অনিক-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

বাংলাদেশের জয় এবং কিছু কথা

লিখেছেন: অনিক

প্রথমেই বলে রাখি, সাকিব-তামিম-মুশফিক-রিয়াদ-মাশরাফির এই বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা টিম। এই টিমকে ঘিরে আমাদের অনেক ভালবাসা, অনেক আশা। আর হয়তো তাই এদেশের মানুষ, এদের যেমন গর্ব করে মাথায় তুলে রাখে, ঠিক তেমনি ছুড়ে ফেলে গালি দিতেও পিছপা হই না কখনো। লাল-সবুজের এই বিজয়ের দিনে মিছিল, মিষ্টি বিনিময়, গলা ফাটানো সব শেষ। তবে এখনো আনন্দের রেষ কাটেনি। একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন, একমাত্র এই ক্রিকেটের কারণেই আমরা সবভুলে আনন্দে মেতে উঠি।
দেখি বলুন তো, বাংলাদেশ টিমে সবচেয়ে সমলোচিত খেলোয়াড় কে?
১) তামিম ইকবাল
২) মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ
আর এই বিশ্বকাপে আমরা ‘সমলোচিত’ তামিমের ব্যাটে চড়ে স্কটল্যান্ডকে হারিয়েছি, রিয়াদের ব্যাটে চড়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছি। – ‘Point should be noted’
তামিমের ইকবাল খানঃ
তামিম ইকবাল খান, বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা ওপেনারের নাম।বাংলাদেশের হয়ে ৪০০০+ রান করা ক্লাবের দ্বিতীয় সদস্য তিনি। ৪০০০+ রান কখনো আকাশ থেকে উড়ে আসে না। তার সবচেয়ে বড় অপরাধ সে আকরাম খানের ভাতিজা। আমি মানছি, এইদিক হতে সে একটু সাপোর্ট পেতেই পারে, তবে যোগ্যতা ছাড়া সে টিমে ঢুকে নাই। ব্যাটিং স্টান্স আর শর্ট দেখলেই বোঝা যায় কোন ব্যাটসম্যানের মাঝে কি আছে। চাচার জন্য সে এশিয়া কাপের দলে ছিল এটা সবাই মনে রেখেছে কিন্তু কেউ মনে রাখলো না, এশিয়া কাপে বাংলাদেশের সেরা সাফল্যের অন্যতম রূপকার তামিম ইকবাল ছিল। পর পর ৪ ম্যাচেই সে ফিফটি করেছিল। আমাদের মত দলের জন্য ইংল্যান্ডে খেলা যেখানে অনেক টাফ ব্যাপার ছিল, তখন সে বাংলাদেশের হয়ে টানা দুই ম্যাচে সেঞ্ছুরী করেছিল এবং লর্ডসের অনার্স বুকে তার নাম লিখিয়েছিল বাংলাদেশের রিপ্রেজেন্টেটর হিসেবে। গত ওয়েস্টইন্ডিজ সিরিজে সবাই বাজে খেললো , তামিম রান করেছিল। কিন্তু দল হারায় এবং ম্যাচের টাইমে বাংলাদেশের মানুষজন ঘুম থাকার ফলে তার রান নিয়ে কেউ কিছু বলেনি। সর্বশেষ জিম্বাবুয়ে সিরিজে টানা দুইম্যাচে সেঞ্ছুরী করেও সাকিবের সাফল্যে পর্দার পিছনেই রয়ে গেল। ইনজুরির কারণে সে দেশে প্র্যাক্টিস তো করেইনি , দলের সাথেও অস্ট্রেলিয়া যেতে পারেনি। অস্ট্রেলিয়া পৌছানোর পর অল্প কদিন পায় প্র্যাক্টিসের জন্য এবং পাকিস্তানের সাথে প্রস্তুতি ম্যাচেই করে ৮২ রান, যা ছিল ইনজুরি থেকে ফেরার পর তার ফাস্ট ম্যাচ। স্কটল্যান্ডের সাথে ৯৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেও লাইমলাইটে তো ছিলই না এমনকি ম্যান অফ দা ম্যাচ ও জুটলো না। এই হলো আমাদের তামিম ইকবাল, যাকে আমরা সকালে একবার, বিকালে একবার, রাতে ঘুমানোর আগে একবার নিয়ম করে গালি দিলে মনে শান্তি পায়।
মাহমুদুল্লাহ রিয়াদঃ
তাকে নিয়ে আসলে বলতে গেলে কথা ফুরাবে না। তাই অত বেশি বলবো ও না। আমরা যদি আজ অস্বীকার করি তবে বেশ ভুল হবে যে, রিয়াদ নিরবে পারফর্ম করে গেছে সবসময়। তার অপরাধ হলো সে মুশফিকের ভায়রা ভাই ! প্রত্যেক প্লেয়ারের মত রিয়াদের অফ ফর্ম আসলো এবং আমরা ঘোষণা করে দিলাম রিয়াদ ভায়রা ভাই কোটায় দলে খেলে। একটু মনে রাখিনি, এই রিয়াদ আমাদের অনেক খেলায় পথ দেখিয়েছে। ওয়েস্টইন্ডিজকে হারিয়ে সিরিজ জেতা ম্যাচে এই রিয়াদের ব্যাটে চড়েই আমরা জিতে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের