানো লোকেরা শেষ পর্যন্ত আরামকেদারায় দোল খায়, না হলে বাজারে চায়ের স্টলে বসে আলোচনার ঝড় তোলে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়- একটা সফল বিদ্রোহের জন্য যে সব দুরূহ এবং জটিল দায়িত্ব কাঁধে নিতে হয় তা নেওয়ার মতো যথেষ্ট পরিমাণে প্রস্তুতি কাল ‘ত তারা ছিলেন কি না। কেউ কেউ বলেছেন, তারা সে অবস্থানে ছিলেন না এবং সকল প্রকার চাপ সত্ত্বেও তাদের উচিত ছিল নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া এবং অপেক্ষায় থাকা। যেখানে জীবন-মরণ প্রশ্ন জড়িত সেখানে ইতিহাস একবারই সুযোগ দেয়। এরকম কাজে পূর্ণ প্রস্তুতি কাল ‘তি থাকা সত্ত্বেও সময়ের হেরফেরে যেকোনো কিছুই ঘটে যেতে পারে।

ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে ১৫ নভেম্বর তারিখে তাহের জানান, অভ্যুত্থানের সময় নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা খুবই জটিল ছিল। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর জোটবদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা  ছিল এবং তারা অভ্যুত্থানের সমর্থকদের খতম করার অভিযানে নামতে পারতো। প্রতিশোধ স্পৃহার অভিপ্রকাশ হিসেবে পরবর্তী তিন বছরে বস্তুত  সেটাই ঘটেছে। অপরিণত ও অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি কাল ‘তি এরকম পরিণতিই বয়ে আনে।

বৈঠকের সপ্তাহ খানেক পর এক বৈঠকে তাহের ইঙ্গিত করলেন, ব্যাপক গণ-সমাবেশ, যেটা তিনি আশা করেছিলেন, তাতে জাসদ সাংগঠনিক ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ রাস্তায় নেমে এসে সিপাহীদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিনন্দিত করলেও, অতীতে যেমন ছাত্র- জনতা-রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যাপক আলোড়ন দেখা গেছে, এক্ষেত্রে তেমনটি ঘটেনি। ৪ ও ৫ নভেম্বর জাসদের  আন্ডারগ্রাউন্ড নেতৃত্বের এক বৈঠকে ঐসব শক্তিগুলোকে সক্রিয় করে তোলার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। অবশ্য দায়িত্ব প্রাপ্তরা পরে যথেষ্ট আন্তরিকতা ও তৎপরতা নিয়ে মাঠে নামেনি। অভ্যুত্থানের বেশ কয়েকটি দিক ছিল। কেবল যে সামরিক শক্তিকেই সংগঠিত করা হয়েছিল তা নয়, ছাত্র-কর্মীদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছিল এবং তাদের সংগঠিত ঐক্যের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছিল। লক্ষ নির্ভর বিদ্রোহের হাতকে মুষ্টিবদ্ধ করতে হলে সকল আঙ্গুলকে তো একসঙ্গেই গুটাতে হয়।

৬০ এর দশকের শেষ এবং সত্তরের দশকের শুরুর দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসসহ জেলার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুসংগঠিত বিক্ষোভ, সমাবেশে মুখর হয়ে ওঠে। যারা তখন এসব সমাবেশের আয়োজন করেছিল, এখন তারা জাসদের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে। কিন্তু ৭ তারিখের সকালে তারা তাদের আগেই সেই ক্ষমতা দেখাতে ব্যর্থ হন। ৭ নভেম্বরের ঠিক পরের দিন বেসামরিক কর্মীদের সক্রিয় হয়ে উঠতে দেখা যায়। তবে অচিরেই তাদের কৌশলগত উদ্যোগ শিথিল হয়ে পড়ে।

