মোহাম্মদ আনু-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য

লিখেছেন: মোহাম্মদ আনু

cvdsazx2

 

তুন পথের যাত্রা পথিক চালাও অভিযান,
উচ্চ কন্ঠে উচ্চার আজ মানুষ মহীয়ান
(কবির লেখা অভিযান কবিতার অংশ বিশেষ যা নাঃগঞ্জে লিখা হয়)
যেখানে আজ সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে মানুষ নামের কিছু অমানুষ, যেখানে বাঙ্গালীর প্রাণ জাতীয় পতাকা ছিড়ে আজ পদপৃষ্ঠ করা হচ্ছেযেখানে আজ খুন,হত্যা,রাহাজানি বিভিন্ন অপকর্মেছেয়ে যাচ্ছে সমাজ সেখানে আজ বারবার মনে পড়ে আমার সেই প্রাণের প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কথাহয়ত কবি যদি আজ থাকতেন তবে উচ্চারিত হত মানুষ নামের সেই কবিতাটি,রচিত হতো আরও কিছু বিদ্রোহী কবিতা আজ বারংবার তার কথাই মনে পড়ছেতাইতো কবির ভাষায় বলতে হয়- ভুল হয়ে গেছে বিলকুল,
আর সবকিছু ভাগ হয়ে গেছে-
ভাগ হয়নিকো নজরুল
ছোটবেলা থেকেই আমি নজরুল অনুরাগী পরবর্তীতে অনুরাগের টানেই স্থানীয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি সংসদ এ সদস্য হয়ে নজরুল চর্চা শুরু করি ১৯৯৮ সালে এই সংগঠনটি সামাজিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নজরুলকে চেনা,জানা এবং বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে মূল লক্ষ্যলক্ষ্য অনুযায়ী শুরু করলাম নজরুলক চেনা আমার একটা বদভ্যাস ছিল আমি গুরুকে অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম যা মোটেও সম্ভব নয়কবি নজরুল লিখেছেন লিচু চোর-
বাবুদের তাল-পুকুরে
হাবুদের ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাড়া
পুকুরের ঐ কাছে না
লিচুর এক গাছ আছে না
হোথা না আস্তে গিয়ে
য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে
গাছে গো যেই চড়েছি
ছোট এক ডাল ধরেছি,
ও বাবা মড়াত করে
পড়েছি সরাত জোরে
পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই,
সে ছিল গাছের আড়েই
ব্যাটা ভাই বড় নচ্ছার,
ধুমাধুম গোটা দুচ্চার
দিলে খুব কিল ও ঘুষি
একদম জোরসে ঠুসি
আমিও বাগিয়ে থাপড়
দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড়
লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল,
দেখি এক ভিটরে শেয়াল!
সেকি ভাই যায় রে ভুলা-
মালীর ঐ পিটুনিগুলা!
কি বলিস ফের হপ্তা!
তৌবা-নাক খপ্তা!
আর অনুসরণ করতে গিয়ে আমার ১১বছর বয়সে লিখে ছিলাম -লিচু খেয়েছি বলে ছড়াটি-
তোমার ঐ লিচু গাছের
লিচু খেয়েছি বলে,
দিলে তুমি বেতের মার
দিয়েছো কান মলে
আমি তবু একা খাই
পরে-খাবে সকলে,
তোমার ঐ বাহাদুরী তখন
যাবে জানি বিফলে
গোঁফ বর্দি পরে তুমি
বনে গেছো রাজা,
আমার জন্য লিচু টিকে
নয়তো খেতো প্রজা
প্রতিদিন গাছের নীচে যদি
কেউ না থাকতো,
গ্রামের দুষ্টু ছেলের দল
তোমার লিচু খেতো
এমন কভু আর করোনা
দিওনা কান মলে,
যদিও কেউ খায় লিচু
বুঝিয়ে দিও বলে
আমার বড় ভাই কবির এখনও আমাকে ক্ষুদে নজরুল বলে ডাকে যা আমার জন্য হাস্যকরপরবর্তীতে একটু বড় হয়েও সে স্বভাবের ব্যাত্যয় ঘটেনি তার প্রমাণ ইতিমধ্যে আপনারা আমার লেখা আমিকবিতাটি পড়েছেনএটা সত্য যে এই পৃথিবীতে নজরুল দ্বিতীয়টি আর হবেনা সাহিত্যের এমন কোন সাইড নেই যেখানে গুরু প্রবেশ করেননি-ছড়া,কবিতা,প্রবন্ধ,উপন্যাস,নাটক সবচেয়ে বড় ভান্ডার হচ্ছে কবি নজরুলের গানের ভান্ডার শুধু তাই নয় উনি নিজে ছিলেন একজন অভিনেতাচলুন না তাঁর জীবনটাকে ছোট পরিসরে আরেকবার জেনে নিই-
