বনলতা সেন-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

রোদসীর চন্দ্রস্নান পর্ব ১

লিখেছেন: বনলতা সেন

 

রোদসী অনেক দিন পরে ছাদে এসে দাড়ায়। ছাদের একপাশে তার নিজের সাজানো ক্যাকটাসগুলো এত্তদিন পরে যেন তাকে দেখে অবাক হল। রোদসী সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা গাছ গুলোর দিকে এগিয়ে যায়। ক্যাকটাস গাছটায় ফুল ফুটছে। সে ধরার চেষ্টা করে। হাতে কাটা ফুটে যায় তার।

‘কি রাগ করেছিস বুঝি!’ সে ক্যাকটাসটাকে বলে।

আগে প্রতিদিন এই গাছগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে না দিলে তার ঘুম হতো না। অথচ তাদের কেই আজ কত অপরিচিতো মনে হচ্ছে! রোদসী এক কোনে এসে দাড়ায়। আজ রাতে আবার জোছনা হবে। কি জানি চন্দ্রস্নান আজ হবে কিনা!

সে খুব সাজগোজ করেছে। একটু পরেই তার এনজেমেন্ট। পাত্রপক্ষ তিনবার এসে দেখে গিয়েছে তাকে। আজ এনগেজমেন্ট হয়ে যাবে। অনেক কষ্টে মায়ের কাছ থেকে দুই ঘন্টা আদায় করেছে সে। দুই ঘন্টা কেউ তাকে বিরক্ত করতে পারবে না। এই দুইঘন্টা নিজের জন্যে ব্যয় করবে সে। রোদসী রেলিংএর উপরে উঠে বসে। মার আসার সম্ভাবনা নেই এখন। মা ব্যাস্ত ক্ষীরসা পিঠা নিয়ে। রোদসী মনে মনে হাসে।

আচ্ছা দুইঘন্টা কি খুব বেশী? সে নিজেকে প্রশ্ন করে। দুইঘন্টা পার হচ্ছে না কেন সেটাই ভেবে পায়না সে। সে দুইঘন্টা সময় নিলো অথচ কিভাবে শেষ করবে ‍দুইঘন্টা বুঝতে পাচ্ছে না। সে তার ডাইরিটা বের করে। এটা তার গোপন চিঠির ডাইরি। এই ডাইরির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এই ডাইরিতে সে যত চিঠি লিখেছে কোন চিঠিই কাওকে পাঠানো হয় নি এবং সবগুলো চিঠিই সম্বধোনহীন। সে ঝুলানো দেলানায় বসে পড়ে। ডাইরি খুলে মুক্তোর মতো অক্ষরে গোটা গোটা হাতে সে লিখে।

 

সখা,

আমি জানি তুমি ভাল আছো।

তুমি অনেক ব্যাস্ত আমি সেটাও জানি। তাই তোমাকে ডিস্টার্ব করি না। মাঝে মাঝে ইচ্ছা হয় তোমাকে একটি চিঠি পাঠাই কিন্তু তাও পাঠাই না। কারণ কি জানো? কারণ আমার আশেপাশের সবাই আমার প্রতি বিরক্ত হয় খুব। আমি চাই না তুমিও বিরক্ত হও। সেটা আমি চাইতেই পারি। তাই নয় কি? আমি জানি এই চিঠি তুমি পাবে না। কারণ আমি পাঠাবোই না! আমার বেশীর ভাগ চিঠিই আনসেন্ট।

যাই হোক সখা জানো আজ না আমার বিয়ে। এনগেজমেন্টের কথা যদিও বলা হয়েছে কিন্তু আমি জানি বিয়েও আজই হয়ে যাবে। কিন্তু সেকথা তুমি জানবে না সেটাই আমার দুঃখ। তুমি এখন আমার কিছুই জানতে চাইবেনা জানি। কেন চাইবে? যেদিন আমি দুজনের পথ আলাদা করে নিয়েছিলাম সেদিনের পর থেকে তো তুমি আর এপথ মাড়াওনি!

