jannatul.ferdous-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

আমি ঘৃণা করি সেই সমাজ কে যারা একটি কুমারী মা কে সহ্য করতে পারে না ,আমি ঘৃণা করি সেই সমাজ কে যাদের জন্য একটি ছোটো শিশু কে পেতে হয় জারজ শিশুর অপবাদ

লিখেছেন: jannatul.ferdous

রাস্তার ধারে একটি ডাস্টবিন । মণিমালা দাঁড়িয়ে ছিল সেখানে ,তার ছোট শিশুটিকে কোলে নিয়ে । তার আর সুমন এর ভালবাসার ফসল এই সন্তান টি । কিন্তু, ওর তো বাঁচার অধিকার নেই । এই সন্তান কে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে মণিমালা কে হতে হবে সমাজচ্যুত । সুমন এর অবশ্য চিন্তার কিছু নেই । সে পুরুষ মানুষ ,তার দিকে কেউ সন্দেহের আঙ্গুল তুলবে না ,তাকে কেউ কোনো অপবাদ দেবে না । শিশু টির জন্ম যদি অপরাধ হয় তবে অপরাধী তো মণিমালা ,সুমন -দুজনের ই হয়া উচিত ।কিন্তু আমাদের সমাজ বাস্তবতায় তা সম্ভব নয় । তাইতো সদ্য জন্ম নেয়া শিশু টিকে নিয়ে মডেল মণিমালা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে । ভাব করছে যেন গাড়ি খুঁজছে ,আসলে অপেক্ষা করছে কখন রাস্তা থেকে সব গাড়ি ,মানুষ জন চলে যাবে। অপেক্ষা করছে শিশুটিকে বিসর্জন দেয়ার উপযুক্ত সুযোগের ।

মণিমালার কোলে ঘুমন্ত শিশুটি হঠাৎ নড়ে ওঠে । মণিমালা আদর করে থামিয়ে দেয়। শিশুটি মায়ের কোল কে সর্ব শ্রেষ্ঠ আশ্রয় ভেবে ঘুমিয়ে পরে ।হায় ,সে কি জানত সমাজের নির্মম নিষ্ঠুর প্রথায় বন্দিনী তার মা , কিছুক্ষণ পর ই তাকে বিসর্জন দেবে চিরতরে ?

আস্তে আস্তে রাস্তা ফাঁকা হয়ে আসতে থাকে । রাত তখন ২ টা র মত বাজে । মণিমালার মনে হয় ,রাস্তা টা কেন খালি হল? অনন্তকাল যদি শিশুসন্তান টিকে বুকে নিয়ে এমনিভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারত রাস্তার মাঝখানে ? মণিমালার মাতৃহৃদয় তো সন্তান টিকে নিজের বুকে চেপে রাখতে চায়।কিন্তু সমাজের বাস্তবতার হাতকড়া যে তার হাতে পরানো…..সন্তান টিকে ফেলে দিয়ে সে আর পিছনে ফিরে তাকাতে পারে না। কান্না বিকৃত মুখে সুমনের কাছে ফিরে যায়। এদিকে সুমন – মনিমালার ভালোবাসার ফসল পরে থাকে ডাস্টবিনে , কুকুর – বিড়াল ,কাক , ময়লা -আবর্জনার মাঝে জীবনের অস্তিত্ব হয়ে ।

পরদিন সকালে ডাস্টবিন এ ময়লা ফেলতে আসে পাশের বাড়ির কাজের মেয়ে জরিনা। শিশু টিকে প্রথম সেই দেখতে পায় – একটি কুকুর শিশু টিকে খাবার মনে করে খেতে আসছে । জরিনা নিজেকে সামলাতে পারে না । শিশু টিকে কোলে তুলে নিয়ে বাসায় ফিরে আসে । শিশু টি তখনো ঘুমিয়ে । সে জানে না, এক রাতের মধ্যে হাত বদল হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা পরিবেশে ,ভিন্ন মানুষ দের মাঝে এসে পড়েছে সে ।

জরিনা যে বাড়িতে কাজ করত সে বাড়ির কর্ত্রী ছিলেন নিঃসন্তান । শিশু টিকে তিনি নিজ সন্তানের মত করে বড় করতে লাগলেন , নাম রাখলেন রাজকন্যা। রাজকন্যা আসল রাজকন্যার মতই বড় হতে থাকল- ভাল স্কুল ,ভাল বন্ধু ,ভাল পরিবেশ এর মধ্যে নিজের জীবন কে অনেক সুন্দর ভাবে মানিয়ে নিল সে । ক্লাসে সবসময় ফার্স্ট  গার্ল , খেলাধুলা , বিতর্ক সব কিছুতেই সে সেরা । যেই সন্তান কে জারজ সন্তান , অবৈধ সন্তান বলে সমাজের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করতে না পেরে একদিন নিজের মা মনিমালা ডাস্টবিনে ফেলে গিয়েছিল , সেই সন্তান আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মহাকাশবিজ্ঞানে পি এইচ ডি করে দেশে ফিরে আসে ।

