Farzana Sonia-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

মৃত্যুর মিছিল

লিখেছেন: Farzana Sonia

মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হলো আরও একটি লাশ। মনির, কাশেম, নাসিমা, মন্টু, আসাদ-এর মত ৬টি তাজা প্রাণ পৃথিবী থেকে বিদায় নিল বড়বেশি অসময়ে। তাদের বুকভরা আকাশসমান স্বপ্নেরা মুকুলেই ঝরে গেল। নিভে গেল জীবন-প্রদীপ। সেই প্রদীপের আলো ছাড়া পরিবারগুলো আজ অমাবশ্যার অন্ধকারে ঢেকে গেছে। তাই আপাতদৃষ্টিতে সংখ্যাটা ৬জন হলেও প্রকৃতপক্ষে ৬টি পরিবার নিঃস্ব-রিক্ত হয়েছে চোখের পলকে। রাজনীতির ক্ষমতার লড়াইয়ে পাঁঠার বলি হয়েছে এরা । কেবলই ৬টি লাশ ছাড়া এরা আর কিছু নয়।
ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জনের বরাতমতে,“গত ৩দফার হরতালে এপর্যন্ত ৬২জন অগ্নিদগ্ধ চিকিৎসা নিয়েছেন। এরমধ্যে ৩ জন প্রতিবন্ধী আর ১৩জন শিশুও রয়েছে। বর্তমানে ২২জন ভর্তি রয়েছেন।” হয়ত তাদের মধ্যেও আরও কয়েকজন দুর্ভাগ্যজনকভাবে যুক্ত হবে সেই মিছিলে!!!
আর যে ৬জন চলে গেল তা কি কেবলই দুর্ঘটনা হিসেবে ভাবা হবে না পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে? এর উত্তর পাওয়া যাবে না। ক্ষমতার রাজনীতিতে জনগণ কেবল ক্রীড়ানক হয়েই রয়ে যাবে। এখানে স্বাভাবিক মৃত্যুরও কোন গ্যারান্টি পাওয়া যাবে না। অথচ গনতন্ত্রে জনগণই সকল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু।
৯০ এর গনঅভুত্থ্যানে নূরহোসেন কি তবে এই গনতন্ত্রের জন্যই ঢেলে দিয়েছিল বুকের তাজা রক্ত? ২২বছরের গনতান্ত্রিক শাসনের ফলাফল কি তবে জীবিত মানুষকে পুড়িয়ে মারা?
শ্রমজীবী মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে হরতালেও রাস্তায় নামে নইলে তার প্রিয় সন্তান,স্ত্রী বা পিতা-মাতা অনাহারে দিন কাটাবে। কোন রাজনীতি এরা বোঝে না। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এরাই এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে। অথচ এর বিনিময়ে তাদের ভাগ্যে জুটছে ককটেল আর পেট্রোলবোমা। ফলাফল নিজ গাড়িতে পুরে মরা,ট্রাক উল্টে বা ইটের আঘাতে অথবা বাবার চোখের সামনে অঙ্গার হয়ে যাওয়া ছেলের আর্তচিৎকার। পিতার সেই অসহায় চোখের চাহুনিতে কম্পিত হয় না অপরাধীদের হৃদয়। বিবেকের তাড়নায় সামান্য দুঃখ প্রকাশ বা সমবেদনাও এদের ভাগ্যে জোটে না।
নাগরিকের নিরাপত্তাবিধান ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দ্বিতীয় অপরিহার্য কাজ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩য় ভাগে ২৬-৪৭ক অনুচ্ছেদ পর্যন্ত নাগরিকের অধিকারসমূহ বর্ণিত আছে। সেখানে কাউকেই নির্বিচারে মানুষ হত্যার বৈধতা দেয়া হয়নি। তাই আজ যখন সাধারণ জীবিত মানুষগুলো পুড়ে কয়লা হয়, যখন তাদের উপার্জনের একমাত্র সম্বল কেড়ে নেয়া হয়, অসহায় স্বজনের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয় তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনও প্রশ্নের মুখে পরে।
যারা হরতাল আহবান করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট করছে আর পৈশাচিকভাবে নিরীহ মানুষগুলোকে হত্যা করছে তাদের ভাষ্য মতে সরকারীদল পরিকল্পিতভাবে এসব হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করছে। রাজনৈতিক কর্মসূচী দেবার পর এসব ঘটনার দায়তো তাদের উপরই বর্তায়। মানবিকতাবোধ বা দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে এসব অগ্নিদগ্ধ হতভাগ্য মানুষ অথবা তাদের পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোতো দূরের কথা তাদের জন্য সান্ত্বনা,সহানুভুতিও তাদের নেই। অথচ এরা রাজনীতি করে মানুষের জন্য। অপরদিকে প্রতিবার হরতালে প্রায় একই স্থানে সহিংস ঘটনাগুলো ঘটছে কিন্তু সরকারের কঠোর কোন ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে আমরা জেনেছি গুটিকয়েক মানুষ ফোন করে সাংবাদিক ডেকে সহিংসতা চালায়(!) মানুষকে আতঙ্কিত করার জন্য। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাত বেশ লম্বা তাই চেষ্টা করলে তারা এসব প্রতিহত করতে পারে অনায়াসে।
কয়েকমাস পর নির্বাচন হয়ত আরও কিছু মনির, নাসিমাকে জীবন দিতে হবে। ক্ষমতার কুক্ষিগত করতে সাধারণ মানুষগুলোর হিসেব বেশিদিন করাও হবে না। আবেগতাড়িত আমরা এই সাধারণ মানুষেরাও কিছুদিন পর সব ভুলে যাব, যেমনটা ভুলেছি বিশ্বজিতকে। কিন্তু মনিরের পিতার সেই অপলক শূন্যদৃষ্টি, মন্টু পালের বিধবা স্ত্রী অথবা আসাদের সমাপনি পরীক্ষার্থী মেয়ে কোনদিন কি ভুলতে পারবে এই অসহ্য বেদনা?
মনির হয়ত লেখাপড়া শিখে বড়গুণী মানুষ হয়ে পরিবার আর দেশকে এগিয়ে নিত। পোশাকশ্রমিক নাসিমার হাতেই ঘুরত দেশের অর্থনীতির চাকা। কাসেম, মন্টু, আসাদেরা সন্তানদের সুশিক্ষিত করে সুনাগরিক তৈরি করত প্রিয় সন্তানদের। এতগুলো স্বপ্নের অপমৃত্যুর দায় আসলে কে নেবে?
আর কত রক্তাক্ত হবে বাংলা মা আর তার নিরীহ সাধারণ সন্তানেরা ?

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/farzana-sonia/24902.html



মন্তব্য করুন