আতিকুর রহমান আতিক-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

এই শরতে রৌমারীঃ শেষ পর্ব

লিখেছেন: আতিকুর রহমান আতিক

অনেক প্রতীক্ষার পর এলাম রৌমারী ঘাটে। ওখানে নেমে পায়ে হেঁটে চললাম রিকশাস্ট্যান্ডে। রতন বলল, যাবেন কোথায়? উঠবেন কোথায়? বললাম, জাপলিন নামে একজন ঘনিষ্ঠ ছোট ভাই আছে, ওর ওখানে।
রতন বলল— সে কী রাজনীতি করে? নূরুল ইসলাম পাপু মিয়ার ছেলে? হ্যাঁ বলতেই রতন—সে তো আমার চাচাতো ভাই। চলুন চলুন, বাড়িতে চলুন…। রিকশায় উঠে ছোট শহর রৌমারী দেখে দেখে এলাম জাপলিনদের বাড়ির দরজায়।
এর আগেও দু’বার এসেছিলাম, তখন তো নূরুল ইসলাম পাপু মিয়া বেঁচে ছিলেন। আজ তিনি নেই…। ইস্ পৃথিবীটা কী ক্ষণিকের!! রিকশা থেকে নেমে আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে এলাম জাপলিনদের বাড়ির দরজায়।
‘ও’ আমাকে দেখে তো অবাক। থাকার ব্যবস্থা করল বৈঠকখানায়। জাপলিন বলল, রতন, তুই ওই বিছানায় থাকবি, উনি ওটাতে থাকবেন।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে খানিক বিশ্রাম নিলাম। সূর্য পশ্চিমে হেলিয়ে পড়তেই রতন বলল, চলুন শরৎ দেখবেন। শৌলমারির দিকে যাবেন। এই যে রতন, এদিকে নামের শেষে মারি কেন? একটু হেসে—রৌমারীতে প্রচুর রুই মাছ ধরা পড়ত বলে এই এলাকার নাম হয়েছে রৌমারী।
রৌমারীর আশপাশের এলাকা, যেমন—বোয়ালমারীতে আস্ত বোয়াল মাছ, শৌলমারিতে শৌল মাছ, বাউশমারিতে বাউশ মাছ, বালিয়ামারিতে বালিয়া মাছ পাওয়া যেত বলেই এসব এলাকার নামকরণ মাছের নামানুসারে।
একটু এগিয়ে দেখি চারদিকে পানি। এদিকে বিলাঞ্চল, ওদিকেও বিলাঞ্চল। রতন বলল, ওই যে বটগাছটা দেখছেন ওখানে গিয়ে বসি। দিনের বেলা প্রেমিক-প্রেমিকারা ওখানে বসে কত যে স্বপ্ন দেখে ঘর বাঁধার।
বললাম, এই রতন তুমি প্রেম-ট্রেম কর না? ‘আরে দাদা কী যে বলেন, বয়স সবে মাত্র সতেরো চলছে। এ বয়সে কেউ কী আর প্রেম করে? তবে আমাদের রৌমারীতে বাল্যবিবাহ অহরহ ঘটছে।’
বটতলায় খানিক সময় কাটিয়ে এবার চললাম রাস্তার দিকে। দেখি লোকজনের ভিড়। সাপের খেলা দেখাচ্ছে বেদেনীরা।
বড় বড় সাপ দেখে তো অবাক। খানিক সময় কাটিয়ে রাস্তা ধরে পায়ে হেঁটে চললাম দু’জনে। যেদিকে তাকাই দেখি—যা কিছু আছে তা যেন এক দ্বীপের মতো। দূরে কত নাম না জানা গাছ। আরও দূরে ছোট্ট এক কুটির। আরেক দিকে দেখি কাশবন। রতন বলল, ‘চলুন ঐ যে কাশবনে কাশফুল ফুটেছে। শরতের প্রতিচ্ছবিইতো ‘কাশবন’ আর সাদা মেঘের ভেলা।
সাদা মেঘের ভেলা সে তো আকাশে, তাতো স্পর্শ করা যায় না! তবে কাশফুল স্পর্শ করা যায়। বারে বারে কাশফুল স্পর্শ করে রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম।