নতুন প্রজন্মের গৌরব তখন এই রাজকন্যা ।প্রতিদিন দেশে – বিদেশে নানা জায়গায় কনফারেন্সে যোগ দিতে হয় তাকে । এর মধ্যে হঠাৎ রাজকন্যার মনে হয় যে তার মা কে একবার আমেরিকা ঘুরিয়ে আনলে মন্দ হয় না । যেই ভাবা সেই কাজ । মা কে বলতে মা তো এক কথায় রাজি । রাজকন্যা তার মা কে নিয়ে যখন ভিসা অফিস এ আসে তখন সেখানের বিভিন্ন অনুসন্ধানে বের হয় যে রাজকন্যার প্রকৃত মা তিনি নন ।

রাজকন্যা তখন সত্যি টা জানতে চায় , জরিনা আর নতুন মা তাকে জানায় ডাস্টবিন এ খুঁজে পাওয়ার কথা । রাজকন্যার চারপাশের পৃথিবী যেন ভেঙ্গে পরতে থাকে । নিজেকে সে বলতে থাকে ,” এই পৃথিবী তে আমার মা আমাকে চায় নি ,আমি কোনোদিন আমার মা কে দেখি নি । আমি অনাকাঙ্খিত ,আমি জারজ সন্তান..।”নিজেকে অনেক ক্ষুদ্র বলে মনে হতে থাকে তার । কনফারেন্স ,মিটিং , ইন্টার্ভিউ সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয় সে । বদ্ধ ঘরে একলা বসে ভাবতে থাকে কিভাবে নিজ মাকে ফিরে পেতে পারবে।

ভাবতে ভাবতে অবশেষে একটি সিদ্ধান্ত নেয় সে । নিজের জীবন টা নিয়ে একটা বই লেখে । একুশের বইমেলায় বই টা  বের ও হয় । যথেষ্ট বিক্রি ও হয় । কিন্তু রাজকন্যা তো এই বই এর মাধ্যমে নিজ মা কে খুঁজে পেতে চায়…সে অপেক্ষা করতে থাকে ।

একদিন সকালে মনিমালা নামের একজন বই টির ব্যাপারে তার সাথে দেখা করতে আসে । মনিমালা তখন ও মডেল । টি ভি তে মনিমালার করা প্রচুর বিজ্ঞাপন দেখেছে রাজকন্যা । চিনতে সময় লাগে না । কিন্তু টি ভি তে বিজ্ঞাপন দেখার সময় কি রাজকন্যা একবার ও কল্পনা করেছিল এই মনিমালা তার মা ?এই সেই হতভাগিনী মা যে সমাজের বাধা উপেক্ষা করতে না পেরে রাজকন্যা কে ডাস্টবিনে ফেলে গিয়েছিল …

মনিমালা রাজকন্যা কে জিজ্ঞেস করে গল্প টা কি সত্য , নাকি শুধুই কল্পনা । রাজকন্যা চুপ করে থাকে । সে জানে না নিজের মা কে এখন কিভাবে পরিচয় দেবে । মনিমালাও জানে না কি বলে নিজ সন্তান কে বুকে তুলে নেবে এত বছর পর। তাদের মধ্যে নীরবতার দুর্ভেদ্য প্রাচীর ভেদ করার প্রয়োজনেই হয়ত রাজকন্যা ছুটে আসে মার কাছে । দুজনের অশ্রুজলে স্নাত হয়ে পূর্ণতা পায় মনিমালার মাতৃত্ব। রাজকন্যার এতদিনের মাতৃহীনতার কষ্ট কোথায় হারিয়ে যায় তা হয়ত সে নিজেও জানে না ।

———————————————————————————————————-রাজকন্যা হয়তো নিজ মা কে ফিরে পায় , কিন্তু আমাদের আশে পাশে এরকম প্রচুর পথশিশু আছে , দুর্ভাগা শিশু আছে যাদের হয়ত জন্ম নেয়ার আগেই জানতে হয় যে “জন্মই আমার আজন্ম পাপ” । কিন্তু আসলে কার পাপের শাস্তি তারা ভোগ করে সারা জীবন ধরে ? আমাদের পাপের শাস্তি । আমাদের ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থার পাপের শাস্তি ।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/jannatul-ferdous/16135.html

 2 টি মন্তব্য

  1. সাজেদুর

    মন্তব্য করার মত ভাষা খুজে পাচ্ছিনা; মাঝে মাঝে মনে হয় এই নোংরা সমাজ আমার জন্য নয় অথবা আমিই এই সমাজের নই, তবুও চলতে হয় সব সহ্য করে। একচোখা সমাজ ব্যবস্হা ও বিবেকহীন সমাজের কাছে ভাল কিছু আশা করাই পাপ। ধন্যবাদ, ভাল লিখেছেন।

    1. jannatul.ferdous

      ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন