gmakas-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

নারীমুক্তি

লিখেছেন: gmakas

                                    >>নারীমুক্তি << (অখণ্ড)

 

নারীমুক্তি  এই  শিরোনামটাই যথেষ্ট বিতর্কের জন্ম দিতে সক্ষম।

নারী কি কোন বন্ধনের নাম যে মুক্তির প্রশ্ন আসবে?

 নারীত্ব কি কোন শৃঙ্খল?

নারীত্ব কি কোন কারাগার?

যে মুক্তির প্রশ্ন আসবে?

আমি সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব না। কারণ আমার ধারনা আপনারা সবাই ব্যাপারটা অনুভব করতে পারেন। নারীরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আইন-কানুন দ্বারা কেমন বঞ্চিত সে ব্যাপারে আলোচনা করা নি¯প্রয়োজন কারণ এটাও অনেকটা দিবালোকের মত সত্য ও স্পষ্ট। সেসব আলোচনা করাও বাহুল্য-তা কারণ আপনারা সবাই কমবেশি জানেন সবাই

আমি বরং মেয়েদের এই আধি-মুক্তির উপায় এবং স্বত্বা গত মুক্তির পথ নিয়ে আলোচনা করব। কারণ সবচেয়ে বেশী যা দরকার তা হচ্ছে নিজস্ব স্বত্বা অর্জন করা। নিজের মত করে দেখতে শেখা, ভাবতে শেখা। নিজের ভেতরের গ্লানি ও  হিন্যমনতা   দূর করাআমারই মতে এর একটাই পথ আছে সেটা হল ভুলে যাওয়া যে আমি নারীকাজটা কঠিন নিঃসন্দেহে রীতিমত দুঃসাধ্য তবুও সম্ভব। আমার হাতে চুরির কাঁকন আমার পায়ে নূপুরের শৃঙ্খল, আমার গলায় ফুলের জানুয়াল, আমি কেমন করে ভুলে যাব যে আমি নারী। আর এই দেখুন  মহাপুরুষরা নারী সম্পর্কে কে কি বলেছেন।

 ## শামূয়লে বাটলার  বলেন মহাপুরুষেরা নারী  কি ভাবেন কখনই বলেন না

## ব্রুয়ে বলেন নারীরা হচ্ছে  চরমের প্রতিভূ তারা হয় পুরুষের চেয়ে উত্তম নয়ত অধম

এভাবে যুগে যুগে নারীদেরে কে বিশেষ একটি শ্রেণীতে মহাপুরুষেরা পরিণত করেছেন। মহৎ কিছু সৃষ্টি  করতে গেলেই স্বাভাবিক ভাবেই যে কোন মেয়ের মনে হতে পারে প্রসিলিস এর কথা।

## যিনি বলেছিলেন ‘‘নারীর প্রধান গৌরব হচ্ছে আলোচিত না হওয়াঅথবা

## গ্রেস বলেছিলেন নারী স্বত্বার মূল কথা হচ্ছে এরা পুরুষের অধীনে থকবে বিনিময়ে পুরুষের দ্বারা প্রতিপালিত হবে

 

নেপোলিয়ন মুসোলিনি এবং হিটলার এই তিন মহাপুরুষ কে অন্যভাবে দেখলে, যারা আসলে কাপুরুষ ও নন- মনে করেন মেয়েরা শিক্ষায় অক্ষম।

এটা তারা ভাবতেই পারেন, কারণ মেয়েরা অধম না হলে তারা উত্তম হকে কি করে?

 কিন্তু শোচনীয় ব্যাপার হল মেয়েদের সম্পর্কে যে কোন অবজ্ঞাপূর্ন কথাই মানুষ খুব সহজে বিশ্বাস  করে থাকে।যেন এরা স্বতঃ:প্রমাণিত। উদাহরণ বাড়িয়ে  কাজ নেই।

আমরা এরিস্টটলকে স্মরণ করতে পারি। অনেক জ্ঞানের অধিকারী নিঃসন্দেহে কিন্তু অনেক ভুল জ্ঞানের ও অধিকারী তিনি। তাকে আমরা পর্যবেক্ষনবাদী বলি কিন্তু সত্য অর্থে তিনি  তার স্ত্রীর মুখে কয়টা দাঁত তাও পর্যবেক্ষণ করেননি। বরং দম্ভ ভরে বলে বসেন মেয়ে-লোকের দাঁতের সংখ্যা পুরুষের তুলনায় কম। শোচনীয় ও হাস্যকর ব্যাপার হল প্রায় সপ্তদশ শতক পর্যন্ত মানুষের এই বিশ্বাস ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে কেউই তার স্ত্রী বা কন্যাদের দাঁত গুনেও দেখেননি। এমনই আমাদের আস্থা মেয়েদের ওপর।

