AZAD-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

খোলা বাতায়ন

লিখেছেন: AZAD

জবানবন্দি

ধর্মাবতার,

আজ আমি ছিনতাই , লুট, ডাকাতি , হত্যা মামলার আসামী। আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলি আমি স্বীকার করে নিচ্ছি। হেন অপরাধ নেই যা আমি করিনি। দুর্ধর্ষ ডাকাতি আর রোমহর্ষক হত্যাকান্ডে আমি নিজেই নেতৃত্ব দিয়েছি। আমি স্বেচ্ছায় , সজ্ঞানে এই অপরাধ সমূহের সাথে যুক্ত হয়েছি। ধর্মাবতার, কেমন করে,কিভাবে এই অপরাধ রাজ্যে আমি প্রবেশ করলাম তা এই আদালতে সকলের উপস্থিতিতে আপনার সামনে জবানবন্দি প্রদান করছি-

আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমি কৈশোরে। দুই ছেলে আর এর মেয়েকে নিয়ে আমার বিধবা মা তখন যেন অথই সাগরে পড়েন। বাবা এমন কিছুই রেখে যায়নি যা আমার মা আমাদের মানুষ করতে অবলম্বন করতে পারে। শুরু হয় কঠিন জীবন সংগ্রাম। মা এবাড়ি ওবাড়ি কাজ করে যা পায় তাই দিয়ে চলতে থাকে আমাদের দিনের পর দিন। বড়ভাই এর ওর এটা ওটা ফুট ফরমাশ  খেটে তার নিজের মত চলতে থাকে। অসৎসঙ্গে মিশে মদ,জুয়া, গাজা, অসৎ নারীসঙ্গ লাভ ইত্যকার অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে সে।  তাকে বাঁধা দেয়ার জন্য আমার মায়ের পাশে কেউ এগিয়ে আসেনি। মাকে দেখেছি নীরবে চোখের জল ফেলতে। যদি এসব নিয়ে মা কখনো তাকে কিছু বলতে যেত, অমনি মায়ের উপর একচোট নিয়ে নিত। এমনকি মাঝে মধ্যে মায়ের গায়ে হাত তুলতো সে। এদিকে দেখতে দেখতে ছোট বোনটি বড় হতে থাকে। পড়ানোর অযুহাতে এক ভদ্রবেশী শয়তানের চোখ পড়ে বোনটির উপর। ভদ্রলোকের বউ বাচ্চা থাকা অবস্থায়ও আমার বোনের দিকে তার লোভাতুর হাত এগুতে থাকে। তার মিষ্টি কথা আর আশ্বাসে আমার সরলমতি বোন ও অসহায় সহজ-সরল মা তার উপর প্রচন্ড নির্ভর করে বসে। এসব দেখে শুনে বড়ই কষ্ট পাই , নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। আমি পালিয়ে বরিশাল চলে আসি ।

পথে পথে ঘুরি। পেটে প্রচন্ড ক্ষুধার জ্বালা । কোথাও কোন কাজ পাইনা। লঞ্চঘাটে কুলির কাজ করেছি কয়েকদিন। ঘাটের কুলিরা কোন কাজ ধরতে দেয়না। তারপর অনেক অনুনয়-বিনয় করে এক হোটেলে বয় এর কাজ পাই পেটে ভাতে। দক্ষিনাঞ্চলে তখন নিষিদ্ধ ঘোষিত সর্বহারাদের দারুণ উত্থান। হোটেল বয় এর কাজ করতে করতে পরিচয় ঘটে এক সর্বহারা নেতার সাথে। তার আহবানে আমি জড়িয়ে যাই দলের সাথে।কাজ শিখতে থাকি। আমি তখন ২০/২২ বছরের যুবক। ছোটখাটো দুয়েকটি অপারেশনে আমার  কৃতিত্ব দলের ভেতর আমাকে আস্থা ও মজবুত অবস্থানে নিয়ে যায়। আমাকে একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেয়া হয়। চার/ পাঁচটি অপারেশন সফল হওয়ার পর আমাকে ঢাকা- বরিশাল চলাচল বড় বড় লঞ্চে ডাকাতির দায়িত্ব দেয়া হয়।

দিনক্ষণ ও অপারেশন ছক আগে থেকেই ঠিক করা ছিলো, আমি যাত্রীবেশে দলবল সহ লঞ্চেই ছিলাম।  জায়গামত দলবল সহ যাত্রীদের উপর ঝাপিয়ে পড়ি, তার আগে লঞ্চে গার্ডে থাকা আনসারদের নিরস্ত্র করে বেঁধে রাখা হয়। ডাকাতি শেষে নিরাপদে আমরা পথেই নেমে পড়ি। আমার নেতৃতে জীবনের প্রথম লঞ্চ ডাকাতি সফল হয়। আমার সাহস দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ফলাও করে এই ডাকাতির খবর খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে বছরে তিন/ চারটি লঞ্চ ডাকাতি আমার  নেতৃতে হত।

