বি এম বেনজীর আহম্মেদ-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

বাংলা

লিখেছেন: বি এম বেনজীর আহম্মেদ

বেশ কয়েক মাস আগের একটি ঘটনা, একদিন স্টাডি রুমে বসে মনের মাধুরী মিশিয়ে ফেসবুকে কি যেন একটা স্ট্যাটাস লিখছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার পাশের চেয়ারে বসে পড়ছিল এক ইতালিয়ান রমণী। যাই হউক আমি তো লিখে যাচ্ছি মনে যা লয়।

হটাৎ আবিস্কার করলাম, মেয়েটা তার পড়া বাদ দিয়ে আমার লেখার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে ব্যাপারটা আমলে নিলাম না। কিন্তু কিছু সময় পর খেয়াল করে দেখলাম, সুন্দরী রমণী এক দৃষ্টিতে আমার ল্যাপটপ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। যা রীতিমত বিরক্তির পর্যায় পৌঁছল। কেননা ওভাবে কেউ থাকিয়ে থাকলে লেখা সম্ভব নয়। এভাবে একপর্যায় যখন বিরক্তির শেষ সীমায় পৌঁছিয়েছি ঠিক তখন মেয়েটি,

- এক্সকিউজ মি!
- ইয়েস
- তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করি?
- হ্যাঁ , কর।
- আচ্ছা, তুমি এটা লিখছ?
- ফেসবুকের স্ট্যাটাস।
- না, সেটা তো বুঝছি, কিন্তু এটা কোন ভাষায় লিখছ।
- বাংলা!
- সেটা আবার কোন দেশের ভাষা ?

(আমি বুঝলাম কোন এক কারনে বাংলা নিয়ে তার আগ্রহ চরমে উঠেছে, কেননা তার মুখের এক্সপ্রেশনে দেখতে পাচ্ছিলাম, কোন একটি বিষয়ে জানার প্রবল আগ্রহ)

- বাংলাদেশের খুশি
- ইটস অ্যান এশিয়ান কান্ট্রি রাইট?
- ইয়েস ম্যাম। খুশি
- আমি জানিনা তুমি কি লিখছ, কিন্তু দেখতে এতটাই ভাল লাগছে যে অনেক্ষন ধরে নিজের পড়া বাদ দিয়ে তোমার এই বাংলা লেখা দেখছিলাম। অসাধারণ আউটলুক। বিশ্বাস কর, এতটাই ভাল লাগছে যে মনে হয় মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে দেখি, না বুঝলেও সমস্যা নাই। এতো সুন্দর ভাষা আমি আজ পর্যন্ত দেখিনাই। তুমি অনেক লাকি, এতো সুন্দর দেখতে একটি ভাষা মাতৃভাষা হিসাবে পেয়েছ। খুশি

(খুব মুগ্ধতার সাথে তার কথা গুলো শুনলাম, এক পর্যায় ভাবলাম, মেয়ের যেহেতু এতো আগ্রহ ওকে কিছু জানানো প্রয়োজন, বাংলা বিষয়ক! )

- বাংলা ভাষার প্রতি তোমার এই ভাল কিছু কথা আমাকে রীতিমত মুগ্ধ করেছে। তাই তোমার যদি কিছু সময় থাকে তাহলে আমি তোমাকে কিছু দেখাতে চাচ্ছি। খুশি
- (খুব আগ্রহের সাথে, সুন্দর একটি হাসি দিয়ে) শিউর প্লীজ খুশি
- তুমি হয়ত জেনে চমকিত হবে যে, সমগ্র পৃথিবীর ভিতর বাংলায় একমাত্র ভাষা যে ভাষাকে অর্জন করতে রক্ত দিতে হয়েছিল বাংলাদেশীদের।
- মানে?? আমি বিস্তারিত শুনতে চাই, প্লীজ।

