ইমরান এইচ সরকার-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

জাতির জনকের বীরোচিত প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন: ইমরান এইচ সরকার

জাতির জনকের বীরোচিত প্রত্যাবর্তন

ঘড়ির কাঁটা নিয়মিতভাবে প্রতি বছর ১০ জানুয়ারি অতিক্রম করে। প্রতিটি সেকেন্ড এগিয়ে চলে সমত্বরণে। তবু দেয়ালঘড়ির টিক টিক শব্দগুলো কেন যেন অনিয়মিত মনে হয়। মূহুর্তগুলো নিজেদের উৎসর্গ করে দেয় দূর থেকে ভেসে আসা কোন কল্পচিত্রের কাছে। কল্পচিত্রের ছায়ায় আজ বজ্রকণ্ঠ নয়, স্পষ্ট আলেয়া। বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছেন তার স্বদেশে দেখছি। আশীর্বাদ কীভাবে এ অসীম গতিতে ইথার হয়ে গণমানুষের বুকে আশা জাগায় ভাবছি।

আজও মুক্তিযোদ্ধাদের পবিত্র রক্তে উর্বর হয়ে আছে বাংলাদেশের মাটি। সুদীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধে যে অদ্বিতীয় মানুষটি অদৃশ্য হয়েও চঞ্চল করে রেখেছিল লাখো বাঙালিকে, তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ সালের এই দিনে তিনি ফিরে এসেছিলেন তার স্বপ্নের স্বর্গভূমিতে। সহস্র বছরের শ্রেষ্ঠ এ বাঙালিকে বরণ করে নিয়েছিল গোটা মানচিত্র। রক্তস্নাত মাটি ছুঁয়ে সেদিন তিনি শপথ করেছিলেন নতুনভাবে দেশ গড়ার। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ইতিহাস হয়ে রইলো। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস তার নিজের বাণীতে ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা’ অভিধা পেল।

এহান এ নেতার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৩৯ সালে। মিশনারি স্কুলে তখন পড়তেন তিনি। সে বছর স্কুল পরিদর্শনে এসেছিলেন তদানীন্তন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মুসলিম লীগ তথা বিপিএমএল এর সাধারণ সম্পাদক হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। স্কুলের ছাদ সংস্কারের দাবীতে সব শিক্ষার্থীরা তখন একমত। একটি দল নিয়ে সবাই তাদের কাছে যান যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজেই। পরের বছর নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগ দেন তিনি। এক বছর মেয়াদের জন্য সেখানে তিনি নির্বাচিত হন। ১৯৪২ সালে এসট্রান্স পাশ করার পর তৎকালীন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমান নাম মাওলানা আজাদ কলেজ) আইন পড়ার জন্য ভর্তি হন। সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতির শুরু মূলত: এ কলেজ থেকেই।

১৯৪৮ সালে পাকিস্তান-ভারত আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ার পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ। এর মাধ্যমে তিনি অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতায় পরিণত হন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেই মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নীতিমালা নিয়ে তিনি একটি প্রস্তাব পেশ করেছিলেন। ফলে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই পরিষদের আহবানে ১১ মার্চ ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘট পালনকালে শেখ মুজিবসহ আরও কয়েকজন রজনৈতিক কর্মীকে সচিবালয় ভবনের সামনে থেকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ছাত্রসমাজের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৫ মার্চ শেখ মুজিব এবং অন্য ছাত্র নেতাদেরকে মুক্তি দেয়া হয়। ১৯ মার্চ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে একটি আন্দোলন পরিচালনা করেন। এতে ১১ সেপেম্বর তাকে আবার আটক করা হয়।

১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি জেল থেকে মুক্তি পান বঙ্গবন্ধু। ২৩ জুন তিনি সোহরাওয়ার্দী এবং মাওলানা ভাসানীর পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগ দেন। পূর্ব পাকিস্তান অংশের যুগ্ম সচিব নির্বাচিত হন তিনি। অক্টোবরের শেষদিকে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সাথে মিলে লিয়াকত আলি খানের কাছে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণের চেষ্টা করায় ভাসানী এবং তাকে আটক করা হয়।

