rajibnoor-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

ধাবমান কালো চোখে আলো নাচে ( ধারাবাহিক উপন্যাস, পর্ব- এক )

লিখেছেন: rajibnoor

শশীভূষন প্রতিদিন রাতে ঘুমোবার আগে এক ঘন্টা নিয়ম করে ডায়েরী লিখেন। তিনি ডায়েরীতে প্রতিদিনকার ঘটনা লিখেন না। নিজের মতন করে লিখেন, অতীত দিনের দুঃখ-কষ্ট এবং আনন্দের কথা। শশীভূষনের একমাত্র মেয়ে অলকা স্কলারশীপ পেয়ে মাইক্রোবায়োলজি পড়তে আমেরিকা গিয়েছে। অলকা নিয়মিত তার বাবার খোঁজ খবর রাখছে। শশীভূষন মনে করেন তার স্ত্রী অপলা বেঁচে থাকলে অলকার মতন এত নজদারী করতো না। মাঝে মাঝে তার খুব রাগ হয়। অলকা বলে দিয়েছে, শশীভুষন যেন রাত এগারো টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুম না এলেও যেন চোখ বন্ধ করে ভেড়া গুনেন। শশীভূষন ভেড়া না গুনে এলোমেলো কথা ডায়েরীতে লিখেন। একটানা লিখতে পারেন না চোখের সমস্যার কারনে। একটু পরপর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখেন।

শশীভূষনের জন্ম ভারতের আসাম রাজ্যে। সেই সময় আসামে অনেক চা বাগান ছিল। আসামের চা বাগান গুলোতে তার অনেক স্মৃতি জড়িত। তখন চা বাগানের পাশ দিয়ে সব সময় হাতী চলাচল করত। কতদিন সে নিজে একাই হাতীর পিঠে চড়েছে। দেশ ভাগের পর অধুনা বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হোন। দেশ বিভাগের পর লাখ লাখ উদ্বাস্তু মানুষ যখন দেশ ছাড়ছিল, তখন হেলিকপ্টার থেকে তা দেখে জিন্নাহ কপাল চাপড়ে বলেছিলেন, এ তিনি কী করলেন! আসাম বাংলাদেশের একেবারেই সীমান্তঘেঁষা এলাকা। আসামের বেশীর ভাগ মানুষই হিন্দু ধর্মের। সেই সময় আসামে জাতি, ধৰ্ম, বৰ্ণ নির্বিশেষে ‘বিহু’ নামে উৎসব পালন করতো। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর আসাম রাজ্যের অর্থনৈতিক সমস্যা প্রকট হতে শুরু করেছিল।

শশীভূষন তার ডায়েরীতে লিখতে শুরু করলেন- বাংলাদেশের মানুষ ১৯৪৭-১৯৭১ এই সময়কে পাকিস্তান আমল হিসাবে উল্লেখ করে থাকে। রাজনৈতিক নিপীড়নের স্বীকার হয়ে জান-মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তাহীনতার কারণে নিরূপায় হয়ে অনেক সময় মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। দেশ ভাগের সময়ে সে দেশের বড় বড় হিন্দু জমিদারেরা লক্ষ লক্ষ বর্গ একর জমি ছেড়ে ভারতে চলে আসেন। তখন সেই জমির অধিকার পান দরিদ্র মুসলিম চাষিরা। এভাবে পূর্ব পাকিস্তানে কোনও আইন বা আন্দোলন ছাড়াই ভূমি সংস্কার হয়ে যায়। ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশদের শাসনের সূত্রপাত হয় ১৭৫৭ সালে। এরপর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত নানা ষড়যন্ত্র ও কৌশলে ব্রিটিশরা তাদের আধিপত্য ধরে রাখে। …শশীভূষন লেখা বন্ধ করে ব্যালকনিতে গিয়ে দাড়ালেন। কিছুক্ষন আকাশ দেখবেন বলে। শশীভূষন আকাশ দেখতে থাকুক, আমরা কিছুক্ষনের জন্য অন্য দিকে নজর দেই ।

গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আজ একটা ছেলে প্রথম ক্লাশ করতে এসেছে। ছেলেটির বয়স সাত বছর। তাকে নিয়ে এসেছে- তার বড় বোন ফাতেমা বেগম । ছেলেটি হাসি মুখে ক্লাশে রুমে ঢুকে প্রথম বেঞ্চে বসল । অন্য ছেলেদের মতন সে কোনো কান্নাকাটি করল না। এই সাহসী বালকের মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। স্কুল ছুটির পর বালক একা একা হেঁটে বাসায় ফিরল । তার মেজ বোন আছিয়া বেগম ভাইকে আনতে স্কুলে যেতে চেয়েছিল- কিন্তু বালক চিৎকার করে বলেছে- আমি একাই আসতে পারব- এতটুকু পথ। এই বালক ১৯৩৮ সনে আঠারো বছর বয়সে ফজিলাতুন্নেসা নামক এক তরুনীকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির ঘরে দুই কন্যা এবং তিন পুত্রের জন্ম হয়। কন্যারা হলেন শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। পরে যথা সময়ে এই বালকের আরও কাহিনী বলা হবে।

এখন, শশীভূষনের মেয়ে অলকা’র কাছে যাওয়া যাক। অলকা থাকে আমেরিকার ফারগো নামক শহরে। ফারগো শহরটি ছবির মতন সুন্দর। এলিন নামের এক বৃদ্ধার কাছ থেকে অলকা দুই রুমের একটা ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছে। অলকা’র ঘরটি ছোট কিন্তু ঘুব সাজানো গুছানো । অলকা অনেক কষ্টে এই শহরকে আপন ভাবতে শিখেছে। তার পাশের ফ্ল্যাটে থাকে মেরি নামের একটি মেয়ে। মেরি ফারগো শহরে এসেছে চীন থেকে। অলকার সাথে সে মাইক্রোবায়োলজিতে পড়ছে। মেরি খুব মিশুক এবং হাসিখুশি টাইপ মেয়ে। মেরির সাহস অত্যাধিক । সেদিন ক্লাশ শেষে মেরি জোর করে অলকাকে নিয়ে গেল পার্কে। পার্কে এক বুড়ো মেরির বুকে হাত দেয়। অলকা প্রচন্ড অবাক হয়ে বুড়োর দিকে তাকিয়ে রইল । বুড়োর এমন ভাব করল- এটা কোনো ব্যাপার না। মেরি রেগে গিয়ে বুড়োকে দিল পেটের মধ্যে এক লাথথি। বুড়ো ছিটকে পড়ল ঘাসের উপর। মেরি বলল- আংকেল এক পা তো কবরে- এখন একটু সাবধান হোন ।

শশীভূষন ব্যালকনি থেকে এসে আবার লিখতে বসেছেন। এবার সে খুব দ্রুত লিখছেন। তার কেন জানি বারবার মনে হচ্ছে- তার হাতে সময় বেশী নেই । সে জানে তার লেখা কেউ পড়বে না এবং কোথাও ছাপা হবে না। এই জন্য সে অনেক নিশ্চিন্ত। কিন্তু সম্পূর্ণ লেখাটা শেষ না করে মরে গেলে, সে মরেও শান্তি পাবে না। চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে শশীভূষন লিখতে শুরু করলেন- ১৯৫০ খ্রীস্টাব্দে ভূমি সংস্কারের অধীনে জমিদার ব্যবস্থা রদ করা হয়। অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী সহ পূর্ব বাংলার নেতারা উপলব্ধি করেন যে, বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম অধ্যুষিত এই জনপদের নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য দরকার পুর্নাঙ্গ স্বাধীনতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে কলকাতার যেই সুশীল সমাজ ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে ছিলেন এই বলে যে ‘বঙ্গ ভাগ হয়ে যাচ্ছে’; সেই সুশীলরাই আবার ১৯৪৭ সালে বঙ্গ কে ভেঙ্গে পশ্চিমবঙ্গকে ভারতমাতার সাথে অন্তর্ভুক্তির দাবী জানাতে থাকে। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগ না হলে বংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র পৃথিবীর মানচিত্রে আবির্ভূত হবার প্রশ্ন আসতো না। আমরা হয়তো আজও অখণ্ড ভারতের অধীনে থাকতাম।