আমদের রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলও ধোয়া তুলসীপাতা ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথের মানস-সুন্দরী এবং উর্বশী কবিতায় অনেকটাই সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, তার মানস-সুন্দরীরা খুব ব্যক্তি-সম্পন্ন নয়। তার মানসীতে রয়েছে মেয়েদের সম্পর্কে চরম অপমানকর একটা

কথা অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা।

 আর নজরুলের নিজের বোধিয়ে বিরুদ্ধে এবং অসঙ্গতি। কখনও তিনি লিখে বসেন

যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর

 আবার তিনিই লিখেন

এরা দেবী এরা লোভী ইহাদের অতি লোভী মন

এভাবে একটা মেয়ে যদি সারাক্ষণ মনে  রাখে সে নারী সে হয়ত মানুষ নয় তবে সে কখনই অর্জন করতে পারবে না বৌদ্ধিক মুক্তি। সে ভাবতে পারবে না নিজের মত করে- তার থাকবে না কোন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা জরুরী।কারণ ইংল্যান্ডের এক মেষপালক নাকি গর্ব করে একবার বলেছিল তবু আমি পৃথিবীর অর্ধেক জনগোষ্ঠীর চেয়ে শ্রেষ্ঠ। উল্টোভাবে কোন মেয়ে  কোনদিন যদি এরকম ভেবে বসে তবে তুচ্ছ সে জীবন। তুচ্ছ সে বেচে থাকা । যে ছেলের কোন প্রতিভা নেই  সেও একটা প্রতিভার অধিকারী-তা হলে সে নারী হয়ে জন্ম নেয়ায় কি তার অপরাধকি অদ্ভুত মিথ্যা দম্ভের আস্ফালনএই দর্প চূর্ণ করাও এখন অনেকটা দায়িত্বের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে মেয়েদের জন্য।

 

আমার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করবেন অনেকেতাদের ধারনা এমনিতেই  রাষ্ট্রীয় এবং পারিবারিক ভাবে মেয়েরা যা পাচ্ছে তার দ্বারায় আমরা অস্থির পুরুষদের বরং এখন আরও সংরক্ষণশীল হওয়া উচিৎ। আমি খুব অবাক হয় এই পুরুষ কর্তৃক নারীমুক্তির বিরোধিতার ইতিহাস সম্ভবত-খোদ নারীমুক্তির ইতিহাসের চেয়েও আকর্ষণীয় 

অধিকাংশ পুরুষরাই ক্রোধান্বিত মেয়েদের ওপর। নারী যেন প্রিয়া হয়েও প্রতিদ্বন্দ্বীকিন্তু এত সুবিধা পেয়েও কেন পুরুষরা ভাবে তাদের আরও রক্ষণশীল হওয়া উচিৎ – ব্যাপারটা রহস্যময় নয় কি? নাকি ক্রোধ আর ক্ষমতার সহজাত চারিত্রিক প্রকাশধনী লোকেরা যেমন সমসময় রেগে থাকেন বদমাশ গরীবরা তাদের সম্পদ হরণের চিন্তা করছে এই ভেবে। কেউ কেউ আবার ভয় পান ভাবেন পুরুষ আধিপত্যর পরই নারী আধিপত্য আসবে। সমর্থক হেসেবে তারা রবীন্দ্রনাথকে পান ।

## যিনি বলেছিলেন দুর্বলের আধিপত্য বড় মারাত্মক 

কিন্তু কর্তা থাকা কি অনিবার্য? হয় পুরুষ নয় নারীকেই কি শাসন করতে হবে পৃথিবী? কেউ কারো প্রভু না হয়ে জীবন যাপন কি সম্ভব নয়?লিঙ্গের বিরুদ্ধে লিঙ্গকে গুনের বিরুদ্ধে গুনকে লিলিয়ে দেয়ার প্রবণতা মানব অস্তিত্বের যেন খেলার পর্ব। যেখানে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ধরাশায়ী করতে হয় এবং মঞ্চে গিয়ে প্রধান অতিথির হাত থেকে মেডেল নিতে  হয়। মানুষ প্রাপ্ত বয়স্ক হলে এসব পক্ষ  প্রধান অতিথি এবং মেডেল সব অর্থহীন হয়ে যায়।