১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথমদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানের পূর্ব পাকিস্তান আগমনকে উপলক্ষ্য করে আওয়ামী মুসলিম লীগ ঢাকায় দুর্ভিক্ষবিরোধী মিছিল বের করে। মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে এবারও শেখ মুজিব আটক হন। সেবার তার দুই বছর জেল হয়েছিল। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা করেন, উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। এ ঘোষণার পর জেলে থাকা সত্ত্বেও মুজিব প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আয়োজনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। জেল থেকে নির্দেশনা দেয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে পরিচালনায় তিনি ভূমিকা রাখেন। জেলে থেকে তিনি ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন পালনের সিদ্ধান্ত নেন। এ অনশন ১৩ দিন কার্যকর ছিল। ২১ ফেব্রুয়ারিকে রাষ্ট্রভাষার দাবী আদায়ের দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি জেল থেকে মুক্তি পান।

১৯৫৩ সালের ৯ জুলাই। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের শেষে দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু। একই বছরের ১৪ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭ টি আসনের মধ্যে ২২৩ টিতে বিপুল ব্যবধানে বিজয় অর্জন করে যার মধ্যে ১৪৩ টি আসনই আওয়ামী লীগ লাভ করেছিল। গোপালগঞ্জে আসনে বঙ্গবন্ধু ১৩,০০০ ভোটের ব্যবধানে বিজয় লাভ করেন। ১৫ মে তাকে কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। ২৯ মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট ভেঙে দেয়। ৩০ মে করাচি থেকে ঢাকা ফেরার পর বিমান বন্দর থেকেই তাকে আটক করা হয়। ২৩ ডিসেম্বর মুক্তি লাভ করেন।

১৯৫৫ সালের ৫ জুন তিনি আইন পরিষদের সদস্য মনোনীত হন। ১৭ জুন আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে আয়োজিত এক সম্মেলনে ২১ দফা দাবী পেশ করে যার মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসন অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২৩ জুন দলের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভায় সিদ্ধান্ত হয়, পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন অর্জিত না হলে আইন সভার সকল সদস্য পদত্যাগ করবেন।

২১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু পুনরায় দলের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ৩ ফেব্রয়ারি মুখ্য মন্ত্রীর সাথে আওয়ামী লীগের বৈঠকে দল থেকে খসড়া সংবিধানে স্বায়য়ত্ত্বশাসন অন্তর্ভুক্ত করার দাবী জানানো হয়। ১৪ জুলাই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব রাখা হয় যা তিনিই সরকারের কাছে পেশ করেন। সেপেম্বর মাসের ৪ তারিখ তার নেতৃত্বে একটি দুর্ভিক্ষ বিরোধী মিছিল বের হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারী এই মিছিলে পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে কমপক্ষে তিনজন নিহত হয়।

১৬ সেপেম্বর শেখ মুজিব কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিয়ে একসাথে শিল্প, বাণিজ্য, শ্রম, দুর্নীতিরোধ এবং গ্রামীণ সহায়তা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে ৩০ মে দলের জন্য সম্পূর্ণ সময় ব্যয় করার তাগিদে তিনি মন্ত্রীপরিষদ থেকে পদত্যাগ করেন। ৭ আগস্ট সরকারি সফরে চীন এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন যান। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা এবং সেনাবাহিনী প্রধান আইয়ুব খান দেশে মার্শাল ল জারি করে সকল ধরণের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এই বছরেরই ১১ অক্টোবর তাকে আটক করা হয়। জেলা থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মাথ্যা অভিযোগ আনা হয়। ১৪ মাস একটানা আটক থাকার পর তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল, কিন্তু জেলের ফটক থেকে আবার গ্রফতার করা হয়।

