Farzana Sonia-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

একটি কথোপকথন

লিখেছেন: Farzana Sonia

একটি কথোপকথন
গত ২৭ শে অক্টোবর প্রথম প্রহরে দুজন সম্মানিত ব্যক্তির কথোপকথন শোনার বিরল সৌভাগ্য হয়েছিল। মনে হতে পারে অহর্নিশ আমরা কত বাক্যালাপ শুনি কিন্তু এই সাধারণ বিষয় ব্যক্ত করার প্রয়োজন কি? হ্যাঁ, যদি এই বাক্যবিনিময় কোন সাধারণ ব্যক্তির হতো তাহলে সে সম্পর্কে কিছু বলার থাকত না। কিন্তু যোগাযোগের আধুনিকতম মাধ্যম মুঠোফোনের দুই প্রান্তে ছিলেন আমাদের দেশের প্রধান দুই দলের দুজন কর্ণধার। স্বাভাবিকভাবেই পুরো জাতি এই ফোনালাপ জানতে ও শুনতে উদগ্রীব ছিল।
ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে রাজনীতি সম্পর্কে বিশেষ কোন জ্ঞান রাখি না। তাই রাজনৈতিক বোদ্ধা বা বিশেষজ্ঞের মত এ বিষয়ে কোন আলোচনা বা সমালোচনা করার যোগ্যতা বা অভিপ্রায় কোনটিই নেই। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিক বা ভোটার হিসেবে আমার নিজস্ব কিছু অনুভূতি ব্যক্ত করতে চাই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিমধ্যে তাদের মুখনিঃসৃত শব্দের ব্যবহার,সংখ্যা,মনোভাব,আচরণ ইত্যাদি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তবে ৩৭ মিনিটের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু মোটামুটি ৪ টি। যেমনঃ
১। লালফোন ( সচল/বিকল)।
২।গনভবনে নিমন্ত্রন এবং তা রক্ষায় অপারগতা প্রকাশ।
৩।হরতাল প্রত্যাহারের অনুরোধ এবং তা প্রত্যাখ্যান।
এবং ৪।অতীত ঘটনা নিয়ে পারস্পরিক অভিযোগ ।
এই কথাগুলো বলতে এতোটা সময়ক্ষেপণের পর ফলাফল যথারীতি শূন্য।
সবকিছু ছাপিয়ে আমদের সম্মানিত বিরোধীদলীয় নেত্রীর কথাগুলো সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। কারন তিনি যে রুঢ় ও আক্রমণাত্মক ভাষায় প্রধানমন্ত্রীর সাথে বাক্যবিনিময় করেছেন তা সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন যেকোন মানুষের কানে লাগবে। নুন্যতম ভদ্রতা, সহনশীলতা বা শ্রদ্ধাবোধের বালাই না থাকায় সাধারণ মানুষকে বিব্রত হয়েছে। কারন তিনি এদেশের ২ বারের প্রধানমন্ত্রীর (মতান্তরে ৩বার) কাছে এমন অশোভন আচরণ কখনোই কাম্য ছিল না। একজন প্রধানমন্ত্রী দেশের নির্বাহী ক্ষমতার প্রধান সেজন্য ব্যক্তি হিসেবে না হলেও পদমর্যাদার খাতিরে তাকে সম্মানসহযোগে সম্বোধন ও কথা বলা উচিত।
* প্রধানমন্ত্রী দুপুরে ফোন করে মাননীয় নেত্রীকে পান নি।তাই পরবর্তীতে তিনিই যদি ফোন করতেন সেটা বেশি শোভনীয় হতো। যাহোক ফোন ধরার ক্ষেত্রেও যথাযথ নিয়ম রক্ষা হয় নি। বরং এতোটা ক্ষুব্ধ ও কড়া ভাষা ব্যবহার করাটাও যথার্থ বলে মনে হয় না।
* ফোনালাপ শুনে মনে হয়েছে মাননীয় নেত্রী যতটা ভালো বক্তা ততটা ভালো শ্রোতা নন। কারন কথা বলার সময় অপরপক্ষকেও সমান বলার সুযোগ দিতে হয় আবার কারো কথা চলতে থাকলে সেখানে বাধা দেয়াটাও শোভনীয় নয়। আমরা শুনলাম আর দেখলামও প্রধানমন্ত্রী খুব অসহায়ভাবে দেশনেত্রীর বকা শুনছেন যেন কড়া কোন মাস্টারমসাই/দিদিমনি তার অবাধ্য ছাত্রীকে ভৎসনা করছেন। যদিও এতে খানিকটা কৌতুকেরও অবতারণা হয়েছে যা বেশ উপভোগ্য।