বংশ পরিচয়-প্রথমেই আসি কাজী কেন বলা হয় নজরুলকে-মোগল আমলে একটি প্রথা চালু হয় যার নাম কাজীএবং নিয়োগ হতো দিল্লী থেকে নিয়োগপত্রে দস্তখত করতেন স্বয়ং সম্রাটফলে কাজীরা স্থানীয় শাসনকর্তাদের বেশী একটা পরোয়া করতেন নাদেশের প্রত্যেক এলাকায় বিচারকার্য চালানোর জন্য একজন কাজী থাকতেনএর উপর ছিল কাজী উল কোজাতনজরুলের পরদাদা ছিলেন কাজী উল কোজাতসম্রাট কাজী নিয়োগ করার পূর্বে ০৫টি জিনিসের দিকে নজর দিতেন ক)স্বস্হ ও সাধুতা খ)বংশ গ)আরবী ফারসী ভাষায় জ্ঞান ঘ)শরিয়তে পান্ডিত্য ঙ)আদর্শবান ব্যক্তিত্ব কাজী আমিনুল্লাহর ছিল বড় সংসার তারঁ পুত্র কাজী ফকির আহম্মেদকে মুনশী তোফায়েলের কন্যার সাথে নিকাহ পড়িয়ে দেয়া হয়এই ফকির আহম্মেদের ঔরসে এবং জাহেদা খাতুনের গর্ভে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১জৈষ্ঠে পশ্চিমবঙ্গের আসানসোল মহকুমা জামুরিয়া থানার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেনকাজী ফকির আহম্মেদের ৭পুত্রও দু কন্যা জন্মগ্রহণ করেনকবি ছিলেন ষষ্ঠপুত্রজৈষ্ঠ কাজীর জন্মের পর ০৪ পুত্র অকালে মারা যায়এরপর নজরুলের জন্ম হলে নাম রাখা হয় দুখু মিয়াকাজী বাড়ীর দক্ষিণে ছিল হাজী পাহলোয়ান শাহের মাজারকবির পিতা ও পিতামহ ছিলেন ঐ মাজারের খাদেমবংশ ধারার গুণেও গুণাণ্বিত ছিলেন কবি নজরুলসত্যকে আজ হত্যা করে অত্যাচারী খাড়াঁয়,
নেই কী রে কেউ সত্য সাধক বুক খুলে আজ দাড়াঁয়?
কবি নজরুলের বাল্য ও শিক্ষাজীবন:-কবি নজরুল বাল্যকালে ছিলেন খুবই ডানপিঠে আর দুষ্টুতাঁর দুষ্টুমীর কারণে সবাই অতীষ্ট ছিলেনএমন কোনও দুষ্টুমী নেই যা তিনি করেননিনজরুলের পিতার ইচ্ছে ছিল নিজের আদর্শে তিনি ছেলেকে গড়বেনতাই তিনি ছেলেকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন গ্রাম্য মক্তব্যে নজরুল লেখাপড়ায় ছিলেন খুবই তুখোরদশ বছর বয়সেই তিনি উর্দূ ও ফার্সী রপ্ত করেছিলেনআলেম সাহেবরা কোরআন শুনে বাহবা দিতেন
কবির বয়স যখন আট বছর তখন পিতা ফকির আহম্মেদ ইন্তেকাল করেনসংসারে নেমে আসে দারিদ্রআর্থিক দৈন্যতার কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়পরে মসজিদে ইমামতিও গ্রহণ করেননজরুলের চাচা বজলে করীম ছিলেন আরবি ও ফার্সী ভাষার একজন কবি ও পন্ডিততা চাচার সামনে একটি কবিতা পাঠ করে বসলেন:মেরা দিল বেতাব কিয়া
তেরে আব্রুয়ে কামান
জালা যাতা হ্য
ইশক্ মে জান………….
চাচা কবিতা শুনে দোয়া করলেন তুই অনেক বড় কবি হবিবর্ধমান জেলায় লেটো নাচ,অভিনয় ও লেখালেখি করে যাত্রাপালায় সুনাম অর্জণ করেনআশেপাশের গ্রাম থেকেও পালাল লেখাতে আসতো নজরুলের কাছেএতে কিছু উপার্জন হতকিছুদিন পর আবার কবি লেখাপড়া শুরু করেনকিন্তু বেশীদিন নয় ক্লাশ সিক্সে আবার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গেলেরানীগঞ্জে কিছুদিন বাবুর্চীও ছিলেন কবিআসানসোলে এক বেকারীতে ৪/৫ টাকা মাসিক বেতনে ময়দা খামীর করার চাকুরী নেনপরবর্তীতে কাজী রফিজ উল্লাহ নজরুলকে সাথে করে ময়মনসিংহের নিজ বাড়ী কাজীর শিমলায় নিয়ে আসেন এবং নিজের বাসার কাজ বাদ দিয়ে ১৯১৪ সাল দরিরামপুর হাইশ্কুলে ক্লাশ সেভেনে ভর্তি করিয়ে দেন দারোগা রফিজ উল্লাহ১৯১৫ সালে আবার রানীগঞ্জে ফিরে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হনস্কুল কতৃপক্ষ নজরুলকে বিনা খরচে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেনসে সময় রাজবাড়ী থেকে ৭ টাকা বৃত্তি পেতেনসে টাকা থেকে ছোটভাই কাজী আলী হোসেনের পড়ার খরচ দিতেন১৯১৬ সালে নজরুল রচনা প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং তার রচনা লেখায় মু্ধ হয়ে স্কুলের বার্ষিক বিবরণীতে প্রধান শিক্ষক শ্রী নগেন্দ্রণাথ ব্যানার্জী লেখেন-Furthering considering in intrincic of the several papers of the competitors for the edgely prize,the generous donar has kindly granted rs/-4 to each of the other candidates viz belaram mukharjee,golak bihari and kazi nazrul islam for their good prouction of the eassay.প্রথম বিশ্বযুদ্ধের তৃতীয় বছরে ১৯১৭ সালে দশম শ্রেণীর রখন ছাত্র নজরুলশহরের দেয়ালে দেয়ালে দেখলেন লেখা যে-কে বলে বাঙ্গালী যোদ্ধা নয়?