তোমাকে আজ কেন চিঠি লিখছি জানো? আজ না জোছনা। মনে আছে জোছনা রাতগুলো তুমি আগে কেমন ভাবে চন্দ্রস্নান করে কাটিয়ে দিতে! আমাকেও বলতে কিন্তু আমি বিরক্ত হতাম! কিন্তু দেখ আজ তুমি বিরক্ত হও আর আমি চন্দ্রস্নান করি।

আমাদের বিচ্ছেদের পরে যখনই তোমার সাখে দেখা হয়েছে ততবারই তুমি সুরমা নামের একটি মেয়ের কথা বলেছো আমাকে।

আচ্ছা সেদিন তুমি যখন সুরমা নামের মেয়েটাকে নিয়ে লেখা কবিতাটা আবৃত্তি করে আমাকে শোনাচ্ছিলে, তখন কি তোমার মনে হয়নি যে আবেগ দিয়ে তুমি সুরমার জন্যে কবিতা লিখছো সেটা তো একদিন শুধুই আমার ছিল! শুধুই আমার জন্যে! কি সহজ ভাবে তুমি সুরমার কথা আমাকে বলছিলে! আমি অনেক অবাক হয়েছি জানো। কান্নার ঢেউ সামলাতে কষ্ট হয়েছিলো। আমি কেন ভুলে গিয়েছিলাম আমি আর তুমি তো আলাদা এখন! আচ্ছা আমাকে নিয়ে লেখা কবিতাটাতে তো তুমি সুর দিয়েছিলে। সেই সুর কি সুরমার জন্যে লেখা কবিতাতে দিয়েছো? আচ্ছা এমন নয় তো আমাকে কষ্ট দেবার জন্যে তুমি এসব করছিলে? নাহ্ তুমি আর যাই কর এমন করতে পারো না আমি জানি।

 

ভয় পেও না আমি কিন্তু তোমার কাছে কিছুই চাই না। জানো কাওকে কাওকে কল্পনায় পেতেই ভাললাগে। বাস্তব যে ভীষন কঠিন! কল্পনায় হারাবার ভয় নেই। কিন্তু বাস্তবে সেই ভয় প্রতিনিয়ত তাড়া করে আমাকে। কারণ আমার রজ্জু যে খুব হালকা! কাওকে ধরে রাখা আমার কাজ নয়। আমি কল্পনা বিলাসী। তাই তোমাকে কল্পনায় পেতেই ভাল লাগে। এটাই হয়তো আমার শাস্তি। তোমাকে ত্যাগ করার। কিন্তু জানো এরপরে আমি আর কাওকে কখনও….. নাহ্ থাক!

আসলে আমার জীবনটা ব্যার্থতায় ভরা। আমি এক ব্যার্থ মানবী। আমি সে কথা কিছুতেই মনে করতে চাই না। কিন্তু সে ব্যার্থতা বারবার আমাকে নাড়া দিয়ে যায়। যেভাবেই হোক নাড়া দিয়ে যায়। বিভিন্ন রূপে আসে সে। জানো আমি যেটা চাই সেটা কখনই পাই না- এমন নয়। আমি পাই। কিন্তু অসময়ে। তখন না পারি রাখতে না পারি ত্যাগ করতে।

তুমি কেমন আছো সখা? খুব জানতে ইচ্ছা করে গো। আমি জানি উত্তর পাবো না। তবুও জানতে ইচ্ছা করে খুব। তোমার হয়ে কেউ যদি উত্তরটা দিতো তাহলে মনে শান্তি পেতাম। আমি জানি তুমি কখনই জানতে চাইবে না আমি কেমন আছি। তবু ও বলছি আমি ভাল নেই গো, ভাল নেই। কেন জানো? নাহ্! তুমি জেনে কি করবে! আমি চাই তুমি ভালো থাকো। অনেক আনন্দ পাও জীবন হতে। দরকার হলে আমার ভাগেরটাও তুমি যেন পাও।

সুখে থাকো। শান্তিতে থাকো গো সখা। প্রিয় সখা জানো আমি তোমাকে একটা কথা বলার ছিলো। সে যাক। আজ আর নয় গো।

