Farzana Sonia-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

আমার বাংলা ভাষা

লিখেছেন: Farzana Sonia

৫২র ভাষা আন্দোলন বাঙালির জীবনের এক অনন্য অসাধারণ ঘটনা। ২১ শে ফেব্রুয়ারী রোপিত হয়েছিল স্বাধীনতার বীজ। মায়ের ভাষার মর্যাদা আর স্বীকৃতি অর্জনের জন্য জন্য বাংলা মায়ের অকুতোভয় বীর সন্তানেরা ঢেলে দিয়েছিল বুকের তাজা রক্ত । পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল এই ত্যাগের মহিমায় তাই শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হয় বাঙালির ভাষাপ্রেম আর দেশপ্রেমের অমর কীর্তি। এই পথেই অর্জিত হয়েছে বাঙালির চির আরাধ্য স্বাধীনতা। ৫২ পরবর্তী সকল আন্দোলনে বাঙালির হৃদয়ে ২১ শে ফেব্রুয়ারীর চেতনা জ্বলেছে দীপশিখার মত আর অনুপ্রেরণা দিয়েছে দাবী আদায়ের পথে নির্ভয়ে, দৃঢ়চিত্তে, দৃপ্তশপথে পথ চলতে।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের ২য় ভাষার স্বীকৃতি পেলেও ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা পেয়েছিল “বাংলা।” সংবিধানের ৩য় অনুচ্ছেদে লেখা হয়েছিল,“প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।” তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকার সর্বস্তরে রাষ্ট্রভাষা প্রচলনের উদ্যোগী হলেও কালের পরিক্রমায় ৪৩ বছর পর আমরা বাংলাভাষার সঠিক মূল্যায়নের বদলে অমর্যাদা আর বিকৃতি দেখছি সর্বত্র !!!
সবচেয়ে দুঃখের আর পরিতাপের বিষয় মহান ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কেই অনেকে অবগত নয়। এই দলে শ্রেণি-পেশা আর বয়স নির্বিশেষে সকলেই আছে !!! অনেক শিশু বা প্রাপ্ত বয়স্করা আছেন যারা বলেন ৫২র ২১ শে ফেব্রুয়ারী যুদ্ধ হয়েছিল !!! এর জন্য অনেকাংশে দায়ী আমাদের খিচুড়ি শিক্ষা ব্যবস্থা !! ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম, মাদ্রাসা, ইংরেজি ভার্সন ইত্যাদি । এসব ক্ষেত্রে দেখা যায় একমাত্র বাংলা তথা সাধারণ শিক্ষা ছাড়া কোথাও দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের জানার সুযোগ নেই । শহর ছাপিয়ে প্রত্যন্ত মফঃস্বল আর গ্রামেও পৌঁছে গেছে সর্বনাশা ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। পিতামাতা বহু অর্থ আর সময় ব্যয় করেন সন্তানকে আধুনিক শিক্ষার নামে নিজস্ব ভাষা আর সংস্কৃতির শেকড় থেকে বিছিন্ন করছেন হয়ত জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে। বাংলার মাঝে ইংরেজি বলাটা এখন বিশেষ স্টাইলের বহিঃপ্রকাশ !! আর বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের প্রতি বিরুপ একটা মনোভাব তৈরি করা হয়েছে যে তারা ভাল ইংরেজি জানে না। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রেও চরম অবহেলার শিকার হচ্ছে বাংলা ভাষা । হাতেগোনা কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলার পড়ার জন্য কোন সুযোগ নেই। এমনকি বাংলা ভাষার গবেষণার জন্য তেমন সুবিধাও নেই । এছাড়া আমাদের পাঠ্যপুস্তকে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত তেমন লেখাও নেই।
উপনেবেশিক মন মানসিকতা বাঙ্গালী এখনও পরিহার করতে পারে নি। যে কারণে রাষ্ট্রভাষা বাংলার চেয়ে মর্যাদা আর প্রতিপত্তিতে এগিয়ে আছে ইংরেজি । চাকরির বাজারে ইংরেজির বড় বেশি কদর। চাকরির দাতার কাছে এখন অন্যতম প্রধান ও অপরিহার্য যোগ্যতা হল প্রার্থীর ইংরেজি ভাষাজ্ঞান । কোন কোন ক্ষেত্রে এটাই প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুদ্ধ বাংলায় কথা বলার চেয়ে বাংলিশ বলাটা অনেকবেশি আধুনিক। সাম্প্রতিক সময়ের এফ.এম রেডিও যেন আগুনের উপর ঘি ঢেলেছে। রেডিও অনুষ্ঠানের উপস্থাপকদের বাংলা উচ্চারণ আর বাংলা-ইংরেজির মিশ্রিত কথোপকথন যেমনি বাংলা ভাষাকে বিকৃত করেছে তেমনি করেছে অপমানিত ।
সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন এখন সময়ের দাবী। বাঙালির ভাষা আন্দোলেরন দিন ২১ শে ফেব্রুয়ারী এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তাই এই ভাষাকে বিশ্বব্যাপী সমাদৃত করতে হলে আগে নিজেদের বাংলার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। এই বাংলা ভাষা আমাদের বড় গর্বের, বড় ভালোবাসার ধন । একারণেই বাংলাকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য ।
সরকারি পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায় পর্যন্ত সঠিক নিয়মে বাংলা ভাষা ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দেয়াটা অতি জরুরী । আধুনিক বিশ্বের সাথে সমগতিতে চলতে আমরা অবশ্যই ইংরেজির মত আন্তর্জাতিক ভাষাকে শিখব এবং জানব কিন্তু তার মর্যাদা বা মূল্যায়ন কোনভাবেই বাংলার চেয়ে বেশি হতে পারে না ।
সন্তানকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার পাশাপাশি প্রত্যেক পিতামাতার একান্ত দায়িত্ব তার সন্তানকে নিজের ভাষা, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির সাথে নিবিড় সম্পর্ক যেন কোনভাবেই বিচ্ছিন্ন না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা। কারণ শেকড়হীন গাছের পরিণতি কি হয় তা নিশ্চয়ই আমরা সকলে জানি ।
নতুন প্রজন্মের আধুনিকতার নামে খিচুড়ি ভাষা ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধে পরিবার, সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সচেষ্ট হতে হবে । এফএম রেডিও, টেলিভিশন, বিজ্ঞাপনসহ যেসব ক্ষেত্রে ভাষার বিকৃতি করা হয় তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বিদেশী অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশও বন্ধ করতে হবে।
সরকারকে সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের সাথে সাথে তার যথাযথ প্রয়োগেরও ব্যবস্থা নিতে হবে । বিশেষ করে উচ্চ আদালতে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা ও রায় লেখার ক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার করার ব্যবস্থা করা উচিত । প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বাংলায় রায় লিখে উৎকৃষ্ট উদাহরণ স্থাপন করেছেন যা সকলের জন্য অনুকরণীয় ।
পাঠ্যপুস্তকে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবং আবহমান বাঙালির কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা শিশুকাল থেকেই শিক্ষার্থীদের দিতে হবে। আর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় শিক্ষা লাভের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে এবং বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে গবেষণার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে ।
বাংলা ভাষার সঠিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
নিজের ভাষাকে যদি সঠিক মর্যাদা আর সম্মান দিতে না পারি, ভালোবাসতে না পারি তবে ভাষা শহিদদের ত্যাগের প্রতি চরম অশ্রদ্ধাই প্রকাশ পাবে । আর তখন ২১ শে ফেব্রুয়ারী কেবলমাত্র একটি দিবস হিসেবেই শুধু বছর ঘুরে বার বার ফিরে আসবে ।
আমাদের খুব বেশি কিছু করতে হবে না। শুধু প্রয়োজন ভাষার প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা আর একটু সচেতনতা।
কবি আবদুল হাকিমের ভাষায় শুধু বলতে চাই,
“যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী ।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি ।
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায় ।
নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায় ।”

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/farzana-sonia/28379.html



মন্তব্য করুন