ইতিমধ্যে দলের মধ্যে আমার অবস্থান বেশ পাকা-পোক্ত হয়ে ওঠে । আঞ্চলিক প্রধানের প্রত্যক্ষ আনুকূল্য লাভ করি। তিনি আমার বিয়ের ব্যবস্থা পর্যন্ত করে দেন। আমি শ্বশুরবাড়িতে থাকতে শুরু করি। ইত্যবসরে আমি রং এর কাজ শিখে নিয়েছি। এই সময়ে আমার অপারেশনের ধরণটাও পালটে ফেলি। কারণ তখন পুলিশি তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। বড়বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিত্তশালীদের বাড়িতে রং এর কাজ জোগাড় করি। অত্যন্ত যত্নের সাথে আমি কাজ করি এবং তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করি। এসবের ফাঁকে আমি জেনে নেই আসল তথ্য। তারপর সুযোগ বুঝে দলবল নিয়ে হানা দেই তাদের উপর আর ছিনিয়ে আনি সবকিছু।

এদিকে আমার প্রথম সন্তান ছেলে দেখতে দেখতে বড় হতে থাকে। তাকে স্কুলে ভর্তি করা হয়। হঠাত সে অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। বড় অসুখ ধরা পড়ে। ছেলেটিকে বাঁচানোর জন্য আমি সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত  ছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি। ধর্মাবতার, ছেলেটির মৃত্যুর পর আমি মূষরে পড়ি। আমার   পাষাণ হৃদয় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যায়। পাপের পথ থেকে সরে আসতে চাই। নামাজ পড়া শুরু করি। ধর্ম কর্ম নিয়ে মসগুল থাকি । এলাকার লোকজন মহল্লার  মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি বানিয়ে দেয়। আমি বিবেকের কাছে অপরাধী হয়ে থাকি।

ধর্মাবতার, দলের পক্ষ থেকে কড়া নির্দেশ আসে দলে সক্রিয় হতে। আমার কোন অনুনয় বিনয় কোনই কাজে আসেনি দলের কাছে। বাধ্য হয়ে দলে আবার সক্রিয় হই। আমার জীবনের সবচেয়ে নির্মম- মর্মান্তিক অপারেশন করি এই সময়ে।না করে উপায় ছিলো না।  হাই কমান্ডের নির্দেশ অমান্য করা হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড তুল্য অপরাধ। দলবল নিয়ে মসজিদে নামাজরত মুসুল্লিদের উপর নির্বিচারে গুলি চালাই। এই পাপ আমাকে তাড়িত করে। সেই রাত্রে আমার এলাকার মসজিদের পুকুরে অজু করে বাকি রাত নামাজ পড়ে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে কান্নাকাটি করে পার করে দেই। এই ঘটনা দেশের তথা বিশ্ব মানবতাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলো ধর্মাবতার।

আমার জীবনের শেষ অপারেশনটি করি শহরে। থানার সন্নিকটে। এক বড় ব্যবসায়ী। ভদ্রলোকের বেশ সুনাম। খবর পেয়েছি সেদিন প্রচুর নগদ টাকা থাকবে তাঁর কাছে। রমযান মাস, তারাবির নামাজ চলছে। রাস্তা-ঘাট ফাঁকা । দলবল সহ হাজির হয়ে টাকা কড়ি সব দিয়ে দিতে বললাম। তিনি কোন পাত্তাই দিলেন না। একশনে যেতে হল, চাইনিজ কুড়ালের আঘাতে তাঁর দুই হাত ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। আমরা প্রচুর নগদ টাকা হাতিয়ে বোমা ফাটিয়ে নির্বিঘ্নে চলে আসি। পরে শুনেছি ভদ্রলোকের একটি হাত কেটে ফেলতে হয়েছে।

ধর্মাবতার, আমার অপরাধের বর্ননা সংক্ষিপ্তভাবে আপনার নিকট বয়ান করলাম। আমি জানি এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন অধিকার আমার নেই। সে ইচ্ছেও আমার নেই। আমার ছোট্ট একটি অনুরোধ,আমাদের যারা  এপথে আসতে প্রলুব্ধ করে, বাধ্য করে তারা কিন্তু সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। তাঁরা হচ্ছে গডফাদার। এরা হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র। এদেশ,এসমাজ তখনই সন্ত্রাসমুক্ত , অপরাধমুক্ত হবে ধর্মাবতার যখন এই গুটিকতক রাঘব বোয়াল ধরা পড়বে। সেটা কি খুব কঠিন কাজ ধর্মাবতার ???

২০,০১,৯৮

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/azad/19911.html



মন্তব্য করুন