আজ যাই। আবারো লিখবো তোমাকে। যখন মনে যাতনা জাগবে সুখের বা বেদনার। তখন লিখবো। তোমাকে লেখা চিঠিগুলো তুমি কখনই পাবে না জানি তারপরও আমি লিখেই যাবো। আমার আনন্দ, দুঃখ, কষ্ট, বিষন্নতা, বেদনা, উল্লাস প্রতিটি অনুভুতিতে আমি তোমাকে চিঠি লিখবো। কেন জানো? নাহ্ আরেকদিন বলবো।

 

তোমার

রোদসী

পুণ: জানো আমার না খুব ইচ্ছা করছে শুণ্যতার অনুভুতি পেতে। তুমি বলেছিলে না যে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়লে কিছুক্ষণের জন্যে শুণ্যতার অনুভুতি পাওয়া যায়! আমার না খুব ইচ্ছা করছে সেই অনুভুতি পেতে। কিন্তু কি করবো বলো আমার যে সাহস নেই!

 

রোদসী ডাইরি বন্ধ করে। হাতের ঘড়িতে দেখে দুই ঘন্টা পার হয়ে যাচ্ছে। ওদের আসার কথা সন্ধ্যা সাতটায় এখন সাড়ে ছয়টা। অন্ধকার হয়ে এসেছে চারদিক। রোদসী জানে তার শুণ্যতার অনুভুতি পাবার সেই সাহস নেই। সারাটা জীবনই তো সাহসের অভাবে পিছিয়ে এসেছে সে! একবার যদি সাহস করতে পারতো সে! শুধু একবার! সে আঁচলে চোখ মুছে আবারো রেলিং এর পাশে গিয়ে দাড়ায়।

মৃদু স্বরে গায়

“আমার এ ঘর বহু যতন করে..

ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে,

আমারে যে জাগতে হবে..

কি জানি সে আসবে কবে যদি আমায়

যদি আমায় পড়ে তাহার মনে

বসন্তের এই মাতাল সমীরণে আজ

জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে।”

রোদসী দুই ঘন্টা পেরুনোর আগেই নিচে নেমে যায়।

 

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/bonolota_sen/2703.html

 31 টি মন্তব্য

(ফোনেটিক বাংলায়) মন্তব্য করুন

  1. আজাদ মাষ্টার

    দুর্দান্ত ছোটো গল্প রোদসীর পরিণতি কি হয়েছিলো তা প্রত্যেক পাঠকের কল্পনা শক্তির উপর নির্ভর করবে তবে ছোটো গল্পের শিরোনামে পর্ব ১ দেখা যাচ্ছে সিরিজ লেখা হলে কি তাকে ছোট গল্প বলা যায় ?

    1. বনলতা সেন

      এটাকে উপন্যাস ক্যাটাগরিতে ফেলেতে পারি নাই। আবার ছোট গল্পের সংজ্ঞাও পুরন করে তাই ছোট গল্পে ফেলেছি।রোদসীর বাকি দুটো পর্ব পড়লেই বুঝবেন।ধন্যবাদ পড়ার জন্যে।

  2. জটিল বাক্য

    সুন্দর গল্প।

    1. বনলতা সেন

      ধন্যবাদ ভাইজান। 

  3. অনিমেষ রহমান

    আবারো ভালোলাগা জানালাম গল্পে।চলুক গল্পগাড়ী।

    1. বনলতা সেন

      ভাল কথা বলেছেন দাদা গল্প গাড়ি!থেঙ্কু।

      1. অনিমেষ রহমান

        হা গল্পগাড়ী।আপনার গল্প অসাধারন হয়।ঝাক্কাস!!

        1. বনলতা সেন

          চলছে গাড়ি যাত্রাবাড়ি!দোয়া রাইখ্খেন।

          1. অনিমেষ রহমান

            খিক খিক!

