ফাতেমা জোহরা-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত এবং ফেব্রুয়ারী……

লিখেছেন: ফাতেমা জোহরা


মায়ের ভাষায় প্রাণখুলে কথা বলার অধিকার আদায়ের মাস ফেব্রুয়ারী।রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষা রক্ষার মাস এই ফেব্রুয়ারী। বাঙালির প্রানের ভাষা বাংলাকে তার যথাযথ মর্যাদা ফিরিয়ে দেবার মাস এই ফেব্রুয়ারী। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ” পাকিস্থান ও ভারত ” নামের দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এরপর ” পাকিস্থান” নামক দেশটি “পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্থান” নামে দুই ভাগে বিভক্ত হয়। কিন্তু পুরো পকিস্থানের শাসনভার পশ্চিম পাকিস্থান অন্যায় ভাবে নিজেরদের হাতে কুক্ষিগত করে রাখে। এমনকি এই পশ্চিম পাকিস্থান পূর্ব পাকিস্থানের মানুষের মাতৃভাষার অধিকার পর্যন্ত কেড়ে নিতে চায়।
১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে : তমদ্দুন মজলিশ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে? বাংলা নাকি উর্দু? ” নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে যেখানে সর্বপ্রথম বাংলাকে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার দাবী জানানো হয়। উল্লেখ্য সেই সময়ে সরকারী কাজকর্ম ছাড়াও সকল ডাকটিকেট, পোষ্টকার্ড, ট্রেন টিকেটে কেবলমাত্র উর্দু এবং ইংরেজিতে লেখা থাকতো । পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী বাংলা সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি এবং বাংলা ভাষাকে হিন্দুয়ানী ভাষা হিসাবে অভিহিত করে এবং তারা পূর্ব-পাকিস্তানের সংস্কৃতিকে “পাকিস্তানীকরণ”, যেটি উর্দু এবং তাদের ভাষায় ইসলামিক, করার চেষ্টা চালাতে থাকে । তমদ্দুন মজলিশের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হওয়া উচিত সে ব্যাপারে একটি সভা আহবান করেন । সেই সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের কাছে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এরপর ১৯৪৭ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের উদ্যোগে পশ্চিম পাকিস্তানে আয়োজিত “পাকিস্তান এডুকেশনাল কনফারেন্সে” পূর্ব – পাকিস্তান হতে আগত প্রতিনিধিরা উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন এবং বাংলাকেও সম-অধিকার প্রদানের দাবী জানান । ৭ই নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সভায় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়। ১৭ই নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকে ঘোষণা দেওয়ার জন্য শত শত নাগরিকের স্বাক্ষর সম্বলিত স্মারকপত্র প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিনের কাছে পেশ করা হয়।
একই বছরের ডিসেম্বর মাসে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের উদ্যোগের বিপক্ষে ঢাকায় তমদ্দুন মজলিশের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ এবং মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ৮ ডিসেম্বর একটি সমাবেশ হতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবী উত্থাপিত হয় । ডিসেম্বরের শেষের দিকে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং তমদ্দুন মজলিশের আহবায়ক অধ্যাপক নুরুল হক ভুইয়া এর আহবায়ক নিযুক্ত হন ।
১৯৪৮ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারী কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত বাঙালি গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পার্লামেন্টে প্রথমবারের মত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার জন্য একটি বিল উত্থাপন করেন । মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীসহ বাঙালি পার্লামেন্ট সদস্যদের একাংশ এর পক্ষে সমর্থন দিলেও মুসলিম লীগ সমর্থিত এমপিরা এর বিপক্ষে অবস্থান নেন । পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্বাচিত সদস্য খাজা নাজিমুদ্দিন ছিলেন এই বিরোধিতার শীর্ষে এবং তার সক্রিয় সমর্থনে এই বিলটিকে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকে পাকিস্তানের সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশের চেষ্টা আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান এর তীব্র বিরোধিতা করেন এবং বিলটি বাতিল করা হয় । ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দমে না যেয়ে তিনবার বিভিন্ন সংশোধনী সহ বিলটি পুনরায় উত্থাপন করেন কিন্তু প্রতিবারই এই বিলটিকে বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়।