কে বলে বাঙ্গালী ভীতু……সৈনিক দলে যোগ দেয়ার আহবানী পোষ্টার দেখে ভীতু কথার জবাব দিতে যোগ দিলেন বাঙ্গালী পল্টনেসেই করাচী চলে গেলেন কবি ফিরলেন বিদ্রোহী হয়ে,মানবতার কবি হয়ে,সাম্যবাদের কবি হয়ে আসলেন নজরুলগাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই,
নহে,কিছু মহীয়ান
নাই দেশ -কাল -পত্রের ভেদ,
অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে,সব কালে
ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি
যুগে যুগে বহু সাহিত্যিক কবি ধরাধামে এসেছিলেন বেশীরভাগ সাহিত্যিকরাই নিজ নিজ ধর্মের গুণগান গাইতেন তাদের রচনাকর্মে এক্ষেত্রে নজরুল ছিলেন ব্যাতিক্রম নজরুল ছিলেন সকল ধর্মের, সকল কালের,সকল মানুষের
অসাপ্রদায়িক কবি নজরুল:-হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা যখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার তখন নজরুল লেখেন-মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান,
মুসলিম তাহার নয়ন মনি হিন্দু তাহার প্রাণশুধু তাই নয় একটি প্রবন্ধও লিখলেন হিন্দু-মুসলমান শিরোণামেলিখেছেন মসজিদ-মন্দির শিরোণামে আরও একটি প্রবন্ধ:মারো শালা যবনদের!মারো শালা কাফেরদের!’-আবার হিন্দু-মুসলমানী কান্ড বাঁধিয়া গিয়াছেপ্রথমে কথা-কাটাকাটি,তারপর মাথা-ফাটাফাটি আরম্ভ হইয়া গেলআল্লাহর এবং মা কালীর প্রেষ্টিজ রক্ষার জন্য যাহারা এতক্ষণ মাতাল হইয়া চিকার করিতেছিল তাহারাই যখন মার খাইয়া পড়িয়া যাইতে লাগিল দেখিলাম তখন আর আল্লা মিয়া ও কালী ঠাকুরের নাম লইতেছেনাহিন্দু মুসলমান পাশাপাশি পড়িয়া থাকিয়া এক ভাষায় আর্তনাদ করিতেছে,বাবা গো ,মাগো !মাতৃ-পরিত্যাক্ত দুটি ভিন্ন ধর্মের শিশু যেমন এক স্বরে কাঁদিয়া তাহাদের মাকে ডাকে!দেখিলাম ,হত -আহতদের ক্রন্দণে মসজিদ টলিল না,মন্দিরের পাষাণ দেবতা সাড়া দিলনাশুধু নির্বোধ মানুষের রক্তে তাহাদের বেদী চিরকলঙ্কিত হইয়া রহিল…………এইভাবে তাঁর লেখাগুলো লিখে গেলেন তিনিসেকালে জনৈক রাজনৈতিক ভাষ্যকার নজরুল সম্পর্কে লিখেন-নজরুল ছিলেন খাপখোলা তালোয়ারসাম্প্রদায়িকতার কাছে কখনও তিনি আপোস করেননি১৯২৬ সালের মে মাসে,কৃষ্ণনগরে কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে,চিত্তরঞ্জন দাশেরহিন্দু-মুসলিম প্যাক্ট বাতিল হবার সম্ভাবনা দেখাদিলে ,তিনি তারঁ বিরুদ্ধে চরম হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন -হিন্দু না ওরা মুসলিম ঐ জিজ্ঞাসে কোন জন,
কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষসন্তান মোর মারসেদিন যদি নজরুলের কথা নেতাদের কানে ঢুকত তাহলে দেশ আর ভাগ হতোনা এমনটিই বললেন ঢাকা ভার্সিটির অধ্যাপক এস এম লুফর রহমানএক বিয়েতে সম্ভবত বহরমপুরে ডঃ নীলিমাক্ষ সান্যালের বিয়ের বরযাত্রী বন্ধু বান্ধবরা নজরুলকে আমন্ত্রণ জানালে গোড়াঁ হিন্দুরা আপত্তি করে উঠে দাড়াঁয়তখন নজরুল একটি গান সবাইকে শুনিয়ে মাত করে দিলেন-জাতের নাম বজ্জাতি শিরোণামেনজরুল সৃষ্টি:-নজরুল যেমন লিখেছেন হাজারো গজল তেমনি লিখেছেন ভোজনঅসাধারণ মেধা না হলে কউ ১০০০০হাজার গানলিখতে পারেন?