অনিক-এর ব্লগ

প্রিন্ট প্রকাশনা

সিমি, আমি লজ্জিত

লিখেছেন: অনিক

আমার বদভ্যাস হল টিবি দেখতে বসলে রিমোটের ১২ টা বাজানো । ১ থেকে ১০০ নাম্বার চ্যানেল ঘুরাঘুরি শেষে, আবার ১০০ হতে উলটা ১ এ …
স্বভাববসত কাল সন্ধ্যাই ও তাই করতেছিলাম। এক পর্যায়ে চ্যানেল আইয়ে এসে থেমে যাই …

তখন চলছিলো ‘ ক্রাইম স্টোরি ‘ । এই ধরণের শো অনেক দেখেছি আগে, তবে গতকালের মত এতটা দাগ কাটে নি মনে।
কাহিনি টা ছিলো একটা মেয়ের। সে নারায়ণগঞ্জ চারুকলার ছাত্রী। বাবা স্কুল শিক্ষক আর মা গৃহিণী। চারুকলার ছাত্রী সিমির পড়ার খরচ জোগার হয় বিভিন্ন জায়গাই আলপনার কাজ করে। তাই কখনো কখনো বাসাই ফিরতে সন্ধ্যার পর হয়ে যাই। পরিবার কখনো তার বাধা হয়ে উঠে নি , বাধা হয়ে উঠলো আমাদের সমাজ ব্যবস্থা আর বখাটে কিছু ছেলে।
এক সন্ধ্যাই বাড়ি ফিরছিল সিমি , সাথে ছিলো এক বন্ধু। কথা বলতে বলতে কিছুদুর যেতেই সামনে এসে দাঁড়ালো বখাটে ছেলে গুলো। প্রভাব খাটিয়ে বলতে থাকে, ‘ বলেছিলাম না সন্ধার আগে বাসাই ফিরতে? আর এইটা কি নতুন কালেকশন? পাড়াই একেক দিন একেক ছেলে নিয়া রঙ্গ চলছে? মাগি কোথাকার। যা বাসাই যা। ‘
সিমি চর দিয়ে বসলো ছেলেটির গালে। সে ঘুণাক্ষরে ভাবেনি এর পরিণতি কি হতে পারে। শুধু এতটা জানে, অন্যায় এর প্রতিবাদ সে করতে পারে।
সেদিন হতে শুরু হয়ে গেলো সমাজের নষ্ট খেলা। ঐ বখাটেরা পথে ঘাটে পথ রুখে দাড়াই , আজ ওড়না কেড়ে নেই তো পরশু বাজে প্রস্তাব দেই। পাড়ার সকলের কাছে বোঝাল এনায়েত সাহেবের মেয়ে একটা মাগি। আর আমাদের সমাজের সেই মুরুব্বিরা বখাটের বিচারের চেয়ে মাগির বিচারে সোচ্চার বেশি। পুলিশ, পাড়ার সালিশ সবই বখাটেদের হাতে। সিমির হাতে শুধু বাবা-মায়ের অকৃত্রিম ভালবাসা।
পাড়ার মুরুব্বিরা সিমির বাবাকে নিজ বাসাই সালিশ ডাকতে বলে। এনায়েত সাহেবকে অসহায় দেখাল তাদের সামনে। তিনি তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিল।
ওইদিকে সিমি ভাবল বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা দরকার। কিন্তু ঈদের ছুটি থাকাই সে কাউকেই পেলো না পরিচিত সেই জায়গা গুলোতে। সিমি পৃথিবীর অন্ধকার রাস্তার পথেই যেনো হাটছিল…
যথারীতি সিমির বাসাই সালিশ বসলো। পাড়ার মুরুব্বিরা মত দিল , এই ধরণের মাগি বাসাই থাকার চেয়ে বিষ খেয়ে মরে যাওয়াই ভাল। পাড়ার মান সম্মান বজাই থাকবে।
হেনস্থার শেষ পর্যায়ে সিমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। এনায়েত সাহেবের স্ত্রী মুরুব্বিদের পায়ে পরলো, দয়ে করে আমার মেয়েকে ঘর থেকে বের করে আনেন। কান্নার হাহাজারি শুনেও পাষাণ দের বুকে জল এলো না। লাথি দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।

সিমি জানে সে কি করতে যাচ্ছে। সে আর পারছে না লড়াই করতে। গাছে দেয়ার জন্যে আনা কীট নাশককে সে বেছে নেই পুরষ নামক পায়ের কীট গুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শেষ ভাষা হিসেবে। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখলো সে। চারুকলার ক্র্যাচ বুক শেষ বারের মত দেখে নিলো সে। ভাবতে লাগলো ছোট বেলা হতে এখন পর্যন্ত সব স্মৃতি। বাবা মাকে একবার দেখেই আর চোখ খুলে হাতে নিল সেই বিষ। গদ গদ করে মুখে দিল তা যেনো অমৃত পান করছে সে। তারপর…

সিমির বাবা মা দরজা ভেঙ্গে ঢুকলো , কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। সিমি আর নেই…..

সিমি আত্মহত্যা করেছে কি? নাকি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল আমাদের নষ্ট সমাজ ব্যবস্থা , পুরুষ তান্ত্রিক সমাজে ঘৃণিত বখাটেপনা…?

এভাবেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে অন্যায়ের লালন পালন… বিনিময়ে ঝড়ে যাচ্ছে আমার এক একটি বোনের জীবন…

সিমি, আমি লজ্জিত…

এ লেখার লিংক: http://projonmoblog.com/anik/21846.html

 2 টি মন্তব্য

  1. অসামাজিক

    কিছু বলার নাই, আমি লজ্জিত, আমাদের স্মাজের হয়ে আমি ক্ষমা চাইবার যদি একটা সুযোগ পাইতাম…………।।

  2. সাজেদুর

    শুধু লজ্জিত বলে চুপ করে সহ্য করাটাও কি অপরাধ নয়? আমরা বড় বেশী সহনশীল; এতটা সহনশীল হওয়া মনেহয় উচিত নয়। অন্যায় বন্ধ করার জন্য অন্যায় করাটা কি খুব বেশী অন্যায় হবে? অপেক্ষায় আছি বহুদিন ধরে, শুধু মাত্র একটি ‍সুযোগের অপেক্ষা…..

মন্তব্য করুন