একই বছরের ৪ থেকে ৭ই মার্চের দিকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠাকে সামনে রেখে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতির শীর্ষমুখদের সমন্বয়ে গঠিত হয় ষ্টুডেন্টস এ্যাকশন কমিটি। এই ষ্টুডেন্টস এ্যাকশন কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়ন করে। ষ্টুডেন্টস এ্যাকশন কমিটির উদ্যোগে ১১ মার্চ ১৯৪৮ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবিতে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।
১১ই মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবীতে একটি বড় সমাবেশ আয়োজন করা হয় । সমাবেশ শেষে বের হওয়া মিছিলে মুসলিম লীগ সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী হামলা চালায় এবং মিছিল থেকে শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, শেখ মুজিবুর রহমান, শওকত আলী, অলি আহাদ সহ বেশ কয়েকজন ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ধীরে ধীরে আন্দোলনের গতি বাড়তে থাকে… ।

১৫ই মার্চ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তান সফরের প্রাক্কালে বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতি মোকাবেলায় খাজা নাজিমুদ্দিন ষ্টুডেন্টস একশন কমিটির সাথে একটি বৈঠকে বসেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার একটি অঙ্গীকারনামা সই করেন। পরবর্তীতে জিন্নাহ এই অঙ্গীকারনামা বাতিল করেন এবং উর্দু (যা ছিল ৫% মানুষের মাতৃভাষা) কে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। উপেক্ষিত হয় পাকিস্তানের প্রায় ৫০% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা।
এখানেই শেষ নয় , ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এর পূর্ব পাকিস্তান সফর উপলক্ষে আয়োজিত একটি বিশাল সমাবেশে জিন্নাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে “উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা”। সমাবেশস্থলে উপস্থিত ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও জনতার একাংশ সাথে সাথে তার প্রতিবাদ করে ওঠে। জিন্নাহ সেই প্রতিবাদকে আমলে না নিয়ে তার বক্তব্য অব্যাহত রাখেন।
এবং সেই বক্তব্যের সাথে সংগতি রেখে ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ “ষ্টুডেন্টস রোল ইন নেশন বিল্ডিং” শিরোনামে একটি ভাষণ প্রদান করেন। সেখানে তিনি ক্যাটেগরিক্যালী বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার দাবীকে নাকচ করে দিয়ে বলেন “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটি এবং সেটি উর্দু, একমাত্র উর্দুই পাকিস্তানের মুসলিম পরিচয়কে তুলে ধরে। তার মূল বক্তব্য থেকে কিছু লাইন তুলে ধরা হলঃ-

“The State language therefore, must obviously be Urdu, a language that has been nurtured by a hundred million Muslims of this sub-continent, a language understood throughout the length and breadth of Pakistan and above all a language which, more than any other provincial language, embodies the best that is in Islamic culture and Muslim tradition and is nearest to the language used in other Islamic countries.”

জিন্নাহর এই ব্ক্তব্য সমাবর্তন স্থলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং ছাত্ররা দাঁড়িয়ে “নো নো” বলে প্রতিবাদ করেন। জিন্নাহর এই বাংলা বিরোধী স্পষ্ট অবস্থানের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন আরো বেশী গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং আন্দোলন আস্তে আস্তে ঢাকা থেকে পুরো পূর্ব পাকিস্থানে ছড়িয়ে পরতে থাকে।
৬ এপ্রিল জিন্নাহর ঢাকা ত্যাগের পর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে ওঠে। উপায়ন্তর না দেখে খাজা নাজিমুদ্দিন East Bengal Legislative Assembly (EBLA) তে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারী ভাষা এবং ডাক টিকেট, ট্রেন টিকেট, স্কুল সহ সর্বত্র উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে একটি প্রস্তাব আনেন । যদিও এই প্রস্তাবের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করার আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করা তথাপি এই প্রস্তাবের ব্যাপারে তৎকালীন নেতৃবৃন্দ ইতিবাচক মনোভাব দেখান।
এরপর একই বছরের ১১ ই সেপ্টেম্বর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল হিসাবে নিযুক্ত হন। এর পরপরই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং বাঙালি সংসদ সদস্যরা East Bengal Legislative Assembly (EBLA) তে গৃহীত প্রস্তাবের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য নাজিমুদ্দিনের কাছে দাবী জানান। নাজিমুদ্দিন পূর্ব-পাকিস্তানের অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও তিনি পুনরায় তার অঙ্গীকার ভঙ্গ করেন এবং ক্ষমতার স্বার্থে রাষ্ট্রভাষার ক্ষেত্রে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। এতে করে আন্দোলন আরও বেগবান হতে থাকে।
