হাসান রাহমান মারজান-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

বেগম রোকেয়া দিবস : আজকের নারী তুমিই জাগিয়েছ হে মহীয়সী।

লিখেছেন: হাসান রাহমান মারজান

বাবা জহিরুদ্দীন হায়দার সাবের চৌধুরী গভীর ঘুমে, মা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানীর কোনো সাড়াশব্দ নেই।সারা বাড়ি নিজঝুম।তখনই মোমের আলোয় বই খুলে বসতো জ্ঞানপিপাসু একটি মেয়ে, আর ভাই ইব্রাহীম সাবের জ্ঞান তৃষার্থ বোনকে দিতেন পাঠ।এই জ্ঞান পিপাসু মেয়ের নামই বেগম রোকেয়া।বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত।বেগম রোকেয়ার জন্ম ৯ ই ডিসেম্বর ১৮৮০ সালে রংপুরের পায়রাবন্দ গ্রামে।আর এই পায়রাবন্দ গ্রামের জমিদার বাড়িতে পায়রার খোপের মত বন্দি জীবন যাপন করতেন তিনি।ঘরের বাহিরেতো নয়ই, কারো সামনে যাওয়াও ছিল নিষেধ। এমনকি সে যদি মেয়ে হয় তাঁর সামনেও নয়। একবার বেগম রোকেয়াদের বাড়িতে কয়েকজন মেয়ে-আত্মীয় বেড়াতে এলে, পাঁচ বছরের রোকেয়াকে কখনো চিলেকোঠায়, কখনো সিঁড়ির নিচে, কখনো দরজার আড়ালে আবার কখনো তক্তপোষের নিচে লুকিয়ে থাকতে হয়েছে। অর্থ্যাৎ, শুধু নারী হওয়ার জন্য বেগম রোকেয়া এরকম অবরোধ প্রথার শিকার হয়েছিলেন।কিন্তু বেগম রোকেয়া ছিলেন আধুনিক মনষ্কা নারী, বেরিয়ে আস্তে চাইলেন এই অবরোধ প্রথা থেকে। তাই যেখানে কোরান আর সামান্য উর্দু শিক্ষাই ছিল তাঁর জন্যে সর্বোচ্চ সেখানে তিনি ভাইয়ের সাহচর্যে গোপনে রাতের পর রাত বাংলা শিখতেন। কিন্তু এখানেও বাদ সাধলো বিয়ে। বেগম রোকেয়ার বয়স যখন মাত্র ১৬ বছর তখন ভাগলপুরের সাখাওয়াত হোসেনের সাথে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। তবে ভাগ্য ভালো যে সাখাওয়াত হোসেনও ছিলেন মুক্তমনা তাই তিনিও বেগম রোকেয়াকে সাহায্য ও উৎসাহ দিতেন। ভাগলপুরের স্বামীর বাড়ির সবাই উর্দুতে কথা বলতেন, তাই রোকেয়াকেও উর্দুতে কথা বলতে হত। কিন্তু একটি বারের জন্যেও প্রাণের বাংলা ভাষাকে ভুলে যাননি। হঠাৎ বেগম রোকেয়ার সামী সাখাওয়াত হোসেন মারা গেলেন। এবার এতদিন নিজে যে জ্ঞানের থালা রাত জেগে তৈরী করেছিলেন তা ছড়িয়ে দিতে চাইলেন বাংলার সকল মুসলমান নারীদের মাঝে।কারন তিনি তাঁর জীবন দিয়ে উপলব্ধি করতেপেরেছিলেন যে, যদি নারীদের চার দেয়ালে আবদ্ধ করে রাখা হয় তবে মুসলমান নারীরা পিছিয়ে পড়বে, পিছিয়ে পড়বে সমাজ ও দেশ।আর তিনিই বলেছিলেন যে, “গাড়ীর একটি চাকা যদি ছোট হয় আর অন্যটি বড় হয় তবে সেই গাড়ীটির কখনোই চলা সম্ভব নয়।ঠিক তেমনই নারীদের ঘরে বন্দি করে এই সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়”। তাই নারী মুক্তির জন্যে বেগম রোকেয়া স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের রেখে যাওয়া অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন একটি বিদ্যালয়। শুরুতে এ স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা কম থাকলেও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলো। অনেকেই বুঝতে পারলো বেগম রোকেয়ার কথাগুলোর গুরুত্ব।এবার নিজের মনের মাঝে জমানো কথাগুলো ছড়িয়ে দিতে কলম ধরলেন, লিখলেন নিজের বন্দী জীবনের কথা, নারী মুক্তির উপায় আর নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা।বেগম রোকেয়া খুব সহজেই সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে এমন অনেক কথাই বলেছেন লিখেছেন।তিনি শুধু নারী মুক্তির পথ দেখাননি দেখিয়েছিলেন কিভাবে নারী-পুরুষ মিলে কাজ করলে সহজেই দেশ ছুটবে অগ্রযাত্রায়। বেগম রোকেয়ার “সুলতানার স্বপ্ন” (Sultana’s Dream) বইটি সারা বিশ্বের নারীবাদী সাহিত্যের এক অভাবনীয় সৃষ্টি। এছাড়াও অবরোধ প্রথা নিয়ে তিনি লিখেছেন “অবরোধবাসিনী” আর নারী অধিকারের জন্যে পুরুষ শাসিত সমাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে হাসি-ঠাট্টা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে “মতিচুর” গ্রন্থে লিখেছেন সমাজ উন্নয়নে নারীর প্রয়োজনীয়তা। তিনি তাঁর সবগুলো প্রবন্ধ, গল্প আর উপন্যাসে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন ধর্মের নামে নারীর প্রতি অবিচারের কথা, দেখিয়েছেন এ থেকে মুক্তির পথও।বেগম রোকেয়া নারীদের চার-দেয়ালের ভিতর থেকে নিয়ে এসেছিলেন মুক্ত সমাজ ব্যবস্থায় আর তারই আদর্শ-অনুপ্রেরণায় নিশাত মজুমদার, ওয়াস্ফিয়া নাজরীন বাংলার নারীদের নিয়ে গেছেন এভারেস্টের চূঁড়ায়।আজ বাংলাদেশে যে নারী জাগরণ আর সাফল্য তাঁর ভিত্তিই গড়েছিলেন বেগম রোকেয়া।বেগম রোকেয়াই নারী অধিকারের জন্যে প্রথম আন্দোলনকারী।আজ ৯ই ডিসেম্বর, বেগম রোকেয়ার জন্ম ও মৃত্যো দিবস অর্থ্যাৎ বেগম রোকেয়া দিবস।বেগম রোকেয়া দিবসে এই মহীয়সী নারীর প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/hasan-marzan/26044.html



মন্তব্য করুন