হীরক বালা-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থাই ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্কের চাবিকাঠি

লিখেছেন: হীরক বালা

বিভিন্ন খবরের মাধ্যমে আমরা জানতে  পেরেছি যে, ভারত তার সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদারের জন্য ড্রোন মোতায়েন করার পরিকল্পনা করছে। আকাশে উড়ে ড্রোন পর্যবেক্ষণ করবে সীমান্তের অবস্থা এবং সেই ভাবে সে রিপোর্ট পাঠাবে নিরাপত্তা সংস্থার কাছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ভারত সরকারের কাছে এর ব্যাখ্যাও চেয়েছে এবং তারা জানিয়েছে  যে, সীমান্তে ড্রন মোতায়েন করার কোন সম্ভাবনা আপাতত ভারত সরকারের নেই।

1233375_10201720906295386_215150746_n

আমি প্রায় সাড়ে তিন বছর (সেপ্টেম্বর ২০০৭ থেকে মার্চ ২০১১) ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্রে (Indian Visa Application Center, IVAC) কাজ করেছি। সেখানে কাজ করার সময় অনেক লোকের সাথে মিশেছি। ভারতীয় হাই কমিশনের ভিসা অফিসার (Visa Officer) থেকে শুরু করে দ্বিতীয় সচিব (Second Secretary) পর্যন্ত অফিসারদের সাথে বিভিন্ন সময় দেখা করেছি জরুরী কাজের জন্য।

অনেক ইমারজেন্সি ভিসা আমি অনেকের জন্য করে দিয়েছি। অনেক অসুস্থ রোগীর জরুরী ভিসার জন্য সরাসরি অনুরোধ করতাম দ্বিতীয় সচিবদের (Second Secretary)। তারা আমার অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারতেন না। আমি অবশ্য নিয়মতান্ত্রিক ভাবেই কাজ করতাম। এজন্য কেউ আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করতে পারত না। এখন অবশ্য পরিস্থিতি অনেক পাল্টে গেছে। এখন কেউই সহজে হাই কমিশনের ভিতর যেতে পারেনা।

ভারত আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত আমাদের বিপদের সাথী ঐতিহাসিক ভাবেই। বস্তুতঃ ভারত ছাড়া আমরা অসহায়। মানুষ যদি তার একটা পা কেটে ফেলে, তাহলে পঙ্গু হয়ে যায়। ঠিক তেমনি ভারত যদি আমাদের থেকে দূরে সরে যায়, আমরা যদি বন্ধুহীন হয়ে যাই, তাহলে আমরাও পঙ্গুত্ব বরণ করব।

আমার বলতে লজ্জা লাগে যে, স্বাধীনতার ৪২ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেল, অথচ এখনও আমরা সীমান্ত সমস্যার কোন গ্রহণ যোগ্য ও যুক্তিসংঘত সমাধান করতে পারলাম না।

আমার ভাবতে অবাক লাগে, এই দুই দেশের অধিবাসীরা এখনও পাসপোর্টে ভিসা নিয়ে পরস্পরের দেশে ভ্রমণ করতে আসে। অথচ ইউরোপে এই ভিসা প্রথা নেই বললেই চলে। কানাডা ও আমেরিকার লোকজন কোন রকম ভিসা ছাড়াই পরস্পরের দেশে ভ্রমণ করছে। আর আমরা কি করছি? আমরা দীর্ঘক্ষণ লাইন দিয়ে ভিসা ফর্ম জমা দেই ভিসা সেন্টারে।

বলাবাহুল্য,  প্রতিদিন ৩০০০-৪০০০ ভারতীয় ভিসা ইস্যু হয় বাংলাদেশের নাগরিকদের ভারত ভ্রমণের জন্য।

বর্তমানে অনলাইনে ভারতীয় ভিসা আবেদন পত্র পূর্ণ করার পর, আবেদন পত্র জমা দেওয়ার তারিখ পাওয়া যায় ১/২ মাস পর। তার মানে ইচ্ছে করলেই তারিখ এগিয়ে নেওয়া যাচ্ছেনা।

যদি কেউ এই মাসেই ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা করে এবং সে যদি আজই অনলাইনে বসে দীর্ঘক্ষণ ভারতীয় ভিসা আবেদন পত্র পূরণ করে, তাহলে ফর্ম জমা দেওয়ার তারিখ পাবে ১ থেকে দুই মাস পর। এই হল ভারতীয় ভিসা পাওয়ার বর্তমান অবস্থা। এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সুদূর পরাহত।

আমাদের মাননীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি কি পারবেন আমাদের এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি দিতে?