নাটক সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন ০৩/০৪টি হবে অথচ শিল্পী ও লেখক আরিফুল হক বলেন৮০টি(দৈনিক ইনকিলাব১৯৯৭)একই অনুষ্ঠানে ডঃ আশরাফ সিদ্দিকী বলেন-১০০ টিরও বেশী নাটক লিখেছেন তিনিকবি নজরুল ১৩টি ছায়াছবির সাথে জড়িত ছিলেনকখনও কাহিনীকার,কখনও গীতিকার ও সুরকার,কখনও অভিনেতামাত্র তেইশ বছরে তারঁ কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ২২টি,কিশোর কাব্য ০২টি,উপন্যাস ০৩টি,নাটক০৩-১০০টি,প্রবন্ধের বই০৫টি,চলচ্চিত্র কাহিনী০২টি,রেকর্ড নাট্য০২টি,গান৩২০১টিএখানে প্রকাশিত এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যা দেয়া হলএর চেয়ে আরও বেশীও হতে পারেনজরুল গবেষক শেখ দরবার আলম অজানা নজরুলগ্রন্থে লেখেন-সুস্থাবস্থায় গ্রামোফোন অফিসে রাখা মোটা পান্ডুলিপি থেকে অনেকে লেখা চুরি করে নিজের নামে চালিয়ে দেয়নজরুল কে বললে আমার প্রিয় কবি নজরুল বলত সাগর থেকে আর ক ঘটি জল নেবে?”আমি এই দেশে ,এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশের, এই সমাজেরই নইআমি সকল দেশের সকল মানুষের।-কাজী নজরুল ইসলাম(যুগবাণী-প্রথম খন্ড পৃ:৬৩০-৬৩৩)
কবি নজরুলের দৃষ্টিতে নারী-কবি নজরুল তাঁর হ্রদয়ের গভীর ভালবাসার রং তুলি দিয়ে নারীকে গল্পে,নাটকে,উপন্যাসে,প্রেমর কবিতা ও গানে সুন্দর করে একেঁছেননজরুলের কাছে পুরুষ আর রমনীর কোন ভেদাভেদ ছিলনা তাইতো নিপীড়িত অসহায় ভীতু নারীদের নিয়ে লিখলেনজাগো নারী জাগো বহ্নি শিখালিখেছেন- নারী
- কাজী নজরুল ইসলাম
সাম্যের গান গাই -
আমার চক্ষে পুরুষ-রমনী কোনো ভেদাভেদ নাই
বিশ্বে যা-কিছু মহান্ সৃষ্টি চির-কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর
বিশ্বে যা-কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী
নরককুন্ড বলিয়া কে তোমাকরে নারী হেয়-জ্ঞান?
তারে বল, আদি-পাপ নারী নহে, সে যে নর-শয়তান
অথবা পাপ যে শয়তান যে নর নহে নারী নহে,
ক্লীব সে, তাই সে নর ও নারীতে সমান মিশিয়া রহে
এ-বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল, ফলিয়াছে যত ফল,
নারী দিল তাহে রূপ-রস-মধু-গন্ধ সুনির্মল
তাজমহলের পাথর দেখেছে, দেখিয়াছ তার প্রাণ?
অন্তরে তার মোমতাজ নারী, বাহিরেতে শা-জাহান
জ্ঞানের লক্ষ্ণী, গানের লক্ষ্ণী, শস্য-লক্ষ্ণী নারী,
সুষমা-লক্ষ্ণী নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারি
পুরুষ এনেছে দিবসের জ্বালা তপ্ত রৌদ্রদাহ,
কামিনী এনেছে যামিনী-শান্তি, সমীরণ, বারিবাহ
দিবসে দিয়াছে শক্তি-সাহস, নিশীথে হয়েছে বধু,
পুরুষ এসেছে মরুতৃষা লয়ে, নারী যোগায়েছে মধু
শস্যক্ষেত্র উর্বর হ, পুরুষ চালাল হল,
নারী সে মাঠে শস্য রোপিয়া করিল সুশ্যামল
নর বাহে হল, নারী বহে জল, সেই জল-মাটি মিশে
ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালি ধানের শীষে
স্বর্ণ-রৌপ্যভার
নারীর অঙ্গ-পরশ লভিয়া হয়েছে অলঙ্কার
নারীর বিরহে, নারীর মিলনে, নর পেল কবি-প্রাণ,
যত কথা তার হইল কবিতা, শব্দ হইল গান
নর দিল ক্ষুধা, নারী দিল সুধা, সুধায় ক্ষুধায় মিলে
জন্ম লভিছে মহামানবের মহাশিশু তিলে তিলে
জগতের যত বড় বড় জয় বড় বড় অভিযান
মাতা ভগ্নী ও বধুদের ত্যাগে হইয়াছে মহীয়ান
কোন্ রণে কত খুন দিল নর, লেখা আছে ইতিহাসে,
কত নারী দিল সিঁথির সিঁদুর, লেখা নাই তার পাশে
কত মাতা দিল হৃদয় উপাড়িকত বোন দিল সেবা,
বীরের স্মৃতি-স্তম্ভের গায়ে লিখিয়া রেখেছে কেবা?
