jannatul.ferdous-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

একটি পতাকা মিছিল এবং ভালোবাসার জয় বাংলা…

লিখেছেন: jannatul.ferdous

স্বাধীনতা দিবস আজ। ২৬ মার্চ। সালটা ২০১৪। বেণীতে বেলি ফুলের মালাটা জড়াতে গিয়ে  নিজের অজান্তেই হাসছিল দোলা।মহান স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এই দিনগুলো এগিয়ে এলে হটাত করেই কেমন যেন মন ভাল হয়ে যায় তার। ঘন সবুজ জমিন আর লাল পাড়ের শাড়িটা অনেক যত্ন করে পরেছে দোলা আজকে।কপালে বেঁধেছে স্বাধীন বাংলার পতাকা।কি ভাববে পাগলটা এই সাজ দেখলে! সাগর কি বুঝবে এই সাজের মর্মার্থ!… নাকি বরাবরের মত আজকেও গল্প করতে করতে কোন অজানায় হারিয়ে যাবে! এসব ভাবতে ভাবতেই চোখে কাজল লাগায় দোলা। চুড়ির সংগ্রহ থেকে লাল- সবুজ চুড়ির গোছাটা বের করে। আজকে সব কিছুই যেন বেশি সুন্দর লাগছে। তৈরি হয়ে ঘর থেকে বাইরে পা বাড়ায় দোলা।
সাগরের বাসা গুলশানে। দোলাকে অনেক ভালোবাসে সে। মাঝে মাঝে তার মনে হয়, মেয়েটা যেন একটু বেশি পাগল। গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে কি এক শাহবাগ নিয়ে পরে আছে, আজ পর্যন্ত বিরাম নেই। ফেসবুকে আগে ওর প্রতিটা স্ট্যাটাসে কত আনন্দ করত দুইজনে মিলে। আর এখন ? দোলার স্ট্যাটাসের মর্মার্থ সাগরের মাথার দুই মাইল উপর দিয়ে যায়। এই শান্ত শিষ্ট মেয়েটার মধ্যে এত তেজ কোথা থেকে আসল সাগর তা ভেবে পায়না। হয়ত শাহবাগ থেকেই। দোলা তো তাই বলে। নিজে সে “আই হেইট পলিটিক্স” ধরণের ছেলে। কিন্তু দোলার কাজে কখনও বাঁধা হয়ে দাড়ায়নি। পাগলিটা আজকে জানি আবার কি আবদার করে বসে! মনে মনে এই ভাবতে ভাবতে বাড়ি থেকে বের হয় সাগর।
ছবির হাটে দেখা করার কথা আজকে ওদের। এই জায়গাটায় আসলেই চারপাশে শুধু জীবনের কোলাহল। কোথাও প্রেমিক- প্রেমিকার ভালোবাসার গল্প তো কোথাও চলছে কোনও গ্রুপের জরুরি মীটিং। আবার কোথাও চলছে বন্ধুত্বের হাসি, গান, আড্ডা আর ছবি তোলা। সাগর আর দোলা দুইজনেরই জায়গাটা খুব পছন্দ। ঠিক সময়ের কিছু আগে এসেই দোলার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে সাগর। আজকে ওকে চমকে দিতেই হবে। প্রত্যেকবার দেরি করে আসার জন্য ধমক খায় সে দোলার কাছে। তারপরেও যেন ইচ্ছা করেই বারবার দেরি করে। কিন্তু আজকে দোলাকে রাগানোর কোন শখ সাগরের নেই। তাই আগে থেকে এসেই অপেক্ষা করতে থাকে জাকিরের চায়ের দোকানে বসে। প্রতি সপ্তাহে একবার করে এখানেই দেখা করে ওরা।