অনিক-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

শিরোনামহীন ভালোবাসা

লিখেছেন: অনিক

আজ রাতটা আমার শেষ রাত পৃথিবীতে। ধরে নিলাম বিস্তৃত এই কালো আধার আজ শেষ বারের মত আমাকে ঢেকে দিবে। হইতো সমুদ্রের বিশাল ঢেউ ও আসবে আমাকে শেষ বিদাই দিতে। হতে পারে, নীল আকাশের মেঘেরা আজ বৃষ্টি হয়ে ঝরবে শেষবারের মত আপন অশ্রু জলে আমার নয়ন মুছে দিতে।

- সীমান্ত… এই সীমান্ত …

- কি হল? এতো চেঁচাও কেনো? আসছি।

ডায়েরীতে সে যখনি কিছু লিখতে যাই কিছু না কিছু বাধা আসবেই, যার কারণে এখন পর্যন্ত কোন কিছুই পুরো লিখা হইনি। মাঝে মাঝে সে নিজের ডায়েরী পড়েই কনফিউজড হই। টপিকটা মনে করতে পারে না। এই ডায়েরীর একটা নাম দিয়েছে সে। “বিলুপ্ত স্মৃতি”

- কেন ডাকছো ?

- তোর কি ফেইসবুক আছে?

- হটাৎ এই প্রশ্ন কেন, মা?

- তনিমার থেকেই শুনলাম , সত্য জানতেই জিজ্ঞাসা করছি?

- হ্যা আছে। তনিমাকে স্পাই না রেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেই তো পারতা।

- তুই আর এইসব করবি না।

- মানে ?

- মানে ফেইসবুক বন্ধ।

- মা, কি হয়েছে বলবা তো?

ডং ডং ডং ডং ডং ডং ডং ডং । ঘড়ির কাটা ৮ টার ঘরে এসে পৌছেছে। সীমান্তের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই

তিনি নিজ রুমে চলে গেলেন। সীমান্তের মাথাই কিছুতেই ঢুকছে না কি কারণ হতে পারে এর পিছনে। তনিমাকেই জিজ্ঞেস করা যাই। তনিমারা থাকে চার তলার প্রথম ঘরটাই। ১৫ বছর ধরে তারা আমাদের বাসাই ভাড়াই থাকে। মনে হয় আজীবন থাকার প্ল্যান করে ফেলেছে।

অনেক দিন ধরেই ওদের বাসার বেল নষ্ট, আর তা জেনেও সীমান্ত প্রথম বার সুইচ টিপ দেই। এরপর দরজা বারি দিবে। বদভ্যাস। দুবার বারি দিতেই তনিমা দরজা খুললো।

- কখন আসছিস তুই?

- বিকেলে। কেমন আছিস ?

- ভালই। তুই?

- খারাপ না। তনিমা, মার সাথে তোর লাস্ট কখন কথা হলো?

- কাল সন্ধ্যাই তোকে খুজতে বাসাই গেলাম, তখন কথা হল। আন্টি বললো তুই ঢাকাই।

- আমাকে বিপদে ফেলে তোর কি লাভ? মাকে বলতে গেলি কেনো আমি ফেইসবুক ইউজ করি? আরো উলটা পালটা বুঝিয়েছিস নিশ্চয়।

- আমি কি জানি নাকি যে আন্টি জানে না? আমি বলছি, কই ফেইসবুকে তো ঢাকা যাওয়ার ব্যাপারে কিছু বললো না। আর তখনি আন্টির জেরার শিকার হলাম। মনে হচ্ছিলো, ২ টা খুনের আসামি আমি। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

- তুই একটা কুফা । বুঝলি? আমি কি সবাইকে বলে বলে ফেইসবুক ইউজ করবো? মা আমাকে ফেইসবুক ইউজ না করতে বলছে। এটা একটা কথা হল, বল?

- মা বড় না আরেক জনের বৌ বড় ?

- ফাইজলামি করবি না । গেলাম।

নিজের রুমে ঢুকেই চোখ কপালে উঠলো তার। টেবিলের উপরে সাদা কাগজে মার হাতের লিখা চিঠি!