পত্রিকা হাতে নিয়ে ওমর আলী সকাল বেলা বারান্দায় বসেছে। সে এখন আরাম করে পত্রিকা পড়বে। এটা তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস । ওমর আলীর স্ত্রী সরলা বিবি তার স্বামীর উপর খুবই বিরক্ত । সরলা বিবি মনে করেন- তার স্বামীর মতন অলস মানুষ এই পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। শুধু অলস হলেও চলতো- সাংঘাতিক বোকা। সরলা বিবির বিশাল ব্যবসা। ইন্ডিয়া থেকে কাসার থালা, প্লেট, মগ এনে এখানে বিক্রি করেন। তার তেরটা বেবী টেক্সী আছে। শাড়ি কাপড়ের ব্যবসা আছে। সব তার একা সামলাতে হয়। ওমর আলীকে ৫০ টা শাড়ি দিয়ে লক্ষ্মীবাজার পাঠিয়ে ছিলেন- ওমর আলী বাসায় ফিরে কিছুই বলতে পারলেন না- শাড়ি কোথায় ? কাকে দিয়েছে ? ওমর আলী সব ভুলে যান। সরলা বিবি এখন নিজেই সব করেন- আর ওমর আলী বাসায় বসে পেপার পড়েন আর রেডিও শুনেন। এখানে একটা কথা বলে রাখতে চাই- দেশ ভাগের কারনে ওমর আলী এবং সরলা বিবি আসাম থেকে এদেশে চলে আসেন।

ওমর আলীর হাতে দৈনিক আজাদ পত্রিকা। সময়টা হলো- ১৯৩৭ সালের ২৩ শে এপ্রিল । পত্রিকার একটি খবরের দিকে তার চোখ আটকে গেল । সে তার স্ত্রীকে বলল- তাড়াতাড়ি এক কাপ চা নিয়ে এসে আমার পাশে বসো। ওমর আলী চা শেষ করে- তার স্ত্রীকে পত্রিকা পড়ে শোনাচ্ছ। সেই খবরের কিছু অংশ আমি হুবহু তুলে দিলাম- “এই বিস্তৃত ভূখন্ডে (বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চল) প্রায় ৭ কোটি ৩০ লক্ষ লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। হিন্দী ভাষীর সংখ্যা এর চেয়ে বেশি নয়। ত্‌হা ছাড়া আসামী, উড়িয়া ও মৈথিলিও বাংলারই শাখা বলিয়া অত্যুক্তি হয় না। পূর্ববঙ্গে, পশ্চিমবঙ্গে ও বাংলার বিভিন্ন জেলায় উচ্চারণের কিছু প্রভেদ আছে বটে, কিন্তু লেখ্য বাঙ্গলার রূপ সর্বত্র একই। সাহিত্যের দিক দিয়ে বাংলা ভারতের সব প্রদেশীক সাহিত্যের মধ্যে শ্রষ্ট বাংলা ভাষার বিধিক ভাব প্রকাশোপযোগী শব্দের সংখ্যা বেশি। অতএব বাংলা সবদিক দিয়াই ভারতের রাস্ট্রভাষা হইবার দাবি করিতে পারে। রাষ্ট্রভাষার আসনের উপর বাংলা ভাষার দাবি সম্বন্ধে আর একটি কথাও বিশেষভাবে জোর দিয়া বলা যাইতে পারে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জলপাইগুড়ি নয়াবস্তি এলাকায়, ছোট একটা বাচ্চা উঠানে একা একা আপন মনে খেলছে। বাচ্চাটি নতুন হাঁটা শিখেছে। দু’ পা হেঁটেই পরে যাচ্ছে আবার উঠে দাড়াচ্ছে- আবার পড়ে যাচ্ছে। এই বাচ্চাটির ডাক নাম পুতুল । তার বাবা ইস্কান্দর মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। ১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে পুতুলের বিয়ে হয়- কমল নামের এক হাসি খুশি তরুনের সাথে । পুতুলের বয়স তখন সতের বছর। জিয়াউর রহমানের ডাক নাম কমল। জিয়া তখন ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ডি এফ আই এর অফিসার হিসাবে তখন দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন। এখানে একটা কথা উল্লেখ করতে চাই, বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেবার পর থেকে মোট চার বার বেগম খালেদা জিয়া গ্রেফতার হন। সর্বশেষ তিনি ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর ৩ তারিখে দূর্নীতির অভিযোগে পুত্রসহ গ্রেফতার হন

( চলবে… ) rajib128_1370861348_1-195885_3577364521753_1046741376_n_1_

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/rajibnoor/23587.html



মন্তব্য করুন