রাইয়ান-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

লালন শাহ

লিখেছেন: রাইয়ান

লালন শাহ ছিল এমন ই একজন যার সারাটা জীবন কেটেছে মানুষের জন্য ।মানবতাকে সবচেয়ে বড় ধর্ম হিসেবে বিশ্বাস করতেন তিনি । ফকির লালন শাহ্ এর জীবন নিয়ে অনেক বিতর্ক সৃষ্টি হয় ।তার জন্মের সময় নিয়েও অনেককে তর্ক করতে দেখা যায় ।
অনেকের ধারনামতে ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশের) যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হারিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন ফকির লালন শাহ।লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ভাড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন।তবে এই তথ্য অনেকেই বিশ্বাস করেনা ।এই মতের সাথেও অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন। বাংলা ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহম্মদী পত্রিকায় এক প্রবন্ধে লালন শাহ এর জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ী গ্রামে বলে উল্লেখ করা হয়।
হিতকরী পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ নিবন্ধে বলা হয়েছে ,

 

লালন তরুন বয়সে একবার তীর্থভ্রমণে বের হয়ে পথিমধ্যে গুটি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। তখন তার সাথীরা তাকে মৃত ভেবে পরিত্যাগ করে যার যার গন্তব্যে চলে যায়। কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা মুমূর্ষু লালনকে উদ্ধার করেন মলম শাহ। মলম শাহ ও তার স্ত্রী মতিজান তাকে বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রষা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এরপর লালন তার কাছে দীক্ষিত হন এবং কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়াতে স্ত্রী ও শিষ্যসহ বসবাস শুরু করেন। গুটিবসন্তরোগে একটি চোখ হারান লালন। ছেঊরিয়াতে তিনি দার্শনিক গায়ক সিরাজ সাঁইয়ের সাক্ষাতে আসেন এবং তার দ্বারা প্রভাবিত হন।

 

লালন শাহ ধর্ম ,বর্ন সবার উপর মানবতাকে বড় করে দেখছেন।মানবতার জয় চেয়েছে তার সমস্ত্য জীবনে ।মানুষের জীবন থেকে পশুত্ব দূর করতে চেয়েছে চিরতরে । তার বিখ্যাত একটি গানঃ

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।
লালন বলে জাতের কি রূপ
দেখলাম না এই নজরে।।
কেউ মালায় কেউ তসবি গলায়,
তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায়।
যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়,
জাতের চিহ্ন রয় কার রে।।

লালনের আত্মতত্ত্ব হিসেবে পরিচিত অসাধারন এই লাইনগুলা।মানুষের চেয়ে বড় মানবতার চেয়ে উপরে যে বড় কেউ হতে পারেনা তাই বুঝিয়েছে ফকির লালন শাহ ।
লালন বেশ কিছু জায়গায় নিজেকে ফকির বলে সম্বোধন করেছে ।তার ধর্ম নিয়েও অনেককে অনেক দ্বিমত পোষন করতে দেখা যায় । লালনের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে উপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন,

‘‘লালন ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কোনোও বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে।’’

অনেকে বিশ্বাস করে লালন ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী আবার অনেকের ধারনা সে সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী। তবে নিজের বিশ্লেষন থেকে মনে হয় লালন ধর্মকে জীবনে তেমন কোন গুরত্ব ই দেইনি ।

একটি গানে লালনের প্রশ্নঃ
‘‘সব সৃষ্টি করলো যে জন তারে
সৃষ্টি কে করেছে
সৃষ্টি ছাড়া কি রূপে সে সৃষ্টিকর্তা নাম ধরেছে”

লালন অনুসারী মন্টু শাহের মতে, তিনি হিন্দু বা মুসলমান কোনটিই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন ওহেদানিয়াতনামক একটি নতুন ধর্মীয় মতবাদের অনুসারী। ওহেদানিয়াতের মাঝে বৌদ্ধধর্ম এবং বৈষ্ণব ধর্মের সহজিয়া মতবাদ, সুফিবাদ সহ আরও অনেক ধর্মীয় মতবাদ বিদ্যমান।

কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অনেকের সঙ্গে লালনের পরিচয় ছিল বলে অনেকের নানা লেখা থেকে পাওয়া যায়।কিন্তু এই ঠাকুরদের সঙ্গে কোন এক বিশেষ কারনে লালনের একবার সংঘর্ষ ঘটে ।ধারনা করা হয় তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কুষ্টিয়ার কুমারখালির কাঙাল হরিনাথ মজুমদার গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এরই একটি সংখ্যায় ঠাকুর-জমিদারদের প্রজা পীড়নের সংবাদ ও তথ্য প্রকাশের সূত্র ধরে উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তারা বিষয়টির তদন্তে প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানে আসেন। এতে করে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ওপর বেজায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ঠাকুর-জমিদারেরা। তাঁকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে লাঠিয়াল পাঠালে শিষ্যদের নিয়ে লালন সশস্ত্রভাবে জমিদারের লাঠিয়ালদের মোকাবিলা করেন এবং লাঠিয়াল বাহিনী পালিয়ে যায়। এর পর থেকে কাঙাল হরিনাথকে বিভিন্নভাবে রক্ষা করেছেন লালন ।তবে ঠাকুর পরিবারের অনেকের জীবনাদর্শেই লালনের প্রভাব দেখা যায় ।

লালন নিজেকে কয়েক জায়গায়’ফকির’ বলেছেন, এরপরই তাকে আবার কয়েক জায়গায়’বাউল’ বলেছেন, যেখানে বাউল এবং ফকিরের অর্থ পারস্পরিক সংঘর্ষপ্রবণ।

বাউল একটি বিশেষ লোকাচার ও ধর্মমত।বাউল গান বর্তমান বিশ্বে এক ঐতিহ্য ।লালনকে বাউল গানের একজন অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।বাউল মত সতেরো শতকে জন্ম নিলেও লালনের গানের জন্য ঊনিশ শতকে বাউল গান জনপ্রিয়তা অর্জন করে।এখনো পর্যন্ত সেই জনপ্রিয়তা বহাল আছে এবং ভবিষ্যতেও তা থাকবে । বাউল গান মানুষের জীবন দর্শন সম্পৃক্ত বিশেষ সুর সমৃদ্ধ।

২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে বিশ্বের মৌখিক এবং দৃশ্যমান ঐতিহ্যসমূহের মাঝে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে ঘোষনা করে।তার পিছনে অন্যতম অবদান লালনের ।
Baul philosophy, especially the thought, practice, and music of Lalon Shai is an important part of the national life and tradition of Bangladesh.

মনের কথা বলবো কারে
মন জানে আর জানে মরম
মজেছি মন দিয়ে যারে।।
মনের তিনটি বাসনা
নদীয়ায় করবো সাধনা
নইলে মনের বিয়োগ যায় না
তাইতে ছিদাম এ হাল মোরে।।
কটিতে কৌপীন পরিবো
করেতে করঙ্গ নেবো
মনের মানুষ মনে রাখবো
কর যোগাবো মনের শিরে।।
যে দায়ের দায় আমার এ মন
রসিক বিনে বুঝবে কোনজন
গৌর হয়ে নন্দের নন্দন
লালন কয় তা বিনয় করে।