আসা যাওয়ার মিছিলে এই রিয়াদই খালি হাল ধরতো। অসাধারণ প্রতিভা থাকার পরও রিয়াদকে খেলতে হতো লোয়ার ওর্ডারে যেখানে সে সঙ্গী হিসেবে পেত বোলারদের। নতুন কোচ আশার পর হয়তো বুঝতে পারলো ওটা রিয়াদের আসল জায়গা না। তিনি রিয়াদকে টপ ওর্ডারে খেলিয়ে দেখলো টেস্টে। ওখানে রিয়াদের সাফল্যে, বাধ্য হয়েই তাকে ওয়ানডে দলেও টপ ওর্ডারে ব্যাট করতে দেয়া হলো। এটা সে ভায়রা ভাই কোটাই পাইনি। নিজ যোগ্যতায় পেয়েছে। এবং সে পর্দার আড়াল থেকেই রান করে যাচ্ছে এখনো। সবাই যদি গেইল হয়, তবে রাহুল দ্রাবিড় কে হবে? রিয়াদ রানের তুলনায় বল বেশি খরচ করলেও আমাদের “দি ওয়াল” এর কাজটা খুব ভালভাবেই করে যাচ্ছে। এই হলো আমাদের সেই মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, যাকে আমরা টিমের বোঝা বানিয়ে ফেলেছিলাম কথার তুরিতে।
আমাদের সমস্যাগুলো এবং সমাধানঃ
টিমের বেস্ট ব্যাটসম্যানরাই সাধারণত ওপেনার হয়ে থাকে কারণ ওয়ানডে ক্রিকেটের সেরা বলগুলো প্রথম ১০-১৫ ওভারেই হয়ে থাকে। আর সেই ওভারগুলো সামলানোর দায়িত্ব ওপেনারদের উপর বর্তায়। আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন, ক্রিকেটের সেরা টিমের সেরা ওপেনারেরাও ব্যার্থ হয় ঐ সময় উইকেট বাঁচাতে। এটাই স্বাভাবিক। এটা অস্বাভাবিক শুধু মাত্র “তামিম ইকবাল” নামক মানুষটার ক্ষেত্রে! কারণ সে চাচা কোটায় খেলে!
তামিম রিয়াদের মতো ব্যাটসম্যানরা একদিনে তৈরি হয় না। এদের পিছনে ক্রিকেট বোর্ড, কোচদের অনেক শ্রম এবং সময় দিতে হয়। আর একেকটা তামিম-রিয়াদ তৈরি হতে ৫-৬ বছর লেগে যায়। আমাদের ক্রিকেট স্ট্রাকচার এমন না যে, আমরা চাইলেই বাদ দিয়ে দিতে পারি বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা সেই ক্রিকেটারদের। অস্ট্রেলিয়া,ইন্ডিয়া টিমে অনেকগুলো বিকল্প প্লেয়ার আছে। তারা চাইলেই বিকল্প খেলাতে পারে। আমাদের সেই সুযোগ কয়? কোথায় পাব আমরা মূল্যবান সেই অভিজ্ঞতা আর ওয়ার্ল্ডক্লাস প্লেয়ার? গেইল, কোহলি ম্যাচের পর ম্যাচ রান না পেলে কোন কথা উঠেই না। কারণ, অন্য কেউ পারফর্ম করে জিতিয়ে দিচ্ছে ।কথা তখন উঠে যখন টিম ম্যাচ হারে। আর আমাদের টিমে পারফরমারের সংখ্যা কম হওয়ায় আমরা নির্দিষ্ট কিছু প্লেয়ারের উপর সবসময় আশা করে বসে থাকি। পুরো টিম যখন আমাদের হতাশা উপহার দেয়, তখন আমরা বলির পাঁঠা বানায় নির্দিষ্ট সে সব প্লেয়ারকে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, একেবারেই ভুল বলছি না আমি।অফ ফর্মে সমর্থকদের সাপোর্ট এবং ফর্মে ফেরার জন্য সুযোগই পারে প্লেয়ারদের দ্রুত ফর্মে ফেরাতে। এছাড়া ক্রিকেট বোর্ডের উচিত ক্রিকেটের স্ট্রাকচারে কিছু পরিবর্তন আনা যাতে ফাস্ট ক্লাস ম্যাচ থেকেই সাকিবের মত ওয়ার্ল্ডক্লাস প্লেয়ার উঠে আসে।
আমাদের সামর্থ্য এবং যোগানের কথা আমাদের সবসময় মাথায় রাখতে হবে।যে প্লেয়ারগুলো লাল-সবুজের পতাকা রিপ্রেজেন্ট করছে, যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের জন্যে ঝাপিয়ে পড়ছে, যারা হারার পর কান্নায় ভেঙে পড়ছে দেশকে জয় উপহার দিতে পারেনি বলে, আসুন তাদের অতিরিক্ত সম্মান দিতে না পারলেও প্রাপ্যসম্মানটুকু অন্তত দিতে শিখি।
এবার প্রত্যাশার ফানুস একটু বড় করার পালা। আমরা শেষ পর্যন্ত যেতে চাই। সম্ভব হলে কাপ বাংলাদেশেই নিয়ে আসতে চাই। ১৯৯৬ এ শ্রীলংকা ‘অখ্যাত টিম’ হয়ে পারলে আমরা কেন পারবো না ওয়ার্ল্ডকাপ জিততে? বিশ্বাস করতে শিখতে হবে, আমরাও পারবো।

পরিবর্তন আসবেই।

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/anik/32540.html



মন্তব্য করুন