FarhanaRoshnee-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

সোনালি ডানার চিলেরা ও একটি শিশুর অপমৃত্যু

লিখেছেন: FarhanaRoshnee

ফুটফুটে প্রাণোচ্ছল ছোট্ট একটি মেয়ে। বয়স ৬ কি ৭। ক্লাস ওয়ানে পড়ে। সবাই খুব আদর করে। তবু শহরের ইট পাথরের গাঁথুনির মাঝে তার ছোট্ট প্রাণটি মুক্তির আশায় খাঁচায় ছটফট করতে থাকে বন্দী মুনিয়াটার মতই। খেলার সঙ্গী কেউ নেই। তার ভাইটি কিছুমাত্র ঘরে থাকেনা। খেলার সাথীদের সাথে দূর দুরান্তে চলে যায়। তারও খুব ইচ্ছে করে ওদের সাথে গিয়ে দস্যিপনা করতে। কিন্তু মায়ের শক্ত বারণে যাওয়া হয় না। তার ভাই যদি যেতে পারে তাহলে সে কেন পারবেনা? কিছুতেই বুঝতে পারেনা।

বড় মানুষগুলো খুব পঁচা। শুধু নিষেধ আর নিষেধ। ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে।

ধুর ছাই বলে, খেলনা পাতিলগুলো নিয়ে কাগজ কুচি কুচি করে রান্না শুরু করে দেয়। ছোট কাগজের টুকরোগুলো ভেন্ডি আর বড়গুলো মাছ। রান্না শেষ করে খাওয়াও সেরে ফেলে। কতক্ষণ রং পেন্সিল নিয়ে আঁকাবুকো করে। ঐ যা ! আউটলাইন দিতে গিয়ে পুরো ফুলটাই যে থেবড়ে কালো হয়ে গেল। কালো ফুলটাকে কি বিচ্ছিরি লাগছে দেখতে! খাতা বন্ধ করে দিয়ে রুপকথার বইটি টেনে নেয়। অনেকবার পড়ে ফেলেছে। তাই পুরো বই পড়ে ফেলতেও এখন আর খুব বেশী সময় লাগে না। কি সুন্দর ছবিগুলো দেখলেই মন নেচে উঠে।

মাতারিকি তার সবচাইতে পছন্দের পরী। দুষ্টু তানো তার তারাটি চুরি করতে চায়। তাই কি হয়!!কক্ষনো না! তারাটিই যে তার সব। মাতারিকি তার তারার মতই সুন্দর। সে বসে বসে মাতারিকির শাড়ী রং করে। লাল শাড়ি তার মাঝে হলুদ ফুটকী। আচ্ছা পরীরা কি মাথায় মুকুট পড়ে ? না পরুক ! মাতারিকি পড়বে ! অপটু হাতে ছোট একটা মুকুট এঁকে দেয়। নিজের রং করা দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায়। আর ভাবে যখন তারও এমনি বয়স হবে, সেও পরী সাজবে। ঠিক এমন করে।

নাসিরুদ্দিন হোজ্জা, গোপাল ভাঁড় আর বীরবল। এর মধ্যে তার পেটুক গোপাল ভাঁড়কেই বেশী পছন্দ। গোপালের কীর্তিকাহিনী পড়ে আর একা একাই হেসে কুটিপাটি হয়।

সারাদিন হাসলেই তো আর চলবেনা!! বন্ধুরা যে তার জন্য অপেক্ষা করছে। সবকিছু ফেলে তাড়াতাড়ি জানালায় দাঁড়িয়ে ঝটপট হাত নাড়ে। আকাশজুড়ে মেঘেদের ছোটাছুটি। তার ছোট্ট দুটি স্বপ্নভরা চোখে মেঘেরা রং পাল্টায়। তার চোখে মেঘেরা কখনও দুরন্ত খরগোশ, ইয়া বড় কানওয়ালা হাতী, নয়ত পুকুরের ধারে ডানা ঝাপটানো কোন হাঁস। ওরাই ওর বন্ধু। সে ওদের সাথে কথা বলে। আর তারা শুঁড় নেড়ে কখনোবা ডানা ঝাপটিয়ে তার জবাব দেয়।