কোন কালে একা হয়নি কজয়ী পুরুষের তরবারি,
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়-লক্ষ্ণী নারী
রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন, রাজারে শাসিছে রানী,
রানির দরদে ধুইয়া গিয়াছে রাজ্যের যত গ্লানি
পুরুষ হৃদয়হীন,
মানুষ করিতে নারী দিল তারে আধেক হৃদয় ঋণ
ধরায় যাঁদের যশ ধরে না কঅমর মহামানব,
বরষে বরষে যাঁদের স্মরণে করি মোরা উসব
খেয়ালের বশে তাঁদের জন্ম দিয়াছে বিলাসী পিতা
লব-কুশে বনে তাজিয়াছে রাম, পালন করেছে সীতা
নারী সে শিখাল শিশু-পুরুষেরে স্নেহ প্রেম দয়া মায়া,
দীপ্ত নয়নে পরাল কাজল বেদনার ঘন ছায়া
অদ্ভূতরূপে পুরুষ পুরুষ করিল সে ঋণ শোধ,
বুকে করে তারে চুমিল যে, তারে করিল সে অবরোধ
তিনি নর-অবতার -
পিতার আদেশে জননীরে যিনি কাটেন হানিকুঠার
পার্শ্ব ফিরিয়া শুয়েছেন আজ অর্ধনারীশ্বর -
নারী চাপা ছিল এতদিন, আজ চাপা পড়িয়াছে নর
সে যুগ হয়েছে বাসি,
যে যুগে পুরুষ দাস ছিল না ক’, নারীরা আছিল দাসী
বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি,
কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও, উঠিছে ডঙ্কা বাজি
নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
আপনারি রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে!
যুগের ধর্ম এই-
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই
শোনো মর্ত্যের জীব!
অন্যেরে যত করিবে পীড়ন, নিজে হবে তত ক্লীব!
স্বর্ণ-রৌপ্য অলঙ্কারের যক্ষপুরীতে নারী
করিল তোমায় বন্দিনী, বল, কোন্‌ সে অত্যাচারী?
আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,
আজ তুমি ভীরু আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা!
চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায় মল,
মাথার ঘোম্‌টা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙে ফেল ও-শিকল!
যে ঘোমটা তোমাকরিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ,
দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন ঐ যত আভরণ!
ধরার দুলালী মেয়ে,
ফির না তো আর গিরিদরীবনে পাখী-সনে গান গেয়ে
কখন আসিল প্নুটোযমরাজা নিশীথ-পাখায় উড়ে,
ধরিয়া তোমায় পুরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে!
সেই সে আদিম বন্ধন তব, সেই হতে আছ মরি
মরণের পুরে; নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী
ভেঙে যমপুরী নাগিনীর মতো আয় মা পাতাল ফুঁড়ি!
আঁধারে তোমায় পথ দেখাবে মা তোমারি ভগ্ন চুড়ি!
পুরুষ-যমের ক্ষুধার কুকুর মুক্ত ও পদাঘাতে
লুটায়ে পড়িবে ও চরণ-তলে দলিত যমের সাথে!
এতদনি শুধু বিলালে অমৃত, আজ প্রয়োজন যবে,
যে-হাতে পিয়ালে অমৃত, সে-হাতে কূট বিষ দিতে হবে
সেদিন সুদূর নয়-
যেদিন ধরণী পুরুষের সাথে গাহিবে নারীরও জয়!
নজরুল সেই সময় রক্ষণশীল সমাজে নারীর দূরাবস্থার কথা চিন্তা করে মৌলভীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে লিখেছিলেন-
চোখে চোখ আজ চাহিতে পারনা;
হাতে রুলী, পায়ে মল,
মাথার ঘোমটা ছুঁড়ে ফেল নারী,
ভেঙ্গে ফেল ও শিকল
যে ঘোমটা তোমা করিয়াছে ভীরু
ওড়াও সে আবরণ,
দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন
যেথা যত আবরণ
এমন স্পষ্ট এবং জোড়ালো ভাষায় পুরুষ হিসেবে কেউ লিখেছেন কিনা আমি জানিনাপৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম নেই যেখানে নারীকে ইসলামের ন্যায় সম্মান দিয়েছে অথচ এক শ্রেণীর মানুষ নারীকে আজ কর্মঠ দেখতে চায়নাযে পরিবারে শুধু একটি নারীর উপার্জণে সংসার চলে সেখানে সে অন্তঃপুরে কীভাবে বসে থাকেপুরুষ ও নারী একে অপরে বাদ দিয়ে চলেনি কোনদিন
যাক আমি নজরুল সম্পর্কে বলছিলাম ঐ সময় যখন নজরুল এমন কবিতা লিখলেন তখনও আলেম ওলামা ছিলেন ওনারা জানতেন নারী ডাক্তার ইন্জিনিয়ার সব হবে নিজের অর্থে সংসার চালাবে হয়ত তাই তেমন আন্দোলন হয়নি তখনকিন্তু প্রচুর লেখালেখি হয়েছে পক্ষে বিপক্ষেকবি নজরুল নারী জাগরণ নিয়ে আরও লিখেছেন-অসতী মাতার পুত্র যদি সে
জারজ সন্তান হয়,
অস পিতার সন্তানও তবে
জারজ সুনিশ্চয়
কবি নজরুল ইসলাম তাঁর বিশাল সাহিত্যভান্ডারে নারীকে সম্মানিত ও মহিমান্বিত করেছেন
নারীর বিরহে নারীর মিলনে,
নর পেল কবি প্রাণ,
যত কথা তার হইল কবিতা
শব্দ হইল গান
আনন্দময়ীর আগমনে

- কাজী নজরুল ইসলাম
আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল
দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?