এরপর ১৯৪৯ সালের ৯ মার্চ খাজা নাজিমুদ্দিনের উদ্যোগে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে আরবি হরফে প্রচলন করার ব্যাপারে একটি প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য ছিল তথাকথিত হিন্দুয়ানী বাংলা হরফ থেকে বাংলাকে মুক্ত করে ইসলামী ভাবাদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রচলন করা। এই লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকার একটি বড় আকারের তহবিল গঠন করে এবং তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্লামেন্টে এর সপক্ষে বলেন -

“The board is of the opinion that in the interest of national unity and solidarity and the rapid advancement of general education in Pakistan, it is necessary to have all the regional languages of Pakistan written in the same script; the Arabic script was most useful for this purpose…”

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহসহ সকল ভাষাতত্ত্ববিদ আরবি হরফে বাংলা লেখার এই উদ্ভট প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার তাদের মনোভাবের ব্যাপারে অনড় থাকে।
এমনি ভাবেই একটু একটু করে পাকি শাসক গোষ্ঠী আমাদের মাতৃভাষায় কথা বলবার অধিকার কেড়ে নেবার লক্ষ্যে একটার পর একটা নীলনকশা করতে থাকে এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের জনগণের মতামতের তোয়াক্কা না করে এই নীলনকশা গুলো বাস্তবায়ন করার ঘৃণ্য প্রয়াস অব্যাহত রাখে।
৪৯ এর ২৩ শে জুন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর অব্যাহত উন্নাসিক দৃষ্টিভঙ্গী, বিভিন্ন ন্যায্য দাবী দাওয়া পূরনে অস্বীকৃতি এবং ভাষার ক্ষেত্রে মুসলিম লীগ সরকারের নীতির বিরোধিতায় মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক (টাঙ্গাইল), শেখ মুজিবুর রহমান ও খন্দকার মোশতাক আহমেদ যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন।একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানেও পীর মানকি শরীফ এর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। পরবর্তীতে এই দুই দল একীভূত হয়ে পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করে এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এর আহবায়ক নিযুক্ত হন। ভাসানী ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৭ পর্যন্ত ৮ বছর আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ভাষা আন্দোলনসহ পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদান করেন। পাকিস্তানে প্রথম বিরোধী দল হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানী রাজনৈতিক নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আওয়ামী মুসলিম লীগ ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং রাজপথের আন্দোলন সংগঠনের পাশাপাশি পার্লামেন্টেও রাষ্ট্রভাষা ভাষার দাবীতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে।
১৯৫০ সালের এপিলের দিকে পার্লামেন্টে আরবি হরফে বাংলা লেখার ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের নেতারা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবীতে আন্দোলন দানা বেধে ওঠে।
তখন থেকেই মূলত ভাষা আন্দোলনের ঝড় তীব্র থেকে তীব্রতর হতে শুরু করে। প্রতিটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের হৃদয়েই সৃষ্টি হয় আন্দোলনের এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। যেটা পরবর্তীতে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পথটিকেও ভীষণ ভাবে ত্বরান্বিত করেছিলো। এমনি ভাবেই ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে আন্দোলন; কখনো সেটা প্রকাশ্যেও দেখা দিতো, কিন্তু সেদিকে কোন কর্নপাতই করতো না পাকি শাসক গোষ্ঠীরা।
১৯৫১ সালের ফেব্রুয়ারীতে জন্ম নেয় ” মুসলিম যুবলীগ”। এই যুবলীগ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পাশাপাশি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া মুসলিম সংস্কৃতির পরিবর্তে পূর্ব বাংলার অধিবাসীদের নিজস্ব সংস্কৃতি যেমন পহেলা বৈশাখ, নবান্ন ইত্যাদি চর্চার ব্যাপারে উচ্চকন্ঠ ছিলো । যুবলীগ মুলত পাকিস্তানের প‌্যান-ইসলামিক মতবাদ থেকে বেরিয়ে এসে পূর্ব-বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চার ক্ষেত্রে একটি কন্ঠস্বর হিসাবে নিজেদের পরিচিত করে।
একই বছর ২৭ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী পুনরায় গণপরিষদেতে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাবটি পেশ করে । এখানে উল্লেখ্য যে মৌলানা আকরম খান এর নেতৃত্বে গঠিত ১৬ সদস্যবিশিষ্ট East Bengal Language Committee আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাবকে বাস্তবতা বিবর্জিত এবং উদ্ভট হিসাবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করলেও সেই রিপোর্টকে সাধারণ জনগনের সামনে প্রকাশ করেনি পাকিস্তান সরকার । ততদিনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের এদেশীয় সদস্যদের মধ্যেও অনেকে বাংলার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছেন ।