এবার রতন বলল, ওই যে কুটির দেখছেন ওখানে চলুন। কিছু সময় পার করি। একটি সুপারি গাছের সাঁকো পেরিয়ে এলাম এক কুটিরে। রতনকে ওখানের সবাই চেনে। আমাদের দেখে ওই বাড়ির গৃহিণী বলল, পায়েস খাবেন বসুন। পিঁড়িতে বসলাম দু’জনে। একটু পরে এলো পায়েস।
গৃহিণী বললেন, রতন তোর বন্ধু কৃষ্ণ একটু পরেই আসবে…। কথাটা শেষ না হতেই দেখি সতেরো বছর বয়সী এক ছেলে এসে উপস্থিত। রতন বলল, উনি আমার দাদা। কৃষ্ণ, দাদা- কিন্তু শরতের রূপ দেখবে বলে রৌমারীতে এসেছে।মনে হলো, শরৎ দেখা যে আমার সফল হলো। ততক্ষণে রাত আটটা বেজে গেছে। শরতের রাতে রৌমারীর গাঁয়ের পথ ধরে চললাম, সঙ্গে কৃষ্ণও আছে। দেখি, দূরে দূরে কারা যেন আলো জ্বেলে আছে।
ওদিকে আকাশে মেঘের গর্জন শুনতে পাচ্ছি। মেঘে ঢেকে আছে চাঁদটা…। তাই চারদিক অন্ধকার মনে হলো। ঘোর অন্ধকারে আমরা পথ চলছি। ওরা দু’জনে বলল, দ্রুত চলুন। বৃষ্টি আসবে ধেয়ে। বললাম, শরতের রাত দেখে দেখে আঁখি না ফেরে।
জাপলিনের বাড়ির দুয়ারে পৌঁছতেই শুরু হলো মুষল ধারায় বৃষ্টি। রতন বলল, কৃষ্ণ খেয়ে-দেয়ে ঘুমা। সকালে আসব…। শরতের সেই রাতে ঘুমিয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না।
খুব ভোরে উঠে দেখি চারদিকে জল থৈ থৈ করছে। কৃষ্ণ বলল, দাদা আমাকে এখনই যেতে হবে—দুয়ারে বসে বসে দেখে নিন শরতের রূপ। সন্ধ্যার ক্ষণে না হয় আসব।
রৌমারী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য: রাত যাপন করার জন্য রৌমারীতে উপজেলা পরিষদের ডাকবাংলো ছাড়াও বিভিন্ন সরকারি দফতরের গেস্ট হাউস রয়েছে। এখানে দেখবেন বিলাঞ্চল আর ফসলের ক্ষেত।
এক সময় রৌমারী ব্রহ্মপুত্র নদীগর্ভে ছিল। পরবর্তী সময়ে আস্তে আস্তে এখানে চর জেগে ওঠে। আর এভাবেই রৌমারীর পত্তন ঘটে। এখানের সীমান্তে দাঁড়িয়ে ওপারের পাহাড় চূড়ায় দেখা মেলে এক মন্দির।
একদা নৌপথে রৌমারীর দাঁতভাঙা ও শৌলমারির সঙ্গে আসামের ধুবড়ি, গোয়ালপাড়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। আজ আর তা নেই। কয়েক বছর আগে চিলমারি হয়ে নদীপথে রৌমারী যাওয়ার একমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল।
সময়ে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। এখন ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি রৌমারীর বাস যায় শেরপুর হয়ে। সময় লাগে আট ঘণ্টা। রৌমারী ভ্রমণে হাজার তিনেক টাকা নিয়ে গেলেই চলবে।
ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ছাড়ে রৌমারীগামী বাস যেমন—সিয়াম ও রিফাত।

তথ্যসূত্রঃ
Bangla News 24.Com

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/ar-atique/22157.html



মন্তব্য করুন