Farzana Sonia-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

আমাদের গণজাগরণমঞ্চ

লিখেছেন: Farzana Sonia

দেখতে দেখতে ঘটনাবহুল দুইটি বছর পার করল গণজাগরণ মঞ্চ। স্মৃতির দুয়ার খুলে পিছন ফিরে তাকালে অদ্ভুত এক অনুভূতির জন্ম হয়। স্বপ্নময় একটা সময় পার করেছি আমরা। আমরা যারা ৭১ সালের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ দেখতে পারিনি তাদের পরম সৌভাগ্য হয়েছে অবাক বিস্ময়ে ২০১৩ সালের গণজাগরণকে অবলোকন করার!! জাতির ক্রান্তিকালীন সেই সময়ে গণজাগরণমঞ্চের সাহসী এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ / কার্যক্রম বাঙালির আন্দোলন আর প্রতিবাদের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে !!
৫ই ফেব্রুয়ারীর গণজাগরণ কোন আকস্মিক ঘটনা বা কোন রাজনৈতিক দলের নেপথ্য ইন্ধনপ্রাপ্ত গণজমায়েত বা সমাবেশ ছিল না। বরং বাঙালির ৫২, ৬৬, ৬৯ আর ৭১এর আপোষহীন, প্রতিবাদী আর সংগ্রামী চেতনাই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই এদিনটিতে উন্মোচিত হয়েছিল আরেকটিবার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ তরুণ প্রজন্ম ৪২ বছরের পূর্বপুরুষের দায়মোচনের প্রবল দায়িত্ববোধে জাগ্রত হয়ে প্রতিবাদে মুখর হয়ে নেমেছিল রাজপথে। তাই ফেব্রুয়ারীর সেই গণজাগরণ আর আজকের গণজাগরণমঞ্চ এদেশের কোটি মানুষের মনের নিভৃতে থাকা দেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ।
দীর্ঘ ৪২ বছর ধরে পুষে রাখা মুক্তিযোদ্ধা, শহিদ স্বজন আর বীরাঙ্গনাদের চাপা কান্না আর ৩০ লক্ষ শহিদের আত্মার অতৃপ্তি ঘুচাতে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করেছে গণজাগরণমঞ্চ আর তার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে প্রগতিশীল , দেশাত্মবোধের চেতনায় উদীপ্ত তরুন প্রজন্মসহ সর্বস্তরের জনগণ আর প্রবাসের বাঙ্গালিরা। আর তাই এই ১ বছরে অনেক কিছুই সম্ভব হয়েছে যা ভাবে নি কেউ। একদিন যা ছিল কল্পনার অতীত ( দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে) আজ তা প্রমানিত সত্য । ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রস্ফুটিত হয়েছে শ্রেণি-পেশা-বয়স নির্বিশেষে সবার মাঝে আর তা বিকশিত হয়েছে সকল বাঙালির বিশ্বাসে, কথায় আর কর্মকাণ্ডে।
৪৪ বছরের দায়মোচনের যাত্রায় এখন স্বপ্ন দেখি নতুন অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদীপ্ত ন্যায্যতা ও সমতা ভিত্তিক সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের। আশার কথা হল ৭১ এর রাজাকার, জন্মশত্রুদের প্রতি এখন স্বচ্ছ একটি ধারনা পেয়েছে নতুন প্রজন্ম যারা আগামী বাংলাদেশের কাণ্ডারি। মানুষ এখন যথেষ্ট সচেতন পূর্বপুরুষের দায়মোচনের কর্মযজ্ঞে শামিল হতে। যেকারনে ৫ই ফেব্রুয়ারী থেকে টানা ১৭ দিনের জনস্রোতে ভেসেছে শাহাবাগ যার উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়েছে বিশ্বের প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। আজকে তাই ৪৪ বছরের ঘোর কাটিয়ে আমরা মুখোমুখি হয়েছি কঠিন বাস্তবতার। আবারও বাঙালি একাট্টা হয়েছে ৭১ এর সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিকভাবে পরাজিত শক্তিকে সর্বাত্মক বর্জনে আর তাদের সকল অপচেষ্টাকে সমূলে উৎপাটনে। আর একারণেই মানবতাবিরোধী হিংস্র দানবদের সর্বোচ্চ শাস্তির রায় প্রদান হয়েছে আর কুখ্যাত কসাইয়ের শাস্তি কার্যকর হয়েছে এই বাংলার মাটিতে। যুদ্ধাপরাধীদের দলীয় নিবন্ধন বাতিল হয়েছে এবং অপরাধী হিসেবে এই দলকে বিচারের সম্মুখীন করার প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। তবে অন্যতম প্রধান অর্জন “জয় বাংলা” স্লোগানকে দলীয় শৃঙ্খলমুক্ত করে আবার তাকে সার্বজনীনতা প্রদান করা।
গণজাগরণমঞ্চের সাথে মানুষের আত্মিকবন্ধনের শেকড়ের গভীরতা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এখন একথা অনস্বীকার্য গণজাগরণমঞ্চ চাইলেই সকল বাধা ডিঙিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। আর তা করার মত ঐক্যবদ্ধ শক্তি, সাহস, জনসম্পৃক্ততা, দক্ষ এবং দূরদর্শী নেতৃত্ব প্রভূতি সবই বিদ্যমান। তার বহু প্রমাণ গত ২ বছরে গণজাগরণমঞ্চ দিয়েছে।
সময়ের প্রবাহমানতায় পেছন ফিরে যাবার কোন সুযোগ নেই কিন্তু ফিরে তাকালে অতীতের সাথে বর্তমানের মেলবন্ধন করা সম্ভবপর হয়। আর তার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ সহজতর হয়। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাস তাই সেভাবেই আমাদের চেতনাকে শাণিত করবে আজীবন। স্মৃতির বারান্দার ঝলমলে রোদে যখন ফেব্রুয়ারী আর গণজাগরণমঞ্চ সমান্তরাল পথে হেঁটে যাবে তখন দেশমাতার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কর্তব্যবোধের চেতনায় প্রতিনিয়ত উদ্বেলিত হব আমরা সকলে।
গণজাগরণমঞ্চের বছর পূর্তিতে অভিনন্দন!!! অভিনন্দন!!! আর অভিনন্দন গণজাগরণমঞ্চ, সকল সহযোদ্ধা, শুভানুধ্যায়ী এবং গণজাগরণমঞ্চের মুখপাত্রকে!!! আপন প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, একাগ্রতা, নির্মোহ ভালোবাসা, আর অসীম ধৈর্যের সাথে সহস্র বাধা- বিপত্তি পেরিয়ে গত ২ বছর ধরে গণজাগরণমঞ্চকে সাফল্যের সাথে পরিচালনা করার জন্য।
গণজাগরণমঞ্চ শত বাঁধা বিঘ্ন অতিক্রম করে দীপ্তকণ্ঠে মানুষের অধিকারের প্রশ্নে,মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে,দেশাত্মবোধের প্রশ্নে এমনি আপসহীনভাবে এগিয়ে যাবে সামনের পথে সেই কামনা সব সময়ের।
জয় বাংলা।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/farzana-sonia/32154.html



মন্তব্য করুন