এমনি করে আস্তে আস্তে আমাদের পক্ষের লোকজন বাড়তেই থাকে। আর ধীরে ধীরে আমরা আমাদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি। এভাবেই শেষ হয় ১৯৫১।
১৯৫২ সালের শুরু থেকেই আন্দোলনের মাঠ বেশ উত্তপ্ত থাকে। ওদিকে পাকি শাসকেরাও আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নেবার নোংরা খেলায় মত্ত থাকে। ওরা ওদের নিজেদের অবস্থানেই অটুট থাকে।৫২’র ২৬ শে জানুয়ারি The Basic Principles Committee of the Constituent Assembly of Pakistan পুনরায় উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে এ্যাসেম্বলীতে চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রদান করে ।
২৭ জানুয়ারি ঢাকা সফররত পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্ণর জেনারেল খাজা নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানের সমাবেশে ঘোষণা করেন কেবল মাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা । সাথে সাথে সমাবেশস্থলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শ্লোগান ওঠে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”… মূলত এই অগ্নিঝরা স্লোগানটির জন্ম হয় সেদিনই। যেটিকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে আমাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। এই দিনের ঘটনার প্রেক্ষিতে এর পর দিন মানে ২৮ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে । এই সমাবেশ থেকে নাজিমুদ্দিনের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করা ছাড়াও পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীপরিষদকে পশ্চিম পাকস্তানের হাতের পুতুল হিসাবে অভিহিত করা হয় ।
উল্লেখ্য, খাজা নাজিমুদ্দিনের বক্তব্য ভাষা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দান করে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ জানুয়ারি নাজিমুদ্দিনের সেই সেই বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই সর্বাত্মক ধর্মঘট পালিত হয় ।একই দিন মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় । সভায় ভাসানীর নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনে ছাত্রদের পাশাপাশি আওয়ামী মুসলিম লীগের সরাসরি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ।
৩১ শে জানুয়ারি ভাসানীর সভপতিত্বে পূর্ব-পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবিদের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় । এই সম্মেলন থেকে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহবায়ক করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় । সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারী সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট আহবান করে । এরপর ১৮ ফেব্রুয়ারী ভীত-সংকিত সরকার ২১ ফেব্রুয়ারী ডাকা সাধারণ ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে এবং সকল সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে । পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ১৪৪ ধারা জারির পরিপ্রেক্ষিতে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এর উদ্যোগে আবুল হাশিম এর সভাপতিত্বে ২০ ফেব্রুয়ারী একটি সভা অনুষ্ঠিত হয় । সভায় উপস্থিত সদস্যগণ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের করার ব্যাপারে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সভার একটি বড় অংশ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে মত দিলেও অনেকেই এতে সহিংসতার আশঙ্কায় বিপক্ষে মত দেন ।
পরদিন মানে ২১ শে ফেব্রুয়ারী সকাল ৯ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিমনেশিয়াম মাঠের পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত) গেটের পাশে ছাত্র-ছাত্রীদের জমায়েত শুরু হতে থাকে।বেলা ১১ টায় কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, গাজীউল হক প্রমুখের উপস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ শুরু । সমাবেশে ১৪৪ ধারা ভংগের ব্যাপারে ছাত্র নেতৃবৃন্দ এবং উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয় । আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক সভায় উপস্থিত হয়ে ছাত্রদের ১৪৪ ধারা না ভাঙ্গার ব্যাপারে যুক্তি প্রদর্শন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এস এম হোসেইন এর নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক সমাবেশ স্থলে যান এবং ১৪৪ ধারা ভংগ না করার জন্য ছাত্রদের অনুরোধ করেন ।