সবদিন এভাবে কাটেনা। বিশেষ করে যখন উপরতলার বা পাশের বাসার আপুটা ডেকে নিয়ে যায়, সেদিনটি তার খুব আনন্দে কাটে। ইচ্ছে করে প্রত্যেকদিন যেতে। কিন্তু মা বলে দিয়েছে, সময়ে অসময়ে মানুষের বাসায় যেতে হয়না। সময় আর অসময়ের পার্থক্য সে বোঝেনা। তাই হ্যাংলার মত তাকিয়ে থাকে কখন আপুরা ডাকবে। ডাকলেই আর কথা নেই। ছুট্টে গিয়ে হাজির। আপুরা কত মজার গল্প জানে! তাদের স্কুলের গল্প, কলেজের গল্প। আপুদের সাথে বাগানে নতুন ফুলের কলি খুঁজে বেড়াতে তার সবচেয়ে ভালো লাগে।

গত দুদিনে নিশ্চয়ই আপুর স্কুলে অনেক মজার ঘটনা ঘটে গেছে। এখনও শোনা হয় নি। কখন যে শুনবে! এইসব ভাবতে ভাবতে কাগজের নৌকো বানায় অনেকগুলো। বালতির পানিতে ভাসাবে। ঘর নোংরা করলে আম্মু রাগ করবে। তাই খুব সাবধানে করছে। কিন্তু দুষ্টু বাতাসের জন্য তা কি আর করার সাধ্য আছে! কাগজের টুকরোগুলো ঘরময় হয়ে যায়। আম্মুর চোখে পড়তেও খুব বেশী দেরী হয় না। আর যায় কোথা! বকার গুলি বর্ষণ করে হাতে একটা বাটি ধরিয়ে দিয়ে বললেন, পাশের আপুদের বাড়িতে খাবারটা দিয়ে আসতে। বকা খাওয়ার স্মৃতি ভুলতে মুহূর্তও লাগেনা। ধেই ধেই করতে করতে পাশের বাড়ী গিয়ে হাজির। কিন্তু গিয়েই খুব আশাহত হল। হুজুর এসেছে। বসার ঘরে আপু, ভাইয়া দুজনেই পড়ছে। ধুর! কত্ত প্ল্যান ছিল!সবটাই ভেস্তে গেল!

কাকীমণিকে বাটীটা দিয়ে বেরিয়ে আসতে গেলেই, হুজুর তার নাম ধরে হাঁক দিলেন। তখনও কাকিমনির সামনেই ছিল। কাকীমণি এক্কেবারে নিষেধ করে দিলেন। কিছুই বুঝতে পারলনা। প্রত্যেকদিন ভোরে সেও একজন হুজুরের কাছে আরবি পড়ে। কখনও পড়া না পারলে হুজুর খুব রেগে যান। হাতের তালুতে স্কেল দিয়ে মারেন। তবে হুজুর ভালোও বাসেন। সে বুঝতে পারে। কাকীমণির কথা শুনে স্কেলের আঘাতের জায়গাগুলো চিনচিন করে উঠে। তবুও না বুঝেই মেনে নেয়। বড়দের অমান্য করতে হয়না তো তাই!

মাথা নিচু করে বেরিয়ে যাচ্ছে, এমন সময় হুজুর আবার জোরে ডাক দিলেন। এই ডাক সে অগ্রাহ্য করতে করতে পারলনা। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেল। কাছে টেনে হুজুর নিজ উরুর উপর বসালেন। একহাতে জড়িয়ে ধরে, অন্যহাতটি স্কার্টের নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে দিলেন। আপু ভাইয়া ক্রমাগত না দেখার ভান করে চলেছেন। নিষ্পেষিত হচ্ছে…সাথে নিষ্পেষিত হচ্ছে তার শিশু সত্তা। তার চোখে শুধুই বিস্ময়। বিহ্বল…বিহ্বল সে দৃষ্টি। কিছুই বুঝতে পারছেনা। হুজুরের নোংরা হাসি, নির্লজ্জ চাহনি আর আপু ভাইয়ার মাটির সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা দেখে সে বুঝতে পারে অনেককিছু।

ব্যাথা! খুব ব্যাথা করছে তার! ভীষণ যন্ত্রণা!!! চিৎকার করবে? কাঁদবে? কি করে ? কাঁদতে যে সে ভুলে গেছে !!!

