Dewan Tanvir Ahmed-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

হীরক রাজার দেশে: আপগ্রেডেড

লিখেছেন: Dewan Tanvir Ahmed

হীরক রাজার কথা মনে আছে? হ্যা, সত্যজিত্‍ রায়ের “হীরক রাজার দেশে” গল্পের সেই অত্যাচারী রাজা যে কিনা হীরক রাজ্যের ভাল রাজাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেছিল, আর সিংহাসনে বসেই প্রজাদের ওপর শুরু করে ভয়ঙ্কর অত্যাচার! যখনই কোনো প্রজা কোনো দাবি জানাতো, শাস্তিস্বরূপ রাজা তাকে পাঠিয়ে দিত বৈজ্ঞানিকের “যন্তর মন্তর” ঘরে, আর সেই ঘরেই মগজ ধোলাই যন্ত্রে প্রজাদের মগজ ধোলাই করে রাজার ইচ্ছেমত মন্ত্র ঢোকানো হত। মগজ ধোলাইকৃত প্রজারা দিনরাত আউরে যেত-

“যাবে যদি যাক প্রাণ,

হীরকের রাজা ভগবান!”

হীরক রাজা রাজ্যের পাঠশালাও বন্ধ করে দেয়। তখন পাঠশালার পণ্ডিত উদয়ন মাস্টার ভূতের রাজার বর প্রাপ্ত গুপী গাইন আর বাঘা বাইনকে সাথে নিয়ে রাজার বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন প্রতিরোধ, রাজ্যের কৃষক, শ্রমিক আর পাঠশালার ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ করেন তিনি হীরক রাজাকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে। এক পর্যায়ে হীরক রাজা এবং তার রাজ কর্মচারীদের ঢোকানো হয় তারই মগজ ধোলাই যন্ত্রে।

সত্য আর অসত্যের লড়াইয়ে চূড়ান্ত বিজয় সত্যের হলেও অসত্যকে কখনো সম্পূর্ণরূপে মুছে দেওয়া যায় না। ঠিক তেমনি হীরক রাজাকেও সম্পূর্ণরূপে মেটানো সম্ভব না, হীরক রাজা বার বার ফিরে আসে একেক সময় একেক রূপে। এই বাঙালি জাতিকে বহুবার হতে হয়েছে হীরক রাজার মুখোমুখি। হীরক রাজার অত্যাচারে যখন বাঙালি অতীষ্ঠ তখন বাংলার মাটিতে আবির্ভূত হন উদয়ন পণ্ডিত আর গুপী-বাঘা, তাদের কাছ থেকে বাঙালি পায় নবজাগরণের মন্ত্র! সেই মন্ত্রের জোরেই বাঙালি একটু একটু করে উঠে দাড়ায়। প্রথমে ১৯৫২, তারপর ১৯৬৯ এবং তারপর হীরক রাজার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই ১৯৭১-এ। এ লড়াইয়ে ত্রিশ লক্ষ প্রাণ আর দুই লক্ষ সম্ভ্রমের বিনিময়ে হীরক রাজার কবল থেকে মুক্ত হয় বাঙালি জাতি, মুক্ত হয় প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ।

কিন্তু হীরক রাজা মিটে যায় নি, বরং অন্য এক রূপে আবার ফিরে এসেছিল ১৯৭৫-এ! আর তারপর থেকেই শুরু হয় একের পর এক অনাচার, সুযোগমত একাত্তরের হীরক রাজার ধামাধারীরা আবার চেপে বসতে থাকে বাঙালির ঘাড়ে। তখন থেকেই নতুনভাবে শুরু হয় বাঙালির মগজ ধোলাই!