১৯৬১ সালে জেল থেকে ছাড়া পান। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন যার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করা। ১৯৬২ সালের ৬ ফেব্রয়ারি জননিরাপত্তা আইনে তাকে আবার আটক করা হয়েছিল। জুনের ২ তারিখে চার বছর ব্যাপী মার্শাল ল অপসারণের পর একই মাসের ১৮ তারিখে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। ২৫ জুন অন্য রাজনৈতিক নেতাদের সাথে মিলে আইয়ুব খান আরোপিত বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে নেমে পড়েন। ৫ জুন পল্টন ময়দানে আয়োজিত এক সম্মেলনে আইয়ুব খানের সমালোচনা করেন। ২৪ সেপেম্বর লাহোর যান এবং সেখানে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে মিলে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গড়ে তোলেন। এটি মূলত বিরোধী দলসমূহের একটি সাধারণ কাঠামো হিসেবে কাজ করেছিল। পুরো অক্টোবর মাস জুড়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে বাংলার বিভিন্ন স্থান সফর করেন এই যুক্তফ্রন্টের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে।

সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে আওয়ামী লীগকে পুনরায় সংহত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ১১ মার্চ একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধকল্পে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সেনাশাসক আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসিস প্ল্যান, সামরিক শাসন এবং এক-ইউনিট পদ্ধতির বিরোধী নেতাদের মধ্যে অগ্রগামী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এই পদ্ধতি অনুযায়ী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার পরিকল্পনা করা হয় এবং প্রদেশগুলোকে একত্রে জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে তিনি আইয়ুব বিরোধী দল প্রার্থী ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থন করেন। যথারীতি নির্বাচনের দুই সপ্তাহ পূর্বে তাকে আটক করা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহীতা এবং আপত্তিকর প্রস্তাব পেশের অভিযোগে অভিযুক্ত করে এক বছরের কারদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। উচ আদালতের এক রায়ে তার আগেই তিনি মুক্তি পেয়ে যান।

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের একটি জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনেই বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবী পেশ করেন যাতে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের পরিপূর্ণ রূপরেখা উল্লেখিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, এ দাবী ছিল “আমাদের বাঁচার দাবী”। এই দাবীর মূল বিষয় ছিল একটি দুর্বল কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত পাকিস্তানী ফেডারেশনে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসন। সম্মেলনের  উদ্যোক্তারা প্রত্যাখান করেন এ দাবী এবং বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করেন। ক্ষোভে এ সম্মেলন বর্জন করে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে আসেন।

মার্চ মাসের এক তারিখে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ছয় দফার পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনা করেন। এই সময় তিনি সিলেট, ময়মনসিংহ এবং ঢাকায় বেশ কয়েকবার পুলিশের হাতে বন্দী হন। বছরের প্রথম চতুর্থাংশেই তাকে আটবার আটক করা হয়েছিল। এই বছরের মে ৮ তারিখে নারায়ণগঞ্জে পাট কারখানার শ্রমিকদের এক র‌্যালিতে অংশগ্রহণের জন্য তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। তার মুক্তির দাবীতে ৭ জুন দেশব্যাপী ধর্মঘট পালিত হয়। পুলিশ এই ধর্মঘট চলাকালে গুলিবর্ষণ করে যার কারণে ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জে তিনজনের মৃত্যু হয়।

সেনাবাহিনী কর্তৃক আটক হয়ে জেলে দুই বছর থাকার পর ১৯৬৮ সালের প্রথমদিকে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধু সহ আরও ৩৪ জন বাঙালি সামরিক ও সিএসপি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করে। ইতিহাসে এটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছিল শেখ মুজিবসহ এই কর্মকর্তারা ভারতের ত্রিপুরা অঙ্গরাজ্যের অন্তর্গত আগরতলা শহরে ভারত সরকারের সাথে এক বৈঠকে পাকিস্তানকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা তৈরী করেছে। এতে শেখ মুজিবকে এক নম্বর আসামী করা হয় এবং পাকিস্তান বিভাগের এই ষড়যন্ত্রের মূল হোতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অভিযুক্ত সকল আসামীকে ঢাকা সেনানিবাসে অন্তরীন করে রাখা হয়। প্রতিবাদে ফেটে পড়ে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান। এই মামলাকে মিথ্যা আখ্যায়িত করে সর্বস্তরের মানুষ শেখ মুজিবসহ অভিযুক্ত সকলের মুক্তির দাবীতে রাজপথে নেমে আসে। ১৯ জুন ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিচারকার্য শুরু হয়।