বেলা ১২টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে আব্দুল মতিন এবং গাজীউল হক ১৪৪ ধারা ভংগের পক্ষে মত দিলেও সমাবেশ থেকে নেতৃবৃন্দ এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে ব্যর্থ হন । এ অবস্থায় উপস্থিত সাধারণ ছাত্ররা স্বত:স্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভংগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং মিছিল নিয়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) দিকে যাবার উদ্যোগ নেয় । এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ এবং গুলি বর্ষণ শুরু করে । গুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত (ঢাবি এর রাষ্ট্রবিজ্ঞান এর মাষ্টার্সের ছাত্র), রফিক উদ্দীন, এবং আব্দুল জব্বার নামের তিন তরুণ মৃত্যু বরণ করেন । পরে হাসপাতালে আব্দুস সালাম যিনি সচিবালয়ে কর্মরত ছিলেন মৃত্যু বরণ করেন । অহিউল্লাহ নামে ৯ বছরের একটি শিশুও পুলিশের গুলিতে মারা যায় । পুলিশের সাথে ছাত্রদের ৩ ঘন্টাব্যাপী সংঘর্ষ চলতে থাকে কিন্তু পুলিশ গুলিবর্ষণ করেও ছাত্রদের স্থানচ্যূত করতে ব্যর্থ হয় ।
সেদিন থেকেই শুরু হয়ে আমাদের প্রানের আন্দোলন… যার পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা পরবর্তীতে মহান মুক্তিযুদ্ধ করবার মতো সাহস অর্জন করি। মূলত, সেদিন শহীদ সালাম, রফিক, শফিক, বরকত, জব্বারের রক্তই আমাদের দেখিয়েছিল এক স্বাধীন বাংলার পথের নিশানা; যেই পথ ধরেই আমরা পরবর্তীতে এগিয়ে গিয়েছিলাম আমাদের স্বাধীনতার পথে। সেদিন ঐ বীর শহীদদের রক্তের মাঝেই ভেসে উঠেছিলো স্বাধীন বাংলার মানচিত্র। তাঁদের রক্তের মাঝেই আমরা দেখেছিলাম আমাদের স্বাধীনতার লাল সূর্যকে।
২৩ ফেব্রুয়ারী রাতে ছাত্র-ছাত্রীরা বরকত শহীদ হওয়ার স্থানে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে একটি অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান শুরু করে ।২৪ ফেব্রুয়ারী ভোর ৬টার সময় “শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের” নির্মানকাজ সমাপ্ত হয় এবং সকাল ১০টার দিকে শহীদ শফিউর রহমানের পিতাকে দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটির ফলক উন্মোচন করা হয় ।সেই “শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি নিছক কোন স্মৃতিস্তম্ভ ছিল না; সেটি ছিল আন্দোলনের মূল প্রেরণার স্তম্ভ। আর এই কথাটিই বুঝতে পেরেছিল পাকি জারজরা। তাই সেদিন বিকেলেই সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজের সম্মুখে স্থাপিত “শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ” গুড়িয়ে দেয় । যার ফলে ঢাকায় ছাত্র আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে কিন্তু ঢাকার বাইরে আন্দোলন দানা বাধে।
আর এমনি ভাবেই বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত পার করে আন্দোলন চলতে থাকে। এরপর সেই চলমান আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৬ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারী পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করে তা সংবিধানের অন্তর্গত করার জন্য প্রস্তাব উত্থাপিত হয় । এর ঠিক ৫ দিন পর অর্থাৎ ২১ শে ফেব্রুয়ারী প্রাদেশিক প্রধানমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার কর্তৃক শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২৬ শে ফেব্রুয়ারী কিস্তান জাতীয় সংসদে বাংলা এবং উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধান পাশ করে । এরপর একই বছরের ৩ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি প্রদানকারী পাকিস্তানের সংবিধান এইদিন থেকে কার্যকর হয় এবং ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে তমদ্দুন মজলিশের মাধ্যমে মায়ের ভাষায় কথা বলার যে আন্দোলনের শুরু হয়েছিল তার সাফল্য অর্জিত হয় ।
মূলত, এভাবেই তীব্র আন্দোলন আর ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকি আমাদের চূড়ান্ত বিজয়ের পথে, একটি স্বাধীন বাংলা গড়বার পথে। যদিও সেই পথ ছিল খুবই বন্ধুর, তারপরেওআমাদের পূর্বপুরুষরা পেরেছে… কারণ তারা ছিলেন এই বাংলা মায়ের যোগ্য সন্তান।
সকল শহীদের প্রতি হৃদয়ের গভীর থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে শেষ করছি। আসলে আমাদের স্বাধীনতার এই মহান ইতিহাসগুলো লিখে কোনোদিনই শেষ করা সম্ভব হবে কিনা আমি জানি না। কিন্তু তারপরেও আমি লিখতে চেষ্টা করেছি। যদি কোন ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকে তবে শুধরে দেবার অনুরোধ জানাচ্ছ।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/fatema-tuz-zohora-71/27892.html



মন্তব্য করুন