পূর্ব ধারণা অনুযায়ী কেন সংগঠিত সমর্থন পাওয়া যায়নি সে ব্যাপারেও যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। শ্রমিক শ্রেণী, ছাত্র ও ব্যাপক মানুষের সক্রিয় ও সমন্বিত সমর্থন ছাড়াই সেনাবাহিনীর একটি অংশে বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল। ১৯৭৩ ও ৭৪ সালে যে সংগঠনটি লাখ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়েছে, তাদের পক্ষে এ ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সামর্থ্যরে বাইরে থাকার কথা ছিল না। ৭ নভেম্বরের সকালে জাসদ পরিষ্কারভাবে তাদের কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করেনি, যা অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তিকে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার এবং বিদ্রোহকে অন্যখাতে প্রবাহিত করার সুযোগ করে দেয়। জনগণের একটি বড়ো অংশ তখন পর্যন্ত ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি, অভ্যুত্থানের নায়ক আসলে কারা এবং তাদের নীতিই বা কি, যদি তা আদৌ থেকে থাকে। কয়েকটি স্লোগানই যথেষ্ট ছিল না। এতে কোনো সন্দেহ নেই, সমাজতান্ত্রিক ধারার কোনো সংগঠনের পক্ষে এগুলো খুবই মারাত্মক ব্যর্থতা।

বিষয়টি এরকমভাবে ভাবা সম্ভব যে, বিদ্রোহ পরবর্তী দিনগুলোতে জাসদ যদি ব্যাপক জনসমর্থন প্রদর্শন এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে  প্রতিফলিত করে এরকম রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা করতে সক্ষম হতো, তাহলে জিয়াউর রহমান বা অন্য কোনো ঊর্ধ্বতন Ÿতন সামরিক কর্মকর্তার আর ভূমিকা পরিবর্তনের সুযোগ হতো না। কিন্তু কেন জাসদের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি, সেটা একটা মূল প্রশ্ন।

এর কোন সহজ বা রেডিমেড উত্তর নেই। কেউ কেউ বলেন, যাদের উপর গুরুত্বপূর্ণ সব কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তারা তাদের কাজ ঠিকমতো করেনি। অন্যদের যুক্তি হলো:৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থান থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সময়টা একটা বড়ো ধরণের প্রস্তুতির জন্য মোটেও যথেষ্ট ছিল না।  তাদের মতে, যতো রকম চাপই থাক, জাসদের  উচিত ছিল সংযম রক্ষা করে অপেক্ষা করা।

পাঁচ বছর পর যখন জাসদের বেশিরভাগ নেতা কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন, তখন দলের ঊর্ধ্বতন Ÿতন মহলে, এতদিনে যা ঘটে গেছে তা আর কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা ছিল না। কারাবাসের আতঙ্ক, ১৯৭৭ সালে গণহারে ফাঁসির ভয়াল স্মৃতি আর খুলনাসহ অন্যান্য জায়গায় কারা বিদ্রোহের সময় গণহত্যার অভিজ্ঞতার পর জাসদ নেতাদের পক্ষে সেসব দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে উঠা নতুন করে জেগে ওঠা সম্ভব হয় না। বস্তুত ‘ত পক্ষে, কোনো  রাজনৈতিক আন্দোলন যখন তার তাত্ত্বিক ধারণা এবং ব্যবহারিক কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে অক্ষম হয়, তখন বিপর্যয় কাটিয়ে উঠা তার পক্ষে ফের সংগঠিত হয়ে ওঠা আর সম্ভব হয় না।

তাই ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর জাসদ নেতারা যখন ফের একত্র হলেন; তখন অতীতের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা, পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক আবহে নতুন উদ্যমে নতুন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামার মতো সামর্থ্য সত্যিই তাদের ছিল না। সিরাজুল আলম খানের মতো শীর্ষ নেতারা অতীত কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি ও আত্ম বিশ্লেষণ করার বদলে পদত্যাগ করে বসেন। অন্য নেতৃস্থানীয় যারা ছিলেন, তারা অধিকাংশই ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগসাজশে অথবা নিজস্ব গ্রুপিংয়ের কারণে দলছুট হয়ে পড়েন।

আংশিকভাবে এটা বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার পরিকল্পিত কারসাজিরও ফল। এদের কারসাজিটা ছিল অদূর্নীতিবাজদের সরিয়ে দেওয়া এবং দূর্নীতিপ্রবণদের উৎসাহিত করা। তাছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতৃত্ব, যারা দলের সব থেকে সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ সদস্য ছিল, কারামুক্তির পর তাদের পক্ষে পুরনো নেতৃত্বকে অবজ্ঞা করে আগের অবস্থানে ও নীতিতে ফিরে এসে দলকে পুনর্গঠিত কিংবা নতুন নেতৃত্বের ছায়াতলে দলকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলা সম্ভব ছিল না। পরিণতিতে বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির একটি সাহসী ও নাটকীয় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।