মাদীগুলোর আদি দোষ ঐ অহিংসা বোল নাকি-নাকি
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি
ঢাল তরবার, আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,
মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দে মা রক্ত দেখা

তুই একা আয় পাগলী বেটী তাথৈ তাথৈ নৃত্য করে
রক্ত-তৃষারময়-ভুখা-হুর কাঁদন-কেতন কণ্বে ধরে।-
অনেক পাঁঠা-মোষ খেয়েছিস, রাক্ষসী তোর যায়নি ক্ষুধা,
আয় পাষাণী এবার নিবি আপন ছেলের রক্ত-সুধা
দুর্বলেরে বলি দিয়ে ভীরুর এ হীন শক্তি-পূজা
দূর করে দে, বল মা, ছেলের রক্ত মাগে দশভুজা।..

ময় ভুখা হুঁ মায়িবলে আয় এবার আনন্দময়ী
কৈলাশ হতে গিরি-রাণীর মা দুলালী কন্যা অয়ী!
প্রেমের কবি নজরুল নার্গিসকে এতো ভালবাসতেন যে ওনার সাহিত্যের পাতায় পাতায় সেই নারীর ভালবাসার কথা ব্যাক্ত করেছেনআজ নার্গিসের দ্বিতীয় বিয়েতে দেয়া শুভেচ্ছাবাণী বা শেষ চিঠি দেয়া দিয়ে শেষ করব আমার লেখা -
কল্যাণীয়াষু,
জীবনে তোমাকে পেয়েও হারালামতাই মরণে পাবো সেই বিশ্বাস ও সান্তনা নিয়ে বেঁচে থাকবোপ্রেমের ভূবনে তুমি বিজয়িনী,আমি পরাজিতআমি আজ অসহায়বিশ্বাস করো আমি প্রতারণা করিনিআমাদের মাঝে যারা দূরত্ব সৃষ্টি করেছে-পরলোকেও তারা মুক্তি পাবেনাতোমার নব অভিযাত্রা সুখের হোক
ইতি
নিত্য শুভার্থী
নজরুল
(১৩৩৮,০১ ডিসেম্বর)
নজরুলের একটি ভাষণ
বন্ধুগণ,
আপনারা যে সওগাত আজ হাতে তুলে দিলেন, আমি তা মাথায় তুলে নিলুমআমার সকল তনু-মন-প্রান আজ বীণার মত বেজে উঠেছেতাতে শুধু একটি মাত্র সুর ধ্বনিত হয়ে উঠেছে- আমি ধন্য হলুম”, “আমি ধন্য হলুম
আমায় অভিনন্দিত আপনারা সেই দিনই করেছেন, যেদিন আমার লেখা আপনাদের ভাল লেগেছেবিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্ম গ্রহণ করেছিএরই অভিযান সেনাদলের তূর্য্যবাদকের একজন আমি- এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলে, শুধু এই দেশেরই, এই সমাজেরই নই; আমি সকল দেশের, সকল মানুষেরকবি চায় না দান, কবি চায় অঞ্জলিকবি চায় প্রীতিকবিতা আর দেবতা সুন্দরের প্রকাশসুন্দরকে স্বীকার করতে হয়, যা সুন্দর তাই দিয়েসুন্দরের ধ্যান, তাঁর স্তবগানই আমার ধর্মতবু বলছি, আমি শুধু সুন্দরের হাতে বীণা, পায়ে পদ্মফুলই দেখিনি, তাঁর চোখে চোখ ভরা জলও দেখেছিশ্মশানের পথে, গোরস্তানের পথে তাঁকে ক্ষুধাদীর্ণ মুর্তিতে ব্যাথিত পায়ে চলে যেতে দেখেছিযুদ্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছিকারাগারের অন্ধভূমিতে তাঁকে দেখেছিফাঁসির মঞ্চে তাঁকে দেখেছি
আমাকে বিদ্রোহী বলে খামখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউএ নিরীহ জাতটাকে আঁচড়ে-কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনদিনই নেইআমি বিদ্রোহ করেছি, বিদ্রোহের গান গেয়েছি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে, যা মিথ্যা-কলুষিত-পুরাতন-পঁচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধেধর্মের নামে ভন্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে
কেউ বলেন আমার বাণী যবন, কেউ বলেন কাফেরআমি বলি, ও দুটোর কোনটাই নয়আমি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি; গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছিসে হাতে হাত মিলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভনীয় হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবেআমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে তাদের কোন বেগ পেতে হবে নাকেননা, একজনের হাতে আছে লাঠি, আরেকজনের আস্তিনে আছে ছুরিহিন্দু-মুসলমানে দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মানুষের জীবনে এক দিকে কঠোর দারিদ্র-ঋণ-অভাব; অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাঙ্কে কোটি কোটি টাকা পাষাণ স্তুপের মত জমা হয়ে আছেএ অসাম্য ভেদজ্ঞান দূর করতেই আমি এসেছিলামআমার কাব্যে সংগীতে কর্মজীবনে অভেদ ও সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলামআমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই নাজীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, আনন্দের গান- বেদনার গান গেয়ে যাব আমিদিয়ে যাব নিজেকে নিঃশেষ করে সকলের মাঝে বিলিয়েসকলের বাঁচার মাঝে থাকবো আমি বেঁচেএই আমার ব্রত, এই আমার সাধনা, এই আমার তপস্যা