                                

স্যামন দ্যা বেভোয়ার নারী সম্পর্কে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন সেটা হল 

 কেউ নারী হয়ে জন্ম নেন না, ক্রমশ হয়ে উঠে নারী “

কথাটা বড়ই সত্য তাই নয় কিজন্মের পরপরই জ্ঞাত এবং অজ্ঞাতসারে মেয়েদের ওপর শুরু হয় মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন। তুমি এটা পারবেনা সেটা পারবেনা ইত্যাকার বিধিনিষেধের স্তূপ বাধাআছে মেয়েদেরকে সংরক্ষিত শ্রেণীতে পরিণত করে ফেলার চেষ্টাপ্রাচীন জার্মানরা মেয়েদেরকে আধা-স্বর্গীয় মনে করে দেবীর মত পূজা করত। এ কিন্তু মেয়েদেরকে নারী করে ফেলারই একটা প্রচেষ্টা। যে কোন সচেতন মেয়েই-বুঝতে পারবে নির্বাক দেবী হবার চেয়ে ব্যক্তিত্ব বান মানুষ হওয়া অনেক বাঞ্ছনীয়আর রয়েছে কবি সাহিত্যিকরা তারা মেয়েদের দিয়ে খিচুড়ি বানিয়ে আমাদের খাওয়ান বিভিন্ন প্রচেষ্টাকখনও তাদের ফুলের সাথে তুলনা করেন কখনও ফুলই বানিয়ে ফেলেন।

হুমায়ূন আহমেদ এর একটা কথা আমার মনে পড়ছে। তিনি তার প্রত্যেক নায়িকাকে প্রকাশ করতেন

“ অপূর্ব সুন্দরী”।

এটা একটা আশ্চর্যের বিষয় যে,  শেকসপিয়ার যখন তার নাটকগুলো লিখেন (১৬০০-১৭০০) তখন ইংল্যান্ডে মেয়েদের অবস্থা ছিল শোচনীয় ভদ্র কোন মেয়ের পক্ষে রাস্তায় একা একা বের হওয়া ছিল অসম্ভব। অথচ কেওই বলতে পারবেনা সেক্স পিয়ারের নারী চরিত্র গুলোর ব্যক্তিত্বে ঘটতি রয়েছে। কেই বলতে পারবে না ক্লিওপেট্রা, লেডি মেকবেথ,  দেসদেমনা  খারাপ জীবন যাপন করেছেন।

 

এভাবে মেয়েদের একটা অদ্ভুত যৌগিক পদার্থে পরিণত করা হয়েছে যুগে যুগে কল্পনায় সে চূড়ান্ত  গুরুত্বের যোগ্য কার্যত তার কোন মূল্যই নেই। কবিতায় ছত্রে ছত্রে তারা উল্লেখ যোগ্য কমনীয় নারী, কিন্তু বাস্তব ইতিহাসে সে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

কথাসাহিত্যে সে রাজা ও বিজেতাদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তবে সে যেকোনো বালকেরও দাসী। এইভাবে মেয়েরা তৈরি হয়েছে এক আজব চিড়িয়ায়। প্রথমে সাহিত্যে ও পরে বাস্তব ইতিহাস পড়ে এদের সম্পর্কে একটা যৌগিক ধারনা হয়।

আর ফ্রয়েড (অনেক নারীবাদী লেখিকাই যাকে বলত ফ্রড) তো ইনি মনো বিশ্লেষণ কর দেখিয়েছেন-

 মেয়েরা প্রাকৃতিক ভাবে স্বভাবতই দুর্বল মানসিকতার অধিকারী হয়”

  তার মতে- “মেয়েদের চরিত্রে প্রভুত্বের চেয়ে অধীনস্থ থাকার প্রবণতা বেশী,পিরীত হবার বাসনা প্রবল

