বি এম বেনজীর আহম্মেদ-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

“মেইড ইন বাংলাদেশ”, কোটি মানুষের মুখের হাসি!!!!!

লিখেছেন: বি এম বেনজীর আহম্মেদ

 

আমি যদি কাউকে জিজ্ঞাসা করি যে, ভাই আপনি কি জানেন GAP, JOE, H&M, OVS, TOMMY HILFIGER, MARLBORO, LACOSTE এইগুলা কিসের নাম?  কোন সন্ধেহ নাই যে উত্তরকরতা প্রকাশে না হলেও মনে মনে ঠিকই বলবে এ তো আস্ত আবাল, তা নাহলে এই প্রশ্ন কেউ আজকাল জিগাই!! পিচ্চি পলাপাইন থেকে শুরু করে এক পা কবরে যাওয়া বুইরা রাও কইতে পারবে এই গুলা বিশ্ব মানের গার্মেন্টস কোম্পানি।

SAM_0899 images

যাই হোক এটা প্রমানের জন্য আমি কাউকে জিজ্ঞাসা করছি না যে এইগুলার নাম কেউ জানে কিনা, আমি আপনি সবাই মোটামুটি পরিচিত এই নামগুলার সাথে। এখন একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি,

 

এই বড় বড় গার্মেন্টস কোম্পানি গুলার প্রোডাকশন হয় এই বাংলাদেশ থেকে। বিদেশের মাটিতে এসে যখন মাঝে মাঝে বড় বড় গার্মেন্টস আউট লেট গুলাই ঢু মারি, কোন একটা প্রডাকট পছন্দ হলে আগে দেখি প্রোডাকশন টা কোন দেশের, সৌভাগ্য বসত অধিকাংশই পেয়ে যাই “MADE IN BANGLADESH” কি বলব নিজের ভিতর থেকে একটা অন্য রকম আনন্দ অনুভব করি, আর সেই বাংলাদেশী হয়ে নিজেকে গর্বিত মনে হয়। সে এক অন্য রকম ভালোলাগা ঠিক বলে বা লিখে বোঝানো সম্ভব নই।

এখন আমি এই  “MADE IN BANGLADESH” ৩ টা শব্দ নিয়ে কিছু বলব।

প্রসঙ্গত প্রথমেই চলে আসে কেন বাংলাদেশ!! কারণ বাংলাদেশই দিতে পারে পৃথিবীর সব থেকে দক্ষ গার্মেন্টস কর্মী, যারা এত বেশী দক্ষ হওয়া সত্তেও বেতন চাহিদা খুবই কম। আর সাথে সাথে শুরু হয়ে গেল বড় বড় কোম্পানি গুলোর বাংলাদেশে প্রবেশ। ব্যবসার সুবিধার্থে এই সব বড় বড় কোম্পানি গুলা আমাদের দেশ থেকে সুবিধা নিচ্ছে, পক্ষান্তরে আমরা অর্থনৈতিক ভাবে শক্তিশালী হচ্ছি, আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছে মুলত এই গার্মেন্টস শিল্প। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল কোন ধরনের অর্থনৈতিক মুক্তি আমরা পেয়েছি?

সাভারে ঘটে যাওয়া ট্রাজেডি আমাদের উপহার দিয়েছে প্রায় ১২০০ রক্ত মাংসে গড়া মানুষের লাশ, যারা কিনা ছিল ঠিক ১২০০ শক্তি যা প্রত্যক্ষ ভাবে আমাদের এই অর্থনৈতিক মুক্তির দাবীদার। চোখের পলকে ১২০০ শক্তি আমাদের এই সম্ভাবনাময় শিল্প থেকে চিরতরে বিদায় নিল। সত্যিই কি এই আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি! এই ১২০০ মানুষের সাথে প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত ১২০০ অথবা তার ও অধিক পরিবার। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি এই ১২০০ পরিবার কে একেবারে পথে বসিয়ে দিল। এক নিমেষে নিঃশেষ করে দিল তাদের বিক্ষিপ্ত ছোট ছোট স্বপ্ন যা তাদের বেঁচে থাকতে অনুপ্রানিত করতো।

কয়েকদিন আগে ফেসবুক এর এক পেজ থেকে দেখলাম এক BGMEA নেতা সকলের প্রতি বিনিত আবেদন জানিয়ে বলেছেন, “দয়াকরে আপনারা এই সাভার ইস্যু নিয়ে একটু কম কথা বলেন, এতে করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে” এই বড় নেতা যে কি বলছে সে এটা নিজেই জানেনা। এরা অসুস্থ!!! কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ এই ধরনের উক্তি করতে পারে বলে আমার মনে হয় না।