রবীন্দ্রনাথ আমায় প্রায়ই বলতেন,“দ্যাখ উন্মাদ, তোর জীবনে শেলীর মত, কীটসের মত খুব বড় একটা ট্র্যাজেডী আছে, তুই প্রস্তুত হজীবনে সেই ট্র্যাজেডী দেখবার জন্য আমি কতদিন অকারনে অন্যের জীবনকে অশ্রুর বরষায় আচ্ছন্ন করে দিয়েছিকিন্তু, আমারই জীবন রয়ে গেল বিশুষ্ক মরুভূমির মত দগ্ধমেঘের উর্ধ্বে শূণ্যের মত কেবল হাসি, কেবল গান, কেবল বিদ্রোহ
আমার বেশ মনে পড়ছেএকদিন আমার জীবনের মহা অনুভূতির কথাআমার ছেলে মারা গেছেআমার মন তীব্র পুত্রশোকে যখন ভেঙে পড়ছে ঠিক সেই দিনই সেই সময় আমার বাড়িতে হাস্নাহেনা ফুটেছেআমি প্রানভরে সেই হাস্নাহেনার গন্ধ উপভোগ করেছিলামআমার কাব্য, আমার গান আমার জীবনের সেই অভিজ্ঞতার মধ্য হতে জন্ম নিয়েছেযদি কোনদিন আপনাদের প্রেমের প্রবল টানে আমাকে আমার একাকিত্বের পরম শূণ্য থাকে অসময়ে নামতে হয়, তাহলে সেদিন আমায় মনে করবেন না, আমি সেই নজরুলসেই নজরুল অনেক দিন আগে মৃত্যুর খিড়কী দুয়ার দিয়ে পালিয়ে গেছেমনে করবেন পুর্ণত্বের তৃষ্ণা নিয়ে একটি অশান্ত তরুণ এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতার বেদনায় তারই বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল
যদি আর বাঁশী না বাজে, আমি কবি বলে বলছি নে, আমি আপনাদের ভালবাসা পেয়েছিলাম, সেই অধিকারে বলছি, আমায় আপনারা ক্ষমা করবেনআমায় ভুলে যাবেনবিশ্বাস করুন, আমি কবি হতে আসি নিআমি নেতা হতে আসি নিআমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলামসে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী হতে নিরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম
যেদিন আমি চলে যাব, সেদিন হয়ত বা বড় বড় সভা হবেকত প্রশংসা কত কবিতা বেরুবে হয়ত আমার নামেদেশপ্রেমী, ত্যাগী, বীর, বিদ্রোহী- বিশেষনের পর বিশেষনটেবিল ভেঙে ফেলবে থাপ্পর মেরেবক্তার পর বক্তাএই অসুন্দরের শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রার্থ্য দিনে বন্ধু তুমি যেন যেও নাযদি পার চুপটি করে বসে আমার অলিখিত জীবনের কোন একটি কথা স্মরণ কোরতোমার ঘরের আঙিনায় বা আশেপাশে যদি একটি ঝরা পায়ে পেষা ফুল পাও, সেইটিকে বুকে চেপে বোল বন্ধু আমি তোমায় পেয়েছি
তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না,
কোলাহল করে সারা দিনমান কারো ধ্যান ভাঙিব না
নিশ্চল নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিঁধুর ধূপ

কবি নজরুলের ব্যক্তিত্ব ,চিন্তাধারা,আদর্শ ভাবের স্বাতন্ত্রতা স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয় তাঁর গান কবিতায় যেমন-নজরুল বিদ্রোহী কবিতায় লিখেছেন- বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,
উঠিয়াছে চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব-বিধাত্রীর
নজরুল এর সার্থকতার প্রমাণ রেখেছেন সাহিত্যকর্মে১৩২৮ সালের ২২ পৌষ বিজলী পত্রিকায় এই কবিতাটি প্রকাশিত হবার পর বাঙ্গালীর শিরা উপশিরায় যেন বয়ে গেল তরল অনলএই কবিতাটি সম্পর্কে প্রেমেন্দ্র মিত্র বলেন- কাব্য-বিচারে বিদ্রোহী মূল্য সবার কাছে নাও হতে পারে কিন্তু এর ভাবাবেগ সবাইকে উজ্জীবিত করেতরুণ সমাজ তো বিদ্রোহীর ভাষায় বাক্যালাপ শুরু করে দিল সকলের মধ্যে সেই মনোভাব- আপনারে ছাড়া কাহারে করিনা কুর্ণিশ
কিছুদিনের মধ্যেই নজরুলের উপর সরকারী রোষ নেমে আসেএকটি দুটি করে মোট০৫টি বই নিষিদ্ধ হয় কবি নজরুলেরজীবনের প্রতিটি প্রান্তে অসহ্য জ্বালা দূর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে নজরুলকে তারপরেও অন্যায়ের সাথে আপোষ করেননি নজরুলদৃপ্ত কণ্ঠে বলেছেন- এদেশ ছাড়বি কিনা বল
নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল
মোরা কিলের চোটে ভূত ভাগাব
মন্ত্র নিয়ে নয়,
মোরা জীবন ভর মার খেয়েছি আর প্রাণে না সয়
সময়ের অভাবে ব্লগ তেমন একটা লিখতে পারছিনা তাই সময়ের কাছে আমার চাওয়া আমায় দয়া কর হে সময় একটু অবসর দাওনজরুলের জীবনী লিখে শেষ করা খুবই কষ্টকরতাই খুব অল্প লিখেই শেষ করছি আমার প্রিয় কবি লেখাটিভবিষ্যতে সময় পেলে আবার লিখবযাওয়ার পূর্বে নজরুলের লেখা কিছু কবিতা শেয়ার করছি-
আমার কৈফিয়
কাজী নজরুল ইসলাম
বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নইনবী’,
কবি অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!
কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে
পড়ে না বই, য়ে গেছে ওটা
কেহ বলে, বৌ- গিলিয়াছে গোটা
কেহ বলে, মাটি হয়ে মোটা জেলে সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!
গুরু , তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা , আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!
মৌ-লোভী যত মৌলবী আরমোল্‌-লারা হাত নেড়ে’,
দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ,
যদিও শহীদ হইতে রাজী !
আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, পা-নেড়ে!’
আনকোরা যত নন্ভায়োলেন্ট নন্‌-কো দলও নন্খুশী
ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্‌’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!
এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
নয় চর্কার গান কেন গাবে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্ফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!
নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!
বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু , ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-
যুগের না হই, হজুগের কবি
বটি রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ষে কষি হৃদ্‌-পেশী,
দুকানে চশ্মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি তেছে নিদ্বেশী!
কি যে লিখি ছাই মাথা মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু?
হাত উঁচু আর না ভাই, তাই লিখি রে ঘাড় নীচু!
বন্ধু! তোমরা দিলে না দাম,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান!
যাহা কিছু লিখি অমূল্য লে -মূল্যে নেন! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?
বন্ধু! তুমি দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,
হাড় কালি শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!
যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
মেরে মেরে তারে করিনু বিকল,
তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না ররি-গান্ধীরে
হঠা জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!
আমি বলি, ওরে কথা শোন্ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্খোশ্‌-হালে!
প্রায়হাফ’-নেতা য়ে উঠেছিস্‌, এবার দাঁও ফস্কালে
ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে
বোঝে না যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,
গান শুন সবে ভাবে, ভাবনা কি! দিন যাবে এবে পান খেয়ে!
রবে না ম্যালেরিয়া মহামারী,
স্বরাজ আসিছে ড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে
মাতা কয়, ওরে চুপ্হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্চেয়ে!
ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,
বেলা য়ে যায়, খায়নি বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি চুন
কেন ওঠে না তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?
আমরা জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!
কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ
মা বুক তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!
বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে
রক্ত ঝরাতে পারি না একা,
তাই লিখে যাই রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে
প্রার্থনা রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!
মুনাজাত
কাজী নজরুল ইসলাম
আমারে সকল ক্ষুদ্রতা হতে
বাঁচাও প্রভু উদার
হে প্রভু! শেখাওনীচতার চেয়ে
নীচ পাপ নাহি আর
যদি শতেক জন্ম পাপে হই পাপী,
যুগ-যুগান্ত নরকেও যাপি,
জানি জানি প্রভু, তারও আছে ক্ষমা-
ক্ষমা নাহি নীচতার।।
ক্ষুদ্র করো না হে প্রভু আমার
হৃদয়ের পরিসর,
যেন সম ঠাঁই পায়
শত্রু-মিত্র-পর
নিন্দা না করি ঈর্ষায় কারো
অন্যের সুখে সুখ পাই আরো,
কাঁদি তারি তরে অশেষ দুঃখী
ক্ষুদ্র আত্মা তার।।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/mohammed-anu/14412.html



মন্তব্য করুন