  4. ইমরান এইচ সরকার

    ভালই তো লিখেছেন। বাকী পর্বগুলো পড়ার অপেক্ষায় রইলাম! দেখা যাক রোদসী সেন এর কি আছে কপালে :p

    1. বনলতা সেন

      পড়ার জন্যে ধন্যবাদ। ই প্রত্যয় পেয়ে আরো ভাল লাগছে।

  5. শনিবারের চিঠি

    চমৎকার উপস্থাপনা। অপেক্ষায় রইলাম পরের পর্বগুলোর জন্য।

    1. বনলতা সেন

      পড়ার জন্যে ধন্যবাদ। পরের পর্ব শীঘ্রই দেবো।

  6. অজন্তা ইলোরা

    গল্পটার মাঝে একটা আকাঙ্ক্ষা আছে। সত্যিই জানতে চাই, কি হলো রোদসী সেনের। লেখককে অনেক ধন্যবাদ।

    1. বনলতা সেন

      রোদসী যে সেন সেটা কিভাবে বুঝলেন?ধন্যবাদ পাড়ার জন্যে।

      1. মাটির মানুষ

        উনি বোধ হয় বনলতা সেনের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলছেন।

        1. বনলতা সেন

          আমি বুঝতে পেরেছি।:)

  7. প্রলয় সংহার

    গল্পের চলন ত খুব সুন্দর। যাক বনলতা সেন কেবল অন্ধকার বিদিশার মতই চুলের মালিক নন, ভাল গল্পেরও পাচক।

    1. বনলতা সেন

      ধন্যবাদ পড়ার জন্যে। 

  8. দুরন্ত..

    গল্প ভাল হইতাছে…..

    1. বনলতা সেন

      থেঙ্কু দুরা ভাই। 

  9. শিমূল

    রোদসীরে চেনা চেনা লাগে, রোদসীর জন্য চিন্তায় আছি 

    1. বনলতা সেন

      রোদসী চেনা হইলেও তারে নিয়া চিন্তার কিছু নাই শিমুল চা…ছরি ভাইয়া :D

  10. মাটির মানুষ

    খুব সুন্দর গল্প। ভাল লাগল। পরের পর্বের জন্য মুখিয়ে রইলাম।

    1. বনলতা সেন

      ধন্যবাদ মাটি ভাই।

  11. নিভৃত স্বপ্নচারী

    Normal
    0

    false
    false
    false

    EN-US
    X-NONE
    X-NONE

    MicrosoftInternetExplorer4

     ভাল লাগছে, চলুক রোদসীর গল্প…

    /* Style Definitions */
    table.MsoNormalTable
    {mso-style-name:”Table Normal”;
    mso-tstyle-rowband-size:0;
    mso-tstyle-colband-size:0;
    mso-style-noshow:yes;
    mso-style-priority:99;
    mso-style-qformat:yes;
    mso-style-parent:”";
    mso-padding-alt:0in 5.4pt 0in 5.4pt;
    mso-para-margin:0in;
    mso-para-margin-bottom:.0001pt;
    mso-pagination:widow-orphan;
    font-size:11.0pt;
    font-family:”Calibri”,”sans-serif”;
    mso-ascii-font-family:Calibri;
    mso-ascii-theme-font:minor-latin;
    mso-fareast-font-family:”Times New Roman”;
    mso-fareast-theme-font:minor-fareast;
    mso-hansi-font-family:Calibri;
    mso-hansi-theme-font:minor-latin;
    mso-bidi-font-family:Vrinda;
    mso-bidi-theme-font:minor-bidi;}

    1. বনলতা সেন

      ধন্যবাদ! পরের পর্ব শীঘ্রই দেবো।

  12. Maju

    অপেক্ষা করছি……

    1. বনলতা সেন

      যুদ্ধ শেষ হোক! তখন গল্প লিখবো! আগে দেশ পরে সব!!

  13. Shoyeb Shourov

    sen ar rodoshi ke tobe mile mise ekakar…
    valo legece bolle annai hobe,asle anek anek valo legece….
    eagerly waiting…..for

  14. Ami Shapnik

    ভালোই

মন্তব্য করুন