 এক কথায় মেয়েরা হচ্ছে মর্ষ কামীকথাটার মধ্যে কিছুটা সত্য আছে কনিষ্ঠ পরিমাণে মেয়েরা বাল্য থেকেই ছেলেদের প্রতি এক প্রকার প্রভুত্বের প্রেষণায় ভোগে এবং শেষ পর্যন্ত পুং লিঙ্গের প্রতি এই ঈর্ষা বোধ থেকে তারা হীনমন্যতায় ভোগে এবং অধীনস্থ থাকায় প্রবণতা তাদের মাঝে দেখা দেয়।  কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, যেমন আধুনিক নারীবাদী লেখকরা বিশ্বাস করেন যে মেয়েরা আসলে পুরুষাঙ্গকে হর্ষ করেনা করে শুধুমাত্র এই নির্বাধ প্রত্যঙ্গটার জন্য পুরুষের প্রাপ্ত সুবিধা সমূহকে সুতরাং কম চিন্তা এবং অর্থনৈতিক সাম্য সাধিত হলেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

পুরুষ তন্ত্রের পক্ষে আর একটি বড় রক্ষাকবচ হল ডার উইনের বিখ্যাত “ SURVIVAL OF THE FITTEST”  মতবাদ।

“যোগ্যতমরাই রাজত্ব করবে পৃথিবীতে।“  

সুতরা পুরুষ প্রমাণ করে যে পুরুষরাই শ্রেয় তর। এটা একটা শোচনীয় যুক্তি আসলে কোন যুক্তিই না। নাকের ডগায় গোলাপি চশমা পুরুষদের মনে করিয়ে দেয় বা তাঁরা অবতারণা  করে এরকম পঙ্গু যুক্তির 

আপনি যদি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেন তবে দেখতে পাবেন পুরুষরা কোন অংশেই নারীদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয় আপনারা হয়ত আমাকে বাধা দিয়ে বলবেন কেন?

 নারীরা পুরুষের চেয়ে আকৃতি গত ভাবে ছোট এবং পেশীশক্তিতে দুর্বল কিন্তু এটা  কোন সভ্য লোকের কথা হল? পেশী শক্তিই যদি শ্রেষ্ঠত্বের  মানদণ্ড হত তবে তো হাতিরা রাজত্ব করত স্থলভাগে আর তিমিরা জলভাগে, ঈগলরা আকাশে। রাস্তার কুকুর গুলির মধ্যে এ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত আয়তনে বড় এবং শক্তি শালিটি নেতৃত্ব দিয়ে থাকে দলেরকিন্তু এটা ২০১৪ সাল এবং আমারা মানুষ। এখানে শ্রেষ্ঠত্ব নিরূপিত হয় বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃষ্টিশীল প্রতিভার দ্বারা।

এক্ষেত্রে অপপ্রচার রয়েছে মেয়েদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ করা হয় মেয়েরা রবীন্দ্রনাথ হতে পারেনি এবং কেউই মানচিত্রে  কাছে গিয়ে বলতে পারবেনা কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন একজন মেয়েআরও এক কাঠি বেড়ে একজন বিসর্প একদা বলেছিলেন অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যতের কেনে নারীর পক্ষে কখনও শেকসপিয়ারের মত নাটক লেখা সম্ভব নয়।

কিন্তু আমরা যখন এসব কথা বলি বা ভাবি তখন আসলে আমরা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জড়তা এবং দৈন্যটারই প্রকাশ ঘটাই। এটা হয় ঘটনার গভীরতা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অনুভব না করার ফলে যদি সেক্স পীয়ারের প্রতিভাবান কোন বোন থাকত সেকি পারত তার মত লন্ডন গিয়ে থিয়েটারে কাজ করতে । তাছাড়া বৌদ্ধিক মুক্তি অনেকাংশই নির্ভর করে আর্থিক সচ্ছলতার ওপর। কোন নারী কেমন করে স্বাধীন  ভাবে ভাবতে কিংবা লিখবে যেখানে সে নিজেই স্বাধীন ছিল না।সুতরাং সপ্তদশ শতকে কোন নারীর পক্ষে শেকসপিয়ারের মত নাটক লেখা অসম্ভবই ছিল। তথাপি সমাজ গবেষক “এডওয়ার্ড ফিড জেরাল্ড” আমাদের ধারনা দেন-