- এই ভাষার অনেক সমৃদ্ধ একটা ইতিহাস আছে। সেই ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশেরা ভারত উপমহাদেশকে কে দুই ভাগে ভাগ করে। একটি ভারত, অপরটি পাকিস্তান। সমস্যা যেখানে হয় সেটা, বাংলাদেশ নিয়ে। ব্রিটিশরা বাংলাদেশ কে ফরমালি আলাদা না করে পাকিস্তানের অংশ হিসাবে রেখে চলে যাই। শুরু হয় নতুন ঝামেলা। কেননা বাংলাদেশিরা কথা বলত বাংলায়, অপরদিকে পাকিস্তানিরা বলত উর্দুতে। যতটুকু মনে পড়ে ১৯৪৮ সালের ২১শে মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মাদ আলি জিন্নাহ ঘোষণা দেয়, “উর্দুই হবে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র ভাষা!!” বাংলাদেশী মানুষ সেটা মেনে নেয়নি। শুরু হয় আন্দোলন, যাকে বলে ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলন চলতে থাকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত। অবশেষে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট সহ সাধারন মানুষেরা রাস্তায় নেমে আসে বাংলা ভাষার অধিকার দাবিতে। কিন্তু ওই মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়, শহীদ হন রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার নামের ভাষা সৈনিকেরা। এই শহীদদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলাকে অর্জন করি। ঠিক তখন থেকে প্রতি বছরের ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আমরা বাংলাদেশীরা মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করে আসছি। এই স্মৃতিচারণের জন্য আমাদের দেশে এটি মনুমেন্ট আছে, যার নাম “শহীদ মিনার”, ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত এই দিবসটি শুধুই আমাদের ছিল। কিন্তু ১৯৯৯ সালের ১৭ ই জানুয়ারি ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করেন। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটা আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবেই পালন করা হয়।

- ওয়াও !! সত্যিই অসাধারণ। ভাষার জন্য কেউ জীবন দিতে পারে এটা স্বপ্নেও কখনও আসেনি। তবে হ্যাঁ এতো সুন্দর দেখতে যে ভাষাটি তার জন্য ভালোবেসে হাসিমুখে জীবন দেয়া যায় !!

(আমি রীতিমত অবাক হয়ে গেলাম তার কথা বলার সময়ে এক্সপ্রেশন দেখে, আমি নিজেও এটা স্বপ্নে ভাবিনাই, কোন ভিনদেশী এক ললনা, যে এই বাংলার কিছুই বঝেনা শুধুমাত্র লেখনী দেখেই এইভাবেই ভালবাসতে পারে !!)

- (আমি মৃদু একটা হাসি দিয়ে) তুমি জেনে আরও খুশি হবে যে, ২০১০ সালে ইউনেস্কো বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।
- যে দেখতে এতো সুন্দর, তাকে শুনতে কতটা মিষ্টি লাগবে সেটা না শুনলেও উপলব্ধি করতে পারছি। খুশি

এরপর মেয়েটাকে কয়েকটি আর্টিকেল দিলাম, ২১ শে ফেব্রুয়ারির উপর করা কয়েকটি ভিডিও ডকুমেন্টারি দিলাম, শহীদ মিনারের ছবি দেখালাম, এই দিবসকে আমারা কিভাবে পালন করি সেটার কয়েকটি ডকুমেন্টারি দেখালাম। তবে আমাদের ২১ শের অমর সেই প্রভাত ফেরী গানটি শুনে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে পরপর তিনবার শুনেছিল।

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি !
 ”

আজব করা বিষয় ছিল এটাই, আমি জানি মেয়েটা কিছুই বুজছেনা। তারপরও হেডফোন দিয়ে যখন সে গানটি শুনছিল সুরের প্রতি তার সেই মুগ্ধতা আমার ভিতর অন্য রকম এক ভালোবাসার জন্ম দিয়েছিল।

আমার কাছ থেকে ওই ডাটাগুলো নিয়ে সে তার ল্যাপটপে একটা নতুন ফোল্ডার বানাল। নাম দিলTI AMO BANGLA যার অর্থ ছিল, বাংলা তোমাকে ভালোবাসি“ খুশি

এরপর থেকে সেই মেয়েটার সাথে আমার আর কখনও দেখা হয়নি। এমনকি আমি আজও তার নামটি জানিনা।

হয়ত কোন এক অজানা দিনের সুন্দর একটি সন্ধ্যায় পিছন থেকে কেউ ডেকে বাংলায় বলবে, “কেমন আছো? দেখেছো আমি সুন্দর বাংলা বলতে পারি। ও ভাল কথা তোমার নামটা যে কি সেটাই জানা হয়নি। তাই অচেনা অজানা সেই তোমার নাম দিয়েছিলাম “বাংলা” খুশি ”

ক্ষণিকের অপ্রত্যাশিত মুগ্ধতার আবাশে আবদ্ধ এই আমি ঠোঁটের কোণায় মৃদু সেই হাসি দিয়ে হয়ত বলবো “ভাল আছি প্রিয়তমা” খুশি

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/bm_banjir/28189.html



মন্তব্য করুন