রাজু রণরাজ-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

কবি দাউদ হায়দার (জন্মই যার আজন্ম পাপ)…

লিখেছেন: রাজু রণরাজ

কবি দাউদ হায়দারের জন্ম ১৯৫২
সালে পাবনায়।
১৯৭৩ সালে তার বয়স যখন একুশ, তখন
তিনি একটা কবিতা লিখেন ‘কালো সূর্যের
কালো জ্যোত্স্নায় কালো বন্যায়’, যেটায়
তিনি বড়
তিনটি ধর্মের প্রবর্তকদের সমালোচনা করেন।
তাছড়া তার “জন্মই আমার আজন্ম
পাপ”কবিতাও প্রবল বিতর্কিত হয়।
দেশে বিতর্কের ঝড় ওঠে। ঢাকা কলেজের এক
শিক্ষক তার নামে মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ
তাকে নিরাপত্তা-হেফাজতে নেয় এবং ১৯৭৪
সালের
২০শে মে।মৌলবাদ দোসরদের ক্রমাগত
উত্তাপে তার নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়
দেখা দিলে তাকে ছেড়ে দিয়ে ২১শে মে একটি বিমানে
চড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গে পাঠিয়ে দেয়া হয়,
যে বিমানে তিনি ছাড়া আর কেউ
যাত্রী ছিলেন
না। তাঁর কাছে সে সময়
ছিল মাত্র ৬০
পয়সা এবং কাঁধে ঝোলানো একটা ছোট ব্যাগ
(ব্যাগে ছিল কবিতার বই, দু’জোড়া শার্ট) ।
তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমান।
মুসলিমবিশ্বের কুদৃষ্টিতে পড়বার আশঙ্কায়
শেখ
মুজিবও দাউদকে আশ্রয় দেননি।
কলকাতা ছিল তার কাছে একদম
অচেনা বিদেশে যেখানে কাউকেই চিনতেন
না।
তিনি দমদম
এয়ারপোর্টে নেমে প্রথমে কাঁদছিলেন।
কলকাতা
য় তিনি প্রথম গৌরকিশোর ঘোষের
কাছে আশ্রয়
পান। তিনি সেখানে একমাসের মতো ছিলেন।
তিনি সেখানে লেখালেখি শুরু করেন।
কলকাতার
কঠিন বাস্তবতার মাঝে তিনি দ্য স্টেটসম্যান
পত্রিকায় লেখা শুরু করেন। তার
জীবনে প্রেমও
আসে সেখানে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণী,
তাকে প্রেম নিবেদন করে। তারপরও
তিনি বুঝতে পারেন
যে তিনি একা কলকাতা শহরের মতোই।
তিনি সেখানে একজন আগন্তুক মাত্র। ১৬
আগস্ট
২০০৯ সালের সমকালে লেখা তাঁর
কলামে (বঙ্গবন্ধু ও অন্নদাশঙ্কর) দেখা যায়
১৯৭৫
সালের আগস্ট মাসে তিনি যাদবপুর
বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আন্তর্জাতিক তুলনামূলক
সাহিত্যের’ ছাত্র ছিলেন। কলকাতায়
তিনি সমাদৃত হন।
বাইশ বছরের অসহায় দাউদকে কোলকাতায়
পুত্রস্নেহে আশ্রয় দেন কবি অন্নদাশঙ্কর রায়।
একপর্যায়ে ভারত সরকারও দাউদকে আশ্রয়
দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
’৭৬-এ দাউদ
হায়দার তার পাসপোর্ট নবায়নের জন্য
কলকাতাস্থ বাংলাদেশ
ডেপুটি হাইকমিশনে জমা দিলে তা আটক
করে বাজেয়াপ্ত করা হয়।স্বৈরশাসক হুসেইন
মুহম্মদ এরশাদ
ক্ষমতায় এলে তিনি আটক পাসপোর্ট ফেরত
চেয়ে আবেদন করেন। তার পাসপোর্ট ফেরতের
ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এরশাদ সরকারও।
ওই পাসপোর্ট আজো ফেরত
পাননি আগুনমুখী কবি।
পাসপোর্ট ছাড়া অন্য
আরেকটি দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসে সমস্যা
দেখা দেয়। ভারত সরকার দায়িত্ব নিতে চায়
না নির্বাসিত কবির। তিনি অন্য
কোনো দেশেও যেতে পারেন না পাসপোর্টের
অভাবে। এমন এক দুঃখকালে তার
পাশে এসে দাঁড়ান কবিবন্ধু নোবেল
বিজয়ী জার্মান কবি গুন্টার গ্রাস।
তিনি জার্মান সরকারের
উচ্চপর্যায়ে কথা বলে বাংলাদেশ
থেকে নির্বাসিত কবিকে রাজনৈতিক আশ্রয়
দেয়ার ব্যবস্থা করেন। ’৮৫-এর কোনো এক
ভোরে জার্মানির বার্লিনে গিয়ে পৌঁছান
দাউদ হায়দার। জাতিসংঘের বিশেষ
‘ট্রাভেল
ডকুমেন্টস’ নিয়ে এখন ঘুরছেন দেশান্তরে।
উৎসাহী পাঠকদের জন্য তার সেই অমর
সৃষ্টি তুলে ধরা হলঃ
“”জন্মই আমার আজন্ম পাপ”"
জন্মই আমার আজন্ম পাপ, মাতৃজরায়ু
থেকে নেমেই
জেনেছি আমি
সন্ত্রাসের ঝাঁঝালো দিনে বিবর্ণ পত্রের মত
হঠাৎ
ফুৎকারে উড়ে যাই
পালাই পালাই সুদূরে
চৌদিকে রৌদ্রের ঝলক
বাসের দোতলায় ফুটপাতে রুটির
দোকানে দ্রুতগামী
নতুন মডেলের
চকচকে বনেটে রাত্রির জমকালো আলো
ভাংগাচোরা চেহারার হদিস
ক্লান্ত নিঃশব্দে আমি হেঁটে যাই
পিছনে ঝাঁকড়া চুলওয়ালা যুবক। অষ্টাদশ
বর্ষীয়ার
নিপুণ ভঙ্গী
দম্পতির অলৌকিক হাসি প্রগাঢ় চুম্বন
আমি দেখে যাই, হেঁটে যাই, কোথাও সামান্য
বাতাসে উড়ে যাওয়া চাল-
অর্থাৎ আমার নিবাস।
ঘরের স্যাঁতসেতে মেঝেয় চাঁদের
আলো এসে খেলা করে
আমি তখন সঙ্গমে ব্যর্থ, স্ত্রীর দুঃখ অভিমান
কান্না
সন্তান সন্তুতি পঙ্গু
পেটে জ্বালা, পাজরায় তেল মালিশের বাসন
উধাও-
আমি কোথা যাই? পান্তায় নুনের অভাব।
নিঃসংগতাও দেখেছি আমি, উৎকন্ঠার
দিনমান
জ্বলজ্বলে বাল্বের মতোন
আমার চোখের মতো স্বজনের চোখ-
যেন আমুন্ড গ্রাস করবে এই আমাকেই
আমিই সমস্ত আহার নষ্ট করেছি নিমেষে।
শত্রুর দেখা নেই, অথচ আমারি শত্রু আমি-
জ্বলন্ত
যৌবনে ছুটি ফ্যামিলি প্ল্যানিং কোথায়
কোথায় ডাক্তার কম্পাউন্ডার
যারা আমাকে অপারেশন করবে?
পুরুষত্ব বিলিয়ে ভাবি, কুড়ি টাকায় একসের
চাল ও
অন্যান্য
সামান্য দ্রব্যাদী মিলবে তো?
আমার চৌদিকে উৎসুক নয়ন আহ্লাদী হাসি
ঘৃণা আমি পাপী
এরা কেন জন্ম নেয়?
এরাই তো আমাদের সুখের বাধা অভিশাপ।
মরণ এসে নিয়ে যাক, নিয়ে যাক
লোকালয়ের কিসের ঠাঁই এই শত্রুর?
-বলে
প্রাসাদ প্রেমিকেরা
আমিও ভাবি তাই, ভাবি নতুন মডেলের চাকায়
পিষ্ট হবো
আমার জন্যই তোমাদের এত দুঃখ
আহা দুঃখ
দুঃখরে!
আমিই পাপী, বুঝি তাই এ জন্মই আমার আজন্ম
পাপ।
সূত্রঃ
উইকিপিডিয়া,
প্রিয়.কম,
কবিতার খাতা,
কবি ও কবিতা।আগুনের বিপ্লবের মানবতার কবি দাউদ হায়দার

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/raju-ronoraaj/25732.html

 2 টি মন্তব্য

  1. খাজা বাবা
  2. রাজু রণরাজ

    খাজা বাবা খাজা বাবা।মারহাবা মারহাবা।

মন্তব্য করুন