পথিক-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

থামবে কবে সীমান্তে হত্যা?

লিখেছেন: পথিক

বর্ডার-কিলিং বা সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যা একটি বহুল আলোচিত ইস্যু যা সমাধানে যতটা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তারচেয়ে বেশী হয়েছে এ ইস্যুর রাজনীতিকরণ। ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ সালের ১৭ই আগস্ট রেডক্লিফ লাইন ঘোষিত হলে পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কাশ্মীরে সীমান্ত নির্দিষ্ট হয়। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো বিস্তৃত হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের সীমান্তে। সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রভাব পড়ে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ শুধু পাক-ভারত বৈরিতার প্রভাবমুক্তই হয়নি, স্বাধীনতার মাত্র তিনমাস পর মিত্রবাহিনীর দেশত্যাগের দৃষ্টান্তও স্থাপিত হয় – যা বিশ্বের ইতিহাসে অনন্য ঘটনা। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই অর্থনীতি ও পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে রাজনীতি’র প্রভাব সীমান্তে পড়লেও মূলত ৯/১১ এর পর সীমান্তে হত্যাকাণ্ড সমস্যা প্রকট হয়ে ওঠে। ফেলানী বা বাংলাদেশী নির্যাতনের বহু ঘটনা অজ্ঞাতেই রয়ে যায়।

সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান
২০০৯ সালে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধে হিউমেন রাইটস ওয়াচ একটি রিপোর্ট প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। ২০১১ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায় বিএসএফ গত ১২ বছরে ৯০০ জনকে হত্যা করেছে। (Human Rights Watch. Retrieved 21 January 2011).

সাম্প্রতিক সময়ের পরিসংখ্যানের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ৩৫০ জন বাংলাদেশীকে বিএসএফ গুলি করে হত্যা করেছে। ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে বিএসএফ এক সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করে যে তারা বিগত ছয় মাসে ৫৯ জনকে গুলি করে হত্যা করেছে যার ৩৪ জন বাংলাদেশী এবং ২১ জন ভারতীয়; ৪ জনের পরিচয় পাওয়া যায় নাই। (http://in.reuters.com/article/topNews/idINIndia-35156020080824);

আগস্ট ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৭৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। ২০০৯ সালের ফেলানীর ঘটনা এবং সম্প্রতি ভারতের এনডিটিভিতে ঘুষ না দেয়ায় বিএসএফ কর্তৃক নির্যাতনের ভিডিও প্রচারিত হলে তা ব্যাপকভাবে আলোচিত সমালোচিত হয়।

সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের কারণ

১) সীমান্তে হত্যার প্রধান কারণ হিসেবে ভারত ক্রস-বর্ডার টেররিজমকে উল্লেখ করে থাকে। বিভিন্ন সময়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলার প্রভাব পড়ে সীমান্তে। আসামের উলফাসহ বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এবং পাকিস্তানের আইএসআই পরিচালিত জঙ্গিদের দমন কার্যক্রমে বেশীরভাগ শিকার হয় নিরীহ জনগণ। গুলিতে নিহত অজ্ঞাত বা পরিচয়হীনরা বিএসএফ এর জবাবদিহিতার একটি একটি বিষয় হিসেবে উপস্থাপিত হতে সহায়তা করে।

২) দ্বিতীয় কারণটি উল্লেখ করা হয় অবৈধ অভিবাসনকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে দেখা যায় পালিয়ে থাকা প্রায় সকল শীর্ষ-সন্ত্রাসীদের অবস্থান ভারতে। ভারতীয় মিডিয়ায় অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে এক কোটি পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে আসামে মুসলিম জনসংখ্যা ক্রমশ: বৃদ্ধির কারণ হিসেবে তারা অবৈধ অভিবাসনকে চিহ্নিত করেছে। অভিবাসন বন্ধে মনঃস্তাত্তিকভাবে প্রভাবিত করতে ব্যবহৃত হয় বর্বর পন্থা।