“হয়ত সব লোককথা এবং গ্রামীণ গীতের রচয়িতাই নারীরা চরকি বুলনের ক্লান্তি অথবা পিঠা বানাতে বানাতে যা তারা গেয়ে শোনাতেন শিশু সন্তানদের” 

মেয়েদের লেখালেখি করাকে আগে ভাল দৃষ্টিতে দেখা হতনা যেমন এখনও নাট্যকলা কে ভাল চোখে দেখা হয় না তার ওপর সব সমই এত খবরদারি ও সমালোচনা করা হত  যে লেখালেখিতে পুরু মন নিবিষ্ট করা সম্ভব ছিল না তখন। একথাটা আজও সত্য অনেকাংশেই। সুতরাং প্রতিভাবান কোন মেয়ে যদি তার প্রতিভা কবিতায় খাটাতে চাইত সে অন্য দেরে দ্বারা এতই বাধাগ্রস্ত এবং নিজের বিপরীত প্রবৃত্তির পীড়নে এতই ক্ষতবিক্ষত হত যে সে মানবিক ভারসাম্য হারাত নি:সন্দেহে।আর যদিও কিছু লিখত তা হত অসুস্থ ও বিকলাঙ্গ সাহিত্য। উদাহরণ হিসাবে আমরা লেডি উইন বিলিসের কাব্যের কথা উল্লেখ করতে পারি তার মন ফেরান ছিল প্রকৃতিও ধ্যানের দিকে কিন্তু তাকে দীক্ষা দেয়া হয়েছিল ঘৃণা ও তিক্ততায়। তার কাব্য ভরতি ছিল সেসব তিক্ত বর্ণনায় যার শিকার তাকে হতে হয়েছিল। সে লিখতে বসত রাগের বসে যেখানে তার লেখার কথা ছিল ঠাণ্ডা মাথায়। সে লিখত অন্ধের মত তার লেখা উচিৎ ছিল প্রাজ্ঞের মত। সে লিখত মনের ভেতর ঘৃণা ও তিক্ততা নিয়ে যার কি না  লেখা উচিৎ ছিল মশাল নিয়ে।

তেমনি বাংলা সাহিত্যেও বেগম রোকেয়া, নাসরিন জাহান, রাবেয়া খাতুন এমনকি তসলিমা নাসরিনও এ বৃত্ত থেকে বের হতে পারেননি। কারণ-তাদের লেখা উচিৎ ছিল তাদের গল্পের চরিত্র সম্বন্ধে তা না  করে তারা নিজেরা কেমন করে বঞ্চিত হয়েছেন সে গল্প করতে শুরু করেন।

 

আমার বড় বোনআমাকে বলতেই হচ্ছে  মাধ্যমিক পাস। অল্প বয়সে বিয়ে করে এখন দুই সন্তানের জননী  গৃহিনী এবং প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক এত ভাল ছাত্রী ছিল , অথচ তাকে বিয়ে দেওয়া হয় ১৬ বছর বয়েসে। হয়তো তাকে পড়তে দিলে

সে হতে পারত ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার।সে হতে পারত কবি বা গায়িকা( এমন হাজারটা উদাহরণ পাবেন আপনার চার পাশে। আপনার মা, খালা, ভাবী , ফুপু………………………… প্রতিবেশী দের জীবনে।) সে এখন কাঁথা আর বালিশের কভার সেলাই করে। রান্না ঘরে পুই আর পালং কাটে। তার মন ফেরান ছিল বাইরের জগতের দিকে আর তাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল রান্নাঘরের দিকে। আমি জানি এই একই গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটছে বাংলাদেশের প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে। পৃথিবীর অর্ধেক জনগোষ্ঠীর কি নিদারুণ অপব্যবহার।

সিমোন দ্য বেভোয়ার যখন তার জগত বিখ্যাত “লা দ্যজিয়েম সেক্সলিখছিলেন তখন পুরুষদের প্রচণ্ড সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন। তাকে আখ্যা দেয়া হয়েছিল লেখার সুড়সুড়ি বিশিষ্ট বদমাশ নারীএবং তাকে বলা হতঅতৃপ্ত নারী যার দরকার একটি উৎকৃষ্ট সংগম

