রিয়াজুল আলম-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমোনা

লিখেছেন: রিয়াজুল আলম

আওয়ামী লীগ ২০০৮ এর নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলো। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো ক্ষমতায় আসলে ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে,যে বিচারের জন্য বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে মুক্তিযুদ্ধে রক্তক্ষয়ী বিজয়ের পর থেকেই। এখন ২০১৫, সেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতার সপ্তম বছরে পদার্পণ করেছে। এই ছয় বছরে একজনমাত্র যুদ্ধাপরাধী তার অপরাধের যোগ্য শাস্তি পেয়েছে। তাও সেই যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার শাস্তি এমনি এমনি হয়নি, শাহবাগ থেকে শুরু করে সারাদেশের মানুষকে এরজন্য দীর্ঘদিবস দীর্ঘরজনী রাজপথে থেকে আন্দোলন করতে হয়েছে। ক্ষমতায় গিয়ে সরকার তার প্রতিশ্রুতি পালনে বারবার গড়িমসি করেছে, জনগণকেই পথে নেমে তাদের দাবি পূরণ করিয়ে নিতে হয়েছে।

১৯৭২ সালের দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীর সংখ্যা ছিল ৭৫২। তখনো বেশিরভাগ যুদ্ধাপরাধীর মামলা চলমান ছিল, সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরেও প্রায় ১১০০০ জনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট যুদ্ধাপরাধের মামলা চলছিলো। আজ ৪৩ বছর পরে ধরে নিলাম সেই ১১০০০ এর মধ্যে বেঁচে আছে ১০০ জন যুদ্ধাপরাধী। একজনের মামলা নিষ্পত্তি করে শাস্তি দিতে সরকারের লেগেছে ৫ বছর, সাথে আরো লেগেছে লক্ষ লক্ষ মানুষের দিনের পর দিন রাজপথে অবস্থান। বর্তমান গতিতে যদি চলতে থাকে, তাহলে তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া ১০০ জনের শাস্তি কার্যকর হতে সময় লাগে ৫০০ বছর, সাথে লাগে ১০০ বার লক্ষ লক্ষ মানুষের রাজপথে অবস্থান। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের সর্বনিম্ন বয়স এখন ৬০ এর কম হবে না। প্রতিটা রাজাকার ১০০ বছর করে বাঁচলেও বর্তমান গতিতে বিচার চললে এ বিচার শেষ করা অসম্ভব। এই হিসাব যতই হাস্যকর মনে হোক না কেন, এটা যুদ্ধাপরাধের বিচারে সরকারের সদিচ্ছার অভাবকেই চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয়। জামাত-শিবির নিষিদ্ধের ব্যাপারেও সরকারের অনাগ্রহ এখন দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।

গণ-আন্দোলন ছাড়া এই ভূখন্ডে মানুষের দাবি পূরণ হয়েছে, এমন ইতিহাস নেই বললেই চলে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও যথাযথ শাস্তি কার্যকর করার এই প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করতে হলে সাধারণ মানুষকে আবারো পথে নামতেই হবে। সরকারের প্রতি যাদের অবিচল আস্থা এখনো অটুট রয়েছে,তাদের কাছে প্রশ্ন রইলো, আপনারা কি পারবেন, সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে সর্বকনিষ্ঠ যুদ্ধাপরাধীটিকে শাস্তি প্রদানের জন্য ৫০০ বছর বাঁচিয়ে রাখতে? যুদ্ধাপরাধী রাজাকার-শিরোমণি গোলাম আজম আমাদের ঔদাসীনতার জন্যে যোগ্য শাস্তি না পেয়েই মরে গেলো, তার অনুসারী পাকিস্তানপন্থীদের জন্য এটা বড় বিজয়, আর আমাদের জন্য এটা চরম দুঃসংবাদ। আপনি পারবেন এর দায় অস্বীকার করতে? আপনার ঔদাস্যই কি এর জন্য দায়ী নয়? আপনার বিবেক কি বলে না, বিচার ও শাস্তি প্রদান প্রক্রিয়ায় সরকারের এই গাফিলতির প্রতিবাদ করা উচিত? এখন সরকারের প্রতি আস্থা রেখে ঘরে বসে থাকলে আপনার বিবেক কি আপনাকে ক্ষমা করবে? ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আপনি কি দায়মুক্ত থাকতে পারবেন?

