টিকটিকি-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

পঁচাত্তর পরবর্তী এক বিকেলে কোন পিতা-পুত্রের কথোপকথন

লিখেছেন: টিকটিকি

চা খাচ্ছিলেন কাশেম মিয়া । চোখেমুখে স্বস্তির ছাপ । ক্যু করে ক্ষমতা দখল করেছেন জিয়াউর রহমান। নাহ্, তার আর কোন বিপদ নাই ! সৌদি আরব,চীনসহ বাঘা বাঘা দেশগুলো ইতিমধ্যে স্বীকৃতি দিয়ে দিয়েছে । যুদ্ধাপরাধীদের বিচারটা বোধহয় এবার কবরের তলাতেই গেল! আহ্,শান্তি !

তাঁর সন্তান আশিফুল কাদের। মাত্র সাত বছর । এরমধ্যেই আরবি রপ্ত করে ফেলেছে । উর্দুও বেশ পারে । বাংলাটায় একটু কাঁচা । তবে বলতে সমস্যা হয় না । উনসত্তরের গণঅভুত্থানের পরপর তার জন্ম । মায়ের চাপে তাকে নরমাল স্কুলে ভর্তি করানো হয় । কাশেম মিয়ার ইচ্ছা ছিল তাকে হাফেজ বানাবেন । দেওবন্দ….না না, ঐসব মালাওনের দেশে না । এক্কেবারে সৌদি আরব থেকে মহা আলেম হয়ে আসবে তাঁর ছেলে । এসব হিন্দুয়ানী সিস্টেমের পড়ালেখায় ছেলেমেয়েদের মাথা বিগড়ে যায় । তারপরও আর কী করা,যুগের চাহিদা বলে তো একটা কথা আছে ।
আচমকা আশিফ এসে বাবাকে প্রশ্ন করে বসে,”আব্বু, মুক্তিযুদ্ধ কী ?”ছেলের প্রশ্ন শুনে তো কাশেম মিয়ার চোখ কপালে ! “তোকে এগুলা কে বলসে ?” “আব্বু বলই না ।”

বুঝতে পারলেন তিনি,তাঁর গুণধর পুত্র এসব কথা তার স্কুল থেকেই শিখেছে । থাক, জবাব তো দিতে হবে । “ও কিছু না আব্বু ওটা তো একটা গণ্ডগোল হইছিল যে ! তোমার ছোট চাচ্চুর ছেলে দুইটা মারামারি করে না ?”
“হ্যাঁ করে তো ”
“ঐরকম আর কী ! ওরাও মুসলমান, আমরাও মুসলমান । মুসলমান মুসলমান ভাই ভাই । ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারির মত আর কী !”
“তো আব্বু আমরা আলাদা হয়ে গেলাম কেন ? ”
“ঝগড়াটা একটু বেশি অইছিল তো, তাই । যেমন তোমার চাচা আর আমি আলাদা অই গেছি ।”

পুত্রকে সন্তুষ্ট দেখাল । পুত্রকে সন্তুষ্ট দেখে কাশেম মিয়াও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল । কিন্তু পুত্রের পরের প্রশ্নে কাশেম মিয়ার দম আটকানোর জোগাড়….”আব্বু, রাজাকার কী ?”

কাশেম মিয়ার গলার পানি শুকিয়ে গেছে । এই ছেলের মাথা পুরোপুরি বিগড়ে গেছে । এই প্রশ্ন কে শেখাল তাকে ? কিন্তু পরিস্থিতি তো সামাল দিতে হবে । “ওরা হল আব্বু খুবই শান্তিপ্রিয় মানুষ । ওরা দুই ভাইকে আলাদা করতে চায় নাই । যেমন তোমার আম্মু আর চাচী চায় নাই আমরা আলাদা হই ।”

নিজের মেধা দেখে হিংসে হচ্ছে কাশেম মিয়ার ! কী দারুণভাবেই না সে ছেলেকে ট্যাকল দিল !
কিন্তু আবার ধেয়ে আসে ছেলের কামানের গোলার মত নির্মম প্রশ্ন,”তাহলে আব্বু ওরা ভাই হয়ে কী করে ত্রিশ লক্ষ ভাইকে মারল ?”