 এর প্রভাব ছিল মারাত্মককারণ শিল্পীর স্বভাবই হচ্ছে তার সম্পর্কে কি ভাবা হচ্ছে সেসব নিয়ে কোন মাথা ঘামানো।এর প্রভাব ছিল মারাত্মককারণ শিল্পীর স্বভাবই হচ্ছে তার সম্পর্কে কি ভাবা হচ্ছে সেসব নিয়ে কোন মাথা ঘামানো।

এভাবেই যুগে যুগে চলছে সৃষ্টিশীল নারীদের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন।

প্রাইড এন্ড প্রেজুডিসলেখার সময় জেন অষ্টে-নতার পাণ্ডুলিপি লুকিয়ে রাখতেন কেউ দেখবে বলে। কে বলতে পারে প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস হয়ত আরও ভাল কিছু হত -যদি তা গোপনে লিখতে না হত।

আর রয়েছে উপকরণের অভাব। এইসব নারীরা দার্জিলিং যায়নি নয়াগ্রায় গোসল করেনি- কাঞ্চনজঙ্ঘায় যায়নি ব্যস্ত পৃথিবী বিখ্যাত  শহর বন্দর দেখেনিভাবের অদান প্রদান করেনি বিচিত্র মনুষ্যদের সাথে। আর কথাসাহিত্য এবং যেকোনো বিমূর্ত জিনিসই তো অনেকটা অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হয়। আমি নিশ্চিত লেভ টলষ্টয়কেযদি বাস করতে হত বাঘা বা পত্নীতলা বা সিলেটের হাওড় অঞ্চলে বা অন্যকোন থানায়-সাত সন্তানের জনক হয়ে তবে তিনি ওয়ার এন্ড পিসলিখতে পারতেন না।

মহৎ কিছু সৃষ্টি করা আসলেই কঠিন। এর জন্য দরকার একাগ্র মনোযোগ আর একনিষ্ঠ মনোযোগকিন্তু জগত এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। পৃথিবী কখনও কাওকে বলবে না কবিতা লিখতে গান গাইতে। যেমন তার দরকার পুলিশ বা আমলা এমনকি পাতিটাও কিন্তু তার কবি দরকার নেই। জীবনানন্দ দাশ, সুকান্ত, আল মাহমুদ এবং বর্তমানে আজাদ, মামুন, আলীম, সঠিক শব্দটি খুঁজে পেল কিনা এ নিয়ে জগতর কোন মাথাব্যথা নেই।

 

কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে এ সমস্যাটা অনেকটা বিরোধিতার পর্যায়ের চলে যায়। জগত নজরুলকে বলেছিল তুমার ইচ্ছে হলে তুমি লেখ। তাতে আমার কি আস যায়।আর জগত তসলিমা নাসরিন কে ব্যঙ্গ করে বলছে—-তোমাকে কে বলেছে লিখতে, লেখালেখি নিয়ে পাকামি করতে

এতসব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাড়িয়ে সুস্থ সাহিত্য লেখা রীতিমত অসম্ভবকারণ মনের ভেতরে ঘুণ পোকা কামড় যে কেও  টাল খেতে বাধ্য। সে যা লিখবে তা হবে ল্যাংড়া লুলা ধ্বজভঙ্গ সাহিত্য।

তাছাড়া শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড পুরুষ অধিপাত্যের এযুগে পুরুষের তৈরি মূল্যবোধ চাপিয়ে দেয়া হয় নারীর তৈরি মূল্যবোধের ওপর। এজন্যই বলা হয় ফুটবল খেলাগুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ফ্যাশন প্রিয়তা ফালতু যদিও দুটোই অনুৎপাদনশীল এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বই কারণ এটি যুদ্ধ নিয়ে রচিত কিংবা সেটা একটা ফালতু বই কারণ ওটি রচিত অন্দরমহলের নারীদের আবেগ অনুভূতি নিয়ে বা রান্না নিয়ে

এখন প্রশ্ন জাগে কে আমাদের শেখাল যে নারীদের আবেগ অনুভূতির চেয়ে যুদ্ধ বেশী গুরুত্বপূর্ণএটাও অনেকটা পুরুষ তন্ত্রেরই প্রভাব। এভাবেই যুগে যুগে নারীর তৈরি মূল্যবোধকে তুচ্ছ করে ছুড়ে ফেলা হয়েছে আর পুরুষ নির্মিত মূল্যবোধের চর্চা হয়েছে।