বিপ্লবী লক্ষ্য অর্জনের মতো যথেষ্ট পরিণত একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে জাসদ নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল কি পারেনি সে প্রশ্ন করা যেতেই পারে। এশিয়ার প্রায় সর্বত্রই দেখা গেছে বিশেষ করে কম্বোডিয়া ও আফগানিস্তানে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদেরকে সমাজবাদী ও বিপ্লবী আখ্যা দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং মুক্তিসংগ্রামের নামে জনগণের ওপর বর্বরোচিত ধ্বংসযজ্ঞ  চালিয়েছে, যে জনগণকে তারা বন্ধন – মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল।

একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে, কিন্তু শেষ হয় না সেই পরিস্থিতির যার মধ্য দিয়ে উদয় ঘটে আবু তাহেরদের মতো মানুষের, যা জন্ম দেয় তাদের মতো মানুষের আত্মপ্রত্যয় এবং কাজে নামার প্রেরণা। এ বিষয়গুলো ধ্রুব হয়ে থাকে চিরকাল।

কোন পর্যায়ে, কোন পরিস্থিতিতে  বাংলাদেশ অভ্যুদয় ঘটেছে তা বুঝতে হলে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত বাংলাদেশের ওপর লেখা একটি নিবন্ধ কাজে দেবে। এ নিবন্ধে নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টের বাংলাদেশের এক ১৫ বছর সমবয়েসী মেয়ে শাফিয়া খাতুনের বর্ণনা দিয়েছেন, যে মেয়েটি দারিদ্র কবলিত গ্রামবাংলা থেকে রাজধানী ঢাকার একটি গার্মেন্টস  ফ্যাক্টরিতে সামান্য বেতনের একটি চাকরি জুটিয়ে নেয়। ‘টাইমস’ এটাকে ‘পথিকৃৎ যাত্রা’ নামে অভিহিত করে।

রিপোর্টে বলা হয়, শাফিয়া খাতুন যে কাজটি পেয়েছে সে ধরনের নারী শ্রম কে বাংলাদেশে আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করা হয়। মেয়েটি মাসে ৩৭৭ টাকা করে রোজগার করে। শ্রমের ক্ষেত্রে এটা ‘ডিকেনসিয়ান পরিস্থিতির’ পর্যায়ে পড়ে। এই শ্রমশর্তটি সেই উনবিংশ শতাব্দীতেই ইউরোপ ও আমেরিকায় আইন করে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। কেবল শিশুদের ক্ষেত্রেই নয়, প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্যও আইনটি প্রযোজ্য। অবশ্য বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের ঔপনিবেশিক শাসন- পরবর্তী অনেক সমাজেই পশ্চিমা অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এ আইন কার্যকর করছে। শাফিয়া খাতুনের চাকরিদাতা সালেহা গার্মেন্টসের  মালিক রেদোয়ান আহমেদ বলেছেন, তার শ্রমিকরা রুটি – রুজির জন্য মাসে ১৩ ডলার বেতনের কাজ করতে প্রস্তুতি কাল ‘ত। এমনকি তারা কোনা আপত্তি ছাড়াই দীর্ঘসময় আরো কঠিন শর্তে কাজ করতে রাজি। একজন গবেষক তার রিপোর্টে বর্ণনা করেছেন কিভাবে ফ্যাক্টরি মালিকরা দরজা বন্ধ করে নারী শ্রমিকদের আটকে রেখে প্রাপ্য মজুরি না দিয়ে ওভারটাইম করতে বাধ্য করে। ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ – এর মতে, এতো অল্প মজুরি নির্ভর রপ্তানি বাণিজ্য চলছে দেখেই বাংলাদেশের পরিকল্পনাকারীরা আজ মাঝে মধ্যে শিল্পায়নের কথা বলার সাহস দেখাতে পারে।