২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের দেশে বর্তমানে ৪০ লক্ষ শ্রমিক গার্মেন্টস শিল্পের জন্য কাজ করছে। আমাদের সবথেকে বড় সমস্যা হল তাদের এই সংখ্যা নিয়ে আমরা বরাবরি কথা বলি, এমনকি আমরা এইটা নিয়ে গর্ব বোধ ও করি কিন্তু যাদের সংখ্যা নিয়ে এত কিছু সেই মানুষগুলো কে নিয়ে আমরা কখনও কথা বলিনা। কিন্তু কেন মনুষ্য জাতির এই অধঃপতন? আমরা থকে প্রত্যেকটা মিডিয়া আজ ছুটছে কে হল BGMEA এর প্রেসিডেন্ট!!

 

আবার সাভার প্রসঙ্গে ফেরা যাক, বড় বড় আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা যেমন BBC, CNN, THE NEWYORK TIMES, AL JAZEERA বিগত ২০ দিন ধরে তাদের প্রথম পাতায় স্থান দিয়েছে “Bangladesh Savar Tragedy” নিয়মিত আপডেট এই খবরের। কিন্তু আমি এই ব্যাপার টাকে একটু অন্য ভাবে দেখি। আমার প্রশ্ন হল তারা কেন এই খবর নিয়মিত প্রেস করছে? আমার কাছে একটায় উত্তর, কারণ বাংলাদেশ গরিব একটা দেশ যে দেশের অর্থনৈতিক প্রবিদ্ধি মানবতাকে পায়ের নিচে দিয়ে পিষছে!!  সুতরাং এই নিয়মিত খবর প্রচারনায় আমি গর্বিত হওয়ার কিছুই দেখি নাই, বরং আমি বাংলাদেশী হয়ে লজ্জিত।

বই এ পড়েছি “মানুষ তার প্রয়োজনে সিস্টেম বানায়, সিস্টেম মানুষ বানায় নাহ” কিন্তু বাস্তবতা বলে উলটা কথা। আমরা আজ সিস্টেমের কবলে বাফাদার কুকুর হয়ে গেছি, সিস্টেম যেটা আমাদের শেখায় আমরা সেটায় করি, ভুল বা সঠিক হিসাব করি না , নিজেদের প্রয়োজনে সিস্টেম কে নতুন করে সাজাতে পারিনা। যাই হোক এটা কল্পনায় ভাল মানাই বাস্তবে নই।

যতই এইগুলো বইয়ের ভাষা হোক না কেন মানবতাকে অস্বীকার আমরা করতে পারিনা। কতিপয় কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের সৃষ্ট এই সিস্টেম তৈরি করেছে পুঁজিবাদ। যা প্রতিনিয়ত মানবতাকে আঙ্গুলি দেখিয়ে চলেছে। যাই হোক এত বড় ভাবে বিশ্লেষণ করলে হয়ত কেউ বুজতে পারবেনা, আমরা ব্যাপারটা একটু ছোট পরিসরে চিন্তা করতে পারি। যেমন সেই ৪০ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিক এর কথায় চিন্তা করা যাক। তাদের এই অল্কান্ত পরিশ্রম, দক্ষতা সৃষ্টি করে চলেছে বিলিয়ন বিলিয়ন অর্থ!!!! কিন্তু আমার প্রশ্ন হল এই সৃষ্ট অর্থ গুলো যাচ্ছে কোথায়??? ৩ টা শ্রেণী এই অর্থ বাজেয়াপ্ত করে চলেছে, প্রথম হল উপরে উল্লেখিত ওই আন্তর্জাতিক ব্রান্ড গুলো, দ্বিতীয়ত আমাদের দেশের গার্মেন্টস মালিক ও উপরের শ্রেণীর কর্মকর্তারা এবং তৃতীয় হল আমাদের দেশের সরকার।

আমি এই তিনটা শ্রেণীকেই উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলতে চাই,