সমাজ তার গালে কষে এক চড় মেরে বলছে, তুই মানুষ না… এমনকি শিশুও না…তুই শুধু মেয়েমানুষ…শুধুই মেয়েমানুষষষষষষ। তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে…মেয়েমানুষষ ষ ষ…

এইটুকুন একটা হৃদয় দুমড়েমুচড়ে যেতে বেশী সময় লাগেনা। মনে পড়ে কিছুদিন আগে প্লাস্টিকের লাল গাড়িটা কিসের যেন চাপে একেবারেই পিষ্ট হয়ে গিয়েছিল। চালানো যাচ্ছিল না বলে ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হয়েছে। ঐ গাড়িটার সাথে তার কি কোথাও মিল আছে !!!

এতদিনকার মায়ের অহেতুক বারণগুলো আজ হঠাৎ অর্থবহ হয়ে উঠে।

রঙিন পৃথিবীটা মুহূর্তেই ধূসর হয়ে যায়। এই পৃথিবীতে প্রজাপতিদের ডানা থাকেনা। পাখিরা ডাকেনা। পোড়ো গাছগুলোতে কখনও ফুল ফোটেনা। কিছুদিন আগে ভুল করে আঁকা কালো ফুলটার কথা এসময় খুব মনে পড়ে।

একসময় সে নিস্তার পায়। এক বুক অভিমান নিয়ে টলোমলো পায়ে ফিরে আসে। কিছুক্ষণ আগেই শিশুটির দাফন হয়ে গেছে। এখন সে মেয়েমানুষ। শুধুই মেয়েমানুষ। নিস্তরঙ্গ, নির্জীব।

কাউকে কিছু বলতে পারেনা। শুধু বুকের ভেতর বোবা কান্নারা নিঃশব্দে ঝরতে থাকে। ঝরতেই থাকে।

খেলনা হাঁড়িগুলো হারিয়ে গেছে। রং পেন্সিল গুলো অমনি পড়ে থাকে। কেউ তাদের খোঁজ নেয়না। রুপকথার বইয়ের উপর ধুলোর স্তর বাড়তে থাকে। গোপাল ভাঁড়ও এখন আর হাসাতে জানেনা। তবে এখনও সে জানলায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখে। মেঘেরা এখনও দুরন্ত খরগোশ হয়ে ছোটাছুটি করে। সে দেখতে পায়না। হাসেরা আজও ডানা ঝাপটায়। কিন্তু তার কানে পৌঁছায় না। মস্ত হাতীর কান গলে তার চোখ স্থির হয়ে থাকে, দিগন্তে চক্রাকারে ঘুরতে থাকা চিলেদের দিকে। সোনালি ডানার বড় বড় চিল!!! ভয়ার্ত চোখে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে, ধুকপুক করতে থাকা ছোট্ট ইঁদুর শাবকটির মতই।

তার আর কখনও পরী সাজা হয়না। তারাটিই যে চুরি হয়ে গেছে!

শুধু আকাশে চিলেদের সংখ্যা বেড়েই চলে।
এক…দুই…তিন…
.

বিঃদ্রঃ কাছের মানুষদের কাছ থেকেই শিশুরা সবচেয়ে বেশী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। শুধু মেয়েশিশু নয়। ছেলেদেরও রেহায় দেয় না এই মানুষের খোলস পরিহিত পশুগুলো। ভাবছেন, চকিত এই ঘটনা ঘটে? না! প্রতিদিনই অসংখ্য শিশু এইভাবে তাদের শৈশব হারাচ্ছে। সেসব আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায়। খুব আপন মানুষেরাও জানতে পারেনা। দিনে দিনে মেয়েটি/ছেলেটি আরও সঙ্কুচিত হয়। বেঁচে থাকলেও সারাজীবন এই গ্লানি থেকে সে মুক্তি পায় না।অনেক শিশুর আর কখনই স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয়না।

তাই আমাদের প্রত্যেকের যে যার অবস্থান থেকে শিশুদের একটি সুন্দর শৈশব নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর এইসব ঘৃণ্য নরপশুদের উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে আর কোন শিশুই চিল/শকুনের খপ্পরে তার শৈশব না হারায়।

আমি বিশ্বাস করি, আমরা যদি সোচ্চার হই তাহলে শিশুরা ফিরে পাবে তাদের আনন্দময় শৈশব। ইনশাআল্লাহ।

এটুকু তারা আমাদের কাছে চাইতেই পারে;তাইনা?

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/farhanaroshnee/31612.html



মন্তব্য করুন