* এখানে লক্ষ্যনীয় গত ২৫ শে অক্টোবর মাননীয় নেত্রী সমাবেশে সরকারকে ২ দিনের আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। যেখানে বলেছিলেন উক্ত ২ দিনের মধ্যে তাদের সাথে সরকারের সংলাপ শুরু অথবা শুরুর উদ্যোগ নিতে হবে নচেৎ ২৭-২৯ তারিখ হরতালের ফাঁদে পড়তে হবে জাতিকে। প্রধানমন্ত্রী শেষ দিন সন্ধ্যায় আলোচনার প্রস্তাব দিলেও তাকে বোঝাতে পারেননি যে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আলোচনার সুত্রপাত হওয়ায় হরতাল দেবার নৈতিক কোন যুক্তি নেই। বার বার আপোষহীন নেত্রী বলেছেন যেহেতু তিনি আগেরদিন সন্ধ্যায় অপেক্ষা করেও কোন ফোন পাননি তাই হরতাল প্রত্যাহার করার কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া তার প্রিয় ১৭ দলের নেতারাও তার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা হরণ করেছে তাই তাদের অনুমতি ছাড়া তিনি হরতাল প্রত্যাহার করতে অক্ষম। পরমুহূর্তে বললেন তার এক দফা মানলে এখনই সেই ঘোষণা দেবেন। বোধকরি নিজের বক্তব্যের সঙ্গে তিনি আপোষ করে পূর্বের ওয়াদা(সমাবেশের) ভঙ্গ করে আপোষহীনটার মুখোশ খানিকটা উন্মোচন করলেন।
* গণভবনে আমন্ত্রণ প্রত্যাখানে তিনি হরতালকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেছেন। হরতালে দেশের ১৬ কোটি মানুষ জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে জীবনবাজি রেখে ছুটে বেড়ায় সেখানে তিনি কেন পারবেন না গুলশান থেকে শেরে-বাংলা নগরে(গনভবন) যেতে? তিনি নিজের দলের ডাকা হরতালে যদি নিজেকে নিরাপদ মনে না করেন তবে, যে জনগণের জন্য (নামে) তিনি রাজনীতি করেন তাদের জন্য তার হৃদয়ে কতোখানি মমতা বা অনুভূতি আছে তাতো এখন প্রশ্নের সম্মুখীন।
* ১৫ই আগস্ট বাঙালির জীবনের এক কলঙ্কময় আর গভীর শোকের দিন। স্বাধীনতার স্থপতি ও তার পরিবারসহ ২১ জন শহিদ হয়েছে বিপথগামী সেনার হাতে। তাই বিষাদময় দিনটিতে আনন্দ উৎসব বড় বেশি বেমানান। যতদূর জানি ৯০ দশক থেকে মাননীয় বিরোধী নেত্রী এই দিনটিকে জন্মদিন হিসেবে পালন করে আসছেন। আসল জন্মদিন হলেও এত ঘটা করে পালন করা খুব দৃষ্টিকটু লাগে। প্রধানমন্ত্রী বহুবার তাঁকে সভা- সমাবেশে অনুরোধ করেছেন এই দিনটিতে কেক না কাটতে কারন এটি সঠিক তারিখ (জন্মদিন) নয়। এবার ফোনে সরাসরি তিনি তাঁকে অনুরোধ করেছেন। তাই এবার মাননীয় বিরোধী নেত্রীর সুযোগ ছিল উদারতার পরিচয় দিয়ে দিবসটি আর উদযাপন না করার ঘোষণা দেয়া। আমাদের দুর্ভাগ্য এর থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম।
* ৭১ বা ২১ শে আগস্ট নিয়ে বেশি কিছু বলার নেই। কারন অবাধ তথ্য প্রবাহের এ যুগে ৭১ এর গণহত্যা বা ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার কারন আর এর নেপথ্যে কারা তা সকলেই জানেন।
ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে কেউই ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নন। প্রধানমন্ত্রীরও ব্যক্তিগত জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় অনেক ভুল-ভ্রান্তি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তারপরও তাঁর অবয়বেই আমরা একজন স্নেহময়ি মা, বোন অথবা পরম আত্মীয়ের ছায়া খুঁজে পাই। যিনি অন্যের দুঃখে অশ্রুপাত করেন, আবেগতাড়িত হন, বিপক্ষ দলকে কথার বাণে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করেন, ছোট্ট শিশুর মত জাতীয় দলের খেলা দেখে লাফিয়ে ওঠেন, আবার জাতীয় সংগীতের সুরে কণ্ঠ মেলান, প্রজন্মের আহবানে প্রদীপ প্রজ্বলন করেন, ভালবাসেন মানুষকে আর সৃষ্টিশীলতাকে।
একটা কথা শোনা যায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর জিহবাই নাকি তার বড় শত্রু। এমনকি আদালতও তাকে কম কথা বলার পরামর্শ দিয়েছে(!) কিন্তু এবারের কথোপকথনের ধৈর্যের পরীক্ষায় তিনি ১ম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাই আন্তরিক শুভেচ্ছা আর ধন্যবাদ তাঁকে।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/farzana-sonia/24512.html



মন্তব্য করুন