জাহিদুল-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

হিমুর জন্য ভালবাসা ১

লিখেছেন: জাহিদুল

ঢাকার অদুরেই একটি ছোট গ্রাম। ছবির মত সুন্দর না হলেও একে বারে যে সৌন্দর্য নেই তা বলা যাবে না। ঢাকার নিকটবর্তী হওয়ায় শ্রমজীবী মানুষের বসবাস এই গ্রামে।যাতায়াত ব্যাবস্থা খুব একটা ভাল না। শুকনো মৌসুমে পায়ে হাঁটা যায় কিন্তু বর্ষার সময় সেটারও অবস্থা থাকে না। রিকশা ভেন কচিতে দু’একটা দেখা গেলেও অধিকাংশ পরিবহন মালামাল পরিবহনই করে। এই গ্রামের মানুষ গুলো অন্যান্য গ্রামের মতই। সাদাসিধে নিরীহ প্রকৃতির। দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পেলেই হল আর কিছু লাগবে না। এই গ্রামেই বেড়ে উঠা একটি ছেলে। ছেলেটির নাম সুজন। নাম শুনেই মনে হবে বখাটে রংবাজ টাইপ একটা ছেলে। যে কিনা ছয়টা- নয়টার শো তে বাংলা অশ্লীল সিনেমা দেখে। তেল চিটচিটে মাথায় পান মুখে দিয়ে কোন এক গার্মেণ্টসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু না সুজন মোটেও এরকম ছেলে না। বাবা মার একমাত্র সন্তান সুজন। পড়াশুনায় তার আগ্রহের কোন কমতি নেই। কোন ক্লাসেই সুজন প্রথম থেকে দ্বিতীয় হয় নি। স্কুল থেকে সুজনকে নানা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। কিন্তু এরকম একটি ছেলের হঠাৎ কি যেন হল। পড়াশুনায় মন বসে না। বাড়ির বাইরে বের হয় না। বন্ধু বান্ধবদের সাথে দেখা করে না। সারাদিন বাসায় থাকে আর মাঝে মাঝে বড় রাস্তার পাশে ছাতিম গাছটার নিচে বসে।

সুজনের বাবা শহরে একটা হোটেলে কাজ করে। আর মা বাসায় থাকেন। মাঝে মাঝে একটু আকটু সেলিয়ের কাজ করেন। এই দু’জনের উপার্জনে সুজনদের সংসার মোটামুটি চলে যায়। কিন্তু ইদানিং সুজনের কি যেন হয়েছে। কারো সাথে কথা বলে না। কারো সাথে মিশে না। সমস্যাটা কোথায়।

সুজন এই বার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবে। স্বাভাবিক ভাবেই সুজনের বেশি বেশি পড়াশুনা করার কথা কিন্তু সুজন কলেজের পাঠ্য বই স্পর্শও করে না। সুজনের এই সমস্যার কথা ওর কলেজে জানাজানি হয়ে গেল।

একদিন সুজনের পদার্থ বিজ্ঞান টিচার সুজনকে ডেকে পাঠালেন তার রুমে। জিজ্ঞেস করলেন সুজনকে কিন্তু সুজন তেমন কিছু বলল না।

সুজন ওর ঘরে। রাত বাজে দুই টা এখনো বাতি জলছে। সুজনের বাবা পানি খেতে উঠে দেখলেন সুজনের ঘরে বাতি জলছে। তিনি সুজনের ঘরে গেলেন।

কি করতাছ বাজান ?

কিছু না।

তোমার হাতে ওইটা কি ? দেখি।

একটা বই আব্বা।

কি বই ?

হুমায়ূন আহমেদের বই। নাম ” তোমাদের এই নগরে ”।

সুজনের পিতা বললেন, বই পড়বা ভালা কথা কিন্তু এত রাতে কেন দিনে পড়বা।

আব্বা আমার রাতে বই পড়তেই ভাল লাগে।

তোমার মা বলল, তুমি নাকি ইদানিং কেমন কেমন হইয়া যাইতাছ। ঘটনা কি সত্যি।

কেমন হইতাছি আব্বা ?