বিচারকার্য চলাকালীন সময়ে ১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তাদের এগার দফা দাবী পেশ করে যার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার সবগুলোই দফাই অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি গৃহীত হয়। এক সময় গণ আন্দোলনে রূপ নেয় এ সংগ্রাম। এই গণ আন্দোলনই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। মাসব্যাপী প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলন, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ, কারফিউ, পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং বেশ কিছু হতাহতের পর আন্দোলন যখন চরম রূপ ধারণ করে তখন পাকিস্তান সরকার ছাড় দিতে বাধ্য হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান রাজনৈতিক নেতাদের সাথে এক গোলটেবিল বৈঠকের পর এই মামলা প্রত্যাহার করে নেন। বঙ্গবন্ধুসহ অভিযুক্ত সকলকে মুক্তি দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক সভার আয়োজন করে। লাখো জনতার এই সম্মেলনেই তিনি বঙ্গবন্ধু উপাধি লাভ করেন। উপাধি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন তাজউদ্দিন আহমেদ। সভার বক্তৃতায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগার দফা দাবীর পক্ষে বঙ্গবন্ধু তার পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।

১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে এখন থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে “বাংলাদেশ” নামে অভিহিত করা হবে:

” একটা সময় ছিল যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে ‘বাংলা’ শব্দটি মুছে ফেলার সব ধরণের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। ‘বাংলা’ শব্দটির অস্তিত্ব শুধু বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। আমি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আজ ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে এই দেশকে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে ‘বাংলাদেশ’ ডাকা হবে”।

গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে । পশ্চিম পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ এবং সামরিক কর্তারা তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করতে শুরু করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রাদেষিক আইনসভায় পরিষ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তানের কোটার ২ টি আসন ছাড়া বাকি সবগুলোতে জয়ী হওয়ার জন্য জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতাও অর্জন করে আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে মেরুকরণ সৃষ্টি করে। পশ্চিম পাকিস্তানের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো, বঙ্গবন্ধুর স্বায়ত্বশাসন নীতির প্রবল বিরোধীতা করেন। ভুট্টো এ্যাসেম্বলি বয়কট করার হুমকি দিয়ে ঘোষণা দেন যে, ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে সরকার গঠনের জন্য আহবান জানালে তিনি সে সরকারকে মেনে নেবেন না।

রাজনৈতিক অস্থিশীলতার মধ্যে ইয়াহিয়া খান সংসদ ডাকতে দেরি করছিলেন। বাঙালিরা এতে বুঝে ফেলে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া স্বত্ত্বেও তাদেরকে সরকার গঠন করতে দেয়া হবে না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মুজিব স্বাধীনতার ডাক দেন এবং জনগণকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করেন।

ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক ও জনসাধারণের অসন্তোষ দমনে ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট শুরু করে। সে রাতেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। মূল ঘোষণার আনুবাদ ছিল:
“এটাই হয়ত আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের মানুষকে আহবান জানাই, আপনারা যেখানেই থাকুন, আপনাদের সর্বস্ব দিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ চালিয়ে যান। বাংলাদেশের মাটি থেকে সর্বশেষ পাকিস্তানি সৈন্যটিকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের আগ পর্যন্ত আপনাদের যুদ্ধ অব্যাহত থাকুক”।

ওই রাতেই পাক হানাদার বাহিনী ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাসভবন থেকে বঙ্গবন্ধুকে আটক করা হয়। গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে একটি জেলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়। পাকিস্তানি জেনারেল রহিমুদ্দিন খান মুজিবের মামলার পরিচালনা করেন। মামলার আসল কার্যপ্রণালী এবং রায় কখনোই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় নি।