নারীপুরুষ উভয়ের জন্যই জীবন সমান  কঠিন এবং সংগ্রাম মুখরপ্রচণ্ড দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস দাবী করে তা। তো এই আত্মবিশ্বাস কিভাবে অর্জন করা হয়?সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হল-ভাবা যে অন্যরা আমার চেয়ে অধম। এতকাল ধরে মেয়েরা এমন এক আয়নার কাজ করে আসছে যার রয়েছে পুরুষকে দ্বিগুণ করে দেখানের এক যাদুকরী ক্ষমতা । পুরুষরা বিভোর হয়ে থাকে রাতে ঘুমাতে যায় এবং প্রাতে ঘুম থেকে জাগে এই মিথ্যা সুখে যে পৃথিবীকে অর্ধেক জনগোষ্ঠীর চেয়ে সে শ্রেষ্ঠ। এজন্যই পুরুষরা এত আত্মবিশ্বাসী ও চনমনে হয়ে থাকেকিন্তু যেদিন মেয়েরা আর আয়নার সাজ কাজ করবে না? যেদিন আয়না সত্য কথা বলা শুরু করবে?

 যেদিন কুঁকড়ে যাবে আয়নার প্রতিবিম্বিত কাঠামোটা?  নেশা বঞ্চিত আসক্তের মত চূর্ণ হবে পুরুষের সব মিথ্যা দর্প।

সুতরাং পুরুষদেরবিশেষ করে শিক্ষিত বন্ধুদের আমি বলব

লিঙ্গ প্রশ্নে নিরপেক্ষ হতে

যদিও তার এমন এক প্রবৃত্তি দ্বারা পরিচালিত যার নিয়ন্ত্রণ তাদের হতে নেই। তবু নিজেদের আত্মিক মুক্তির জন্যই আমি তাদেরকে বলব

মনকে স্বচ্ছ ও সংবেদনশীল, সৃজনশীল ও নিরপেক্ষ এবং উজ্জ্বল ও অভিব্যক্ত কর

কারণ সম্পূর্ণ বিকশিত মনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে লিঙ্গ বিষয়ে বিচ্ছিন্ন চিন্তা না করা।

আর আমার ভগ্নি গন আমি জানি রোজ সন্ধ্যায়  TSC তে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেবার সময় আপনাদের হলে গেটের ঘণ্টাধ্বনি  বাজে ( আসলেই বাজে কি না জানিনা) হলে ফেরার তাড়া দেয়। ঘণ্টার প্রত্যেকটা ধ্বনি আপনাকে মনে করিয়ে দেয় আপনি একজন নারী তবু আমি আপনাদের বলব ভুলে যান আপনি নারী, ভাবুন আপনি মানুষ। যেমন পলাশ, জাহিদ, হেমায়েত, খালীদ বা ঊর্মি, বিলকিস, জেসমিন। 

প্রিয় ভগ্নি গনআমি আপনাদের দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতে বলব আপনারা কারও চেয়ে অযোগ্য নন-কেউ আপনাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয় আপনার ভাইটি। আপনারা বড় করে নিঃশ্বাস নিন- নিজের ভেতরে বোধগুলোকে পদ্মের মত ফুটতে দিন-রঙিন প্রজাপতির মত উড়তে দিন ভেতরের ইচ্ছে গুলোকে আপনারা আকাশের দিকে তাকান এবং থুথুর মত ফেলে দিন ভেতরে সব গ্লানি ও জড়তা। নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করুন। সব ব্যাপারেই পুরুষের তৈরি মূল্যবোধ নয় বরং নিজস্ব ভঙ্গিতে নিজের মত করে ভাবতে শিখুন।

 

খুব বেশী নারীর সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়নি আমার কিন্তু তবুও অনেক মেয়েই সামাজিক রীতিনীতি প্রথা এবং বাস্তবতার দোহাই দেয়। আমি তাদেরকে বলব এই  বন্ধনের বিরুদ্ধের আপনাকে শতভাগ জয়ী হতে হবে এমনতো নয়। ঝড় আসবে-সমাজপতিরা আসবে-নিজের বিপরীত প্রবৃত্তির পীড়ন আসবে কিন্তু আপনি হতে মশাল রাখুন আর এগিয়ে যান নিজের মত মনে রাখবেন বিজয়ের সংগ্রাম বেশী মমত্বের

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/gmakas/28699.html



মন্তব্য করুন