এই যে কারো লগে কথা বল না। কারো সাথে মিল মিশ করো না। বাজান তুমি আমার এক মাত্র ছাওয়াল। তোমারে নিয়া আমার অনেক বড় স্বপ্ন। তুমি বড় বড় পাশ দিয়া ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হইবা। কথা গুলো বলতে বলতে সুজনের পিতার গলা ধরে এলো। তিনি নিজেকে সামলে সুজনের গায়ে হাত বুলিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু সুজনের মন শান্ত হল না। বরং পিতার নিঃস্বার্থ ভালবাসার জ্বলে আরেকটু ভিজে গেল।

সুজন শুধু একজনকেই কল্পনা করছে। বাস্তবের সাথে এই একজনের মিল খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। সে থাকে বাস্তবতা আর অবাস্তবতার মাঝখানে। লজিক আর এন্টি লজিক শব্দ দুটির মাঝামাঝি বসবাস সেই মানুষটির। আমরা অনেকেই এই চরিত্রটির সাথে পরিচিত। এই মানব চরিত্র আমাদের সকলের মাঝেই কিছু না কিছু উপস্থিত। চরিত্রটির নাম – হিমু।

হ্যাঁ, হুমায়ূন আহমেদের সেই বিখ্যাত চরিত্র হিমু। আমাদের ভোলাভালা সুজনকে যে চরিত্রটি যাদু করেছে সে আমাদের আরেক ভোলাভালা – হিমু।

হিমুর সাথে সুজনের প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন যিনি তিনি হেলাল ভাই। দুঃখিত, হেলাল ভাই ওনার নাম আর হেলাল লেখেন না। তিনি লেখেন হেলালুর রহমান হিমালয় অরুফে হেলাল হিমু। হিমুর প্রতি প্রবল ঘোর থেকেই এই কাজটা তিনি করেছেন।

হেলাল ভাই সম্পর্কে একটু পরিষ্কার করে বলি। হেলাল ভাই সুজনদের কলেজের পাশের এক মেসে থাকেন। ঢাকা শহরে আগে কি যেন একটা চাকরী করতেন এখন আর তা করেন না। দিনরাত শুধু বই পড়েন আর হিমু চর্চা করেন। পড়াশুনা তেমন একটা করেন নি। গ্রামের কলেজ থাকে বি এ পাশ করেছেন সেই অনেক আগে। এখনো বিয়ে করেন নি। মনে হয় আর করবেনও না। নিজের ব্যাক্তিগত সম্পত্তি বলতে গেলে ঘুণে ধরা একটা চকি, তেল চিটচিটে একটা বালিশ আর হিমু সিরিজের কয়েকটি বই। বই গুলোর অবস্থাও ভাল না। উঁই পোকার নিয়মিত খাদ্যে পরিণত হয়েছে বই গুলো। এই দিকে হেলাল হিমুর কোন মাথা ব্যাথা নেই। তিনি মনে করেন প্রকৃতি এই খাদ্য উঁই পোকাদের জন্য বরাদ্দ করেছে। এখন বই গুলো সরিয়ে ফেললে খাদ্য শৃঙ্খলে ব্যাঘাত ঘটবে।

হেলাল ভাইয়ের আগে এরকম ছিলেন না। স্মার্টনেস কাকে বলে হেলাল ভাইকে দেখে শেখা যেত। ক্লিন শেভ করতেন। সানগ্লাস পড়তেন। চুলে সেম্পু করতেন। পারফিউম ব্যাবহার করতেন। টাইট জিন্সের সাথে টাইট টি-শার্ট পড়তেন। আবার দু’একটা প্রেমও করতেন। মোটকথা আধুনিক বাংলা সিনেমার আদর্শ হিরো।

কিন্তু এখন তাকে দেখে  তাঁর অতীত বোঝার উপায় নেই। হেলাল ভাই এখন আগাগোড়া হিমুখোড়। হিমুখোড় শব্দটা আগে কোথাও শুনি নি। এই প্রথম ব্যবহার করছি। আমরা এই সমাজে নানা খোর দেখতে পাই, যেমন- মদ খোড়, জুয়া খোড়, আফিম খোড়, হিরোইন খোড়, বিড়ি খোড়, মাগি খোড় ইত্যাদি। শেষের খোড়টা শুনতে একটু খারাপ শোনা যায় কিন্তু আমাদের সমাজে এই খোড়ের সংখ্যাই সবচে’ বেশি। হিমু খোড় এর চেয়েও ভয়ংকর। তাই বলছি, হিমু খোড় থেকে একশ হাত দুরে থাকুন।

সুজনের সাথে হেলাল ভাইয়ের পরিচয় হয় এক বছর আগে, কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়। সুজন ওর এক বন্ধুকে নিয়ে হেলাল ভাইয়ের মেসে যায়। উদ্দেশ্য তেমন কিছু না, সুজনের বন্ধু ঐ মেসের কার কাছ থেকে নাকি একটা বই নিয়েছিল সেটা ফেরত দিতেই যাওয়া। ঘটনাক্রমে ঐ লোক হেলাল ভাইয়ের রুমমেট।