শুরু হল রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাস পর লাখো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হল স্বাধীনতা। যুদ্ধবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু পরিবারকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। বাঙ্গালির দাবি এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তানি শাসকবৃন্দ মহান এ নেতাকে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। লণ্ডন হয়ে নতুন দিলি−তে ফিরে আসেন তিনি এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাতের পর ১০ জানুয়ারি তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করেন। ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাখো মানুষ তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা জাতির জনককে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানায়। গান্ধীর সাথে সেদিন তিনি ঢাকায় জড়ো হওয়া প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সামনে বক্তৃতা দেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে যুক্ত হল নতুন এক পৃষ্ঠা বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। স্বাধীনতার পর সব বাঙালি সেদিনই আবেগে অশ্রসিক্ত হয়ে পড়ে। প্রিয় নেতাকে সামনে পেয়ে গোটা জাতি সংকল্পবদ্ধ হয় নতুন এক দেশ বিনির্মাণে। “জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র” এ চারটি মূলনীতিকে সামনে রেখে রচিত হতে থাকে নতুন সংবিধান।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত এ মহান নেতা তার রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময় ছিলেন জেলে। গণমানুষের মুক্তির বীণাকে কণ্ঠে ধারণ করে আপোষহীনভাবে নের্তৃত্ব দিয়েছিলেন গোটা জাতিকে। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস হলেও বাঙালি জাতি বিজয়ের পূর্ণতা পায় বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসেই। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মাটি থেকে মিত্র বাহিনীর সদস্যদের ভারতে ফিরে যাওয়া, বিপুল পরিমাণ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আনা, জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা, জাতিসংঘ প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাষ্ট্রের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান, এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, বিধ্বস্ত অবকাঠামোসহ সামগ্রিক অর্থনীতির পুনর্বাসন, সংবিধান প্রণয়ন, সশস্ত্র বাহিনী, আইন-শৃংখলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসন পুনর্গঠন থেকে শুরু করে সবকিছু তাকে নতুন করে গড়ে তুলতে হয় তাকে। বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আজকের বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং তার সুদীর্ঘ সংগ্রামী ঐতিহ্য থেকে প্রেরণা নিয়ে আমাদেরকে নতুনভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/imran/1894.html

 9 টি মন্তব্য

(ফোনেটিক বাংলায়) মন্তব্য করুন

  1. মনি

    bongo bondhur ar kokhonoe prottaborton hobe na, kintu tar nitigulo roye jabe chirokal. “জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র” এ চারটি মূলনীতিকে সামনে রেখে amader agiye jete hobe.

    1. ইমরান এইচ সরকার

      সেটাই। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

  2. শনিবারের চিঠি

    অসাধারণ ঝরঝরে লেখা। প্রাসঙ্গিক কিছু ছবি দরকার ছিলো। সবচেয়ে বড়ো কথা- ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেই একটা ভাষণ দিয়েছিলেন। অবেগঘন ও অত্যন্ত সাবলীল একটি ভাষণ। সে ভাষণ শুনলে এখনও চোখে জল আসে। সে ভাষণটা দেয়া গেলে ভালো হতো।

    কমেন্ট সেকশনে ভিডিও যোগ করা যাচ্ছে না, গেলে আমিই সেটা দিয়ে দিতাম।

    1. ইমরান এইচ সরকার

      ব্লগের জটিল বিষয়সমুহ আমি এত ভাল বুঝি না আপনাদের মত!
      লেখাটি মুলত একটি পত্রিকার সম্পাদকীয়তে দিয়েছিলাম। ভাবলাম যেহেতু প্রাসঙ্গিক তাই দিয়ে দেই। পড়ার জন্য ধন্যবাদ

  3. অনিমেষ রহমান

    চমতকার লিখেছেন।মোটামুটি অল্পকথায় অনেক কিছু।

    1. ইমরান এইচ সরকার

      ধন্যবাদ অনিমেষ ভাই। পড়ার জন্য ধন্যবাদ।

      1. অনিমেষ রহমান

        বঙ্গবন্ধুর জীবনী প্রায় পুরোটাই উঠে এসেছে ইমরান ভাই।ধন্যবাদ আপনার প্রাপ্য।

  4. রাইয়ান আজম

    খুব ভাল লাগল।লেখাটা আমার কাছে অসাধারন লেগেছে

  5. মোঃ মোসাদ্দেক হোসেন

    খুব ভাল লাগল

মন্তব্য করুন