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়না। ঐত লাল- সবুজ শাড়ি পরা দোলা আসছে। দূর থেকে দেখতে সাগরের মনে হয়, মেয়েটা তার প্রতি পদস্পর্শে পথের ধুলোগুলোকে যেন ধন্য করে দিয়ে যাচ্ছে। কাছে এসে ধাক্কা দিয়ে সাগরের ঘোর ভাঙ্গায় দোলা। অনেকদিন ধরে জমানো টাকা দিয়ে সাগরের জন্য একটা ঘড়ি কিনেছে সে। পাগলটা অনেক ধনী পরিবারের ছেলে। যা চায় তাই পায়, কিন্তু কিছু চাওয়ার কথাই যেন মনে থাকেনা। কি এক ছেঁড়া ঘড়ি পরে থাকে, নিজের যেন কোন খেয়ালই নেই। তবে পাগলের খেয়াল না থাকতে পারে, পাগলি তো আর চুপ করে থাকতে পারেনা। নিজের খুব বেশি সামর্থ্য নেই দোলার। তবে সাধ্যের মধ্যে সবচেয়ে ভালোটাই কেনার চেষ্টা করেছে সে। ভালোবাসা মেশানো উপহার, ভাল না হয়ে কি পারে !!!!
উপহারটা সাগরকে দিয়ে দোলা বলে, “আজকে তোমাকে আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে। যাবে তো ?”
“কোথায়?” সাগরের অবাক হওয়ার পালা।
“গেলেই তো দেখতে পাবে। চল তো…”
উঠে দাঁড়ায় সাগর। আজকের দিনে দোলাকে রাগ করানোর ইচ্ছা নেই তার। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করতে করতে চলে আসে প্রজন্ম চত্বরে।সেখানে তখন চলছে পতাকা মিছিলের প্রস্তুতি। মিছিলের সাথে মিশে যায় তারা। হাঁটতে থাকে। হটাত সাগর লক্ষ্য করে, দোলার সাথে সেও কণ্ঠ মিলাচ্ছে স্লোগানে। আর সেই স্লোগানগুলো, হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে যেন। বিশেষ করে এতগুলো কণ্ঠ যখন এক একবার জয় বাংলা বলে চিৎকার করে উঠছে, মনে হচ্ছে লক্ষ লক্ষ সমুদ্রের ঢেউ যেন আছড়ে পরছে তীরে। দোলা মেয়েটা একদম মগ্ন হয়ে গেছে স্লোগানে। চারপাশে শুধু লাল- সবুজের ছড়াছড়ি। স্বাধীন বাংলার পতাকা সবার হাতে। একেই বলা হয় স্বাধীনতা দিবস। কোন মুহূর্তে দোলা সাগরের হাতে একটা পতাকা দিয়ে দিয়েছে সাগর নিজেও জানেনা। নিজেকে সে আবিষ্কার করে মিছিলের সাথে পা মিলিয়ে স্লোগান দিতে দিতে সামনে এগিয়ে চলা অবস্থায়।
মিছিল শেষে আবার চায়ের দোকানে এসে বসে ওরা। সাগর, তখন অন্যরকম এক মানুষ। দোলা লক্ষ্য করে, একমনে কি যেন ভাবছে সাগর।
- কি মনে হল ? রাজনীতি ?
- একদমই না। এই মিছিল রাজনীতি হলে বেঁচে থাকাও রাজনীতি।
- কি ভাবছ এত নিশ্চুপ হয়ে ?
- সত্যি কথা বলব ?
- অবশ্যই। শাহবাগে মিথ্যা বলতে হয়না।
-দোলা, তুমি যতবার জয় বাংলা বলে চিৎকার করে উঠেছ, মুগ্ধ বিস্ময়ে তোমাকে দেখেছি আর তোমার সাথে কণ্ঠ মিলিয়েছি। সত্যি বলছি,”মা” বলতে যে ভাললাগা কাজ করে, “জয় বাংলা” বলতে আমার মধ্যে একই রকম ভাললাগা কাজ করেছে।
দোলা আর সাগর দুজনেরই চোখে পানি। পরম ভালোবাসায় একজন ধরে ফেলে আরেকজনের হাতের বিশ্বস্ত দশটি আঙুল। তারপর আকাশ- বাতাস কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে “জয় বাংলা…”
দোলার ঘন কালো চোখে তখন চিকচিক করছে স্বপ্নজয়ের আনন্দ।।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/jannatul-ferdous/29012.html



মন্তব্য করুন