” সীমান্ত , আমি জানি তুই আমার কথা ফেলবি না। ভাবছিস, তোর মা কেনই বলছে এমন। ছেলে হারানোর বেদনা এক মা’ই বুঝে । আমার দুই ছেলের এক জনকে হারিয়েছি গত ফেব্রুয়ারীতে। সে ও ফেইসবুক ইউজ করতো, তুই জানতি শুধু আমিই জানতাম না। জানলে হইতো আজ তাকে হারাতেও হত না। দেশপ্রেমে বুদ ছিলো। মাথাই লাল সবুজের পতাকা বেধে বেরিয়ে পড়তো । তোর কিছুই তো অজানা না। বাবা, ফেইসবুকে বন্ধুর তুলনায় শত্রু বেশি হয়। আমি আমার বড় ছেলের সাথে ঘটা ভুল তোর সাথে হতে দিব না। তুই ঐ অবিশপ্ত ফেইসবুক আর চালাবি না। ভাবিস না, ব্যগ গুছিয়ে চলে যাইনি। আমি তোর ভাইয়ার কবরে যাচ্ছি। দূর হতে একবার জিজ্ঞেস করবো, আঁধার ঘরের মায়া কি আমার চেয়ে বেশি টানে তাকে ?? ”

সীমান্ত এতক্ষণে বুঝে গেলো সব। বাবাকে সে দেখেই নি। তার জন্মের আগেই রোড এক্সিডেন্টে মারা যান তিনি। যখন থেকে বুঝতে শুরু করলো এক মাকেই দেখছে সংসারের হাল ধরে আছে। ভাইয়া , আমি আর মা । আমাদের ৩ জনের ছোট এই পরিবারে বাবা হারানোর বেদনা ছাড়া আর তেমন কোন কষ্ট ছিলই না। থাকবে কিভাবে?? মা বুঝতেই যে দিত না কিছু…

সীমান্তের চোখে তখন নোনা জল… আজ রাতের গহীনে ছল ছল করে ঝরে পরছে এই জল…

ভাইয়া চলে যাওয়ার পর আমি ছাড়া মার আর কেউ নেই। আর আমি কিনা একটি বার সেই মার কথাই না ভেবে আত্মহত্যার পথই বেছে নিয়েছি?? একটি মেয়ের জন্যে, যে কিনা আমার চোখ গলিয়ে সুখের সংসার করছে আরেকজনের সাথে? কাকে বিশ্বাস করবো ? কেনই বা করবো? কেঊ যে কথা রাখে না। কেউ কথা রাখে না…

সীমান্ত ডায়েরী হাতে নেই। আজ সে লিখাই পুর্ণতা দিবে।

আজ রাতটা পৃথিবীতে আমার শেষ রাত হতে পারতো। বিস্তৃত এই কালো আধারে আজ শেষ বারের মত তোমাকে ভালবাসবো। হইতো সমুদ্রের বিশাল ঢেউ ও আসবে আমাকে সান্ত্বনা দিতে। হতে পারে, নীল আকাশের মেঘেরা আজ বৃষ্টি হয়ে ঝরবে শেষবারের মত আপন অশ্রু জলে আমার নয়ন মুছে দিতে।

বেঁচে থাকা মানেই বেঁচে থাকা নয়। তবু কিছু মানুষকে শিখরের টানে বেঁচে থাকতে হয়। আমিও সেই কিছু মানুষের অংশ এখন। ভার্চুয়েল জগতের পাট চুকিয়ে যাবে আজ এই আঁধারে। আমার স্ট্যাটাসে আর ঝড়ে পরবে না বেদনার আভা। কেউ বলবে না, ‘আর কত?’

মাগো তোমায় কখনো মুখ ফুটে বলা হয়নি- ভালবাসি।

কেমন জানি একটা জড়তা কাজ করে…লজ্জা লজ্জা লাগে

কত বার যে বলতে চেয়েছি…পারিনি।

আমার না বলা এই ভালবাসার কথাটা তুমি নিজ থেকে বুঝে নিও।

আমার অক্ষমতা তোমার চেয়ে কেই বা বেশি বোঝে…মা………

০৫.০৬.২০১৩

-সীমান্ত

ডায়েরী বন্ধ করার আগেই সীমান্ত কাধে হাতের ছোয়া অনুভব করলো। পিছন ফিরে দেখে মা দাঁড়িয়ে আছে তার কাঁধে হাত রেখে। দুচোখ যেনো তার হীরের ন্যায় উজ্ঝল। কাঁদলে মানুষকে এত সুন্দর লাগে?!! সীমান্ত আজ আরেকটি বার হেরে গেলো অকৃত্রিম ভালবাসার কাছে। নিজেকে সমর্পন করলো মায়ের আচলে। ছোট বেলায় ভয় পেলে যেই সীমান্ত জড়িয়ে ধরতো মাকে, আজ সেই সীমান্তই যেন ফিরে এল। মাকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ কাঁদতে লাগলো সে।

প্রকৃতি আজ উপভোগ করছে অশ্রু-সজল ভালবাসার অকৃত্রিম নিদর্শন।

আগামীকাল আবার ভোর হবে, তবে একটু অন্যরকম। :)

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/anik/22500.html



মন্তব্য করুন