হেলাল ভাইয়ের রুমে ঢুকেই সুজন অবাক হল। দেয়ালে হাতে লেখা নানা কাগজ লাগানো। যেমন একটা কাগজে লেখা,

” হিমু হওয়ার নিয়মাবলি ”

(১) বয়স আঠারো বছরের উপরে হতে হবে। আঠারো বছরের নিচে হিমু হওয়া যাবে না।

(২) হলুদ পাঞ্জাবী বাধ্যতামূলক। তবে শীতকালে হলুদ চাদর পরা যাতে পারে।

(৩) খালি পা বাধ্যতামূলক না। কম দামি চামড়ার স্যান্ডেল পরা যেতে পারে। শীত প্রধান       দেশের হিমুরা জোতা মোজা পড়তে পারবে।

(৪) প্রতি পূর্ণিমায় পূর্ণচন্দ্রের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকা বাধ্যতামূলক।

(৫) বৃষ্টি বাদলার দিনে ছাতা ব্যবহার করা যাবে না। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়       বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে যেতে হবে।

(৬) রাতে নির্জন রাস্তায় হাটার বিধান শিথিল যোগ্য।

(৭) হিমুরা কখনো রাজনৈতিক দলের সদস্য বা সমর্থনকারী হতে পারে না। তাদের              একটাই নীতি হিমু নীতি।

(৮) হিমুদের জন্য সপ্তাহে দু’দিন নিরামিষ আহার বাধ্যতামূলক বাকি দিন গুলোতে মনের সুখে খাওয়া দাওয়া করা যেতে পারে।

(৯) হিমুদের পাঞ্জাবীতে পকেট থাকে না তবে কেউ পকেট রাখতে চাইলে দোষ হবে না।

(১০) হিমুরা কখনোই মানি ব্যাগ ব্যবহার করতে পারবে না।

(১১) হিমুরা সদা হাস্য মুখে থাকবে। সবার সঙ্গেই ঠাট্টা ফাজলামি করবে তবে পুলিশ বাহিনীর কোন সদস্যের সাথে কখনো না। তারা ঠাট্টা ফাজলামি বুঝে না।

(১২) আদি হিমুর পিতা যেসব নীতি মালা হিমুর জন্য লিখে গেছেন সেইসব নীতিমালা নিয়মিত পাঠ করতে হবে সে মত জীবন যাপন করতে হবে।

(১৩) হিমুরা কখনোই কোন তরুণীর সাথে হৃদয় ঘটিত ঝামেলায় জড়াবে না। এক সঙ্গে ফুচকা খাওয়া, ফাস্ট ফুড খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

(১৪) এক হিমু আরেক হিমুকে সর্বদা আপন ভাইয়ের মত দেখবে।

(১৫) বিশেষ বিশেষ উৎসবে যেমন, পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারিতে সব হিমুরা একত্রিত হয়ে হিমু সঙ্গীত গাইবে।

এই পর্যন্ত লিখে কাগজের শেষে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

প্রশ্নবোধক চিহ্নটা দেওয়ার কারন সুজন ধরতে পারল না। ধরতে পারার কথাও না কারন সুজন তখনো হিমু সম্পর্কে অজ্ঞাত।

প্রথম দেখাতেই হেলাল ভাইকে সুজনের পাগল ধরনের মানুষ বলে মনে হল। গাল ভর্তি দাড়ি। খোঁচা খোঁচা নয় লম্বা লম্বা দাড়ি। পড়নে বোতাম বিহীন চিটা পড়া হলুদ পাঞ্জাবী আর পায়ের কাছে ফেঁসে যাওয়া কালো একটা প্যান্ট। দেখে মনে হয় দীর্ঘ দিন পরিষ্কার করা হয় নি। ধুলোয় সাদা হয়ে আছে। ঘরে আসবাব পত্র বলতে আছে একটা কমদামী চকি আর পায়ার ভাঙ্গা একটা টেবিল। ভাঙ্গা পায়াটার নিচে এক স্তূপ পত্রিকা। টেবিলের উপর কতগুলো বই। বেশির ভাগ বইয়েরই নাম পড়া যাচ্ছে না। উঁই পোকা খেয়ে ফেলেছে। বইয়ের পৃষ্ঠা গুলো ছত্রাকের কালো আবরণে ঢাকা।

 

 

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/jahidseueee/28238.html



মন্তব্য করুন