একী শুনছে কাশেম মিয়া ? তাঁর ঔরসজাত সন্তানই তো ? আবার সে ছুঁড়ে দিল এক নির্জলা মিথ্যা,”ত্রিশ লক্ষ না তো ! এই দুই তিন হাজারের মত হবে । আচ্ছা বাপ, এই যে কারফিউ চলছে,আমরা কি বের হচ্ছি ?”
“না”
“বের হলে কী হবে ?”
“ধরে নিয়ে যাবে”
“আর যদি বের হয়ে গুলি ফুটাই?”
“আমাকেও গুলি করে মেরে ফেলবে”
“এইতো বুঝেছিস । এখানে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ছেলে এসব করেছিল । আর জানিসই তো, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও জঘন্য ।”
“ও তাইতো । আচ্ছা আব্বু, ইজ্জত কী ?”

এক বিব্রতকর আক্রমণের আভাস পাচ্ছেন কাশেম মিয়া । “কেন রে?” “না,স্যার বলল যে,ওরা আর রাজাকাররা নাকি আমাদের মা বোনের ইজ্জত লুটেছে ?”
“আব্বু, এগুলা অনেক কঠিন কথা। বড় হলে সব জানবি । এখন পড়তে বয়গে । দেখছিস না, আযান দিয়ে দিচ্ছে ?”

আশিফ দমাদম মাস্তকালান্দার গাইতে গাইতে চলে গেল । কাশেম মিয়ার পাঞ্জাবী ঘামে ভিজে গেছে । এরকম ভাবে ভয়ে পাঞ্জাবী ভিজেছিল সেই গণ্ডগোলের বছরে !

======

এই আশিফরা কারা জানেন ? ঐ যে গালে পাকিপতাকা এঁকে কিছু জারজ খেলার মাঠে গিয়েছিল, ফেসবুক আর ব্লগে “আন্তর্জাতিক মানের” যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য যারা গলা ফাটাচ্ছে….ওরাই । যদিও দোষটা তাদের নয়,দোষটা তাদের জন্মের ।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/pcborty/501.html

 11 টি মন্তব্য

(ফোনেটিক বাংলায়) মন্তব্য করুন

  1. রিপন ঘোষ

    রাজাকার কাশেম মিয়া যেভাবে নিজের ছেলের মগজ ধোলাই করেছে ঠিক তেমনি জামায়াতের শুয়োরগুলো ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে ছাত্র সমাজের মগজ ধোলাই করছে। ঐ রাজাকারের বাচ্চাগুলোকে দেশ থেকে নিপাত করতেই হবে।

    1. টিকটিকি

      করতেই হবে ।

  2. নির্ঝর মজুমদার

    কি লিখলেন ভাই। পুরাই পাঙ্খা।

    1. টিকটিকি

      হে হে ! থ্যাঙ্কু ভাই । সাথে থাকবেন ।

  3. ইমরান এইচ সরকার

    চমৎকার লিখেছেন…

    1. টিকটিকি

      একগাদা ধনেপাতা !

  4. konok

    simply mind blowing writing style. keep it up brother. very well written. nothing more to say.

    1. টিকটিকি

      Thank you brother !

  5. NLM

    এই আশিফরা কারা জানেন ? ঐ যে গালে পাকিপতাকা এঁকে কিছু জারজ খেলার মাঠে গিয়েছিল, ফেসবুক আর ব্লগে “আন্তর্জাতিক মানের” যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য যারা গলা ফাটাচ্ছে….ওরাই । যদিও দোষটা তাদের নয়,দোষটা তাদের জন্মের ।

    অসাধারণ একটা সত্য কথা!!!

    1. টিকটিকি

      আসলে আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের ভুলে একটি অন্ধকার প্রজন্মের জন্ম হয়েছিল । অনেকেই সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে,অনেকেই পারেনি ।

  6. kasem880

    Ami ekaney nutan.sobar subakamona korchi. kasem,
    Abu Dhabi.
    UAE. +971507837133

মন্তব্য করুন