লালনকে নিয়ে কয়েকটি চলচিত্র ও তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ হাসান ইমাম পরিচালনা করেন লালন ফকির চলচিত্রটি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে একই নামে একটি চলচিত্র নির্মাণ করেন। ম. হামিদ ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে পরিচালনা করেন তথ্যচিত্র দ্যাখে কয় জনাযা বাংলাদেশে টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়। তানভীর মোকাম্মেল১৯৯৬ সালে পরিচালনা করেন তথ্যচিত্রঃ অচিন পাখি। ২০০৪ সালে তানভির মোকাম্মেলের পরিচালনায় লালননামে একটি চলচিত্র নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ২০১০ এ সূনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে গৌতম ঘোষ মনের মানুষনামে একটি চলচিত্র নির্মাণ করে যা ২০১০ খ্রিস্টাব্দে ৪১তম ভারত ফিল্ম- ফ্যস্টিভ্যালে সেরা চলচ্চিত্রর পুরষ্কার লাভ করে। উল্লেখ্য যে এই চলচ্চিত্রে লালনকে কোন উল্যেখযোগ্য সূত্র ছাড়াই হিন্দু হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই চলচ্চিত্রটি অনেক সমালোচনার মুখোমুখী হয়।
বর্তমান যুগে অনেকেই ,অনেক ব্যন্ড লালন সংগীতকে বিভিন্ন ভার্ষন করছে এবং এ নিয়ে নতুন করে অনেক দ্বিমত ও প্রকাশ করছে ।তবে আমার মতে , এইভাবে উপস্থাপন করে কোন ভুল নয় বরং লালনকে তরুন সমাজের মাঝে নতুন করে জানার একটা সুযোগ করে দিচ্ছে ।
লালনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গানঃ
*.আমি অপার হয়ে বসে আছি
*.সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে
*.জাত গেলো জাত গেলো বলে
*.খাঁচার ভিতর অচিন পাখী কেমনে আসে যায়
*.আপন ঘরের খবর লে না
*.আমারে কি রাখবেন গুরু চরণদাসী
*.মন তুই করলি একি ইতরপনা
*.এই মানুষে সেই মানুষ আছে
*.যেখানে সাঁইর বারামখানা
*.বাড়ির কাছে আরশিনগর
*.আমার আপন খবর আপনার হয় না
*.দেখ না মন, ঝকমারি এই দুনিয়াদারী
*.ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফান্দ পেতে
*.সব সৃষ্টি করলো যে জন
*.সময় গেলে সাধন হবে না
*.আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে
*.তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে
*.এসব দেখি কানার হাট বাজার
*.মিলন হবে কত দিনে
*.কে বানাইলো এমন রঙমহল খানা

লালন আমৃত্যু ‘মহৎ উদ্বেগ’ ভোগ করেও মহৎ এক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, মানুষকে ঈশ্বরের (মানুষ গুরু) অনুসন্ধানে মগ্ন থাকতে বলেছেন । বলেছেন, তাহলেই মানবজীবনের সব সাধনা সার্থক।
এভাবে ‘মহৎ উদ্বেগের’ অবসান হয়েছিল কিনা তা লালনই জানেন।
-ইমন জুবায়ের
১৭ই অক্টোবর ১৮৯০সালে পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় ফকির লালন শাহ ।তবে তিনি বেঁচে থাকবেন আজীবন ।বেঁচে থাকবেন তার অমর গানের মাধ্যমে ।বেচে থাকবেন তার মতের মাধ্যমে । যেই মানবধর্ম সে অন্তরে ধারন করত সেই মানবধর্মের মধ্যেই সে বেঁচে থাকবে আমাদের মাধ্যমে ।
জানিনা কতটুকু কি জোগাড় করে লিখতে পেরেছি ।ভুলত্রুটি হলে নিজ গুনে মাফ করে দিয়ে ঠিক করে দিবেন ।

 

লালন শাহ বেঁচে থাকুক সবার অন্তরে… ।

 

উৎসর্গঃ তারিক লিংকন

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/raiaan/24193.html

 2 টি মন্তব্য

  1. বি এম বেনজীর আহম্মেদ

    লালন মানবতাকে ধর্ম করেছিল!!! আজ আমরা বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন মতবাদে পৃষ্ঠ হয়ে করুন দৃষ্টিতে হয়ত মানবতাকেই খুঁজি!!! যে মানবতা এই বিভিন্ন ধর্ম পালনে ব্রত মানুষেরা পায়ের নিচে দাবিয়ে রেখেছে!! :( 

  2. রাইয়ান

    তবে তারা দাবায় রাখতে পারবেনা। মানবতার জয় হবেই :) 

মন্তব্য করুন