আমাদের এই ৪০ লক্ষ শ্রমিকরা কিন্তু দরিদ্র, তারা দারিদ্রের সীমার নিচে জীবন ধারন করে চলেছে প্রতিনিয়ত। খুবই সামান্য অর্থ মজুরি নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে গার্মেন্টস শিল্পকে বাচিয়ে রাখতে। তারা জানে, যদি তারা ঠিক মতো কাজ না করে তাহলে এই গার্মেন্টস শিল্প বাচবেনা, তারাও তাদের কাজ হারাবে, কোন রকম খেয়ে  না খেয়ে দিন কাটাইতে হবে। ভয় পাই তারা ওই বীভৎস জীবন কে। তাইতো শরীরের রক্ত পানি করে তারা কাজ করে যাচ্ছে একটু ভাল থাকার আশায়। তাদের এই ত্যাগের বিনিময়ে তোমরা গড়ে তুলেছ পুঁজিবাদ। তারা কিন্তু তাদের পারিশ্রমিক হিসাবে লক্ষ লক্ষ টাকা দাবি করে না। তারা কোন রকম দুবেলা দুমুঠো ভাল খেতে পারার মত উপার্জনেই খুশি এবং পাশাপাশি তারা একটু নিরাপত্তা চাই। আমি বেতন বৃদ্ধির কথা না হয় বাদই দিলাম,   আমি তাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে কথা বলছি। দয়াকরে তাদের এই নিরাপত্তার ব্যাপার টা আপনারা মাথায় আনেন।

কথায় আছে চোরে শোনেনা ধর্মের কাহিনী, সুতরাং আপনারা আপনাদের মতই ব্যাপারটা ভেবে দেখুন যে (BGMEA এবং বাংলাদেশ সরকার) ব্রান্ডের কথা চিন্তা করা বাদ দেন, চিন্তা করুন এই ৪০ লক্ষ শ্রমিক দের নিরাপত্তার কথা। ব্রান্ড হল ধূর্ত শিয়াল, তারা জানে আমাদের শ্রমিক এর মূল্য। সুতরাং যত যাই হোক না কেন তারা এই দেশেই আসবে তাদের প্রোডাকশন এর জন্য। কিন্তু এইভাবে যদি হাজার হাজার শ্রমিক নিরাপত্তার কারনে মৃত্যু বরন করে তাহলে এমন ও তো একদিন আস্তে পারে যে দিন এই শ্রমিক গুলো সামান্য কিছু টাকার থেকে ও নিজেদের জীবনকে বেশী মূল্য দিবে, হয়ত সেদিন তারা বিদায় নিবে এই সুপ্রতিষ্ঠিত গার্মেন্টস শিল্প থেকে। সেই দিনের আর বেশী দেরি নেই। কি করবেন সেইদিন আপনারা????? কাদের নিয়ে এই গড়ে ওঠা কারখানা চালাবেন!!!! নিশ্চয় ওই ব্রান্ড এসে এইগুলো চালাবেনা, সেদিন তাদের টিকি টাও খুজে পাবেন্না এই দেশে। সুতরাং নিজেদের পায়ে আর নিজেরা কুড়াল মেরনা। একটু সময় করে নিজের কথা ভাব, নিজের মানুষ গুলোর কথা ভাব। বেশী কিছু দাবি ওরা করে না, ভাল একটা নিরাপত্তা বেষ্টনী তাদের দাবি, যেখানে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবে, মুখে থাকবে সেই দুর্লভ হাসি, যে হাসিমুখ তোমাদের উন্নয়নের মুল চাবিকাঠি!!!!!!!!!!!!!!!!

এই “MADE IN BANGLADESH” ট্যাগ টাই আর রক্ত দেখতে চাই না।

97993808-made-bangladesh

 

লক্ষ লক্ষ মুখের হাসির বিনিময়ে অর্জিত এই ৩ টি শব্দ, যা আমাদের জাতিগত ভাবে বয়ে এনেছে অনেক সম্মান। আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আজ আমরা World Most Emerging Country। এত দরিদ্র একটি দেশের মানুষের এত সুখ, সামাজিক মূল্যবোধ কোথা থেকে আসে এই ব্যাপারটা নিয়েই আজ অনেক বড় বড় গবেষক গবেষণা শুরু করেছে। হয়ত এমন দিনের বেশী দেরি নাই যেদিন বাংলাদেশের মানুষ হবে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে সুখি মানুষের আদর্শ, যার সবটুকুই নির্ভর করছে আপনাদের কিছু দায়িত্বের উপর।

তখনি আমাদের এই  গর্ব “MADE IN BANGLADESH” ব্লাড ডায়মন্ড না হয়ে, হবে “MADE IN BANGLADESH WHICH MAKES BILLIONS OF SMILE”

 

 

 

 

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/bm_banjir/13235.html

 2 টি মন্তব্য

  1. আজাদ মাষ্টার

     লেখা পড়ে ভালো লেগেছে ।

    1. বি এম বেনজীর আহম্মেদ

      এই অনুপ্রেরনার উৎস ভাইয়া আপনারাই, দোয়া করবেন আমার জন্য :)

মন্তব্য করুন