টাইমসের রিপোর্টার অবশ্য একথা মনে করতে পারবেন না যে, এমন অনেক লোক বাংলাদেশে রয়েছে, যাদের স্মরণে আছে স্বাধীনতার পর পরই অন্য একদল পরিকল্পক শিল্পায়নের কথা বলেছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে, এখনকার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন সামাজিক কাঠামোয় দাঁড়িয়ে। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে পুঁজি বিনিয়োগ ছিল পশ্চিম পাকিস্তান ভিত্তিক। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে তখনই যখন বিশ্ব বাজারে নেতৃত্ব দানকারী দেশগুলো কিছু সহজ শর্ত  আরোপ করে। ‘টাইমস’ লিখেছে:

যুক্তরাষ্ট্র  বাংলাদেশের জন্য কোটা পদ্ধতি চালু করার পরই কেবল সেখানে গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ ঘটে। এটা সাম্প্রতিক  ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের মোট উৎপাদনের ৮৫ শতাংশ নিচ্ছে। সে দেশে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সামগ্রী রপ্তানির পরিমাণ ১৯৮৪ সালের সাড়ে ৪ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ১৯৮৮ সালে দাঁড়ায় ৩০ কোটি ডলার, এবং বাংলাদেশ সে বছর আমেরিকায় গার্মেন্টস সামগ্রী রপ্তানিতে ষষ্ঠ বৃহত্তম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

মিলানের গার্মেন্টস শিল্পপতি পাওলো তাচ্চিনার্দি বলেন, ‘কাজের জন্য বাংলাদেশ হচ্ছে সব থেকে সস্তা জায়গা।’ কর্মীদের, ব্যবস্থাপকদের, জাহাজ মালিকদের পাওনা মেটানোর পরও একটি শার্ট যখন ইতালি এসে পৌঁছে, তখন সেটার দাম স্থানীয় বাজারের দামের চেয়ে তিনগুণ কম থাকে। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, যে পোশাকগুলো পরছেন, সেগুলো নারী ও শিশুদের তৈরি। কিন্তু, আমরা যদি সেখানে গিয়ে ওদের কাজ না দিই, তাহলে ওদের আর কিছুই করার থাকে না।

এটাই কি বাংলাদেশের জন্য এখনো একমাত্র উপায়? প্রথমদিকে ইউরোপীয় বণিকরা দক্ষিণ এশিয়ায় এসে ঔপনিবেশিক আনুগত্যের বিনিময়ে উপহার দিয়েছিল ঈশ্বর ও সাম্রাজ্যবাদ। আজকের দিনে তারা দিচ্ছে ‘কাজ’ বিনিময়ে নিচ্ছে তিনগুণ মুনাফা। আসলে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্তরসূরি এখনো সেখানে রয়ে গেছে।

একটি দেশ, যে একদা গর্বিত ছিল গোটা এশিয়ার বাজারে মসলিনের মতো মিহি কাপড়, সুতা আর সিল্ক সরবরাহের একচেটিয়া ব্যবসা নিয়ে, সে এখন শুধু সেলাই করছে নিউইয়র্ক, প্যারিস আর টোকিওর দোকানগুলোর জন্য সস্তা পোশাক। নিজের গরীব বস্ত্রহীন নাগরিকের জন্য যে জাতির আজ বস্ত্র উৎপাদনে দৃষ্টি দেওয়ার কথা সে আজ তা না করে পোশাক তৈরি করছে ধনী দেশের জন্য।

এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, দেশের স্বাধীনতার জন্য কর্নেল তাহেরের মতো আরো যারা যুদ্ধ করেছেন, তাদের একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। বাংলাদেশের জনগণকে যেন আর কখনো নিজ দেশে ক্রীতদাসে পরিণত হতে না হয়, সেজন্য ঐ দৃষ্টিভঙ্গিটা ফিরিয়ে আনতে হবে।  (সমাপ্ত)।

কার্টেসীঃ

দৈনিক প্রথম আলো, কর্নেল তাহের ওয়েব সাইট www.col-taher.com

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/riddha/14884.html

 2 টি মন্তব্য

  1. আজাদ মাষ্টার

      তাহের কে নিয়ে লেখা সিরিজ খানা আগ্রহ নিয়েই পড়ছি চালিয়ে যান ।

    1. এএস রিয়াদ

      ধন্যবাদ মাষ্টার ভাই।  জেনে ভালো লাগলো।  প্রজন্ম ব্লগে হিট বেশী হয় কিন্তু কমেন্ট হয়ই না বলা যায়। 

মন্তব্য করুন