ভারত এখন তাদের সীমান্তকে বিপদমুক্ত রাখতে ড্রোন মতায়েন করার পরিকল্পনা করছে। তার মানে চোরাচালানি থেকে শুরু করে যে কোন রকম অবৈধ অনুপ্রবেশ তারা রুখতে চায়।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি ছোট দেশ। আমাদের সম্পদ সীমিত। ভারতের সাথে আমাদের কোন অশান্তি হোক, তা আমরা কখনই চাইনা। কারন তাতে ক্ষতি আমাদেরই হবে। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের উপর নির্ভরশীল। এই বাস্তবতা মোটেই অস্বীকার করা যাবেনা।

1175671_10201720907935427_673674392_sতাই ভারতের সাথে যে কোন সমস্যা কুটনৈতিক পর্যায় থেকে সমাধান করাই শ্রেয়।

আমরা ভারতেকে যেমন বিশ্বাস করি, তারাও আমাদেরকে বিশ্বাস করে। এই বিশ্বাসবোধে ফাটল ধরলে, তাতে হিতে বিপরীত হওয়াই স্বাভাবিক। তাই পারস্পরিক বিশ্বাসবোধ ও আস্থা অর্জন করাই আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ভারতের সাথে আমাদের কোন রকম সংঘাত হলে, তাতে লাভ হবে পাকিস্তানের।

তাই সংঘাত নয়, বৈরিতা নয়, যুদ্ধ নয়। শান্তি ও কুটনৈতিক স্থিতিশীলতাই পারে পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন অটুট রাখতে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত জোড়াল ভাবে সীমান্তে যাতে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তার দিকে সুনজর দেওয়া।

বিজিবি সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী। তাই শুধু সীমান্ত রক্ষা করাই নয়, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং চরাচালানি কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রন করাই হবে দেশপ্রেমের পরিচয়।

রক্ষক যদি ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে আর দেশপ্রেমের কোন মূল্য থাকবেনা।

পরিশেষে এইটুকই বলতে পারি যে, পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থাই ভারত-বাংলাদেশ সুসম্পর্কের চাবিকাঠি।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/hirak/22200.html

 4 টি মন্তব্য

(ফোনেটিক বাংলায়) মন্তব্য করুন

  1. রহস্যময় শিশির

    ভারত যে বন্ধুর বেশে আমাদের রীতিমত শোষণ করে যাচ্ছে, তার ছিটেফোটাও আপনার লেখায় উঠে আসেনি !

    1. হীরক বালা

      আমরা নিজেদেরকেই গত ৪২ বছর ধরে কতোটা শোষণ করেছি, স্বজাতিকে কতোটা নির্যাতন করেছি, তার কোন হিসেব আপনার কাছে আছে রহস্যময় শিশির ভাই? ১৯৭১-এ দেশের মানুষই নিজের জাতির সাথে অনেক বেইমানি করেছে। নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। তার বিচার আবার আমরাই এখন করছি।  ১৯৭৫-এর পর এই বাংলাদেশের মানুষ যে কুকর্মগুলো করেছিল, যে অন্যায়-অবিচার করেছিল, তার কোন জবাব আছে আপনার কাছে?  আমরা নিজেদেরকেই এখনও চিনলাম না, অন্যকে কিভাবে চিনব? এদেশের মানুষ এখনও সংগ্রাম করছে মাথা উচু করে বাঁচার জন্য। আমরা নিজেদেরকেই বিশ্বাস করিনা, অন্যকে বিশ্বাস কিভাবে করব? 

      1. রহস্যময় শিশির

        // আমরা নিজেদেরকেই বিশ্বাস করিনা, অন্যকে বিশ্বাস কিভাবে করব ? //..নিজেদের উপর বিশ্বাস নেই । অন্যকে (ভারতকে) এতোটা বিশ্বাস করছেন কীভাবে ? আপনার এই উক্তিটি স্ববিরোধী হয়ে গেলো নাহ ?

        1. হীরক বালা

          স্ববিরোধী কেন হবে? আরে ভাই, “নিজের চরকায় তেল দেন”। কি লাভ ঝগড়া করে? ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেমন হবে, তা সময়ই বলে দেবে। 

মন্তব্য করুন