৩) বাংলাদেশকে অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ করা হয়ে থাকে। দশ-ট্রাক অস্ত্র উদ্ধার সে অভিযোগের সত্যতা প্রকাশে ভূমিকা রেখেছে। এ ঘটনায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা করার বিষয়টিও আলোচিত।

৪) সীমান্তে হত্যার শিকার হওয়ার অন্যতম কারণ গরু চুরি বা পাচার। গৃহপালিত গরু সীমানা পেরিয়ে গেলে ফিরিয়ে আনার সময় সন্দেহভাজন হিসাবে গুলির শিকার হয়। আবার গরু পাচারের বিষয়টিও উল্লেখযোগ্য।

৫) চোরাচালান বর্ডার-কিলিং এর অন্যতম প্রধান কারণ। গরু বা অস্ত্র ছাড়াও ড্রাগস এবং বিভিন্ন পণ্য চোরাচালানের জন্য সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর কোন বিকল্প নেই। চোরাচালানীচক্র তাদের এই কাজে ব্যবহার করে বেকার কিংবা নারী ও কিশোরদের। পণ্য পাচারে দুদেশের সীমান্ত রক্ষীদেরই ঘুষ দিতে হয়। অস্ত্র বা ড্রাগস পাচারের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না। বিএসএফকে অবগত না করে কিংবা টাকা না দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করতে গেলে তাদের গুলির শিকার হতে হয়।

সীমান্ত ও হত্যা নিয়ে রাজনীতি
বাংলাদেশে যেমন ভারত-বিরোধিতা নিয়ে রাজনীতি করা হয় তেমনি ভারতেও বিজেপির মতো দলগুলো বাংলাদেশ বিরোধিতাকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে যার পরোক্ষ প্রভাব পড়ে সীমান্তে। কিন্তু পার্থক্য হল ভারতে জাতীয় স্বার্থে সকল দল ঐক্যবদ্ধ থাকে আর বাংলাদেশে ইস্যু খোঁজা হয় ক্ষমতা গ্রহণের সিঁড়ি হিসেবে। বিগত জোট সরকারের আমলে সীমান্তে ৩৫০ জন বাংলাদেশীকে হত্যা করা হয়েছে যা বন্ধে উল্লেখযোগ্য কোন পদক্ষেপই গৃহীত হয়নি। নদী কমিশনের আলোচনায় পানি নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি – এমন খবরও আমরা সংবাদে দেখেছি।

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী প্রায় সকল এলাকার জনপ্রতিনিধিগণ বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত। দু:খজনক হলেও সত্যি যে তাদের বড় একটি অংশ চোরাচালানীদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। চোরাচালান বন্ধে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী ছাড়াও বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম এই জনপ্রতিনিধিগণ। অথচ আমাদের সহজ-সরল জনগণের অনুভূতিকে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক স্বার্থে। ভোটের জন্য জীবনের চেয়ে ইস্যুই যেন বেশী প্রয়োজন।

সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের যতই কারণ দেখানো হোক এটি নি:সন্দেহে মানবতা বিবর্জিত একটি ঘটনা। বিএসএফ কর্তৃক হত্যাকাণ্ডের শিকার ভারতীয়দের সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ, মতান্তরে ৪০ শতাংশ। উল্লেখ্য কোন বাংলাদেশীকে হত্যা করা হলে আমরা অন্তত জানতে পারি কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই ভারতীয় নাগরিক নিহত হওয়ার বিষয়টি তাদের সংবাদ-মাধ্যমে প্রচারিত হয় না। সীমান্তে হত্যা বন্ধে সম্প্রতি ভারতে চারজন বিএসএফ সদস্যকে বরখাস্ত করাসহ সাতজনকে কারাদণ্ড দেয়ার সংবাদ পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের একটি ইতিবাচক দিক। হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা শূণ্যে আনার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। কারণসমূহ নির্দিষ্ট করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে যে উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে তা ফলপ্রসূ হবে বলে আশা করি।

লেখাটি সাপ্তাহিক কাগজে প্রকাশিত 

লেখক : আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল

Source : http://shaptahikkagoj.com/?p=567

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/pothik/105.html



মন্তব্য করুন