আপিল বিভাগে কামারুজ্জামানের চূড়ান্ত রায় মৃত্যুদন্ড ঘোষিত হয়েছে এক মাসেরও বেশি হয়ে গেল, কবে তার ফাঁসি কার্যকর হবে? আপনার আমার ট্যাক্সের টাকায় কামারুজ্জামান আরামে বসে খাচ্ছে, কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী সাইদি আরামদন্ড পেয়ে আরামে আছে, তার মামলার রিভিউ করা হচ্ছে না, এসবের প্রতিবাদে কি আপনার সোচ্চার হওয়া উচিত না? আজ যদি আস্থা রেখে ঘরেই বসে থাকেন, আপনি আমি সবাই যদি ঘরেই বসে থাকি, তাহলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই এক গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। যুদ্ধাপরাধের বিচারে আমরা যখন থেকেই রাজপথে নেমেছি, ২০১৩ এর ৫ ফেব্রুয়ারি, তখন থেকেই আমাদের বিরোধীপক্ষ জামাত-শিবির-মৌলবাদের দানবটি সর্বশক্তি নিয়ে সক্রিয় হয়ে আছে। এই দানবটিকে চূড়ান্তভাবে নির্মূল করার আগে আর আমাদের ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। দানবটি কিন্তু বসে নেই, আমাদের ভাষা-সংস্কৃতি, দেশ, দেশের মানুষের উপর সে তার বিষদাঁত বসিয়েই যাচ্ছে। এই দানবটিকে জাগিয়ে রেখে আমরা ঘুমিয়ে থাকলে আমাদের পতন অনিবার্য।

IMG_105329626734759

তাই সকলের প্রতি অনুরোধ, যার যার অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সক্রিয় হোন জামাত-শিবিরের এই দানবটিকে নির্মূল করতে। সরকারের প্রতি আস্থা রেখে ঘরে বসে থাকার ফলাফল আপনার জন্য, আপনার ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য কখনোই সুখকর হবে না। হতাশ হওয়ার কোনো কারণ আমাদের নেই। দীর্ঘদিন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস আমাদের আছে। বৃটিশদের বিরুদ্ধে বাঙালি দুইশ বছর তার সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ২৪ বছর আমরা নিরন্তর সংগ্রামে থেকেছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ স্থায়ী হয়েছে মাত্র নয় মাস, এই যুদ্ধ আমাদের বহু বছর চালিয়ে যাওয়াও লাগতে পারতো, মুক্তিযোদ্ধারা কেউই ভাবেননি এত অল্পদিনে দেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। জীবনভর যুদ্ধ করার প্রত্যয় নিয়েই তারা নেমেছিলেন। তাই এত অল্পদিনের সংগ্রামে আমাদের ঝিমিয়ে পড়ে হাল ছেড়ে দেয়া হবে পূর্বপুরুষের রক্তের প্রতি অপমান। তাই আসুন, আবারো সোচ্চার হই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তরান্বিত করার দাবিতে, সরকারকে বাধ্য করি দ্রুততার সাথে কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকর ও অন্যান্য মামলার কার্যক্রম আরো দ্রুত চালিয়ে যেতে। পূর্বপুরুষদের সংগ্রামের ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখলে একাত্তরের মতো এবারও আমাদের বিজয় কেউ আটকে রাখতে পারবে না।

জয় বাংলা।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/reazulalambhuiyan/31849.html

 1 টি মন্তব্য

  1. রিয়াজুল আলম

    যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাইলেই যেখানে জলকামান দাগানো হয়, সেখানে সরকারের উপর কোন যুক্তিতে আস্থা রাখবে মানুষ?

মন্তব্য করুন