এরপর একাত্তরের হীরক রাজার ধামাধারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয় ১৯৯২ সালে, বাংলার মাটিতে আরো একবার আবির্ভাব ঘটে উদয়ন পণ্ডিতের। ফলস্বরূপ উদয়ন পণ্ডিত আর গুপী-বাঘাদের রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা করে হীরক রাজার সেই ধামাধারীরা।

এরপর একুশ বছর পাড় হল, ২০১৩ সাল এল। একাত্তরের হীরক রাজার ধামাধারীদের বিরুদ্ধে আরো একবার মাথা তুলে দাড়িয়েছে বাঙালি জাতি, গড়ে তুলেছে এক বিশাল গণজোয়ার! কিন্তু আগেই বলেছি, হীরক রাজা একেক সময় একেক রূপে আবির্ভূত হয়, ২০১৩ সালেও আমরা দেখতে যাচ্ছি হীরক রাজার নতুন এক রূপ। হীরক রাজা এখন শিখেছে নতুন কায়দার রাজনীতি। সত্যজিত্‍ রায়ের হীরক রাজা সিংহাসনে বসার পর প্রজাদের মগজ ধোলাই করত, কিন্তু এখনকার হীরক রাজা তা করে না। কিন্তু এই হীরক রাজা সিংহাসন দখল করার জন্য যা যা করা দরকার তা আগেই করেছে। আপগ্রেডেড হীরক রাজার রয়েছে বিভিন্ন শাখা প্রশাখা, যাদের দেখে সবাই বলবে এরা আলাদা আলাদা; কিন্তু রসুনের গোড়া মূলত এক জায়গায়ই। হীরক রাজার একটা শাখার কাজ হল দেশের সর্বস্তরের মানুষের মগজ ধোলাই, আর এই মগজ ধোলাই করা হয় কচি বয়সেই. . . এরাই হয় পরবর্তীতে হীরক রাজার ধামাধারী. . . এদের মস্তিষ্কে ঢোকানো হয় হীরক রাজার মন্ত্র-

“যাবে যদি যাক প্রাণ,

নেতা মোদের ভগবান!”

এই হীরক রাজা সিংহাসনে বসার আগেই দেশবাসীর মগজ ধোলাই করে রাখছে, আর তাদের ব্যবহার করেই হীরক রাজা দেশপ্রেমিক বাঙালিদের ওপর একের পর এক আঘাত হেনে চলেছে। আর এই হীরক রাজা যখন সিংহাসন সম্পূর্ণরূপে দখলে নিয়ে নেবে, তখন একাত্তরের হীরক রাজার দালালেরা হবে দেশের মন্ত্রী, আর দেশে শুরু হবে অনাচার!

আমাদের মাঝে উদয়ন পণ্ডিত আর গুপী বাঘার আবির্ভাব আবারও হবে কিনা জানা নেই, কিন্তু উদয়ন পণ্ডিতের শেখানো জাগরণের মন্ত্র তো আমরা ভুলি নি! হীরক রাজা যতই আপগ্রেডেড হোক, হীরক রাজাকে প্রতিরোধের মন্ত্র চিরকাল একই থাকবে-

“অনাচার করো যদি,

রাজা তবে ছাড়ো গদি!

রাজার যারা ধামাধারী,

তাদেরও বিপদ ভারী!

গরিবে শোষণ পাপ,

ক্ষমা চেয়ে নাহি মাফ!

নাই কোনো পরিত্রাণ,

হীরকের রাজা শয়তান!

দড়ি ধরে মারো টান,

রাজা হবে খান খান!”

আমরা পারি না অস্ত্র চালাতে,

পারি না গ্রেনেড চার্জ করতে,

কিন্তু আমরা জানি প্রতিবাদ করতে,

জানি প্রতিরোধ গড়তে!!!

জয় বাংলা!!

জয় প্রজন্ম!!!

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/dewan-tanvir-ahmed/23624.html

 2 টি মন্তব্য

  1. ফাতেমা জোহরা

    অসাধারণ একটা লেখা লিখেছেন। আমিও আপনার সাথে একমত যে- হীরক রাজারা  যেভাবেই সিংহাসনে আসুক না কেন আর যতই আপগ্রেডেড হোক না কেন  তাঁদের প্রতিরোধের মন্ত্র  চিরকাল একই থাকবে। জয় বাংলা, জয় প্রজন্ম , জয় বঙ্গবন্ধু।।।  

    1. ব্যাকডেটেড বাঙালি

      জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!!

মন্তব্য করুন